ই-পেপার বিজ্ঞাপনের তালিকা মঙ্গলবার ১৮ জানুয়ারি ২০২২ ৪ মাঘ ১৪২৮
ই-পেপার মঙ্গলবার ১৮ জানুয়ারি ২০২২
http://www.shomoyeralo.com/ad/Amin Mohammad City (Online AD).jpg

ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন : বর্জ্য অব্যবস্থাপনা চরমে
ফয়সাল খান
প্রকাশ: রোববার, ৫ ডিসেম্বর, ২০২১, ১০:৪২ এএম | অনলাইন সংস্করণ  Count : 185

ঢাকার দুই সিট করপোরেশনের ময়লা সংগ্রহ থেকে শুরু করে ডাম্পিং পর্যন্ত প্রতি ধাপে নানা অব্যবস্থাপনায় নাগরিকদের ভোগান্তি বেড়েই চলেছে। বিভিন্ন উদ্যোগ নিলেও এখন পর্যন্ত টেকসই ও সুশৃঙ্খল বর্জ্য ব্যবস্থাপনা গড়ে তুলতে পারেনি প্রতিষ্ঠান দুটি। সম্প্রতি বর্জ্যবাহী গাড়িচাপায় বেশ কয়েকজন নাগরিক হতাহতের ঘটনায় সিটি করপোরেশনের ময়লা পরিবহনের বেহাল চিত্র সামনে চলে আসে। 

দেশের সিটি করপোরেশনগুলোর মধ্যে সবচেয়ে ক্ষমতাধর ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন শহরের ময়লা সংগ্রহ করে বৈধ চালক দিয়ে তা ল্যান্ডফিলে নিয়ে যাওয়ার মতো সক্ষমতাই এখনও অর্জন করতে পারেনি। বৈধ চালক ছাড়া ময়লার গাড়ি না চালানোর সিদ্ধান্তের পর রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় ময়লা-আবর্জনার স্তূপ দেখা যাচ্ছে। অনেক এলাকার সেকেন্ডারি ট্রান্সফার স্টেশনেও (এসটিএস) দু-তিন দিন ধরে  ময়লা পড়ে থাকায় দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। ল্যান্ডফিল ভরাট হয়ে ব্যক্তিমালিকানাধীন জায়গায় ময়লা ছড়িয়ে পড়ছে। এ ছাড়া বাসাবাড়ি থেকে বর্জ্য সংগ্রহেও নানা অব্যবস্থাপনা রয়েছে। এলাকাভেদে ময়লার জন্য বাড়তি টাকা আদায়ের অভিযোগ অনেক পুরনো।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন এলাকায় প্রতিদিন প্রায় ৭ হাজার মেট্রিক টন বর্জ্য উৎপন্ন হচ্ছে। এর মধ্যে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) মিলে পাঁচ থেকে সাড়ে পাঁচ হাজার মেট্রিক টন বর্জ্য সংগ্রহ করে বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় ল্যান্ডফিলে নিয়ে যাচ্ছে। বাকি বর্জ্য রাস্তাঘাট, খালবিল ও নদীতে পড়ে থাকছে। এমনকি পুরান ঢাকার বিভিন্ন এলাকার বাসাবাড়ি থেকে বর্জ্য সংগ্রহ করে তা বুড়িগঙ্গায় ফেলে দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে বেসরকারি বর্জ্য সংগ্রহ কাজে নিয়োজিত প্রাইমারি ওয়েস্ট কালেকশন সার্ভিস প্রোভাইডার (পিসিএসপি) সংস্থার বিরুদ্ধে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, এক সময় এলাকাভিত্তিক বিভিন্ন সংগঠন বাসাবাড়ি থেকে বর্জ্য সংগ্রহ করত। এরপর সিটি করপোরেশন একটি চুক্তির আওতায় পিসিএসপির মাধ্যমে বর্জ্য সংগ্রহ করছে। পিসিএসপির কর্মীরা বর্জ্য সিটি করপোরেশন নির্ধারিত স্থানে রেখে যায়। সেখান থেকে ময়লার গাড়ি এসে তা ল্যান্ডফিলে নিয়ে যায়। এর মধ্যে বাসাবাড়ি থেকে বর্জ্য সংগ্রহের ক্ষেত্রে নাগরিকদের নানা অভিযোগ রয়েছে। অনেক এলাকার একটি বাসা থেকে প্রতি মাসে ১০০ থেকে শুরু করে ৩০০ টাকা পর্যন্ত নেওয়া হচ্ছে। বিভিন্ন বাণিজ্যিক স্থাপনা থেকে দুই থেকে তিন হাজার টাকা আদায়েরও অভিযোগ রয়েছে। প্রাথমিক বর্জ্য সংগ্রহে শৃঙ্খলা আনতে এরই মধ্যে দুই সিটি করপোরেশনই মাসিক ফি নির্ধারণ করে দিয়েছে। কিন্তু মাঠ পর্যায়ে পিসিএসপির কর্মীরা তা মানছে না।

এক হিসাবে দেখা গেছে, প্রতিবছর ১০০ থেকে ১৫০ কোটি টাকা বর্জ্য সংগ্রহ বাবদ কর আদায় করেছে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন। গৃহকরের সঙ্গে ময়লা পরিষ্কার বাবদ টাকা দিয়ে ফের বর্জ্য সংগ্রহের জন্য মাসিক ফি দিতে হচ্ছে নাগরিকদের। বাসাবাড়ি, রেস্তোরাঁ ও রাস্তার ময়লা নির্ধারিত স্থানে ফেলার পর সেখান থেকে ট্রাকে করে নিয়ে যাওয়া হয় ল্যান্ডফিলে। এজন্য সিটি করপোরেশনের পর্যাপ্ত গাড়ি থাকলেও নেই চালক। পরিচ্ছন্নতাকর্মী ও পিয়নসহ অদক্ষ চালক দিয়ে গাড়ি পরিচালনা করা হচ্ছে। ফলে প্রায়ই ঘটছে দুর্ঘটনা। সম্প্রতি ময়লার গাড়িচাপায় নটর ডেম কলেজের এক শিক্ষার্থীসহ দুজন নিহত হয়েছে। এ ছাড়া বৃহস্পতিবার ময়লার গাড়িচাপায় মোহাম্মদপুরে এক নারী আহত হয়েছেন।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এরই মধ্যে দুই মেয়র সিটি করপোরেশনের পরিবহন বিভাগে শৃঙ্খলা আনতে নানা উদ্যোগ নিয়েছেন। কিন্তু সিটি করপোরেশনের বিদ্যমান জনবল কাঠামোতে এতসংখ্যক চালক নিয়োগ দেওয়ার সুযোগ নেই। কেননা ডিএসসিসির গাড়ি রয়েছে ৬০৯টি। অথচ অর্গানোগ্রামে চালকের পদ রাখা হয়েছে মাত্র ১৯৩টি। জনবল কাঠামো সংশোধন করে চালক নিয়োগ করা অনেক দীর্ঘ প্রক্রিয়া।
তবে ঢাকা ডিএনসিসির মেয়র বিআরটিএ’র মাধ্যমে চালকদের প্রশিক্ষণের ঘোষণা দিয়েছেন। এরই মধ্যে চালকদের নিয়ে সভাও করেছেন তিনি। আর দক্ষিণে অন্যজনকে দিয়ে গাড়ি চালানোর অভিযোগে এক চালককে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। তাদের এ অভিযান চলমান থাকবে বলে জানিয়েছেন কর্মকর্তারা।

এদিকে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের দুটি ল্যান্ডফিলই মেয়াদোত্তীর্ণ। অবিভক্ত ঢাকা সিটি করপোরেশনের মাতুয়াইল ল্যান্ডফিলের মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা ছিল ২০১৬ সালে। আমিনবাজার ল্যান্ডফিলের মেয়াদ নির্ধারণ করা হয় ২০১৭ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত। ১৯৯০ সালে মাতুয়াইলে ময়লা ডাম্পিংয়ের জন্য ৫০ একর জমির ওপর ল্যান্ডফিল তৈরি করে তৎকালীন ঢাকা সিটি করপোরেশন (ডিসিসি)। তখন ঢাকার জনসংখ্যা ছিল ৬৪ লাখ ৮৭ হাজার। জনসংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ায় ২০০৫-০৬ অর্থবছরে আরও ৫০ একর জমি অধিগ্রহণের মাধ্যমে সম্প্রসারণ করা হয়। একই অর্থবছরে আমিনবাজারে ৫০ একর জমিতে আরও একটি নতুন ল্যান্ডফিল তৈরি করা হয়। ২০০৭ সালে এখানে ময়লা ডাম্পিং শুরু হয়। সিটি করপোরেশন ভাগ হওয়ার পর আমিনবাজারের ল্যান্ডফিলটি ডিএনসিসি আর মাতুয়াইলেরটি ডিএসসিসি ব্যবহার করছে।

ডিএসসিসি সূত্রে জানা গেছে, মাতুয়াইল ল্যান্ডফিল ২০১৬ সালের মধ্যে ভরাট হওয়ার কথা থাকলেও সিটি করপোরেশন ভাগ হওয়ায় এখনও পুরোপুরি ভরাট হয়নি। তবে শিগগিরই এটি ভরাট হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। নতুন করে আরও ৮১ একর জমি অধিগ্রহণ কার্যক্রম প্রক্রিয়াধীন।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, ডিএসসিসি এলাকায় জনসংখ্যা প্রায় ১ কোটি। এর সঙ্গে নতুন করে যোগ হয়েছে আট ইউনিয়ন। যেখানে ডিএসসিসির ১৮টি ওয়ার্ড করা হয়েছে। নতুন এলাকায় প্রায় ২০ লাখ লোক বসবাস করছে। দিন দিন জনসংখ্যা আরও বাড়বে। বাড়বে বর্জ্যরে পরিমাণও। তাই ল্যান্ডফিল ভরাট হতেও বেশি সময় লাগবে না। একই অবস্থা হবে ডিএনসিসিতেও।

ডিএনসিসির আমিনবাজার ল্যান্ডফিলের অবস্থা আরও বেগতিক। সেখানে ল্যান্ডফিলের জায়গা ভরাট হয়ে আশাপাশের ব্যক্তিমালিকানাধীন জায়গায় ছড়াচ্ছে বর্জ্য। প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে নতুন করে জায়গা অধিগ্রহণের বিষয়টি এখনও প্রক্রিয়াধীন।

অন্যদিকে শুধু জমি অধিগ্রহণ করে ল্যান্ডফিল বৃদ্ধি করে এ সমস্যা থেকে উত্তরণ সম্ভব নয় বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। তাই বর্জ্যরে বিকল্প ব্যবহার নিশ্চিতে জোর দিয়েছে উভয় সিটি করপোরেশন। তা না হলে বর্জ্য নিয়ে মহাবিপদে পড়তে হবে।

অন্যদিকে বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে বিভিন্ন সময় সরকারের পক্ষ থেকে উদ্যোগ নেওয়া হলেও তা আলোর মুখ দেখেনি। ২০১২ সালে বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের একটি প্রকল্প হাতে নিয়েছিল স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়। ওই বছরের শেষদিকে ইতালিয়ান কোম্পানি ম্যানেজমেন্ট ইন্টার এনভায়রনমেন্ট ফিন্যান্সের (এসআরএল) সঙ্গে চুক্তি হয়। 

চুক্তি অনুযায়ী, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান প্রথম দেড় বছরে দুটি প্লান্টে ১০ মেগাওয়াট, দুবছরে ৩০ মেগাওয়াট ও তিন বছরে ৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনে যাওয়ার কথা ছিল। পরে এ প্রকল্পটি আর এগোয়নি। এরপর ডিএসসিসিকে বিভিন্ন সময় চীন, জাপান, মালয়েশিয়া, কোরিয়া, আমেরিকা, যুক্তরাজ্য ও ইইউসহ বিভিন্ন দেশ বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রস্তাব দেয়।

এ প্রসঙ্গে বক্তব্য নিতে ডিএসসিসির প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা সিতওয়াত নাঈমকে ফোন করা হলে তিনি কথা বলতে অপারগতা প্রকাশ করেন। তবে নাম প্রকাশ না করার শর্তে সংশ্লিষ্ট একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, প্রথম চুক্তি বাতিল হওয়ার পর আর কোনো প্রকল্পই হয়নি। বিভিন্ন দেশের প্রস্তাব পর্যালোচনা করার পর আর কোনো অগ্রগতির খবর তারা জানেননি।

এদিকে আমিনবাজার ল্যান্ডফিলে বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে এরই মধ্যে চীনের একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি করেছে ডিএনসিসি। এ প্রসঙ্গে ডিএনসিসির মেয়র মো. আতিকুল ইসলাম বলেন, আমিনবাজার এলাকায় ৪২ দশমিক ৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতাসম্পন্ন প্রকল্পটিতে প্রতিদিন ৩ হাজার মেট্রিক টন কঠিন বর্জ্য ব্যবহার করা হবে। এ লক্ষ্যে ইতোমধ্যে চীনের চায়না মেশিনারি ইঞ্জিনিয়ারিং করপোরেশনের সঙ্গে চুক্তি হয়েছে।

/জেডও/


আরও সংবাদ   বিষয়:  সিটি করপোরেশন   বর্জ্য ব্যবস্থাপনা  




সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত


ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: কমলেশ রায়, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড
এর পক্ষে প্রকাশক গাজী আহমেদ উল্লাহ
নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।

ফোন : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৭৫। ই-মেইল : [email protected]