ই-পেপার বিজ্ঞাপনের তালিকা মঙ্গলবার ১৮ জানুয়ারি ২০২২ ৪ মাঘ ১৪২৮
ই-পেপার মঙ্গলবার ১৮ জানুয়ারি ২০২২
http://www.shomoyeralo.com/ad/Amin Mohammad City (Online AD).jpg

বিজয়ের ৫০ বছর
শাফিয়া খাতুনের যুদ্ধদিনের স্মৃতি
জাকিয়া খান
প্রকাশ: রোববার, ৫ ডিসেম্বর, ২০২১, ১:৪৫ পিএম আপডেট: ০৫.১২.২০২১ ২:২৪ পিএম | অনলাইন সংস্করণ  Count : 294

একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ ওই সময়ের প্রতিটি মানুষের ওপর নানাভাবে প্রভাব ফেলেছে। কিন্তু গবেষণার ক্ষেত্রে গবেষকরা দেখা যায়, তারা পুলিশের কথা বলছেন, সেনাবাহিনীর সদস্যদের কথা বলছেন বা রাজনৈতিক কর্মীদের কথা বলছেন। সেখানে সাধারণ মানুষের উল্লেখ খুব কম। এ লেখায় সাধারণ মানুষের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরা হয়েছে। যুদ্ধদিনে শাফিয়া খাতুনের যুদ্ধ দিনের কথা লিখেছেন জাকিয়া খান 

আমার ষষ্ঠ সন্তান আগত। থাকি ঢাকার মিরপুরের সদুরবাড়ী গ্রামে। বাবার বাড়িও একই গ্রামে। ননদ এসেছিল শ্বশুরবাড়ির লোকজন নিয়ে। আরও অনেকে বাড়িতে এসে উঠেছেন। 

সদুরবাড়ীর প্রতিটি বাড়িতেই কেউ না কেউ এসে পালিয়েছিলেন। বৈশাখ মাস। খোলা চাঁছা হয়েছে, গোবরও দেওয়া হয়েছে। সরকারি চাকরিজীবী স্বামী পত্তন নিয়ে ক্ষেতও করতেন। ধান কেটে এনে ঘাটা দেওয়া হচ্ছে। এমন সময় মিলিটারি আসার খবরে আমরা পালাই বাড়ি থেকে। মেলারটেক পালাতে গিয়ে সঙ্গের একজনের বাচ্চা হয়ে যায়। 

শুরুতে দুদিন দৌড়ানি দেয় বিহারিরা। যাই নাই। তৃতীয়বার তুরাগ নদী পার হয়ে সিন্নিরটেক থেকে বাঘসাঁতরা গ্রামে আসে। সেখান থেকে কাউন্দিয়া ইউনিয়নের কাউন্দিয়া গ্রামে আসে, আগুন দেয়। মাঝের দুই বোনকে আগেই সাভারের কালামপুর গ্রামে পাঠানো হয়েছিল। মিরপুর পর্বতা সেনপাড়ায় কিছু মানুষ মারা হয়। মিলিটারির ভয়ে ওখানে থাকা বোনের শ্বশুরবাড়ির অনেকে আমার বাবার বাড়িতে এসে উঠেছিল। মা পর্দা করতেন। পঙ্গু ছোট বোনকে নিয়ে বাড়িতেই। ভাইয়ের বউ মানিকনগর বাবার বাড়িতে। যেদিন প্রথম নদীর ওই পাড়ে মিলিটারি আসে, ঘাটে নৌকা ছিল না। সবাই নৌকা তুলে রেখেছিল। অন্য জায়গায় গিয়ে চালাত পেট চালাতে। কালামপুর পালানোর সময় মাঝিরদা গ্রামে গিয়ে নৌকায় উঠি। দুবার দুই বাড়িতে পালাই। প্রথমবার বিহারি মিলিটারি সদুরটেক পর্যন্ত আসেনি। প্রতিরোধের মুখে আগায়নি। যেদিন মিরপুর বাজারে আগুন দেয়, সেদিন বের হই। যুবতী মেয়ে বউদের নিয়ে আতঙ্ক। বাজারপাড়া, বাগবাড়ী থেকে অনেকে পালিয়ে এসেছিলেন। দৌড়ানি খেয়ে মানুষ আরও দূরে চলে যায়। বোনের শ্বশুর-শাশুড়ি সেদিনই সাদুল্লাপুর চলে যান। 

ইত্তেফাকের আখতার উল আলম, যিনি লুব্ধক নামে লিখতেন, দুই ছেলে নিয়ে আমার বাবার বাড়িতে ছিলেন। তাকে ধরে নিয়ে যায় বিহারিরা। থাকতেন গোলারটেক। স্ত্রী আজিমপুর মেটারনিটির নার্স ছিলেন। মাকে অন্য বাড়িতে নেওয়ার আগে বাড়ির আশ্রয়প্রার্থীরা চলে যান। এত লোকের খাওয়া জোগাড় সমস্যা হয়ে পড়েছিল।

একদিন চাচাশ্বশুর বাইরে থেকে ফিরে বললেন, তোমরা বের হও। থাকতে পারবে না। আমি বান্দে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখি অনেক মানুষ। বাজানের ছাত্র রহমান মাস্টারকেও দেখি। উনার কাছে বন্দুক ছিল পারিবারিক সূত্রে। তহুরার বাবা মহিউদ্দীন তখন মেম্বার। লোকে মহুদ্দি মেম্বার বলত। উনি, ওপারের মান্নান খা গুলি করছেন ওপারের শত্রুপক্ষকে। বাড়িতে এত মানুষ। পুলের ওখানে বুড়িগঙ্গা দুভাগ হয়ে একটা আমাদের এদিকে, আরেকটা ইশারাবাজ হিজলার সামনে দিয়ে গেছে। ওই পারে চৈতমারটেক। মধ্যে কয়েকটা গ্রাম। নদী পার হয়ে শাশুড়ির বাবার বাড়ি চৈতমারটেক যাওয়া ঠিক হয়। গেলাম খালি হাতে। আমাদের প্রথম বের হওয়া এটা। দুই-তিন দিন থেকে ফিরে আসি। এত গুলির পরও কিছু মানুষ বড় বড় গাহি দা, বন্দুক নিয়ে বিহারিদের তাড়া করছিল। পিস্তল ছিল চেয়ারম্যানের বাড়িতে। আর কেউ পিস্তল ব্যবহার করতে পারে না। প্রায়ই বিহারি আসার খবর পাওয়া যেত। 

একদিন ভাই খোঁজ নিতে যায় পাড়ার নাসিরসহ। টিকালটেকের নামায় নামলে দুজনে দেখে অনেক মানুষ দৌড়াদৌড়ি করছে। কাউন্দিয়ার পর অল্প খোলা জায়গার পর কুমারবাড়ী গ্রাম। সেদিকে মানুষ দৌড়ে আসছে। কেমন আক্রমণের মতো। আগুন দিতে দিতে বিহারিরা কুমারবাড়ী গ্রাম থেকে আগাচ্ছিল। ভাইরা ঘুরে বাড়িতে আসার জন্য উঠতে চাইলে পেছন থেকে গুলি করে। গায়ে লাগেনি। এসে বারান্দায় শুয়ে পড়ে। মা সেদিন মানিকনগর যেতে রাজি হন। আহমেদ কবির তখন মেট্রিক পরীক্ষা দেবে। ও বন্দুক নিয়ে গুলি করার কারণে বিহারিরা আসতে পারেনি সেদিন। আগুন দেওয়ার জন্য আনা তেলের ড্রামে গুলি করলে তেল পড়ে যায়। পরে আহমদ যুদ্ধে যায়।

ছেলেমেয়ে নিয়ে বোনের পরিবারসহ বড় বোনের মেয়ের শ্বশুরবাড়ি কালামপুর গ্রামে যাই দুবার। একবার মে মাসের দিকে। আবার স্বাধীন হওয়ার আগে আগে। নিজেদের নেওয়া খাবারই খেতাম, বা কিনে খেতাম। স্বামী বাড়ির কাছাকাছি থাকতেন। মিলিটারি আসলে দৌড়ে পালাতেন কোথাও। অফিসে যেতে হতো। অপ্রস্তুত অবস্থায় পালাতে হয়েছিল বলে জিনিসিপত্র গুছাতে পারিনি। শাশুড়ি আর স্বামী মিলে গয়না রাখেন। পরে অনেককিছু আর পাইনি। বাবার বাড়ির কুয়ায় ফেলেন কিছু। পরে কুয়া থেকে পানের বাটা আর তুলতে পারেননি। কাচের জিনিস কুয়ার পাড়ে এখানে সেখানে রাখেন। মাটির নিচে রাখায় ভেতরে ফাটা ফাটা দাগওয়ালা প্লেট এখনও আছে। ওপরে ভালো। আমার খুব ক্রোকারিজের শখ ছিল। মাঝখানে কিছুটা স্বাভাবিক হলে বাড়ি ফিরেছিলাম। তৃতীয়বার বাড়ি ছেড়ে যাই বেরাইদ। স্বাধীনের পর দিন বাড়ি ফিরি। বড় জাও ফেরে বাবার বাড়ি থেকে। ননদ আর এক জা স্বাধীনের অনেক পরে আসে। ওখানে গোলায় ধান ছিল বলে থেকে গিয়েছিল। 

যেদিন আমার শ্বশুরবাড়িতে আগুন দেয়, আমরা কেউ নাই। শ্বশুরকে বেয়োনেট চার্জ করে। হাত দিয়ে থামাতে গেলে হাতটা ফেড়ে যায়। একটা চোখ আহত করে। পরে দুটো চোখই চলে যায়। সেলাই করানো হাত একটু বাঁকা হয়ে যায়। চেয়ারম্যানরাও পালিয়েছিলেন। আমাদের কাউন্দিয়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আব্দুল হাই মুসলিম লীগ করতেন। যুদ্ধে যোগ দেন নাই, বিরোধিতাও করেননি। অনেক মানুষকে সহযোগিতা করেন। পরে মুক্তিযোদ্ধারা তাকে উত্ত্যক্ত করতেন। সদুরবাড়ী, টিকালটেক, মেলারট্যাক এই তিন গ্রাম থেকে আমাদের গ্রামের কবিরাজ বাড়ির আহমদ কবির আর মেলারট্যাকের মুন্সিবাড়ির আগাখান মিন্টু ছিল ট্রেনিংপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধা।

গ্রামের ৪ জন মারা যান এক দিনেই। পেছন থেকে মিলিটারির গুলি খেয়ে। খলিফা বাড়ির উম্মুইরার বাবাকে গুলি করে মারে, যেদিন সদুরবাড়ীতে আগুন দেয়। নামার মধ্যে তুষা মহাজন, নয়া নামে তার এক চাচাতো ভাই, বয়রা বাশারসহ ক্ষেতে কাজ করা অনেক কামলাকে মারে। বৈশাখ মাস, খোলায় কাজ করছিলেন সবাই। যুদ্ধের আগে থেকেই এখানে হত্যা শুরু হয়। ওই পাড় থেকে কামান দাগলে অনেক বাড়ি ধ্বংস হয়। বাবার বাড়ির কামরাঙা গাছের কাণ্ড ভেঙে পড়ে। একটা বড় লোহার পাত পাওয়া যায়। সেটা দিয়ে আমার স্বামী দা বানায় পরে। বাশাট্টা নামে একটা জায়গা ছিল। বাঁশ ভাসিয়ে রাখে বলে বাশাট্টা। বাঁশের ওপরে বাঁশ বেঁধে মানুষ দূর-দূরান্তে পার হতো। সেগুলোতে করেই মিলিটারিরা এ পারে আসে। বাজারপাড়ায় আসে আগে। এখন আর বাঁশের টালি নদী দিয়ে আসে না, ট্রাকেই আসে। 

কত মানুষ কত জায়গা থেকে কত জায়গায় গেছে। কেউ ঢাকা থেকে ময়মনসিংহ, কেউ কুমিল্লা, কেউ কুষ্টিয়া। যার যার দেশে বউ-বাচ্চাসহ পালাতে যায়। সবাই ঢাকা ছেড়ে দূরে যেতে চেয়েছে। তখন মোহাম্মদপুর থেকে মিরপুর বিহারিপাড়া পর্যন্ত মাটির নিচে দিয়ে সুড়ঙ্গ ছিল। বিহারিরা সেটা দিয়ে চলাফেরা করত। আমি কিছু জিনিস আগে টের পাই মাঝেমধ্যে। বাড়িতে দুটো পাটনাইয়া ছাগল ছিল। একটা বাচ্চা পুরো লাল। সেই বকরির বাচ্চা নিয়ে বোনঝি জামাইয়ের সঙ্গে যাচ্ছি। পাহাড়ে উঠব। জীবনে পাহাড় দেখি নাই। এমন স্বপ্ন দেখলাম যুদ্ধের আগে। যুদ্ধের সময় সেই বোনঝি জামাইয়ের সঙ্গেই ছেলের হাতে বকরির বাচ্চা নিয়ে একজনকে পেটে আরেকজনকে কাঁখে নিয়ে কালামপুর যাই। সেখানে পাহাড় ছিল না। আরও একটা স্বপ্ন দেখি ’৬৯-এর দিকে। বাবার বাড়িতে আগে একটা সুপারি গাছ ছিল, গাছটা অনেকদিন ধরেই নাই। কিন্তু দেখি, সেখানে যেন গাছটা আছে। ওখান দিয়ে একটা উড়াজাহাজ এসে আগুনের গোলা ফেলল। পাতিল গলে গেল। 

মাঝে বাড়ি ফেরার পর পোড়ো বাড়ির বারান্দায় থাকতাম। কালামপুর গিয়ে সবার আমাশয় হয়। ভালো হচ্ছিল না। বাথরুমে যাওয়ার সময় ‘আঁও আঁও’ অদ্ভুত শব্দ। বকরির বাচ্চা নাকি বিড়াল বোঝা যাচ্ছে না। আল্লাহই বলে, না কি যে বলে। পুল থেকে গুলি করে অনেককে মারত মিলিটারিরা। মনে হয় তেমন কেউ। দেখা গেল এক মুক্তিযোদ্ধা কচুরিপানায় আটকে আছে। স্বামী, দেবর আর নাসিরের বাবা মিলে অল্প পোড়া দরজার পাট খুলে তাতে উলঙ্গ মানুষটাকে কাপড় ঢাকা দিয়ে শুইয়ে জামাইমারা চেয়ারম্যানের কাছে নেওয়া হয়। এমন নির্দেশনাই ছিল। স্বাধীনের কিছু আগের ঘটনা এটা।

লেখক : শিক্ষক




সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত


ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: কমলেশ রায়, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড
এর পক্ষে প্রকাশক গাজী আহমেদ উল্লাহ
নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।

ফোন : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৭৫। ই-মেইল : [email protected]