ই-পেপার বিজ্ঞাপনের তালিকা মঙ্গলবার ১৮ জানুয়ারি ২০২২ ৪ মাঘ ১৪২৮
ই-পেপার মঙ্গলবার ১৮ জানুয়ারি ২০২২
http://www.shomoyeralo.com/ad/Amin Mohammad City (Online AD).jpg

পঞ্চাশ বছরের রাজনীতি
মোহম্মদ শাহাবুদ্দিন
প্রকাশ: রোববার, ৫ ডিসেম্বর, ২০২১, ১:৪৯ পিএম আপডেট: ০৫.১২.২০২১ ১:৫৬ পিএম | অনলাইন সংস্করণ  Count : 160

বাংলাদেশ একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র। এ রাষ্ট্রের জন্ম ইতিহাস বড় সংগ্রামের। বড় বেদনার। বড় আত্মত্যাগের। লাখো মানুষের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত হয়েছে এদেশের মহান স্বাধীনতা। যে স্বাধীনতার বীজ রোপিত আছে ১৯৪০ সালের লাহোর প্রস্তাবে। প্রাচীন যুগে বাংলাদেশে কোনো অখণ্ড রাষ্ট্র বা রাজ্য ছিল না। বাংলার বিভিন্ন অংশে তখন বঙ্গ, পুণ্ড্র, রাঢ়, গৌড়, সমতট, হরিকেল প্রভৃতি জনপদ বা রাষ্ট্র গড়ে উঠেছিল। এ জন্য প্রাচীন বাংলা ভিন্ন ভিন্ন নামে খণ্ডে খণ্ডে বিভক্ত ছিল। আর্যপূর্ব যুগে বাংলা, আর্য যুগে বাংলা, মৌর্য ও গুপ্ত যুগে বাংলা, গুপ্ত পরবর্তী বাংলা, বাংলায় পাল বংশ, রাজ বংশ, সেন বংশ, সুলতানি আমল, দিল্লির সুলতানি আমলে বাংলা, বাংলায় তুর্কি শাসন, বাংলার স্বাধীন সুলতানি আমল, মুঘল আমল পেরিয়ে আসে ব্রিটিশ শাসনাধীনে বাংলাদেশ। তাই বাংলাদেশের স্বাধীনতার পটভূমিতে আছে ১৯৪৭ সালের দেশ ভাগ। ১৯৪৮ সালের ভাষা আন্দোলন। ১৯৪৯ সালের আওয়ামী মুসলিম লীগের জন্ম। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের চূড়ান্ত পরিণতি। বাংলা ভাষার জন্ম। ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্ট। ১৯৫৬ সালের সংবিধান। ১৯৫৮ সালের আইয়ুব খানের শাসন। ১৯৬২ সালের শিক্ষা আন্দোলন। ১৯৬৬ সালের ৬ দফা আন্দোলন। ছাত্রদের ২১ দফা আন্দোলন। ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থান। ১৯৭০ সালের নির্বাচন এবং ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ।

১৯৭১ সালের ৭ মার্চ। রেসকোর্স ময়দানে বিশাল জনসভা। ভাষণ দেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। ভাষণের শেষ অংশে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বলেন, ‘প্রত্যেক গ্রামে, প্রত্যেক মহল্লায়, আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে সংগ্রাম পরিষদ গড়ে তোল এবং তোমাদের যা কিছু আছে তাই নিয়ে প্রস্তুত থাক। মনে রাখবা, রক্ত যখন দিয়েছি, রক্ত আরও দেব- এদেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়ব, ইনশাল্লাহ। এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’ জয় বাংলা।

বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের এই ভাষণের পর পাকিস্তান সরকারের ভিত নড়ে যায়। কেঁপে ওঠে ইয়াহিয়া খান, জুলফিকার আলী ভুট্টোসহ সবাই। ২৫ মার্চ ইতিহাসের এক তমসাক্লিষ্ট ভয়াল অশুভ ক্ষণ। বাংলার বুকে নামে কালরাত। এই রাতে নিরস্ত্র বাঙালির ওপর অতর্কিতে হামলা করে হানাদার পাকিস্তানিরা। নির্মমভাবে হত্যা করে ৫০ হাজারেরও বেশি ঘুমন্ত মানুষকে। অসহযোগ আন্দোলনের ২৫তম এই দিনে দেশের সর্বত্র শোকের কালো পতাকা ওড়ানো হয়। পাশাপাশি ওড়ে স্বাধীনতার লাল-সবুজ পতাকা। সারা দেশে সভা-সমাবেশ-শোভাযাত্রা-মিছিল-মিটিং চলে। সে রাতে হাজার হাজার নিরস্ত্র অসহায় বাঙালি শহীদের রক্তে লাল হয় শ্যামল বাংলার সবুজ মাটি। নির্মম হত্যাযজ্ঞে মেতে ওঠে পাকিস্তানি সেনারা। ঘুমন্ত নিষ্পাপ শিশু-কিশোর, নারী, বৃদ্ধ-বৃদ্ধা কেউ রেহাই পায়নি তাদের বর্বর নিষ্ঠুরতা থেকে। মানবতা লঙ্ঘন ও বর্বরতার এক ঘৃন্যতম দৃষ্টান্ত স্থাপিত হয় বাংলার বুকে। পাকিস্তান সামরিকজান্তা অজস্র সাধারণ বাঙালি নাগরিক, ছাত্র-ছাত্রী, শিক্ষক, বুদ্ধিজীবী, সাংবাদিক, পুলিশসহ সাধারণ মানুষ হত্যা করে। পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী পূর্ব পাকিস্তানে বাঙালি নিধনে ঝাঁপিয়ে পড়ার পরিণামে একটি জনযুদ্ধের আদলে স্বাধীনতা যুদ্ধের সূচনা ঘটে। 

২৫ মার্চ মধ্যরাতে ২৬ মার্চ প্রথম প্রহরে গ্রেফতার হওয়ার পূর্বেই শেখ মুজিবুর রহমান ওয়্যারলেসে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা দেন। এ ঘোষণা লিখিত আকারে পিলখানা ইপিআর ব্যারাক ও অন্যান্য স্থান থেকে ওয়্যারলেসের মাধ্যমে বার্তা আকারে সারা দেশে পাঠানো হয়। বার্তাটি ছিল হুবহু এই রকম- ‘ঞযরং সধু নব সু ষধংঃ সবংংধমব, ভৎড়স ঃড়ফধু ইধহমষধফবংয রং রহফবঢ়বহফবহঃ. ও পধষষ ঁঢ়ড়হ ঃযব ঢ়বড়ঢ়ষব ড়ভ ইধহমষধফবংয যিবৎবাবৎ ুড়ঁ সরমযঃ নব ধহফ রিঃয যিধঃবাবৎ ুড়ঁ যধাব, ঃড় ৎবংরংঃ ঃযব ধৎসু ড়ভ ড়পপঁঢ়ধঃরড়হ ঃড় ঃযব ষধংঃ. ণড়ঁৎ ভরমযঃ সঁংঃ মড় ড়হ ঁহঃরষ ঃযব ষধংঃ ংড়ষফরবৎ ড়ভ ঃযব চধশরংঃধহ ড়পপঁঢ়ধঃরড়হ ধৎসু রং বীঢ়বষষবফ ভৎড়স ঃযব ংড়রষ ড়ভ ইধহমষধফবংয ধহফ ভরহধষ ারপঃড়ৎু রং ধপযরবাবফ.’

এই ঘোষণার ভিত্তিতেই ২৬ মার্চ বাংলাদেশের স্বাধীনতা দিবস। স্বাধীনতা ঘোষণার পর দেশে হত্যাযজ্ঞের পরিমাণ তিনগুণ চারগুণ বেড়ে যায়। শেখ মুজিবকে নিয়ে যাওয়া হয় পাকিস্তান কারাগারে। পূর্ব পাকিস্তানের নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের সমম্বয়ে আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দ ১৯৭১ সালের ১০ এপ্রিল গঠন করেন প্রবাসী বাংলাদেশ সরকার। আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দ সীমান্ত অতিক্রম করে আশ্রয় গ্রহণ করেন ভারতের মাটিতে। তারা একত্রিত হয়েছিলেন আগরতলায়। সেখানেই গঠিত হয় বিপ্লবী সরকার। ঘোষণা করা হয় কুষ্টিয়া জেলাধীন মেহেরপুর মহকুমার বৈদ্যনাথতলার আমবাগানে বাংলাদেশ সরকারের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানের। বৈদ্যনাথতলার নতুন নামকরণ করা হয় মুজিবনগর। মুজিবনগরের নামানুসারে বাংলাদেশ সরকারকে অভিহিত করা হয় ‘মুজিবনগর সরকার’ নামে। বঙ্গবন্ধুর অনুপস্থিতিতে মুজিবনগর সরকারই মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনা করে। মুজিবনগর সরকারের রাষ্ট্রপতি হিসেবে নাম ঘোষণা করা হয় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের। অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম, প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ, পররাষ্ট্রমন্ত্রী খন্দকার মোশতাক আহমদ, অর্থমন্ত্রী ক্যাপ্টেন এম মনসুর আলী এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্ব পান এএইচএম কামারুজ্জামান। 

১৪ এপ্রিল উপরাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম জেনারেল এমএজি ওসমানীকে প্রধান সেনাপতি নিযুক্ত করেন। মুজিবনগর সরকার শপথ গ্রহণ করে ১৭ এপ্রিল। ১৯৭১ সালে ১০ এপ্রিল থেকে ১৯৭২ সালের ১২ জানুয়ারি পর্যন্ত মুজিবনগর সরকার কার্যকর থাকে। ১৭ এপ্রিল নতুন সরকার শপথ গ্রহণের পর মুক্তিযুদ্ধ সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার জন্য বাংলাদেশকে ১১টি সেক্টরে ভাগ করা হয়। একেকটি সেক্টরের দায়িত্ব দেওয়া হয় একেকজন সেক্টর কমান্ডারকে। মুক্তিযুদ্ধের পুরো ৯ মাসব্যাপী পাকিস্তান সামরিক বাহিনী ও তাদের এদেশীয় দোসররা সুপরিকল্পিতভাবে একের পর এক বুদ্ধিজীবী হত্যা করে। পাকিস্তানি বাহিনীর আনুষ্ঠানিক আত্মসমর্পণের ঠিক দুদিন আগে ১৪ ডিসেম্বর ১৯৭১ সংঘটিত বীভৎস-নারকীয়-পাশবিক হত্যাকণ্ডের কোনো তুলনা নেই ইতিহাসে। একসঙ্গে এত বুদ্ধিজীবী হত্যার ঘটনা একাত্তরের আগে পরে কখনও ঘটেনি পৃথিবীতে। 

দীর্ঘ ৯ মাস যুদ্ধের পর ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশ বিজয় অর্জন করে। স্বাধীন বাংলার মাটিতে উড়তে থাকে লাল-সবুজের পতাকা। সেদিন বিকাল ৫টা। ঐতিহাসিক রেসকোর্স ময়দান। মেজর জেনারেল জ্যাকবের তৈরি করা আত্মসমর্পণ দলিলে পাকিস্তান সরকার ও সেনাবাহিনীর পক্ষে লে. জেনারেল এ কে নিয়াজী এবং মিত্রবাহিনীর পক্ষে লে. জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরা স্বাক্ষর করেন। লাখ লাখ মুক্তিপিপাসু জনতা এবং শতাধিক বিদেশি সাংবাদিক এই অনুষ্ঠান অবলোকন করেন। মুজিবনগর সরকারের পক্ষে উপস্থিত ছিলেন গ্রুপ ক্যাপ্টেন এ কে খন্দকার। 

১৯৭২ সালের ৮ জানুয়ারি পাকিস্তান সরকার আন্তর্জাতিক চাপে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে মুক্তি দেয়। ১০ জানুয়ারি তিনি ঢাকায় ফেরেন। ১২ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করেন।

১২ মার্চ ১৯৭২ বঙ্গবন্ধুর অনুরোধে ভারতীয় মিত্রবাহিনী বাংলাদেশ ত্যাগ করে। ১৯৭৩ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ৩০০ আসনের মধ্যে আওয়ামী লীগ ২৯৩ আসন লাভ করে। ৩ সেপ্টেম্বর আওয়ামী লীগ, সিপিবি ও ন্যাপের সমম্বয়ে ঐক্যফ্রন্ট গঠিত হয়। ১৯৭৪ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তান বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়। ১৯৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারি বাংলাদেশে রাষ্ট্রপতি পদ্ধতির সরকারব্যবস্থা প্রবর্তন হয় এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান রাষ্ট্রপতির দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। ২৪ ফেব্রুয়ারি দেশে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সমম্বয়ে জাতীয় দল কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ গঠন করা হয়। বঙ্গবন্ধু এই দলের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। তিনি জাতীয় দলে যোগদানের জন্য দেশের সব রাজনৈতিক দল ও নেতাদের প্রতি আহ্বান জানান। বিদেশি সাহায্যের ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে বাঙালি জাতিকে আত্মনির্ভরশীল হিসেবে গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করেন। তাই স্বাবলম্বিতা অর্জনের লক্ষ্যে অর্থনৈতিক নীতিমালাকে নতুনভাবে ঢেলে সাজান। স্বাধীনতাকে অর্থবহ করে মানুষের আহার, বস্ত্র, বাসস্থান, চিকিৎসা, শিক্ষা ও কাজের সুযোগ সৃষ্টির লক্ষ্যে দ্বিতীয় বিপ্লবের কর্মসূচি ঘোষণা দেন। যার লক্ষ্য ছিল- দুর্নীতি দমন; ক্ষেত খামার ও কলকারখানায় উৎপাদন বৃদ্ধি; জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ এবং জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠা।

এই লক্ষ্যে দ্রুত অগ্রগতি সাধিত করার মানসে ৬ জুন বঙ্গবন্ধু সব রাজনৈতিক দল, পেশাজীবী, বুদ্ধিজীবী মহলকে ঐক্যবদ্ধ করে এক মঞ্চ তৈরি করেন, যার নাম ‘বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ।’ ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সপরিবারে শহীদ হওয়ার পর দেশে সামরিক শাসন জারি করা হয়। গণতন্ত্রকে হত্যা করে মৌলিক অধিকার কেড়ে নেওয়া হয়। শুরু হয় হত্যা, ক্যু ও ষড়যন্ত্রের রাজনীতি। কেড়ে নেওয়া হয় জণগণের ভাত ও ভোটের অধিকার। বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুর পর খন্দকার মোশতাক আহমদ নিজেকে রাষ্ট্রপতি ঘোষণা করেন। মোশতাক রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নিলে তার সরকারকে প্রথম স্বীকৃতি দেয় পাকিস্তান। পরবর্তী পর্যায়ে সৌদি আরব এবং চীন মোশতাক সরকারকে স্বীকৃতি দেয়। 

খন্দকার মোশতাক আহমদের শাসনামলে ১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর ঢাকার কেন্দ্রীয় কারাগারে চার জাতীয় নেতা- সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ, ক্যাপ্টেন মনসুর আলী ও এএইচএম কামারুজ্জামানকে হত্যা করা হয়।

১৯৭৫ সালের ৫ নভেম্বর ৮৩ দিনের মাথায় সেনাবিদ্রোহের দ্বারা ক্ষমতাচ্যুৎ হন মোশতাক আহমেদ। ক্ষমতা দখল করে অভ্যুত্থানের নায়ক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল খালেদ মোশাররফ। ব্রিগেডিয়ার জেনারেল খালেদ মোশাররফ অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতা গ্রহণ করলে খন্দকার মোশতাক আহমেদ রাষ্ট্রপতির পদ থেকে পদত্যাগ করতে বাধ্য হন। আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েম বাংলাদেশের নতুন রাষ্ট্রপতি হন। জিয়াউর রহমানকে চিফ অব আর্মি স্টাফ থেকে পদত্যাগ করতে বাধ্য করেন। এরপর নানা অভ্যুত্থান পাল্টা অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে জিয়াউর রহমান ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হন। ১৯৭৭ সালের ২১ এপ্রিল বিচারপতি আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েমকে রাষ্ট্রপতির পদ থেকে অপসারিত করে প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ১৯৮১ সালের ৩০ মে মেজর জেনারেল আবুল মঞ্জুরের নেতৃত্বে সেনাবিদ্রোহে জিয়াউর রহমান নিহত হন। বিচারপতি আব্দুস সাত্তার রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেন। 

১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে বিচারপতি সাত্তারকে ক্ষমতাচ্যুৎ করে সামরিক শাসন জারি করে নিজে হন প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক। এরশাদ সরকারের সময় দেশে রক্তের বন্যা বয়ে যায়। রাউফুন বসুনিয়া, দিপালী সাহা, ডা. মিলন, নূর হোসেনসহ শত শত তরুণের রক্তে রঞ্জিত হয় ঢাকার রাজপথ। সারা দেশে চলে হত্যাযজ্ঞ। 

গণআন্দোলনের মুখে ১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর স্বৈরশাসক এরশাদের পতন ঘটে। রাষ্ট্রপতি হিসেবে ক্ষমতা গ্রহণ করেন তৎকালীন প্রধান বিচারপতি শাহাবুদ্দিন আহমদ। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান হিসেবে বিচারপতি শাহাবুদ্দিন আহমেদ একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের ব্যবস্থা করেন। নির্বাচনে জয়ী হয়ে বেগম খালেদা জিয়া ১৯৯১ সালের ২০ মার্চ বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন। রাষ্ট্রপতি হন আব্দুর রহমান বিশ্বাস। ১৯৯৫ সালের ২৪ নভেম্বর রাষ্ট্রপতি আব্দুর রহমান বিশ্বাস পঞ্চম জাতীয় সংসদ ভেঙে দেন। ৩০ মার্চ ১৯৯৬ রাষ্ট্রপতি ষষ্ঠ জাতীয় সংসদ ভেঙে দেন এবং বেগম খালেদা জিয়া পদত্যাগ করেন। রাষ্ট্রপতি আব্দুর রহমান বিশ্বাস সাবেক প্রধান বিচারপতি মুহাম্মদ হাবিবুর রহমানকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োগ প্রদান করেন। 

তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পরপরই দেশের বিদ্যমান আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়নে সচেষ্ট হন। ১৯৯৬ সালের ১২ জুন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচনে আওয়ামী লীগ বিজয় অর্জন করে। ১৯৯৬ সালের ২৩ জুন শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন। তিনি সরকার গঠন করেন। এরপর ২ অক্টোবর ধানমন্ডি থানায় জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যা করার বিরুদ্ধে এজাহার দায়ের করা হয়। ১২ নভেম্বর জাতীয় সংসদে ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ বাতিল করা হয়। 

১ মার্চ ১৯৯৭ ঢাকার জেলা ও দায়রা জজ আদালতে বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচারকার্য শুরু হয়। ৮ নভেম্বর, ১৯৯৮ জেলা ও দায়রা জজ কাজী গোলাম রসুল ৭৬ পৃষ্ঠার রায় ঘোষণায় ১৫ জনকে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করেন। ১৪ নভেম্বর ২০০০ সালে হাইকোর্টে মামলার ডেথ রেফারেন্স ও আপিলে দুই বিচারপতি মো. রুহুল আমিন ও বিচারপতি এবিএম খায়রুল হক দ্বিমতে বিভক্ত রায় ঘোষণা করেন। এরপর তৃতীয় বিচারপতি মো. ফজলুল করিম ১২ জনের মৃত্যুদণ্ড বহাল রেখে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেন। পাঁচ আসামি আপিল বিভাগে লিভ টু আপিল করে। ২০০২-২০০৬ পর্যন্ত বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের সময় মামলাটি কার্যতালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়। ২০০৭ সালে শুনানির জন্য বেঞ্চ গঠিত হয়। ২০০৯ সালে ২৯ দিন শুনানির পর ১৯ নভেম্বর প্রধান বিচারপতিসহ পাঁচজন বিচারপতি রায় ঘোষণায় আপিল খারিজ করে ১২ জনের মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখেন। ২০১০ সালের ২ জানুয়ারি আপিল বিভাগে আসামিদের রিভিউ পিটিশন দাখিল এবং তিন দিন শুনানি শেষে ২৭ জানুয়ারি পাঁচ ঘাতকের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। ঘাতকদের একজন বিদেশে পলাতক অবস্থায় মারা গেছে। পাঁচজন বিদেশে পলাতক রয়েছে। ভারতে পলাতক ক্যাপ্টেন মাজেদের ফাঁসি কার্যকর করা হয়েছে। বঙ্গবন্ধু ও তাঁর পরিবারের লোকদের নৃশংস হত্যাকাণ্ডের বিচারের দাবি ৩৪ বছর পর বাস্তবায়িত হয়। এটা শেখ হাসিনা সরকারের সবচেয়ে বড় সাফল্য। 

২০০৬ সালে ফখরুদ্দিন আহমদ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টার দায়িত্ব গ্রহণ করার পর জেনারেল মঈন উদ্দিনের পরামর্শে কাজ করতে শুরু করেন। দুর্নীতির চিত্র উন্মোচিত করতে গিয়ে ২০০৭ সালের আগস্ট মাস পর্যন্ত বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রায় ১৭০ জন শীর্ষ নেতাকে আটক করেন। প্রধান দুটি রাজনৈতিক দলের প্রধান- বেগম খালেদা জিয়া ও শেখ হাসিনাকে আটক করেন। বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়াকে ২০০৭ সালের ৩ সেপ্টেম্বর দুর্নীতির অভিযোগে তারেক রহমানসহ গ্রেফতার করেন। আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা ২০০৭ সালের ১৬ জুন সকালে গ্রেফতার হন। এই সময় সংসদ ভবনে অস্থায়ী আদালত (ক্যাঙ্গারো কোর্ট) বসিয়ে ফখরুদ্দিন এবং মঈন উদ্দিন ইচ্ছামতো বিচার করে রাজনৈতিক নেতাদের শাস্তি দিতে থাকেন। তারা ‘মাইনাস টু’ ফর্মুলা চালু করে রাজনীতি থেকে বেগম খালেদা জিয়া এবং শেখ হাসিনাকে সরানোর আপ্রাণ চেষ্টা করেন। দুই নেত্রীকে বিদেশ পাঠানোরও চেষ্টা করেন।

অবশেষে জনগণের চাপে এবং রাজনৈতিক দলগুলোর তৎপরতায় ফখরুদ্দিন সরকার নির্বাচন দিতে বাধ্য হয়। ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর নির্বাচন অনুষ্ঠান সম্পন্ন করার জন্য নির্বাচন কমিশনকে নির্দেশ দেওয়া হয়। নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি এই দুটি বড় দলসহ অন্যান্য দল অংশগ্রহণ করে। ২০০৮ সালের ডিসেম্বরে নির্বাচনে আওয়ামী লীগ বিজয়ী হয়। ২০০৯ সালের ৬ জানুয়ারি আওয়ামী লীগ মহাজোট সরকার গঠন করে। ২৪ জন মন্ত্রী এবং ১৯ জন প্রতিমন্ত্রী নিয়ে মহাজোট সরকার গঠন করা হয়। শেখ হাসিনা হন মহাজোট সরকারের প্রধানমন্ত্রী। মো. জিল্লুর রহমান রাষ্ট্রপতি। ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর নির্বাচনে জয়লাভের পর হতে আজ পর্যন্ত আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায়। ক্ষমতা গ্রহণের পর সরকার যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ও এর রায় কার্যকর করে। দেশের উন্নয়ন নিয়ে ভাবা শুরু করে। বাংলাদেশের উন্নয়নে আওয়ামী লীগ সরকার এবং সরকারপ্রধান শেখ হাসিনার ভাবনার যেন শেষ নেই। নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মাণ ছাড়াও মেট্রো রেল, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে, উড়াল সেতুসহ নানাবিধ উন্নয়ন করে শেখ হাসিনার সরকার। দেশের উন্নয়ন অগ্রগতির কথা চিন্তা করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ১০টি বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণ করেন। 

এসব উদ্যোগের মধ্যে আছে- একটি বাড়ি একটি খামার প্রকল্প, আশ্রয়ণ প্রকল্প, ডিজিটাল বাংলাদেশ, শিক্ষা সহায়তা কর্মসূচি, নারীর ক্ষমতায়ন, ঘরে ঘরে বিদ্যুৎ, কমিউনিটি ক্লিনিক ও মানসিক স্বাস্থ্য, সামজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি, বিনিয়োগ বিকাশ ও পরিবেশ সুরক্ষা। শেখ হাসিনার এসব উদ্যোগের ফলে বাংলাদেশ আজ উন্নয়নের রোল মডেল। স্বল্পোন্নত থেকে উন্নয়নশীল দেশের মর্যাদা লাভ করেছে। করোনা অতিমারিকালেও শেখ হাসিনার সরকার ব্যাপক সাফল্য দেখিয়েছেন। 

সারা বিশ্বের তুলনায় বাংলাদেশে করোনায় আক্রান্ত এবং মৃত্যুর হার অনেক কম। স্বাধীনতার ৫০ বছর এবং জাতির পিতার জন্মশতবর্ষ যথাযথ মর্যাদা ও সম্মানের সঙ্গে পালন করছে আওয়ামী লীগ সরকার। যে দলের হাত ধরে এদেশের স্বাধীনতা এসেছে সে দলই আজ উদযাপন করছে স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী। যে বাঙালির জন্ম না হলে বাংলাদেশ হতো কি না সন্দেহ, সে বাঙালি, হাজার বছরের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালির জন্মশতবর্ষ পালন করতে পেরে গোটা বাঙালি জাতি আনন্দিত। উল্লসিত। উদ্বেলিত। তাঁর কন্যার উন্নয়ন কর্মকাণ্ড দেখে গৌরবাম্বিত। বাংলাদেশের জয় হোক। বাঙালির জয় হোক। শুভ সুবর্ণজয়ন্তী। শুভ মুজিব জন্মশতবর্ষ। 

লেখক : সাবেক খণ্ডকালীন শিক্ষক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়




সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত


ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: কমলেশ রায়, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড
এর পক্ষে প্রকাশক গাজী আহমেদ উল্লাহ
নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।

ফোন : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৭৫। ই-মেইল : [email protected]