ই-পেপার বিজ্ঞাপনের তালিকা শনিবার ২৯ জানুয়ারি ২০২২ ১৪ মাঘ ১৪২৮
ই-পেপার শনিবার ২৯ জানুয়ারি ২০২২
http://www.shomoyeralo.com/ad/Amin Mohammad City (Online AD).jpg

তুচ্ছ ঘটনায় বাড়ছে আত্মহত্যা
সাইফুল ইসলাম
প্রকাশ: সোমবার, ৬ ডিসেম্বর, ২০২১, ১২:৩৮ পিএম | অনলাইন সংস্করণ  Count : 121

কুমিল্লার লাকসাম উপজেলার শ্রীয়াং দাসপাড়ায় গত ৬ জুন জয় চন্দ্র দাস (১৮) নামে এক কিশোর আত্মহত্যা করে। কারণ, বাবা মোবাইল ফোন কিনে দেয়নি। একইভাবে কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ীতে মোবাইল ফোন না পেয়ে গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করে অটোভ্যান চালকের ছেলে তৃতীয় শ্রেণির ছাত্র আপন মিয়া (১০)। 

আবার গত ২৯ সেপ্টেম্বর পড়ার জন্য মা বকা দেওয়ায় রাজধানীর যাত্রাবাড়ীতে আত্মহত্যা করে মাদ্রাসাছাত্র তরিকুল (১৬)। মেয়ের অতিরিক্ত মোবাইল আসক্তির কারণে মা বকাবকি করায় ২৯ মে রাজধানীর তেজগাঁওয়ে আত্মহত্যা করে এসএসসি পরীক্ষার্থী ফাতেমা আক্তার। 

গত ২৫ নভেম্বর রাজধানীর দক্ষিণখানের হাজীপাড়া এলাকায় পরীক্ষা শেষ হলে সপরিবারে কক্সবাজার ঘুরতে নেওয়াকে কেন্দ্র করে আত্মহত্যা করে রুবায়েত মাশরেক অন্তনু (১৬)। গত ২৮ নভেম্বর রাজধানীতে প্রেমে বনিবনা না হওয়ায় এক স্কুলছাত্রী আত্মহত্যা করেছে। শনিবার রাজধানীর সবুজবাগের দক্ষিণ মাদারটেকে পরীক্ষার ফল খারাপ হওয়ায় মো. শাহরিয়ার (১৬) নামে দশম শ্রেণির এক ছাত্র আত্মহত্যা করেছে। প্রতিনিয়ত এ রকম তুচ্ছ কারণে আত্মহত্যার ঘটনা ঘটছে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে।

পুলিশ সদর দফতরের পরিসংখ্যানে দেখা যায়, মোবাইল কিনে না দেওয়া, সামান্য বকাঝকা করা এসব তুচ্ছ কারণে কিশোর-কিশোরী ও তরুণ-তরুণীদের মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা বাড়ছে। জানুয়ারি থেকে জুন মাস পর্যন্ত সারা দেশে পুলিশ ৭ হাজার ৩৯১টি আত্মহত্যার ঘটনা রেকর্ড করেছে। একই সময় অপমৃত্যুর মামলা হয়েছে ১১ হাজার ১০৯টি। এসব অপমৃত্যুর মধ্যে ৭ হাজার ৩৯১টি আত্মহত্যার ঘটনা। পুলিশ সদর দফতর (অপরাধ) শাখার এক কর্মকর্তা বলেন, পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, তুচ্ছ কারণ ও পারিবারিক কলহ এবং পরকীয়াসহ নারীঘটিত কারণে আত্মহত্যার ঘটনা বেশি ঘটছে।

পুলিশের পরিসংখ্যান মতে, জানুয়ারি থেকে জুন মাস পর্যন্ত আত্মহত্যা করা ভিক্টিমদের মধ্যে ৫২ শতাংশ পুরুষ ও ৪৮ শতাংশ নারী। আত্মহত্যা করা এসব ভিক্টিমের ৬০ শতাংশই আত্মহত্যা করেছে গলায় ফাঁস দিয়ে। বিষপানে আত্মহত্যা করছে প্রায় ২৬ শতাংশ। গায়ে আগুন দিয়ে ১ দশমিক ৩৪ শতাংশ। আত্মহত্যা করা এসব ব্যক্তির মধ্যে ২৫ শতাংশেরই বয়স ১৮ বছরের নিচে। ১৯ থেকে ৩০ বছর বয়সি প্রায় ৩৮ শতাংশ, ৩১ থেকে ৪৫ বছর বয়সি প্রায় ২২ শতাংশ এবং ১০ শতাংশের বয়স ৪৬ থেকে ৬০ বছর। ৬০ বছরের বেশি বয়স্ক আছেন ৫ শতাংশ।

পুলিশ সদর দফতর আত্মহত্যার প্রবণতা প্রতিরোধে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও মনোরোগ বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে কর্মশালা করার নির্দেশনা দিয়েছে। পাশাপাশি প্রত্যেক জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপারের (ক্রাইম) নেতৃত্বে মামলাগুলো পর্যালোচনা করে কারণ নির্ণয় ও প্রতিকারের উদ্যোগ নিতে বলেছে।

পুলিশের উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি, অপারেশন, প্ল্যানিং ও মিডিয়া) মো. হায়দার আলী খান সময়ের আলোকে বলেন, সমাজ পরিবর্তিত হচ্ছে। আগে দেখা গেছে, একজন স্কুলছাত্রকে শিক্ষকরা স্কুলে বেদম মারধর করত। অভিভাবকরা মারধরের জন্য শিক্ষককে সাধুবাদ জানাতেন; কিন্তু এখন সে অবস্থা নেই। এখন কোনো শিক্ষার্থীকে শিক্ষক মারধর করলে শিক্ষার্থীরা প্রতিবাদ করে, অভিভাবকরাও ক্ষুব্ধ হন। এখন সমাজে আচরণের ধারা পরিবর্তন হয়ে গেছে। এখন আর বয়স কোনো আনুপাতিক বিষয় নয়। আমরা দিন দিন অনলাইন ও মোবাইল ফোন ব্যবহারে অভ্যস্ত হয়ে পড়ছি। অনলাইন কেন্দ্রিক লাইফস্টাইল গড়ে উঠেছে। আগে একজন কিশোর কিশোরীর সঙ্গে দেখা করতে চাইলে অনেক প্রতিকূলতার মুখোমুখি হতে হতো। পাড়া প্রতিবেশী, আত্মীয়স্বজনের ভয় ছিল। কিন্তু এখন প্রযুক্তির কারণে সহজেই একে অপরের সান্নিধ্যে চলে আসছে। আমাদের আবেগ, হাসি-কান্না, সুখ-দুঃখগুলো সহজেই প্রযুক্তির মাধ্যমে অপরের কাছে প্রকাশ করতে পারছি। এসব কারণে আবেগতাড়িত হয়ে আত্মহত্যার প্রবণতা দেখা যায়। অনেক ক্ষেত্রে অভিভাবকরা বুঝতেও পারছেন না। আবার অনেক গেমস আছে, যেগুলো আত্মহত্যার প্রবণতাকে উদ্বুদ্ধ করে। অনেকে লাশ ও রক্ত দেখলে ভয় পায় আবার অনেকে সেটা দেখে স্বাভাবিকভাবেই।

পুলিশের এই কর্মকর্তা বলেন, আমাদের প্রয়োজনীয়তা বেড়েছে। আগে দেখা গেছে, মানুষ লবণ দিয়ে পেট ভরে ভাত খেয়ে খুশি থাকত। কিন্তু এখন তারা চায় দামি জামা, জুতা, দামি মোবাইল ফোন। পণ্যকেন্দ্রিক আমাদের আবেগ-অনুভূতি প্রকাশ পাচ্ছে। দেখা যাচ্ছে, কোনো ক্লাসে তার বন্ধু দামি আইফোন বা দামি মোবাইল সেট নিয়ে আসছে। তখন অন্য বন্ধু যার হয়তো সামর্থ্য নেই, তার মধ্যেও সেটি পাওয়ার আকাক্সক্ষা জাগে। মা-বাবার কাছে চেয়ে না পেলে কেউ কেউ আত্মহত্যাপ্রবণ হয়ে ওঠে। প্রযুক্তি বা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের অপব্যবহারও আত্মহত্যা প্রবণতা বাড়ানোর জন্য দায়ী। 

তিনি আরও বলেন, আত্মহত্যার প্রবণতা রোধে প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়া বড় ভূমিকা রাখতে পারে। সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন সংগঠন ও প্রতিষ্ঠানকে একযোগে কাজ করতে হবে। গবেষণার মাধ্যমে আত্মহত্যার যথাযথ কারণগুলো চিহ্নিত করে প্রতিকারে সবাইকে একযোগে কাজ করতে হবে। মানুষকে নিরাপদ জীবন ও জীবনের জন্য জীবন, যতদিন বাঁচব স্বাচ্ছন্দ্যে বাঁচব, এই ধারণা দিতে হবে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ তৌহিদুল হক সময়ের আলোকে বলেন, চাহিদা বিষয়টা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। সন্তানদের চাহিদাগুলো মেনে নিতে না পারলেই দেখা যায় আত্মহত্যার ঘটনা ঘটে। তিনি বলেন, কোনো কিশোর আপনার বাসার জানালার কাচ ভেঙে ফেলল, আপনি যদি তার বিষয়ে কঠোর না হন, তাহলে দেখবেন এক সময় সে খুনও করে ফেলতে পারে। অর্থাৎ কোনো অপরাধই এক দিনে হয় না। আত্মহত্যাপ্রবণ হওয়ার আগে তার কিছু কর্মকাণ্ড আছে, যা দেখে আপনি বুঝতে পারবেন শিশুটির মধ্যে অপরাধপ্রবণতা আছে।

অপরাধ বিশেষজ্ঞ তৌহিদুল হক বলেন, আমরা এখন সন্তানদের স্কুলে শারীরিক শাস্তি দিতে পারি না। উচ্চ আদালতেরও এক্ষেত্রে নির্দেশনা রয়েছে। আমি নিজেও মনে করি শারীরিক মারধর করা উচিত নয়, এটি শিশুর সামাজিক মর্যাদা খর্ব করে। কিন্তু আমাদের সমাজে দ্রুত পরিবর্তনের কারণে মা-বাবা হিসেবে সন্তানদের যেভাবে অভিভাবকত্বসুলভ শাসন করা উচিত; আমরা সেভাবে শাসন করতে পারি না। মা-বাবার যে দায়িত্ব সেটা আমাদের অনেকের মধ্যে এখনও হয়তো গড়ে ওঠেনি। সন্তানকে যে ধরনের পারিবারিক অনুশাসন দেওয়া উচিত, সেটি দিতে পারছি না। মারধর বা নির্যাতন নয়; শিশুকে বিকল্প উপায়ে শাসন করা উচিত। শিশু কী চায় তার মধ্যে অগ্রাধিকার নির্ধারণ করা উচিত। কারণ শিশুরা মনে করে, সে যা চাইবে সেটিই তার অধিকার।

তৌহিদুল হক বলেন, শিশুকে শাসনের সঠিক পদ্ধতি অনুসরণ করতে হবে। সঠিক শাসন না করতে পারলে শিশু-কিশোররা মনে করবে পাখি, জামা পাওয়া তার অধিকার, আবার ২ লাখ টাকা দামের মোটরসাইকেল পাওয়া, কিংবা আইফোন বা ল্যাপটপ পাওয়াও অধিকার মনে করে। আর সে তার অধিকার না পেলে আত্মহত্যাপ্রবণ হয়ে ওঠে। এ ছাড়া সামাজিক চাপ বেশি থাকলে, আয় ও সম্পদের বৈষম্য থাকলে তখনো আত্মহত্যার প্রবণতা বাড়ে। আত্মহত্যা প্রবণতা রোধে সন্তানকে তার অধিকার সম্পর্কে বোঝাতে হবে। তাকে এ বিষয়ে সচেতন করতে হবে। সন্তানকে বোঝাতে হবে অধিকার এবং দায়িত্ব একে অপরের পরিপূরক। শুধু তার অধিকার পেলেই হবে না, তারও কিছু দায়দায়িত্ব আছে। কারণ আমরা শুধু সন্তানকে চাওয়া শিখাই, সন্তানের যে মা-বাবার প্রতি দায়িত্ব আছে সেটি বুঝতে শিখাই না। তাই আমাদের অভিভাবকদেরও দায়-দায়িত্ব নতুন করে শেখার বিষয় আছে। এই দায়িত্ব নিজেরা শিখতে পারলে সন্তানদের আত্মহত্যার মতো ভয়ানক অপরাধপ্রবণতা কমানো সম্ভব।

/জেডও/


আরও সংবাদ   বিষয়:  আত্মহত্যা   




http://www.shomoyeralo.com/ad/BD Sports News.gif

সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত


ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: কমলেশ রায়, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড
এর পক্ষে প্রকাশক গাজী আহমেদ উল্লাহ
নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।

ফোন : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৭৫। ই-মেইল : [email protected]