ই-পেপার বিজ্ঞাপনের তালিকা মঙ্গলবার ১৮ জানুয়ারি ২০২২ ৪ মাঘ ১৪২৮
ই-পেপার মঙ্গলবার ১৮ জানুয়ারি ২০২২
http://www.shomoyeralo.com/ad/Amin Mohammad City (Online AD).jpg

ওমিক্রনকে অবহেলা করার সুযোগ নেই
মমতাজউদ্দীন পাটোয়ারী
প্রকাশ: শুক্রবার, ১৪ জানুয়ারি, ২০২২, ১২:৪২ পিএম | অনলাইন সংস্করণ  Count : 71

অতিমারি কোভিড-১৯ তথা করোনাভাইরাসের সংক্রমণ তৃতীয় বর্ষে পদার্পণ করেছে। ২০২০ এবং ২০২১-এ বেশ বড় ধরনের দুটি ঢেউ, কোথাও কোথাও তৃতীয় ঢেউ পৃথিবীর তাবৎ মানুষকে মহাবিপর্যয়ে ফেলে দিয়েছে। এশিয়ার এই অঞ্চলে আমরা গত বছর ডেল্টা ভাইরাসে সবচেয়ে বেশি কাবু হয়েছিলাম। আমাদের দেশে যদিও প্রথম ঢেউয়ের আঁচড়টা ২০২০ সালে ঢাকা, চট্টগ্রামসহ কয়েকটি শহরে তুলনামূলকভাবে বেশি হওয়ায় গ্রামাঞ্চলের মানুষ করোনাকে পাত্তাই দিতে চায়নি। অনেকেই নানা কুসংস্কারে আচ্ছন্ন ছিল। কেউ কেউ এটিকে চীনাদের মধ্যেই সীমিত থাকার দাবি করেছিল। 

কেউ কেউ আবার আগ বাড়িয়ে বলার চেষ্টা করেছিল যে, মুসলমানদের মধ্যে করোনার কোনো সংক্রমণ হবে না। আমাদের বেশ কজন মওলানা এ নিয়ে নানারকম বিভ্রান্তিকর ধারণা বেশ উচ্চকণ্ঠে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে দিয়েছিল। কেউ কেউ করোনার চিকিৎসার নানা ‘মহৌষধও’ প্রেস্ক্রাইব করছিলেন। এ নিয়ে ভেতরে ভেতরে অনেক হাতুড়ে ডাক্তার, কবিরাজ, প্রতারক অনলাইনে যোগাযোগ স্থাপনের মাধ্যমে করোনার চিকিৎসার নামে টাকা হাতিয়ে নেওয়ার নানা ব্যবস্থা করছিল।

আমাদের দেশে যেহেতু বেশিরভাগ মানুষের চিকিৎসাবিজ্ঞানগত ধারণা অতি সীমিত। তাই ওষুধ, দাওয়াই-বালাইয়ের নামে অনেকেই মৌসুমি ব্যবসা খুলে টাকা হাতিয়ে নিতে পারে। এক্ষেত্রে তারা সাধারণ মানুষের ধর্মবিশ্বাস, তন্ত্রমন্ত্র, দাওয়াই, পানি, কালোজিরা, গোমূত্র, উটের চোনা ইত্যাদির পসরা সাজিয়ে বেশ কিছু অর্থ কামাই করে নিয়েছিল। কিন্তু ২০২১ সালে যখন ডেল্টা ভাইরাস মহাতাণ্ডব নিয়ে আছড়ে পড়ে তখন এসব ফকির দরবেশের তন্ত্রমন্ত্র কালোজিরা, পানিপড়া ইত্যাদি ভেসে যেতে থাকে। হাজার হাজার মানুষ তখন অক্সিজেনের অভাবে নিশ্বাস নিতে পারছিল না।

হাসপাতালে অক্সিজেন সিলিন্ডার পাওয়ার জন্য হাহাকার লেগে যায়। করোনার চিকিৎসা তখন কতটা মানুষকে সারিয়ে তুলতে অপরিহার্য সেটি প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার মাধ্যমে দেখতে ও বুঝতে পারছিল। জেলা হাসপাতালগুলোতে রোগী সামাল দিতে অনেকেই পারছিল না। ঢাকায় অনেকেই করোনা আক্রান্ত মানুষকে নিয়ে এ হাসপাতাল, ও হাসপাতালে ছোটাছোটি করেছিল। কেউবা একটা সিট পেয়ে যেন আকাশের চাঁদ হাতে পেয়েছিল। গণমাধ্যমে এসব দৃশ্য প্রচারিত হয়েছিল। করোনার এই ভীতিকর আতঙ্ক প্রায় সব পরিবারেই হানা দিয়েছিল। অনেক মানুষই না বোঝার আগেই প্রিয়জনদের ছেড়ে চলে গেছেন। প্রিয়জনকে বাঁচাতে আবার অনেকে প্রাণপণ চেষ্টা করেছেন। কেউবা পেরেছেন, কেউবা পারেননি।

ডেল্টা ভাইরাসের সংক্রমণ সারা বিশ্বের মতো বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছিল। আমাদের চিকিৎসক এবং সেবাদানকারীরা রাত-দিন করোনার চিকিৎসায় সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকার করেছিলেন। ডাক্তার, নার্স, টেকনিশিয়ানদের অনেকেই করোনার দ্বিতীয় ঢেউ সামাল দিতে গিয়ে নিজেরাই আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন। অনেকে কয়েকবার আক্রান্ত হয়ে বেঁচে উঠেছেন। এসব দৃশ্য দেখেশুনে মানুষ বিশ্বাস করতে শুরু করেছিল যে, অতিমারি করোনার সংক্রমণ তন্ত্রমন্ত্র দিয়ে নয়, অবিশ্বাস করে ছাড় পাওয়ার নয়। এর থেকে মুক্তি পেতে হলে চিকিৎসা ও স্বাস্থ্যবিধি মানতেই হবে। এমন বাস্তবতা দেখে করোনাবিরোধী প্রচারকারীরা আড়ালে চলে গেল। বিজ্ঞানের সত্যকে অস্বীকার করে কেউ কুসংস্কারকে জয়ী করতে পারে না। ২০২১-এ করোনার দ্বিতীয় ঢেউ আমাদেরকে অনেক কিছুই শিখিয়েছিল। কিন্তু এই শেখাটি অর্জন করতে আমাদের অনেকের প্রাণ দিতে হয়েছিল, অনেকের জীবনে নানা অর্থনৈতিক, মানবিক এবং শারীরিক সঙ্কট তৈরি হয়েছিল যা তাদেরকে অতিক্রম করতে হয়েছে। 

গত সেপ্টেম্বর মাসে করোনা সংক্রমণ কমে আসার পর মানুষের জীবনে আবার ছন্দ ফিরে আসতে শুরু করে। আমাদের অর্থনীতি আবার ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করে। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় আবার শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা ফিরে আসতে থাকে। আমরা আবার স্বাভাবিক হয়ে আসার স্বপ্ন দেখতে থাকি। অসংখ্য মানুষ দীর্ঘ বন্দিজীবন থেকে বের হয়ে আসে। পরিবারের সদস্যদের নিয়ে অনেকেই আত্মীয়-স্বজনদের সঙ্গে দেখা-সাক্ষাৎ, পর্যটন নগরী কিংবা বিদেশে ঘুরে বেরিয়ে আসতে চেষ্টা করে। বিশেষত দুই বছরের করোনায় যারা কাজ ও ব্যবসা খুইয়ে অনেকটাই দিশেহারা বা নিঃস্ব হয়ে গিয়েছিলেন, তারা আবার স্ব-স্ব ক্ষেত্রে ঘুরে দাঁড়াতে উদ্যোগ গ্রহণ করতে থাকেন।

ধারণা করা হয়েছিল করোনার সংক্রমণ আর হয়তো ততটা বিস্তার লাভ করবে না। কেনোনা এরই মধ্যে টিকার আবিষ্কার এবং টিকাকরণ অন্তত আমাদের দেশে জানাজানি ও পাওয়ার উদ্যোগ দৃশ্যমান হতে থাকে। সরকার বিদেশ থেকে টিকা আমদানির সব ধরনের চেষ্টা অব্যাহত রাখে। ফলে টিকাকরণটি বেশ দ্রুততার সঙ্গেই সারা দেশে ঘটতে থাকে। মানুষের মধ্যে এক ধরনের আশা জাগানিয়া সৃষ্টি হয়। কিন্তু বিশ্বে তখন নতুন আরেক ভ্যারিয়েন্ট করোনার মহাঢেউ ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে। ইউরোপ, আমেরিকাসহ অনেক অঞ্চলেই প্রতিদিন লাখ লাখ মানুষ নতুন এই করোনার ঢেউয়ে আক্রান্ত হতে থাকে। 

আমাদের দেশে অনেকেই ভেবেছিলেন আর বোধহয় করোনার ঢেউ আছড়ে পড়বে না। যদিও বিশেষজ্ঞরা বারবার সতর্ক করে দিচ্ছিলেন যে বিশ্বে এখনও করোনাভাইরাস নিষ্ক্রিয় হওয়ার মতো কোনো পরিস্থিতি তৈরি হয়নি। সুতরাং যেকোনো মুহূর্তে এর নব রূপান্তরিত রূপটি আমাদের এখানেও আঘাত হানতে পারে। বিশেষজ্ঞরা তাই মাস্ক পরা, টিকা নেওয়া এবং স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার ওপর জোর দিচ্ছিলেন। কিছুতেই যেন মানুষজন এসব নিয়মকে অবহেলা না করে সেই পরামর্শও দিচ্ছিলেন। কিন্তু কে শোনে কার কথা? মাস্ক অনেক আগেই মানুষের মুখ থেকে উধাও হয়ে যায়, স্বাস্থ্যবিধি নামক শব্দযুগল যেন অনেক অতীত ইতিহাসের বিষয় হতে থাকে, টিকাগ্রহণের ক্ষেত্রে আগ্রহ কমে যেতে থাকে। অথচ সরকার কোটি কোটি ডোজ টিকা বিদেশ থেকে কিনে এনেছে। সেগুলোর কোটি কোটি ডোজ গুদামে পড়ে থাকার মতো অবস্থা সৃষ্টি হয়েছে। অথচ এখন থেকে ৭-৮ মাস আগে তথা ২০২১ সালে টিকার অভাবে একদিকে সরকার, অন্যদিকে সাধারণ মানুষও দিশেহারা হয়ে পড়েছিল। 

টিকার প্রাপ্তি নিয়ে কত রাজনীতি, কত কূটনীতি, কত বাণিজ্যের ফন্দিফিকির আমরা দেখেছি। এত অল্প সময়ে আমরা সবকিছু ভুলে গেছি। কিন্তু করোনা তো আমাদেরকে ভোলেনি! বিশ্বের অন্যত্র যেখানে করোনা দাপিয়ে বেড়াচ্ছে, আমরা সেখানে কীভাবে করোনার রক্তচক্ষুর আড়ালে লুকিয়ে থাকতে পারি? নতুন ভ্যারিয়েন্ট ওমিক্রন এরই মধ্যে ভারত হয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। 

যেখানে কদিন আগে করোনা সংক্রমণের হার ১ শতাংশের নিচে নেমে গিয়েছিল। সেখানে দেড়-দুই সপ্তাহে তা ১০ শতাংশের কাছাকাছি উন্নীত হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন করোনার ওমিক্রন তৃতীয় ঢেউ হিসেবে অধিকতর ক্ষিপ্র আকারে ছড়িয়ে যেতে পারে। এর সংক্রমণ ক্ষমতা আগের ধরনগুলোর চেয়ে অনেক বেশি। যদিও এর আক্রমণাত্মক জটিলতা কিছুটা ভিন্ন কিন্তু একেবারেই অবহেলা করার উপায় নেই। 

বাংলাদেশে এরই মধ্যে যেসব জিনোম সিকুয়েন্সিং করা হয়েছে তাতে ওমিক্রন এবং ডেল্টা ভাইরাসের সমান উপস্থিতি লক্ষ করা যাচ্ছে। এটি বিশেষজ্ঞদের মতে মানুষের মৃত্যুঝুঁকি বাড়িয়ে দিতে পারে এবং নতুন ভ্যারিয়েন্টের রূপান্তর ঘটাতে পারে। এরই মধ্যে সাইপ্রাসে ডেল্টাক্রন নামে নতুন একটি ভ্যারিয়েন্ট ধরা পড়েছে। সুতরাং ওমিক্রন, ডেল্টা এবং নতুন ভ্যারিয়েন্টের আক্রমণ আমাদের এখানেও যে ছড়িয়ে পড়বে না তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। যেহেতু আমাদের এত বিপুলসংখ্যক টিকা মজুদ রয়েছে তাই দ্রুত গ্রামের প্রান্তিক মানুষ পর্যন্ত টিকাকরণের উদ্যোগ নেওয়া উচিত। তাহলে করোনার সংক্রমণ থেকে মুক্ত থাকার অন্যতম একটি শর্ত পূরণ করা যাবে। মাস্ক পরা ও স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার নিয়মগুলো এখনই বিনা প্রশ্নে সবারই মেনে চলা উচিত। বিষয়গুলো এখন কারও আর অজানা বা কম জানার মধ্যে নেই।

তাই আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নিয়োগ করে মাস্ক পরা ও স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার বিধান কার্যকর করতে হবে কেন? এখন টিকা, মাস্ক ও স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার বিষয়গুলো সবাই নিজ উদ্যোগে পালন করলে ওমিক্রন বা অন্য যেকোনো ধরনের করোনার আক্রমণ থেকে আমরা অনেকটাই মুক্ত থাকতে পারব। বিশেষজ্ঞরা দাবি করেছেন সবাই টিকা গ্রহণ, মাস্ক পরা ও স্বাস্থ্যবিধি মেনে চললে আক্রান্ত ১০ শতাংশের বেশি মানুষকে হাসপাতালে ভর্তি নাও হতে পারে। ৯০ শতাংশ মানুষ ডাক্তারি নির্দেশ মোতাবেক ওষুধ সেবন করে সুস্থ হয়ে উঠতে পারে। সেক্ষেত্রে আমাদের দেশে লকডাউনের প্রয়োজনীয়তা দেখা নাও দিতে পারে। লকডাউন দেশের অর্থনীতির জন্যেই শুধু নয়, মানুষের জীবন জীবিকার অতিমারির সংক্রমিত অবস্থায় বেঁচে থাকা ও কাজকর্ম স্বাভাবিক রাখারও একটি সুযোগ হিসেবে থাকতে পারে। বিশেষত আমাদের কল-কারখানা, ব্যবসা-বাণিজ্য, অফিস-আদালত, শিক্ষা- নানা ধরনের পরিষেবা নতুন করে যদি লকডাউনের পরিস্থিতির শিকার হয় তাহলে আমাদের অর্থনীতি ও রাষ্ট্রব্যবস্থা বড় ধরনের দীর্ঘমেয়াদি সঙ্কটে পড়তে বাধ্য হবে। তাতে জনজীবনে হাহাকার ও সঙ্কট ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে। 

মনে রাখতে হবে গোটা বিশ্বই এখন অতিমারির মহাসঙ্কটে দীর্ঘমেয়াদে মহাবিপর্যয়ের আশঙ্কা করছে। আমরা তা থেকে মুক্ত থাকতে পারব না যদি করোনার তৃতীয় ঢেউ ওমিক্রনকে অবহেলা করি। আমাদের এখনই টিকা, মাস্ক ও স্বাস্থ্যবিধি স্ব-স্ব উদ্যোগে গ্রহণ ও মেনে চলতেই হবে। নতুবা বিপর্যয় আমাদেরকে ছেড়ে দেবে না।

ইতিহাসবিদ ও কলাম লেখক




সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত


ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: কমলেশ রায়, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড
এর পক্ষে প্রকাশক গাজী আহমেদ উল্লাহ
নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।

ফোন : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৭৫। ই-মেইল : [email protected]