ই-পেপার বিজ্ঞাপনের তালিকা শনিবার ২৯ জানুয়ারি ২০২২ ১৪ মাঘ ১৪২৮
ই-পেপার শনিবার ২৯ জানুয়ারি ২০২২
http://www.shomoyeralo.com/ad/Amin Mohammad City (Online AD).jpg

গণপরিবহনে আবার অরাজকতা
মোহাম্মদ শাহাবুদ্দিন
প্রকাশ: শনিবার, ১৫ জানুয়ারি, ২০২২, ১১:২০ এএম | অনলাইন সংস্করণ  Count : 96

গণপরিবহনে অরাজকতা চলছে। সাধারণ মানুষ পড়েছে চরম ভোগান্তিতে। টেনশন পেরেশানি দুশ্চিন্তা আর স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ে সবাই পথ চলছে। গণপরিবহনে যাতায়াত করছে শঙ্কা আর আতঙ্ককে সঙ্গী করে। সাধারণ মানুষের কপালটাই এই রকম। তারা টাকা খরচ করে দ্বিগুণ, আতঙ্কও হয় দ্বিগুণ।

কোনো দেশের মানুষ এমন সঙ্কটে থাকলে তার জন্য সরকার যথাযথ ব্যবস্থা নেয়। বাংলাদেশ সরকারও তাই করেছে। সরকার বলেছে ওমিক্রনের প্রভাব বাড়ার কারণে গণপরিবহনে দুই সিটে একজন যাত্রী বসাতে হবে। সরকারের এই কথা মানেনি বাংলাদেশ পরিবহন মালিক সমিতি। তারা বলছে সব সিটেই যাত্রী নেওয়া হবে। 

সরকারের পক্ষ থেকে বিধিনিষেধ শিথিলের কোনো ঘোষণা আসেনি। কিন্তু বাসমালিক সমিতি ঘোষণা দিয়েছে তারা সব আসনে যাত্রী নিয়েই বাস চালাবে। যে কথা সে কাজ। সরকারের নিদেশ ‘দুই সিটে এক যাত্রী’ মানছে না মালিক সমিতি। 
বাংলাদেশ পরিবহন মালিক সমিতির মহাসচিব খন্দকার এনায়েত উল্যাহ বলেছেন, যত সিট তত যাত্রী নিয়ে বাস চলাচল করবে। ভাড়া নেওয়া হবে আগের মতোই। তবে এক্ষেত্রে স্বাস্থ্যবিধি কঠোরভাবে মানা হবে।

পরিবহন মালিক সমিতির এ কথা মানছে না অনেক বাস ড্রাইভার হেলপার কন্ডাক্টর। তারা তাদের ইচ্ছামতো যাত্রী উঠাচ্ছে। ভাড়াও নিচ্ছে দ্বিগুণ তিনগুণ। রাস্তায় বাসের পরিমাণ কম থাকায় যাত্রীরা গাদাগাদি করে উঠছে। দ্বিগুণ ভাড়া দিতে অনেকটা বাধ্য হচ্ছে। কোনো কোনো বাসে কন্ডাক্টরের সঙ্গে যাত্রীদের ঝগড়াঝাটি এমনকি হাতাহাতি হচ্ছে। যাত্রীরা আসলে অনেকটাই জিম্মি পরিবহন মালিক শ্রমিকদের হাতে। তারা যেভাবে চালায় সেভাবেই চলতে হয় যাত্রীদের। 

বিআরটিএ’র চেয়ারম্যান বলেছেন, সব আসনেই যাত্রী নিয়ে বাস চলতে পারবে তবে এক্ষেত্রে কঠোর স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে হবে। করোনাভাইরাস সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে অন্যান্য সব বিধিনিষেধ বহাল থাকবে। করোনার নতুন ধরন ওমিক্রনের দাপটে সংক্রমণ বাড়তে থাকায় ১১টি ক্ষেত্রে আবারও বিধিনিষেধ আরোপ করেছে সরকার। সরকারের এই বিধিনিষেধ মানা সবার জন্য বাধ্যতামূলক। কিন্তু পরিবহন ক্ষেত্রে আরোপিত শর্ত অনেকটাই মানছে না পরিবহন শ্রমিক কর্মকর্তা কর্মচারীরা। ফলে সাধারণ মানুষ আছে বিপাকে। স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়েই চলাফেরা করতে বাধ্য হচ্ছে।

১৪ জানুয়ারি ২০২২ পর্যন্ত বাংলাদেশে করোনায় আক্রান্ত হয়েছে ১৬ লাখ ৪ হাজার ৬৬৪ জন। মারা গেছে ২৮ হাজার ১২৩ জন। এ সময় পর্যন্ত সারাবিশ্বে আক্রান্ত হয়েছে ৩১ কোটি ৮০ লাখ ৩৯ হাজার ৮৩৯ জন। মারা গেছে ৫৫ লাখ ১৭ হাজার ৪১৪ জন। 

করোনাভাইরাসের নতুন ধরন ওমিক্রনের প্রভাব দিন দিন বাড়ছে। যার কারণে সরকার নানারকম বিধিনিষেধ আরোপ করছে। সবক্ষেত্রেই সাধারণ মানুষ এসব বিধিনিষেধ মানছে। শুধু পরিবহন ক্ষেত্রেই মানা সম্ভব হচ্ছে না। কারণ পরিবহন ক্ষেত্রটা সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে। এর নিয়ন্ত্রণের চাবিকাঠি পরিবহন মালিক-শ্রমিক, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের হাতে। তারা তাদের ইচ্ছামতো চালায়। প্রয়োজনে সরকারকে চাপ দিয়ে ভাড়া বাড়ায়। তাদের সুবিধামতো তারা সব নিয়মকানুন তৈরি করে। যাত্রীদের সুবিধা হলো নাকি অসুবিধা হলো সে ব্যাপারে তাদের তেমন কোনো মাথাব্যথা নেই। 

সকালবেলা অফিস সময়ে বাসে ওঠাটাই যেন একটা যুদ্ধ। সাধারণ মানুষের এই যুদ্ধের সুযোগটাই নেয় পরিবহন শ্রমিকরা। ১০ টাকার ভাড়া ২০ টাকা হাঁকে। মানুষের তখন কিছুই করার থাকে না। বাধ্য হয়ে বাসে ওঠে। গাদাগাদি করে অফিসে যায়। ভাড়া দেয় সরকার নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে দ্বিগুণ বেশি। বিকালে অফিস থেকে ফেরার পথে একই অবস্থা। গাদাগাদি করে এসেও ভাড়া দিতে হয় দ্বিগুণ।

সাধারণ মানুষের এই জিম্মি দশাটা একেবারেই কাটছে না। যতই দিন যাচ্ছে ততই যেন বাড়ছে। করোনার কারণে মানুষের আয়-রোজগার কমেছে কিন্তু খরচ বেড়েছে দ্বিগুণ-তিনগুণ। পরিবহন ভাড়ার সঙ্গে নিত্যপ্রয়োজনীয় সব জিনিসের দামের একটা সম্পর্ক আছে। পরিবহন ভাড়া বাড়লে সব জিনিসের দাম অটো বেড়ে যায়। 

একসময় মানুষ ভাবত বাসা ভাড়া নিয়ে। বেতনের প্রায় অর্ধেক টাকা চলে যেত বাসা ভাড়ায়। এখন মানুষের জীবনে নতুন সংযোজন পরিবহন ভাড়া। বাসা আর পরিবহন এই দুই ভাড়া নিয়ে সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাস। বেতনের প্রায় ৭০-৮০ শতাংশ টাকা চলে যায় এই দুই খাতে। বাকি ২০-৩০ শতাংশ টাকা দিয়ে চালাতে হয় সংসার। দ্রব্যমূল্যের এই ঊর্ধ্বগতিতে সংসার চালানোই যেন দায়।

তার মধ্যে আবার ‘মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা’ করোনাভাইরাস। বিভিন্ন সময় ভিন্ন ভিন্ন নামে আসছে করোনাভাইরাসের বিভিন্ন ধরন। এই ধরনগুলো মানুষকে যত না আক্রান্ত করছে তারচেয়ে বেশি করছে আতঙ্কিত। সাধারণ মানুষের জীবনকে করে তুলেছে দুর্বিষহ।

করোনাভাইরাসের সংক্রমণ বাড়লেই সরকার নানারকম বিধিনিষেধ আরোপ করে। সেসব বিধিনিষেধের কারণে মানুষের চলাচলে বাধা আসে। গণপরিবহনের ক্ষেত্রে যেসব বিধিনিষেধ আরোপ করা হয় সাধারণ মানুষ তা অক্ষরে অক্ষরে পালন করার চেষ্টা করে। কিন্তু মানুষকে বিপাকে ফেলে দেয় পরিবহন মালিক-শ্রমিক,কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। নানা বাহানায় তারা পরিবহন সেক্টরে নৈরাজ্য সৃষ্টি করে। যার প্রত্যক্ষ শিকার হয় সাধারণ যাত্রীরা। 

পরিবহন মালিক-শ্রমিকরা কথায় কথায় পরিবহন বন্ধের হুমকি দেয়। সরকারের এবারের সিদ্ধান্তটি কার্যকর না হওয়ার পেছনেও মূল কারণ পরিবহন মালিক-শ্রমিকদের ‘হুমকি’। তারা অর্ধেক আসন খালি রেখে পরিবহন চালাতে নারাজ। প্রয়োজনে পরিবহন বন্ধ করে ঘরে বসে থাকবে তারপরও অর্ধেক আসন ফাঁকা রেখে পরিবহন রাস্তায় নামাবে না। প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে এই হুমকির কারণেই সরকার সিদ্ধান্ত বদলাতে বাধ্য হয়েছে।

জনস্বাস্থ্যের কথা চিন্তা করে সরকার যে সিদ্ধান্ত নিয়েছিল তা ছিল সঠিক ও সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত। ওমিক্রমন সংক্রমণের হার লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ার এই সময়ে সরকার যে সিদ্ধান্ত নিয়েছিল তা ছিল জনবান্ধব। পরিবহন মালিক সমিতি নিজেদের ব্যবসার স্বার্থে জনগণের বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছে। তাদের এই অবস্থান সাধারণ মানুষ ভালোভাবে গ্রহণ করেনি। মানুষের শরীর স্বাস্থ্যের কথা চিন্তা করে বাসমালিকদের সরকারের সিদ্ধান্ত মেনে নেওয়া উচিত ছিল। 

আসলে সবাই সব কিছু বোঝে না। বোঝার ক্ষমতাও সবার থাকে না। এসব বোঝা না বোঝার ফাঁকে পড়ে সাধারণ মানুষের অবস্থা বেগতিক। মানুষ না পারছে সহ্য করতে, না মেনে নিতে। তারপরও বাধ্য হয়ে মানতে হচ্ছে। মাত্র কদিন আগেই সরকার পরিবহন ভাড়া বৃদ্ধি করেছে। ডিজেলের দাম বাড়ার কারণে সরকার পরিবহন ভাড়া বাড়িয়েছে।

ডিজেলের দাম বাড়িয়েছে লিটারপ্রতি ১৫ টাকা। আগে ছিল প্রতিলিটার ডিজেলের দাম ৬৫ টাকা। সে হিসেবে ডিজেলের দাম হয়েছে প্রতিলিটার ৮০ টাকা। এর কিছুটা প্রভাব পড়বে পুরোপুরি ডিজেলচালিত গাড়ির ওপর। পেট্রোল-অকটেন বা সিএনজিচালিত গাড়ির ওপর এর কোনো প্রভাব পড়বে না।

দূরপাল্লার অধিকাংশ বাসই পেট্রোলচালিত। ডিজেলের দামের কোনো প্রভাব এই বাসের ওপর পড়ার কথা না। বাসমালিকরা অনেকটা গায়ের জোরে ফেলেছে। দূরপাল্লার কোনো কোনো বাস সিএনজিতে চলে। ঢাকা শহরের অধিকাংশ ‘সিটি সার্ভিস’ই সিএনজিচালিত।

সরকার বাসভাড়া বাড়িয়েছে ২৭ শতাংশ। লঞ্চভাড়া বাড়ানো হয়েছে ৩৫ শতাংশ। সারা দেশে দূরপাল্লার বাসের ভাড়া প্রতি কিলোমিটারে ১ টাকা ৪২ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ১ টাকা ৮০ পয়সা করা হয়েছে। মহানগরীতে বিভিন্ন রুটের বাসভাড়া প্রতি কিলোমিটারে ১ টাকা ৭০ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ২ টাকা ১৫ পয়সা করা হয়েছে। মিনিবাসের ভাড়া প্রতি কিলোমিটারে ১ টাকা ৬০ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ২ টাকা ০৫ পয়সা করা হয়েছে।

কিন্তু কে শোনে কার কথা? বাসমালিক-শ্রমিকরা ভাড়া বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নিজেদের মতো করে ভাড়া আদায় করতে শুরু করেছে। সাধারণ মানুষ তাদের হাতে পুরোপুরি জিম্মি।

গণপরিবহন খাতকে সরকারের নিয়ন্ত্রণে রাখাটা খুব জরুরি। এই খাতের ওপর অনেকটাই নির্ভরশীল দেশের অর্থনীতি, রাজনীতিসহ সবই। পরিবহন মালিক-শ্রমিক, কর্মকর্তা-কর্মচারীরা যদি সাধারণ মানুষের কথা এতটুকু ভাবে তাহলে মানুষ শান্তি পাবে। জীবনের অনেক সমস্যারও সহজ সমাধান হবে। মানুষ যতই বিপাকে থাকুক, যতই বিপদ আসুক যদি শক্ত হাতে মোকাবিলা করতে পারে তা হলে বিপাক-বিপদ দুটোই কাটানো সম্ভব। 

বাংলাদেশসহ সারা বিশ্বে ‘করোনাভাইরাস’ নামক যে বিপদটা আক্রমণ করেছে সে আক্রমণ হতে যেদিন গোটা পৃথিবী মুক্ত হবে সেদিন মানুষ শান্তি স্বস্তি ফিরে পাবে। 

বাংলাদেশের মানুষের অনেক সমস্যাই প্রাকৃতিক। অনেকগুলো মানুষের সৃষ্টি। মানুষের তৈরি সমস্যাগুলোর একটি ‘পরিবহন ভাড়া’ সমস্যা। এই সমস্যার সুষ্ঠু সমাধান হলে মানুষ জীবনের অনেক ঝামেলা হতে মুক্ত হবে। ফিরে পাবে স্বাভাবিক জীবন। যে জীবনের প্রত্যাশায় দিন গুনছে বাংলাদেশসহ সারাবিশ্বের সব মানুষ। 

তাদের এই প্রত্যাশা অচিরেই পূরণ হবে। মানুষ ফিরে পাবে হারানো দিনগুলো। মানুষের দুঃসময় একদিন কাটবেই। উদিত হবে নতুন সূর্য। করোনাকে জয় করে মানুষ ফিরে যাবে নতুন স্বাভাবিক জীবনে। বাসভাড়া নিয়ে ভাবনারও অবসান ঘটবে।

সাবেক খণ্ডকালীন শিক্ষক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়




http://www.shomoyeralo.com/ad/BD Sports News.gif

সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত


ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: কমলেশ রায়, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড
এর পক্ষে প্রকাশক গাজী আহমেদ উল্লাহ
নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।

ফোন : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৭৫। ই-মেইল : [email protected]