পুরস্কার নয়, লেখার জন্য লেখি: সেলিনা হোসেন

রুকাইয়া জহির

সাহিত্য

আগামী তিন বছরের জন্য বাংলা একাডেমির সভাপতি হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন নন্দিত কথাসাহিত্যিক সেলিনা হোসেন। তার উপন্যাসে প্রতিফলিত হয়েছে সমকালের সামাজিক

2022-02-11T14:22:37+00:00
2022-02-11T14:22:37+00:00
 
  মঙ্গলবার, ২৮ জুলাই ২০২৬,
১৩ শ্রাবণ ১৪৩৩
মঙ্গলবার, ২৮ জুলাই ২০২৬
সাহিত্য
পুরস্কার নয়, লেখার জন্য লেখি: সেলিনা হোসেন
সাক্ষাৎকার
রুকাইয়া জহির
প্রকাশ: শুক্রবার, ১১ ফেব্রুয়ারি, ২০২২, ২:২২ পিএম 
আগামী তিন বছরের জন্য বাংলা একাডেমির সভাপতি হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন নন্দিত কথাসাহিত্যিক সেলিনা হোসেন। তার উপন্যাসে প্রতিফলিত হয়েছে সমকালের সামাজিক ও রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব-সঙ্কটের সামগ্রিকতা। বাঙালির অহঙ্কার ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধের প্রসঙ্গ নতুন মাত্রা যোগ করেছে। তার গল্প-উপন্যাস ইংরেজি, রুশ, মেলে এবং কানাড়ি ভাষায় অনূদিত হয়েছে। ১৯৪৭ সালের ১৪ জুন রাজশাহী শহরে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। পৈতৃক নিবাস লক্ষ্মীপুর জেলার হাজিরপাড়া গ্রামে। ১৯৫৪ সালে বগুড়ার লতিফপুর প্রাইমারি স্কুলে তৃতীয় শ্রেণিতে ভর্তি হন। ১৯৫৯ সালে রাজশাহীর নাথ গার্লস স্কুলে অষ্টম শ্রেণিতে ভর্তি হন। ১৯৬২ সালে তিনি এখান থেকে মাধ্যমিক সম্পন্ন করেন। পরবর্তীতে ১৯৬৪ সালে রাজশাহী মহিলা কলেজে ভর্তি হন। কলেজজীবন শেষ করে বাংলা ভাষা ও সাহিত্য নিয়ে ভর্তি হন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৬৭ সালে বিএ অনার্স এবং ১৯৬৮ সালে এমএ পাস করেন। সেলিনা হোসেন ১৯৭০ সালে বাংলা একাডেমির গবেষণা সহকারী হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। ১৯৯৭ সালে বাংলা একাডেমির প্রথম মহিলা পরিচালক হন। ২০০৪ সালের ১৪ জুন চাকরি থেকে অবসর নেন। তার প্রথম গল্পগ্রন্থ ‘উৎস থেকে নিরন্তর’ প্রকাশিত হয় ১৯৬৯ সালে। তার উপন্যাসের সংখ্যা ৩৫টি, গল্পগ্রন্থ ১৩টি, ২২টি শিশু-কিশোর গ্রন্থ এবং প্রবন্ধের গ্রন্থ ১০টি। এ ছাড়া ১৩টি সম্পাদনা গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। ভাষা ও সাহিত্যে অবদানের জন্য বাংলা একাডেমি পুরস্কার, জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার, একুশে পদক, স্বাধীনতা পদক পেয়েছেন। বাংলা একাডেমির সভাপতি নিয়োগপ্রাপ্তির এ আনন্দঘন ক্ষণে তার সাক্ষাৎকার নিয়েছেন রুকাইয়া জহির

সময়ের আলো : আপনার জন্ম রাজশাহী, বেড়ে ওঠা বগুড়ায়। লেখালেখির শুরুটা জানতে চাই। লিখতে ইচ্ছে হলো কখন?
সেলিনা হোসেন : ছোটবেলায় যখন আমি স্কুলে পড়তাম, তখন ডায়েরিতে কবিতা লিখে লুকিয়ে রাখতাম। পাছে কেউ দেখে, আমার লজ্জা করত, ভয়ও পেতাম। ১৯৬৪ সালে রাজশাহী মহিলা কলেজে পড়ার সময় বিভাগীয় কমিশনার রাজশাহী বিভাগের সব কলেজের ছেলেমেয়েদের নিয়ে একটি সাহিত্য প্রতিযোগিতার আয়োজন করেন। সেখানে কলেজ থেকে আমাকে পাঠানো হয় গল্প লেখাসহ আরও সাতটি বিভাগে নাম দিয়ে। গল্প লিখি না বলে তখন কেঁদে ফেলেছিলাম। স্যার, ধমক দিয়ে বলেছিলেন ‘যা পার তাই লিখবে’। তারপর রেজাল্টের সময় দেখা গেল আমার গল্পটা প্রথম হয়েছে।

সময়ের আলো : ১৯৬৪ সালে প্রথম পুরস্কার, তারপর বাংলা একাডেমি পুরস্কার, জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার, একুশে পদক, স্বাধীনতা পদক, সর্বশেষ অন্যদিন হুমায়ূন আহমেদ সাহিত্য পুরস্কার। কেমন লাগে একটা একটা করে পুরস্কারের ঝুলি যখন বেড়েই চলে?
সেলিনা হোসেন : পুরস্কার পেলে আমি মনে করি আমার লেখাটি পাঠকের কাছে সমাদৃত হয়েছে। সেজন্য এটাকে গৌরবের জায়গা মনে করি। তবে পুরস্কারের জন্য নয়, লেখার জন্য লেখি। ১৯৬৪ সাল থেকে অনবরত লিখেছি, কখনও ছাপা হয়েছে, কখনও হয়নি। আমি মনে করতাম আমার গল্পটা হয়তো ঠিকমতো হয়নি, সেজন্য সম্পাদক সেটা পছন্দ করেননি।

সময়ের আলো : প্রথম বই প্রকাশিত হলো কবে?
সেলিনা হোসেন : ১৯৬৯ সালে আমার ‘উৎস থেকে নিরন্তর’ বইটি প্রকাশিত হয়েছিল। রাজশাহী কলেজের অধ্যাপক আবদুল হামিদ আমাকে বলেছিলেন, ‘যতগুলো গল্প লিখেছো এগুলো এক করে একটা বই করো। তোমার চাকরি পেতে সহজ হবে। বায়োডাটাটা অন্যদের চেয়ে একটু আলাদা হবে।’ মাকে বলার পরে মা সংসারের খরচ থেকে বাঁচিয়ে টাকা দিতে রাজি হন। বায়োডাটা সমৃদ্ধ করার আশায় আমি বই ছাপিয়েছি, লেখক হব ওই চিন্তায় বই ছাপাইনি।

সময়ের আলো : একজন নারী লেখক হিসেবে কখনও কোনো প্রতিবন্ধকতার শিকার হয়েছেন কি না?
সেলিনা হোসেন : না, কখনও আমাকে কেউ বলেনি আপনার লেখা ছাপব না। নারী লেখক নারী লেখক 
বলে আলাদা করে চিন্তা করার সুযোগ নেই। জীবন ঘনিষ্ঠ লেখাই লেখকের মূল কাজ ।

সময়ের আলো : লেখালেখি করে জীবিকা নির্বাহ করা যায়?
সেলিনা হোসেন : আমি আমার অভিজ্ঞতা থেকে লেখি। এ জন্য আমাকে বিভিন্ন এলাকায়, জায়গায় যেতেও হয়। কাছে গিয়ে দেখি। আমি বাংলা একাডেমির চাকরির বেতনের কিছু অংশ সবসময় সঞ্চয় করে রেখে দিতাম লেখালেখির খরচ মেটানোর জন্য। যাতে পয়সার অভাবে বসে থাকতে না হয়।

সময়ের আলো : নতুন লেখকদের জন্য কোনো পরামর্শ আছে কি না?
সেলিনা হোসেন : পরামর্শ হলো, নিজের জীবনের অভিজ্ঞতা, মানুষের সঙ্গে মিশে, ঘুরে বেরিয়ে এবং বই পড়ে অভিজ্ঞতার সঞ্চয় করে লিখতে হবে।

সময়ের আলো: অনেক সময় লেখার মানের চেয়ে লেখকের জনপ্রিয়তা মুখ্য হয়ে যায়। অনেক গুণী লেখকের লেখা আড়ালে থেকে যায় প্রচারবিমুখতার কারণে, এ বিষয়টিকে কীভাবে দেখেন?
সেলিনা হোসেন : যিনি জনপ্রিয় তিনি যখন পাঠকের পিপাসা মেটাতে পারেন, সেটিকে গৌরবের জায়গা থেকে দেখি। এ পাঠকরা জনপ্রিয় লেখকের বই পড়তে পড়তে, আরেকটি গবেষণা কিংবা নিষ্ঠার সঙ্গে লেখা ভালো বই পড়তে আগ্রহী হন। মূল কথা পাঠক তৈরি হয়। 

সময়ের আলো : এখন নতুন কী লিখছেন?
সেলিনা হোসেন : একটা উপন্যাস লিখছি, মুক্তিযুদ্ধের সময় যে শরণার্থীরা ভারতে ছিল, সেই পটভূমিতে ‘শরণার্থীর সুবর্ণরেখা’ নামে। প্রত্যাশা করছি এবার বই মেলাতে হয়তো প্রকাশিত হবে।

সময়ের আলো : বিজয়ের সুবর্ণজয়ন্তী উদযাপন করলাম আমরা। ৫০ বছরে কতটা এগিয়েছে জাতি?
সেলিনা হোসেন : এখনও বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা পুরোপুরি গড়ে ওঠেনি। এখনও দুর্নীতির ঘেরাটোপে জর্জরিত আমরা। তবে অর্থনৈতিকভাবে এখন দরিদ্র মানুষের থালায় ভাত আছে, এটা একটা স্বপ্নের জায়গা। আমার মনে হয়, সমাজতান্ত্রিক রাজনীতি দিয়ে দেশ শাসন হলে মানুষের সব মৌলিক চাহিদা পূরণ হবে। আমাদের সরকারপ্রধান চেষ্টা করছেন, মেয়েদের শিক্ষিত করতে, বাল্যবিয়ে রোধ করতে, এসব দিক খুবই ইতিবাচক। আমাদের গার্মেন্টস ফ্যাক্টরিসহ বিভিন্ন অর্থনৈতিক কাজে মেয়েরা এগিয়ে যাচ্ছে, বৈদেশিক মুদ্রা আনছে, এগুলো বিশাল এক উন্নতির দিক। শুধু সরকারের পদক্ষেপে হবে না, প্রত্যেককে নিজ জায়গা থেকে এগিয়ে আসতে হবে। করোনার সময় এত বাল্যবিয়ে হলো, আমাদের মেয়েরা কেন প্রতিবাদ করল না, কেন এগিয়ে এসে বাবা-মাকে বলল না, ‘এখনই আমাকে বিয়ে দিও না, আমার পড়ালেখা করতে হবে।’

সময়ের আলো : সামনের দিনগুলোতে আর কী চান? জীবনে আর কী পেতে চান?
সেলিনা হোসেন : জীবনে আর কিছু পেতে চাই না। আমি যা পেয়েছি, অনেক পেয়েছি। মানুষের ভালোবাসা তো অনেক পেয়েছি। ভালোবাসা নিয়েই আছি। তবে আমার চিন্তায় কিছু লেখার বিষয় আছে, সেগুলো লিখতে চাই।

সময়ের আলো : সময় দেওয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।
সেলিনা হোসেন : সময়ের আলো ও তার পাঠকদের অসংখ্য ধন্যবাদ।



  বিষয়:   সেলিনা হোসেন  কথাসাহিত্যিক 


Loading...
Loading...
সাহিত্য- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: