ই-পেপার বিজ্ঞাপনের তালিকা শনিবার ৩ ডিসেম্বর ২০২২ ১৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৯
ই-পেপার শনিবার ৩ ডিসেম্বর ২০২২
https://www.shomoyeralo.com/ad/Amin Mohammad City (Online AD).jpg

আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের গতিবিধি
সাব্বির আহমেদ
প্রকাশ: সোমবার, ৪ এপ্রিল, ২০২২, ১:০৭ পিএম | অনলাইন সংস্করণ  Count : 530

পৃথিবী একটাই। এর ওপর নির্ভর করে বেঁচে থাকে লক্ষ-কোটি প্রজাতির প্রাণী। এরা কেউই একা এক জায়গায় বাঁচতে পারে না। জীবিকার অন্বেষণে প্রতিটি প্রাণীকেই বের হতে হয় ঘরের বাইরে। হাজার হাজার মাইল পাড়ি দিয়ে প্রতিবছর পাখিরা আসে খাদ্য আর আবাসনের সন্ধানে। এক দেশ থেকে আরেক দেশে চলে যায় প্রাণীর দল। তাদের ভিসা বা এলসি লাগে না। অতীতে লাগেনি মানুষেরও। পরিযায়ী পাখির মতো খাদ্য, সম্পদ আর জ্ঞান আহরণের জন্য লাখ লাখ বছর ধরে মানুষ চষে বেড়াচ্ছে পৃথিবীর একূল থেকে ওকূল। 

যেদিন পূর্ব আফ্রিকা থেকে আদিম মানুষরা পৃথিবীব্যাপী ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে, সেদিন থেকেই শুরু মানুষের বিশ্বায়ন। এক জাতির মানুষ আরেক জাতের সঙ্গে বাণিজ্য করছে তাও কয়েক হাজার বছর ধরে। সিল্ক রোডের বয়সই তো দুই হাজার বছরের বেশি। গ্লোবালাইজেশন বা বিশ্বায়ন নতুন কিছু নয়। বিশ্বায়ন মানে নয় শুধু ব্যবসা-বাণিজ্য। বিশ্বায়নে রয়েছে মানুষের যাতায়াত, মূলধন আর পণ্য চলাচল; জ্বালানি তেল, ই-মেইল, সংস্কৃতি, খবর, রেডিও সিগন্যাল, স্যাটেলাইট, তথ্যপ্রবাহ, ওষুধপথ্য, সন্ত্রাস, অস্ত্রের চালান, খাদ্য, কার্বন ডাই-অক্সাইড, রোগ, আরও কত কী। 

বিশ্বায়নের বর্তমান অধ্যায় শুরু হয় শিল্প বিপ্লবের পর থেকে। যন্ত্রচালিত শিল্পকারখানা মানুষের পণ্য উৎপাদন শক্তি বহুগুণ বাড়িয়ে দিলে উৎপাদিত পণ্য বিপণনের জন্য বিশ্বায়ন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রিগ্যান আর ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী মার্গারেট থ্যাচার বিশ্বব্যাপী মুক্তবাজার অর্থনীতির ওকালতি শুরু করলে বর্তমানকালের বিশ্বায়নের গোড়াপত্তন হয়। 

বার্লিন দেয়াল আর সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে দেওয়ার পর থেকে সারা দুনিয়ায় ব্যাপকভাবে বাস্তবায়ন করা হয় মুক্তবাজার অর্থনীতির ধারণাগুলো। প্রথম, দ্বিতীয়, তৃতীয় সব বিশে^ই চালু হয়ে যায় মুক্তবাজার অর্থনীতির জয়জয়কার। চীন আর কিউবার মতো কমিউনিস্ট দেশগুলোও বিশ্বায়নের এই স্রোত থেকে নিজেদের আলাদা রাখতে পারেনি। ধীরে হলেও যোগ দিয়েছে বিশ্বায়ন তথা মুক্তবাজার অর্থনীতির গড্ডলিকা প্রবাহে। 

এ পর্যায়ে বিশ্বায়ন হয়েছে মূলত পণ্য আর মূলধন প্রবাহে। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা গঠন করে তাকে দেওয়া হয়েছে বিশ্বায়নের নিয়মনীতি প্রণয়নের কাজ। জাতিসংঘের মতোই বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার ওপরেও প্রভুত্ব আরোপ করে ধনী রাষ্ট্রগুলো। বিশ্বায়নের নীতিগুলো প্রণয়ন করা হয় তাদের স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে। সব পণ্যে ও সেবার ওপর শূন্য শুল্ক ও শূন্য ভর্তুকি ধার্যের এবং সেসঙ্গে সব বাণিজ্য প্রতিবন্ধকতা দূর করার লক্ষ্য নিয়ে শুরু হলেও তা বাস্তবায়ন সম্ভব হয়নি ধনীদের কারণেই। 

তারা নিজ দেশে কৃষি ভর্তুকি বজায় রাখে; পেটেন্ট আরোপ করতে চায় বীজের ওপর; বিশ্বায়ন হয়নি জ্ঞান-বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, তথ্য, শিল্প-সাহিত্য, দর্শনের। সেবাখাত আর শ্রমিকের চলাচল উন্মুক্ত হলে উন্নয়নশীল দেশগুলো বেশি সুবিধা পাবে বলে পর্যাপ্ত নীতিমালা প্রণয়ন করা যায়নি এসব ক্ষেত্রে। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার মাধ্যমে ধনী বিশ্বের সুযোগ বৃদ্ধির বিষয়গুলো ধীরে ধীরে প্রকাশ হয়ে পড়ে। ১৯৯৮ সালের সিয়াটল সম্মেলন থেকে দেশে দেশে শুরু হয় বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার বিশ্বায়নবিরোধী প্রতিবাদ, প্রতিরোধ। অনেক চেষ্টার পরও বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা আর বিশ্বনাগরিকের পূর্ণ সমর্থন আদায় করতে পারেনি। তবে গ্যাটস থেকে শুরু করে যতগুলো নিয়ম-কানুন ডব্লিউটিও করেছিল তা অব্যাহত থাকে। চলে বাণিজ্যের বিশ্বায়ন। 

এই পর্বের বিশ্বায়নে লাভবান হয়েছে উন্নত দেশের সম্পদশালীরা। তার কিছু ভাগ পেয়েছে গরিব দেশের উদ্যোক্তারাও। উন্নয়নশীল দেশগুলোতে তৈরি হয়েছে নব্য ধনিক শ্রেণি; বেড়েছে অর্থনৈতিক বৈষম্য। আন্তর্জাতিক কোম্পানিগুলো দরিদ্র দেশ থেকে কমদামে পণ্য তৈরি করে নিয়ে অনেক বেশি দামে বিক্রি করেছে ধনী দেশের ভোক্তার কাছে। এতে ধনী দেশের ক্রেতা তার দেশে পণ্যটি উৎপাদন হলে যে দামে তাকে কিনতে হতো তার থেকে কমদামে পণ্য পেয়েছে; গরিব দেশের কিছু শ্রমিক মৃত্যুক্ষুধা থেকে রেহাই পেয়েছে। গরিব দেশে কর্মসংস্থান বৃদ্ধির অজুহাতে রাষ্ট্রীয় আইনগুলো নিজেদের অনুক‚লে নিয়ে নিয়েছে উদ্যোক্তারা; গড়েছে সম্পদের পাহাড়। তাছাড়া বিশ^জুড়ে কমেছে শিশুমৃত্যুর হার, দারিদ্র্য; বেড়েছে গড় আয়ু, আয় ও সম্পদবৈষম্য। 

বিশ্বায়নের সুযোগে কারখানাগুলো কমদামি শ্রমের দেশে নিয়ে যাওয়ায় এবং নতুন নতুন কারখানা সেসব দেশে তৈরি করায় কাজ হারিয়েছে ধনী দেশের শ্রমিকরা। তার ওপর কয়েকটি যুদ্ধের উদ্বাস্তু এবং ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের কারণে ইউরোপ এবং নিজ দেশে শ্রমের দাম কমানোর জন্য অভিবাসীদের গ্রহণ করে আমেরিকা আরেক দফা কমিয়েছে শ্রমিকের মজুরি। এই বিশ্বায়নের যুগে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ধনী দেশের শ্রমিক শ্রেণি সবচেয়ে লাভবান হয়েছে সেসব দেশের বিলিয়নিয়ার পরিবারগুলো। অর্থনৈতিক বৈষম্য চূড়ায় উঠেছে। মাত্র ২৬ জন ব্যক্তির হাতে জমা হয়েছে ৩৮০ কোটি মানুষের সমান সম্পদ। দরিদ্র দেশ থেকে শোষণ করা হয়েছে শ্রমিকের ঘাম আর প্রাকৃতিক সম্পদ। সেসঙ্গে ধ্বংস হয়েছে প্রকৃতি। পত্তন হয়েছে নয়া সাম্রাজ্যবাদের। বাণিজ্য সুবিধা দিয়ে দরিদ্র দেশগুলোকে কার্যত অর্থনৈতিক উপনিবেশে পরিণত করেছে ধনী ও শক্তিশালী দেশগুলো। 

ধনী দেশগুলোতে ২০০৮-০৯ সালের আর্থিক সঙ্কট সৃষ্টি হলে অর্থনৈতিক বৈষম্য বেশ স্পষ্ট হয়ে ওঠে। দেশে দেশে, শহরে শহরে মানুষ প্রতিবাদী হয়, প্রতিরোধে পথে নামে। বদলে যায় ইউরোপ আর আমেরিকার রাজনৈতিক পট। বিশ^ায়ন এবং অভিবাসনবিরোধী রাজনীতির পালে হাওয়া লাগে। আমেরিকায় গড়ে ওঠে অকুপাই ওয়ালস্ট্রিট আন্দোলন। 

মাসাধিককাল ধরে চলে প্রতিবাদ, আন্দোলন। সারা দুনিয়ার জ্ঞানীগুণী বিবেকবান মানুষরা সমর্থন জানায় এ আন্দোলনের প্রতি। সংহতি প্রকাশ করে একই দিনে বিশে^র প্রধান ৮০টি শহরে পথে নামে লাখ লাখ মানুষ। পরবর্তী সময়ে দেশে দেশে রাজনৈতিক অঙ্গনে শক্তিশালী হয়ে ওঠে লোকরঞ্জনবাদ (চড়ঢ়ঁষরংস)। হয় ব্রেক্সিট, রাষ্ট্রক্ষমতায় লোকরঞ্জনবাদীরা ভাগ বসায় অনেক দেশে। আমেরিকায় রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন লোকরঞ্জনবাদী ডোনাল্ড ট্রাম্প। 

ট্রাম্প নির্বাচিত হওয়ার পর বিশ্বায়নবিরোধিতা তুঙ্গে ওঠে। অনেক দেশ এবং অঞ্চলের সঙ্গে করা আমেরিকার বাণিজ্য চুক্তি তিনি বাতিল করে দেন; অভিবাসন ঠেকাতে মার্কিন আইনসভা অর্থায়ন করে ট্রাম্প প্রস্তাবিত মেক্সিকো সীমান্তে দেয়াল তুলতে। লোকরঞ্জনবাদী ট্রাম্প দ্বিতীয় বৃহৎ অর্থনৈতিক শক্তি চীনের সঙ্গে করা বাণিজ্য চুক্তি বাতিল করে শুরু করে বাণিজ্য যুদ্ধ। চীনে করোনাভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার পর ট্রাম্প প্রথমে এটাকে ‘চীনা ভাইরাস’ নামে অভিহিত করে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করে চীনের সঙ্গে তাদের চলমান বিরোধকে জাগিয়ে তোলেন। চীন-আমেরিকা বাণিজ্য যুদ্ধ আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ওপর, তথাকথিত বিশ্বায়নের ওপর যথেষ্ট প্রভাব ফেলেছে; করোনা-পরবর্তী পৃথিবীতে তা আরও ব্যাপক ভ‚মিকা রাখবে। করোনা পরিস্থিতি নিয়ে উত্তাল ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন। অবাধ চলাচলে সমস্যা সৃষ্টি হতে পারে সেখানেও। 

করোনাভাইরাসের তাণ্ডব শুরু হওয়ার পর এপ্রিল মাসে ফাইন্যান্সিয়াল টাইমসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বিশ্বায়নবাদী ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমান্যুয়েল ম্যাক্রোঁ স্বীকার করেছেন, ‘জলবায়ু পরিবর্তনের চাপ, অর্থনৈতিক বৈষম্য এবং ক্ষয়ে যাওয়া গণতন্ত্রের মধ্যে অনুভব করছি যে করোনাভাইরাস সৃষ্ট সঙ্কটের আগেই প্রতিষ্ঠিত বিশ্বায়ন তার জীবনচক্রের শেষ প্রান্তে চলে এসেছে।’ ‘বস্তুত একালের বিশ্বায়ন অর্থনৈতিক এবং অন্যান্য স্বার্থকে একীভ‚ত করে জগৎকে এগিয়ে নিতে এখন কিংবা কখনই একমাত্র বা শ্রেষ্ঠ পথ ছিল না’, যুক্তরাজ্যের প্রসপেক্ট ম্যাগাজিনে সম্প্রতি প্রকাশিত এক নিবন্ধে এ কথা বলেছেন হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড্যানি রডরিক। নিউইয়র্ক টাইমসের কলামিস্ট এবং নিউইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক নরিয়েল রৌবিনি করোনা-পরবর্তী বিশ্ব অর্থনীতি সম্পর্কে সাম্প্রতিক এক নিবন্ধে লিখেছেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র এবং চীনের সম্পর্ক বিযুক্তিকরণ হবে দ্রুতগতিতে এবং বেশিরভাগ দেশ নিজেদের ব্যবসায় ও শ্রমিকদের রক্ষা করার জন্য প্রতিরক্ষামূলক নীতি গ্রহণ করবে। করোনা-পরবর্তী বিশ^ প্রযুক্তি, তথ্য-উপাত্ত, শ্রম, পণ্য, সেবা ও মূলধন চলাচলের ওপর কঠোরতা আরোপের কাল হিসেবে চিহ্নিত হবে।’ 

করোনাকালে যুক্তরাষ্ট্র তার আধিপত্য আরও অনেকটা হারিয়েছে। থাইল্যান্ড থেকে জার্মানির মাস্ক, পিপিই ছিনিয়ে নিয়ে, কানাডার সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ করোনা রসদ সরবরাহ না করে, ভারতকে নিজের আইন লঙ্ঘন করে ম্যালেরিয়ার ওষুধ পাঠাতে বাধ্য করে আমেরিকা নিজের অবস্থানকে দুর্বল করে তুলেছে। পক্ষান্তরে নিজেদের দেশের করোনা সমস্যা অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে নিয়ন্ত্রণ করে চীন পৃথিবীর অনেক দেশে স্বাস্থ্য সহায়তা পাঠিয়েছে। করোনা-পরবর্তী পৃথিবীতে চীনের প্রভাব অনেকখানি বাড়বে বলে ধরে নেওয়া যায়। 

চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ক শক্তিশালী রয়েছে অনেকদিন থেকে। সে সম্পর্ক জোরদার হচ্ছে দিনকে দিন। চীন-ভারত বৈরিতার সম্পর্ক বহু পুরনো। মনমোহন সিংয়ের শেষ সরকারের সময় সে বৈরিতা বন্ধুত্বে রূপ নিয়েছিল। সে সম্পর্ক বর্তমান প্রেক্ষাপটে ফিরে আসার যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে। তা হলে বাংলাদেশ আঞ্চলিক এবং আন্তর্জাতিক দুই ক্ষেত্রেই অত্যন্ত সুবিধাজনক অবস্থানে চলে যাবে। তা না হলেও বর্তমানের মতো চীন ও ভারত দুই বৃহৎ শক্তিকে পাশাপাশি রেখে এগিয়ে চলার নীতি বজায় থাকলেই আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে সুবিধাজনক অবস্থানে থাকবে বাংলাদেশ। 

করোনার কারণে বিশ্ব বাণিজ্য থমকে দাঁড়িয়েছে। জ্বালানি তেলের দাম রয়েছে অনেক নিচে। যুক্তরাষ্ট্রে তেলের দাম নেমেছিল শূন্যেরও নিচে। আংক্টাড জানিয়েছে, এ বছরের দ্বিতীয় ত্রৈমাসিক বাণিজ্য সঙ্কোচন হবে ২৭ শতাংশ। আইএমএফ আগেই জানিয়েছে, বিশ^ অর্থনীতি এ বছর সঙ্কুচিত হবে ৩ শতাংশ, যা ত্রিশের দশকের মহামন্দার পরে সর্বনিম্ন। 

আইএমএফের এই প্রাক্কলনকে অনেকেই আশাবাদী বলে মন্তব্য করেছেন। বিশ্ব অর্থনীতির সঙ্কোচন আগামীতে মহামন্দায় পরিণত হওয়ার আশঙ্কাও করছেন অনেক। তাদের ধারণা, করোনা বিশ^ অর্থনীতির যে ক্ষতি করছে তা কাটিয়ে স্বাভাবিক পর্যায়ে আসতে ৩ থেকে ১০ বছর সময় লেগে যেতে পারে। এখনকার ধারণাগুলোর অনেক কিছুই আগামীতে বাস্তব হবে; অনেকগুলো ভুল প্রমাণিত হবে। তারপরও এটা স্পষ্ট যে, আগামী দু-চার বছর অর্থনীতি দুর্বল থাকবে এবং বিশ্বব্যাপী দ্রব্যের চাহিদা এবং মূল্য দুটোই কম থাকবে। এরকম একটা নিকট ভবিষ্যৎ পরিস্থিতির কথা বিবেচনায় রেখেই আমাদের আগামী দিনের ক‚টনীতি এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের পরিকল্পনাগুলো সাজাতে হবে।

আন্তর্জাতিক বাজারের গতিবিধির ওপর সতর্ক নজর রেখে আমাদের কিছু কাজ করার রয়েছে। করোনাকালে অনেক দেশ স্বাস্থ্যসেবায় নিজেদের দুর্বলতাগুলো বুঝতে পেরেছে। স্বাস্থ্যসেবা শক্তিশালী করতে হলে তাদের প্রয়োজন হবে ডাক্তার, নার্স এবং চিকিৎসা যন্ত্রপাতি ও অন্যান্য রসদের। খাদ্যশস্য আমদানিনির্ভর অনেক দেশ কৃষিতে স্বাবলম্বী হওয়ার বিষয়টি এখন গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে। তারা নিজেরা খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ হতে চাইবে। সেজন্য দরকার হবে কৃষিকাজে দক্ষ কৃষকের। বাংলাদেশের রয়েছে যথেষ্ট দক্ষ ডাক্তার, নার্স এবং কৃষক। এই দুই ক্ষেত্রেই বাংলাদেশ সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিতে পারবে। ক‚টনৈতিক মিশনগুলো যে যে দেশে আছে সে দেশের এবং তার পাশর্^বর্তী দেশের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করলে এই চাহিদাগুলো দেখতে পাবে। চাহিদা সৃষ্টি হওয়া মাত্র তা জোগান দেওয়ার জন্য বাংলাদেশকে প্রস্তুত থাকতে হবে। 

বাংলাদেশ জ্বালানি তেল ও গ্যাস দুইই আমদানি করে। সতর্কতার সঙ্গে আমরা বেশ কিছু কৌশলগত ক্রয় করতে পারি। পূর্ণ করে রাখতে পারি আমাদের ট্যাঙ্কগুলো। বিস্তারিত বিবেচনায় উপযুক্ত মনে করলে নতুন নতুন ট্যাঙ্ক বানিয়ে আমাদের জ্বালানি তেলের ও এলএনজির মজুদ বাড়িয়ে রাখতে পারলে অনেক জ্বালানি খরচ সাশ্রয় করা যাবে। দেশে বেশিরভাগ শিল্পের কাঁচামাল আমদানি করতে হয়। ক্রমবর্ধমানশীল শিল্প খাতের যন্ত্রপাতির জন্যও বাংলাদেশ আমদানির ওপর নির্ভর করে। বাংলাদেশ তৈরি পোশাক রফতানির নির্ভরশীল হয়ে আছে। এই করোনাকালে বিষয়টি আরও বেশি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। সমাজকে এর জন্য ইতোমধ্যে অনেক দামও দিতে হয়েছে। 

রফতানি বহুমুখীকরণের কথা অনেক আলোচনা হয়; কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হচ্ছে না। এবার এক্ষেত্রে নজর দিতে হবে। করোনাকালে প্রয়োজনের তাগিদে বাংলাদেশ ভ্যান্টিলেটরের মতো আধুনিক যন্ত্রপাতি তৈরির কারখানা স্থাপন করছে। ইতোমধ্যে দেশে ইলেকট্রনিক্স উৎপাদন প্রায় বিপ্লব সৃষ্টি করে ফেলেছে। শুধু ইলেকট্রনিক্সই নয়, অন্যান্য যন্ত্রপাতি তৈরি করার জন্য প্রয়োজনীয় জনবল দেশেই রয়েছে। উচ্চতর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি শিক্ষায় শিক্ষিত তরুণরা যোগ্যতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কাজ পাচ্ছে না। বিশ^ অর্থনীতির মন্দার এই সময়ে আন্তর্জাতিক বাজারে শিল্প কাঁচামাল ও যন্ত্রপাতির দাম অনেক কমে গেছে, আরও কমে যাবে। অর্থনৈতিক অঞ্চল তৈরির কাজও অনেক এগিয়েছে। বর্তমান এবং নতুন শিল্পে বিনিয়োগের এখন উৎকৃষ্ট সময়। 

শিল্পের জন্য কাঁচামাল ও যন্ত্রপাতি এবং তথ্যপ্রযুক্তির যন্ত্রপাতিতে বিনিয়োগ করে বাংলাদেশ এই করোনা দুর্দিনকে সুদিনে রূপান্তর করে ফেলতে পারে। চ্যালেঞ্জটা নিতে হবে দক্ষতা ও যোগ্যতাসম্পন্ন ব্যক্তিদের। বিনিয়োগ সবসময় ঝুঁকিপূর্ণ। সতর্কতার সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাজারের এবং বৈদেশিক মুদ্রার গতিবিধি পর্যবেক্ষণ, বিশ্লেষণ এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে ব্যর্থ হলে হিতে বিপরীত হতে পারে। অভিজ্ঞ এবং দক্ষ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে সতর্কতার সঙ্গে যাচাই-বাছাই করে বিনিয়োগের জন্য নির্ধারণ করতে হবে। প্রশাসনিক জটিলতা দূর করে অনলাইনে ব্যবসা ও শিল্প স্থাপনের অনুমতি, লাইসেন্স ইত্যাদি পাওয়ার ব্যবস্থা করে দিতে হবে। উদ্যোক্তাদের উৎসাহ দেওয়ার জন্য বিভিন্ন রকমের কর, অর্থায়ন এবং অন্যান্য প্রণোদনা দিতে হবে। দূর করতে হবে বিনিয়োগের প্রতিবন্ধকতাগুলো; দিতে হবে প্রাতিষ্ঠানিক সুবিধাবলি। লাল ফিতার দৌরাত্ম্য ঘুচিয়ে ব্যাপকভাবে শিল্পায়ন করার এখনই সময়। এ কাজগুলো সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করার জন্য এখনই একটা কমিশন গঠন করলে দ্রুত ফল পাওয়া যাবে। কমিশন বিনিয়োগের উপযুক্ত ক্ষেত্র নির্ধারণ করে, নীতিমালা প্রণয়ন করে দিলে করোনাকাল কেটে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বাংলাদেশ কাজে নেমে পড়তে পারবে। 

আন্তর্জাতিক বাজারে বিনিয়োগ করার ক্ষেত্রে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ এবং সরবরাহ সতর্কতার সঙ্গে পর্যবেক্ষণে রাখতে হবে। দেশের রয়েছে যথেষ্ট পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, তার ওপর রয়েছে বৈদেশিক মুদ্রায় ঋণ নেওয়ার অনেক সুযোগ। তৈরি পোশাকের রফতানি এবং প্রবাসীদের পাঠানো অর্থের প্রবাহ বর্তমানে কমে গেলেও এ অবস্থা বেশিদিন বজায় থাকবে না। আমাদের তৈরি পোশাক নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের অন্তর্ভুক্ত, বিলাসদ্রব্য নয়। ফলে ইউরোপ-আমেরিকা কিছুটা চালু হলেই আবার আমাদের বাজার ফিরতে শুরু করবে। একই ব্যাপার ঘটবে প্রবাসীদের রেমিট্যান্সের ক্ষেত্রেও। নতুন সৃষ্ট ক্ষেত্রগুলোতে রফতানি বাড়াতে পারলে আর শ্রমিক পাঠাতে পারলে বাড়বে বৈদেশিক মুদ্রার জোগান। দেশে অনেক অপ্রয়োজনীয় বিলাসপণ্যের আমদানি হয়। এসব আমদানি বন্ধ করলে অনেক বৈদেশিক মুদ্রার সাশ্রয় হবে। অর্থের অভাব হওয়ার কথা নয়। দরকার স্বপ্নদর্শী যোগ্য নেতৃত্ব আর সাহসী ও সতর্ক পদক্ষেপ। 

এক জাতির মানুষের যেহেতু অন্য জাতির মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ এবং আদান-প্রদান, লেনদেন, বাণিজ্য করতে হয়; শ্রম আর মূলধনের অবাধ চলাচল দরকার হয়; তথ্য, জ্ঞান, অভিজ্ঞতা বিনিময়ের প্রয়োজন হয়; সন্ত্রাস দমন করতে হয়; সর্বোপরি একই প্রকৃতি ভাগ করে নিতে হয় সেহেতু করোনা-পরবর্তী বিশ্বে নতুন একটা সর্বজনগ্রহণযোগ্য বহুপক্ষীয় ব্যবস্থা দরকার হবে। বিশ্বায়ন শেষ হয়ে যাচ্ছে বলে অনেকে রব তুলেছেন। বিশ^ায়নের শেষ বলে কিছু নেই। বিশ্বায়ন শুরু হয়েছে কয়েক লাখ বছর আগে। প্রাণিকুল যতকাল পৃথিবীতে বসবাস করবে, বিশ্বায়ন ততকাল চলতে থাকবে। এক পর্ব থেকে আরেক পর্বে গিয়ে বিশ^ায়নের রূপান্তর হবে মাত্র। করোনাকাল হচ্ছে বর্তমান পর্বের বিশ্বায়নের শেষ সময়। করোনা-উত্তর পৃথিবী হবে নতুন পর্বের সূচনাকাল। 

আগামী দিনের পৃথিবী কতটা কল্যাণমুখী হবে তা নির্ভর করবে এখন আমরা কী করছি আর নিকটভবিষ্যতে কী করব তার ওপর। বর্তমান সভ্যতা যে সবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারেনি করোনাভাইরাস তা আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে। করোনা আমাদের এও শিখেছে যে, একটু যত্ন নিলেই সেরে উঠবে অসুস্থ পৃথিবী। বিভিন্ন দেশের নেতারা করোনা-উত্তর পৃথিবীর রূপরেখা নির্মাণে যেরকম প্রতিক্রিয়া দেখাবে সেরকমভাবেই তৈরি হবে আগামী দিনের বিশ্বব্যবস্থা বা বিশ্বায়ন। আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে আমাদের প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বের যথেষ্ট সুনাম এবং গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে। দিনবদলের সন্ধিক্ষণে তার কল্যাণকামী এবং দৃঢ়চেতা নেতৃত্ব ভূমিকা রাখবে আগামী পৃথিবীর রূপরেখা প্রণয়নে। বিশ্বনেতারা প্রকৃতি ও তার সব সন্তানের মঙ্গলের জন্য, কল্যাণের জন্য সোচ্চার হলে আমরা পাব সব প্রাণের সমান অংশীদারিত্বে বাসযোগ্য নতুন পৃথিবী। 

লেখক: চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট।




https://www.shomoyeralo.com/ad/Google-News.jpg

সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত


ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: কমলেশ রায়, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড
এর পক্ষে প্রকাশক গাজী আহমেদ উল্লাহ
নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।

ফোন : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৭৫। ই-মেইল : shomoyeralo@gmail.com