ই-পেপার বিজ্ঞাপনের তালিকা শনিবার ৩ ডিসেম্বর ২০২২ ১৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৯
ই-পেপার শনিবার ৩ ডিসেম্বর ২০২২
https://www.shomoyeralo.com/ad/Amin Mohammad City (Online AD).jpg

স্বাস্থ্য খাতের চিত্র ও টিকা কার্যক্রম
গোলাম মোস্তফা
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ৫ এপ্রিল, ২০২২, ১:২৯ পিএম | অনলাইন সংস্করণ  Count : 353

আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের যুগে পুরো বিশ্বকে স্তম্ভিত করে দেওয়া এক আতঙ্কের নাম করোনাভাইরাস। শুধু আতঙ্ক কিংবা স্তম্ভিত নয়, এর দাপটে একসময় মানুষ ঘরবন্দি থাকতে বাধ্য হয়েছিল। বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিল এক দেশ থেকে অন্য দেশ। বৈশ্বিক এই মহামারির কারণে শহর বন্দর নগরে নেমে এসেছিল নিস্তব্ধতা। দীর্ঘদিন জনমানবিহীন ছিল রাস্তাঘাট। করোনার ভয়াল থাবার হাত থেকে রেহাই পায়নি পৃথিবীর সবচেয়ে উন্নত এবং ক্ষমতাধর রাষ্ট্র যুক্তরাষ্ট্র থেকে বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশ। 

বিশ্বকে ওলট-পালট করার সাথে সাথে বদলে দিয়েছে সমাজ, অর্থনীতি, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, জীবনযাপন, সংস্কৃতি ও মানুষের চিরাচরিত আচরণ। একসময় এই ভাইরাসের বিরুদ্ধে লড়তে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে জরুরি অবস্থা জারি হয়। অনেক দেশই আবার লকডাউনের পথ বেছে নেয়। যদিও আগের সেই ভয়াবহ অবস্থা আর নেই। বাংলাদেশসহ পুরো বিশ্ব স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে গেছে। মানুষকে স্বস্তি দিচ্ছে এর প্রতিষেধক টিকা। 

তবুও এই ভাইরাসটির থাবা থেকে রক্ষা পাচ্ছে না শিশু থেকে শুরু করে বৃদ্ধ পর্যন্ত। যদিও প্রাণঘাতী এই ভাইরাসের সবশেষ আতঙ্কের নাম ওমিক্রন। বিশ্বের অন্যান্য দেশে যেমন ওমিক্রন ডেলটা ভ্যারিয়েন্ট রিপ্লেস করেছে, বাংলাদেশেও বর্তমানে সংক্রমিত রোগীদের অধিকাংশ মানুষের দেহে ওমিক্রন ভাইরাস। ঢাকায় এখন ৯৮ শতাংশ কোভিড রোগীই ওমিক্রনের বলে আইসিডিডিআরবির এক গবেষণায় দেখা গেছে। যদিও বর্তমানে বাংলাদেশসহ সারা বিশ্বে করোনায় মৃত্যু ও রোগী আক্রান্তের সংখ্যা তুলনামূলক অনেক কম। 

২০১৯ সালের ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহে চীনের হুবেই প্রদেশের উহান থেকে করোনাভাইরাস সংক্রমণ শুরু হয়ে এখন পর্যন্ত বাংলাদেশসহ বিশ্বের ২২৪টি দেশ ও অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছে কোভিড-১৯। সেই থেকে এখনও থামেনি মৃত্যুর মিছিল, বরং দিনকে দিন দীর্ঘ হচ্ছে লাশের সারি। প্রাণঘাতী করোনাভাইরাসে আক্রান্ত, মৃত্যু ও সুস্থতার হিসাব রাখা ওয়েবসাইট ওয়ার্ল্ডওমিটারের তথ্য অনুযায়ী, ৪ মার্চ পর্যন্ত অদৃশ্য ভাইরাসটিতে আক্রান্ত হয়ে বিশ্বে এখন পর্যন্ত মৃতের সংখ্যা ৬০ লাখ ছাড়িয়েছে। 

মোট আক্রান্ত হয়েছে ৪৪ কোটি ১৯ লাখ ৮৮ হাজার ১০৯ জন এবং সুস্থ হয়েছে ৩৭ কোটি ৪৮ লাখ ৮৩ হাজার ৬৮২ জন। এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি সংক্রমণ ও মৃত্যু হয়েছে বিশ্বের শীর্ষ ক্ষমতাধর দেশ যুক্তরাষ্ট্রে। আক্রান্তে দ্বিতীয় এবং মৃত্যুতে তৃতীয় অবস্থানে ভারত এবং আক্রান্তে তৃতীয় ও মৃত্যুতে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে ব্রাজিল। এ ছাড়া এ তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান ৪১তম। বাংলাদেশে ২০২০ সালের ৮ মার্চ করোনাভাইরাসের প্রথম সংক্রমণ ধরা পড়ে। 

প্রথম রোগী শনাক্তের ১০ দিন পর ২০২০ সালের ১৮ মার্চ দেশে প্রথম মৃত্যুর তথ্য নিশ্চিত করে স্বাস্থ্য অধিদফতর। বাংলাদেশে করোনার প্রাদুর্ভাব শুরু হওয়ার পর থেকে গত ৩ মার্চ পর্যন্ত মোট মৃত্যু হয়েছে ২৯ হাজার ৫৮ জনের। আর মোট করোনা শনাক্ত হয়েছে ১৯ লাখ ৪৫ হাজার ৭৬৫ জনের। এর মধ্যে সুস্থ হয়েছে ১৮ লাখ ৩১ হাজার ৫৭৭ জন। আর রোগী শনাক্তের হার কমে দাঁড়িয়েছে ২ দশমিক ৯১ শতাংশে।

২০২০ সালের ৪ জানুয়ারি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা চীনে ভাইরাসটির প্রাদুর্ভাবের কথা ঘোষণা করে। এ প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ৪ জানুয়ারি থেকেই দেশের বিমানবন্দরসহ সব স্থল ও নৌবন্দরে বিদেশ থেকে আসা যাত্রীদের স্ক্রিনিং শুরু করে। বাংলাদেশে প্রাণঘাতী এই ভাইরাস নিয়ন্ত্রণে রাখতে ২০২০ সালের ২৪ মার্চ থেকে সরকারি-বেসরকারি সব প্রতিষ্ঠানে সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয়। কয়েক দফায় এই মেয়াদ বাড়িয়ে ওই বছরের ৫ সেপ্টেম্বর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ছাড়া অন্যান্য সব প্রতিষ্ঠানে লকডাউন শিথিল করা হয়। 

সাধারণ ছুটির মধ্যে সারা দেশেই জরুরি সেবা, পণ্য পরিবহন, চিকিৎসা ইত্যাদি অতিপ্রয়োজনীয় ক্ষেত্রগুলো ছাড়া গণপরিবহনও বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। এরপর করোনার দ্বিতীয় ঢেউ এলে ২০২১ সালের ১৪ এপ্রিল থেকে ১ আগস্ট পর্যন্ত বিভিন্ন নামে লকডাউনে ছিল পুরো দেশ। বন্ধ করে দেওয়া হয় বাস সার্ভিস, লঞ্চ, বিমান রেল যোগাযোগ। সারা দেশে সন্ধ্যা ৬টার পর থেকে সকাল ৬টা পর্যন্ত বাইরে বের হলে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার ঘোষণা দেয় সরকার। 

একই সাথে এক এলাকা থেকে আরেক এলাকায় চলাচল বন্ধের জন্যও প্রশাসন কড়াকড়ি আরোপ করে। এ ছাড়াও ভারতীয় ভ্যারিয়েন্টের কারণে সীমান্তবর্তী জেলাগুলোতে লকডাউন দেওয়া হয়। লকডাউনের কবলে লঞ্চ, বিমান ও রেল যোগাযোগ এবং দূরপাল্লার বাসসহ জেলার অভ্যন্তরীণ রুটেও বাস চলাচল বন্ধ থাকে। প্রথমে ঢিলেঢালাভাবে চললেও পরে কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করে দেশজুড়ে ‘সর্বাত্মক লকডাউন’ দেওয়া হয়। কিন্তু বাস্তবে সেসব বিধিনিষেধও খুব একটা মানা হয়নি। রাস্তায় মানুষজনের কমতি ছিল না। বেশিরভাগের মুখে মাস্কও ছিল না।

দেশের স্বাস্থ্যসেবার অপ্রতুলতা নিয়ে বরাবরই অভিযোগ থাকলেও, করোনা সংক্রমণ বিস্তার লাভের পর থেকেই স্বাস্থ্যসেবার অবস্থা যে কতটা নাজুক ছিল, সেই চিত্রটি মানুষ হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছে। যদিও এরই মধ্যে স্বাস্থ্য খাতে ভালো অর্জন রয়েছে। শিশুমৃত্যুর হার কমেছে, জন্মনিয়ন্ত্রণ একধরনের সন্তোষজনক জায়গায় এসেছে, মাতৃমৃত্যুর হার কমেছে। এছাড়াও করোনা মহামারিকালে দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার জন্য যে চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছিল তা মোকাবিলা করতে সরকার যথেষ্ট সফলতার পরিচয় দিয়েছে। 

একদিকে যেমন প্রান্তিক জনগোষ্ঠী থেকে শুরু শিক্ষার্থীরা কোভিডের টিকা কার্যক্রমের আওতায় এসেছে, অন্যদিকে করোনাভাইরাস আক্রান্ত রোগীদের হাসপাতালগুলো ঠিকভাবে সেবা দিতে পারছে না, তা ছাড়াও অন্যান্য জটিলতার রোগীরাও চিকিৎসা পেতে গিয়ে হয়রানির শিকার হচ্ছে। আর মানসম্পন্ন সেবার অভাবে রোগীকে হাসপাতাল থেকে হাসপাতালে ঘুরতে দেখা গেছে। সরকারি হাসপাতালগুলোর পাশাপাশি সেই তালিকায় রয়েছে বেসরকারি হাসপাতালগুলোও।

এখন বাংলাদেশে করোনা অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। মৃত্যুর সংখ্যা এখন সিঙ্গেল ডিজিটে নেমে এসেছে। সংক্রমণের হারও কমে এসেছে। বিশ্বের অনেক উন্নত দেশ যখন টিকার সংস্থান করতে হিমশিম খাচ্ছিল, তখন বাংলাদেশ সরকার তিন কোটি ডোজ টিকার সংস্থান করে বিশ্ববাসীকে তাক লাগিয়ে দিয়েছিল। জনস্বাস্থ্য উন্নয়নে জাতিসংঘের দেয়া লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে বিভিন্ন ক্ষেত্রে সফলতা দেখিয়েছে বাংলাদেশ। করোনাভাইরাস মহামারি থেকে মানুষের জীবন বাঁচাতে, মানুষের স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করতে শুরু থেকেই গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন পদক্ষেপ নেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। একই সঙ্গে দরিদ্র মানুষকে ত্রাণ সহযোগিতার পাশাপাশি জীবিকা ও অর্থনীতি বাঁচাতে নিয়েছেন নানান পদক্ষেপ।

করোনা সংকট মোকাবিলায় দ্রুত বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়ায় দেশের বাইরে আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও প্রশংসিত হয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবশালী ফোর্বস ম্যাগাজিনসহ আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় শেখ হাসিনার নেতৃত্বের প্রশংসা করা হয়েছে। বিখ্যাত ম্যাগাজিন ফোর্বস এক আর্টিকেলে করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব মোকাবিলায় শেখ হাসিনার গৃহীত পদক্ষেপের প্রশংসা করেছে, একই সঙ্গে প্রশংসা করা হয়েছে তার বলিষ্ঠ নেতৃত্বেরও।

এখন পর্যন্ত মোট জনগোষ্ঠীর ৭২ শতাংশের বেশি মানুষ প্রথম ডোজের টিকা পেয়েছে। তবে দ্বিতীয় ডোজে পিছিয়ে টিকাপ্রাপ্তদের এক-তৃতীয়াংশ। ফলে অপেক্ষায় থাকা চার কোটির বেশি মানুষকে চলতি মাসেই দ্বিতীয় ডোজের টিকা নিশ্চিত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার।

স্বাস্থ্য অধিদফতরের তথ্য মতে, দেশে এখন পর্যন্ত ২৯ কোটি ৬৪ লাখ টিকা পাওয়া গেছে। এর মধ্যে কোভ্যাক্সের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র ৬ কোটি ১০ লাখ ফাইজারের তৈরি টিকা দিয়েছে বাংলাদেশকে। এর মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের অনুদানকৃত করোনার টিকার সবচেয়ে বড় গ্রহীতা বাংলাদেশ। আর যুক্তরাজ্য বাংলাদেশকে উপহার দিয়েছে ৫০ লাখ টিকা। তা ছাড়া বেশিরভাগ টিকা এসেছে চীন থেকে। 

আর দেশে শুরু থেকে গত ৩ মার্চ পর্যন্ত করোনাভাইরাস প্রতিরোধী টিকার আওতায় এসেছে ২১ কোটি ৯৬ লাখ ২ হাজার ৬৭৯ মানুষ। তাদের মধ্যে প্রথম ডোজ টিকাগ্রহীতার সংখ্যা ১২ কোটি ৫১ লাখ ৫৮ হাজার ২৩৯ জন মানুষ। দ্বিতীয় ডোজ দেওয়া হয়েছে ৮ কোটি ৫৮ লাখ ৪ হাজার ৪৪০ জন এবং বুস্টার ডোজ পেয়েছে ৪০ লাখেরও উপরে। এ পর্যন্ত ১৮ লাখের উপরে ভাসমান মানুষ টিকা পেয়েছে। আর স্কুলের শিক্ষার্থীও পেয়েছেন ১ কোটি ৬৯ লাখের বেশি টিকা। তা ছাড়াও গত ১৭ ফেব্রুয়ারি থেকে ১ মার্চ পর্যন্ত এই ১৩ দিনে প্রথম ডোজের টিকা দেওয়া হয় দুই কোটি ৩২ লাখ মানুষকে। আর গণটিকার এ সময়ে নিবন্ধন বা জন্মসনদের মতো কোনো কাগজের বাধ্যবাধকতা না থাকায় মানুষকে টিকা নিতে ভিড় দেখা যায় টিকাকেন্দ্র ও হাসপাতালগুলোতে। ভিড় সামলাতে হিমশিম খেতে হয় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে। এ ছাড়াও নিয়মিত ভ্যাকসিন কেন্দ্রে স্বাভাবিকভাবেই প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় বা বুস্টার ডোজ প্রয়োগ করা হচ্ছে। এসব টিকাদানে সম্পৃক্ত করা হয় গ্রাম পর্যায়ের কমিউনিটি ক্লিনিক, ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্র, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ অস্থায়ী টিকাদান কেন্দ্রগুলোকে। স্বাস্থ্যসেবা ও পরিবার পরিকল্পনা বিভাগের কর্মীরাও টিকাদান কার্যক্রমে অংশ নেন।

এদিকে, বুস্টার ডোজ গ্রহণের বয়সসীমা কমিয়ে ৪০ বছর থেকে সর্বনিম্ন ১৮ বছর করা হয়েছে। অন্যদিকে ৫ থেকে ১২ বছরের বাচ্চাদেরও এখনও টিকা দেওয়া হয়নি। কারিগরি কমিটি ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার অনুমোদন পেলে তাদেরও টিকাদান শুরু হবে। গত ২৬ ফেব্রুয়ারি এক দিনে ১ কোটি ২০ লাখ মানুষকে টিকা দেওয়ার পর মাইলফলক স্পর্শ করে বাংলাদেশ। তা ছাড়াও গত বছরের সেপ্টেম্বরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জন্মদিন উপলক্ষে দুই দিনে ৭৬ লাখ ডোজের বেশি টিকা দেওয়া হয়েছিল। দেশে ২০২১ সালের ২৭ জানুয়ারি প্রথম করোনার ভ্যাকসিন প্রয়োগ শুরু হয়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ওই দিন টিকা কার্যক্রমের উদ্বোধন করেন। কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে এদিন ২৬ জন ভ্যাকসিন গ্রহণ করেন। 

ভারতের সিরাম ইনস্টিটিউটের কাছ থেকে কেনা এবং ভারতের কাছ থেকে উপহার পাওয়া অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকার কোভিশিল্ড ভ্যাকসিন প্রয়োগ করা হয়। এ দিন দেশে প্রথম ভ্যাকসিন নেওয়া কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালের সিনিয়র স্টাফ নার্স রুনু ভেরোনিকা কস্তা। পরে ২০২১ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি জাতীয় পর্যায়ে ভ্যাকসিন প্রয়োগ শুরু হয়। এ দিন ভ্যাকসিনের নিবন্ধনের জন্য সুরক্ষা প্ল্যাটফর্মের ওয়েব অ্যাপ্লিকেশন সীমিত আকারে উন্মুক্ত করা হয়। 

পরবর্তীতে ১৮ ফেব্রুয়ারি থেকে অফিসিয়ালি এই ওয়েব অ্যাপ্লিকেশনে নিবন্ধন শুরু করা হয়। আর এর দুই মাস পর ৮ এপ্রিল শুরু হয় দ্বিতীয় ডোজ দেওয়ার কার্যক্রম। এর মধ্যে গত বছরের ২৮ ডিসেম্বর তৃতীয় ডোজ বা বুস্টার ডোজ দেওয়া শুরু করে স্বাস্থ্য অধিদফতর। এ ছাড়াও শিক্ষার্থীদের টিকা নিবন্ধনের নিয়মও শিথিল জন্মনিবন্ধন তথ্য দিয়ে সুরক্ষা অ্যাপে নিবন্ধনের মাধ্যমে ১২ থেকে ১৮ বছর বয়সি শিক্ষার্থীদের টিকা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। গত ১ নভেম্বর ঢাকার মতিঝিল আইডিয়াল স্কুল দিয়ে ১২ থেকে ১৭ বছর বয়সি স্কুল পড়ুয়াদের কোভিড টিকাদান কর্মসূচির সূচনা হয়। পরে সারা দেশে ১২ থেকে ১৮ বছর বয়সি শিক্ষার্থীদের টিকা দেওয়া হয়।

মূলত বাংলাদেশে টিকাদান কর্মসূচি শুরু হয় অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকা উদ্ভাবিত কোভ্যাক্স প্রয়োগের মাধ্যমে। মহামারির প্রথম ঢেউ সামাল দেওয়ার মধ্যেই ভারতের সিরাম ইনস্টিটিউট থেকে অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকার তৈরি তিন কোটি ডোজ করোনাভাইরাসের টিকা কিনতে চুক্তি করে বাংলাদেশ। দুই চালানে সিরাম ইনস্টিটিউট ৭০ লাখ ডোজ টিকা পাঠানোর পর ভারত সরকার রফতানি বন্ধ করে দিলে বাংলাদেশ বেকায়দায় পড়ে। দ্বিতীয় ডোজ দিতে কমপক্ষে ২০ লাখ ডোজ টিকার জন্য বাংলাদেশ ভারতের কাছে অনুরোধ জানায়। কিন্তু ভারত তাতে অপারগতা জানিয়েছে। সে সময়ে টিকা সংকট দেখা দেয়ায় পুরো টিকাদান কর্মসূচি একটি ধাক্কা খায়। কমে আসে কর্মসূচির গতি। পরে বাংলাদেশ টিকা পেতে চীনের সঙ্গে চুক্তি করে। পাশাপাশি বিশ্বজুড়ে ন্যায্যতার ভিত্তিতে টিকা বিতরণে গড়ে তোলা আন্তর্জাতিক উদ্যোগ কোভ্যাক্সের মাধ্যমে কোটি কোটি টিকা আসতে থাকে। যদিও চুক্তি অনুযায়ী কিছু টিকা ভারতের কাছ থেকে পেয়েছিল বাংলাদেশ। 

দেশে এখন যুক্তরাজ্যের অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকা, চীনের তৈরি সিনোফার্ম ছাড়াও যুক্তরাষ্ট্রের ফাইজার-বায়োএনটেক এবং মডার্নার টিকা প্রয়োগ হয়েছে বাংলাদেশে।

স্বাস্থ্য অধিদফতরের তথ্যমতে, ভারতের সিরামের পাশাপাশি চীন, যুক্তরাষ্ট্র ও টিকার বৈশ্বিক উদ্যোগ কোভ্যাক্সের সঙ্গেও টিকা চুক্তি করেছে সরকার। এসব মাধ্যমে মোট ৩৬ কোটি টিকা নিশ্চিত করেছে সরকার। এর মধ্যে টিকা পাওয়া গেছে ২৮ কোটি। হাতে আছে ৯ কোটির মতো। প্রথম ডোজ নেওয়া সবার বুস্টার ডোজ নিশ্চিত করতে গেলে টিকা প্রায় ৪০ কোটি ডোজ প্রয়োজন। 

যদিও দেশের মোট জনসংখ্যার ৭০ শতাংশ অর্থাৎ ১১ কোটি ৯২ লাখ ২১ হাজার ৯৫৪ জনকে টিকা দেওয়ার পরিকল্পনা করেছে সরকার। সেই হিসেবে সরকারের লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে গেছে। ফলে করোনাভাইরাসের টিকাদানে বিশ্বে বাংলাদেশ এখন শীর্ষ দশে অবস্থান করছে।

যাদের ভ্যাকসিন দেওয়ার কথা ছিল তাদের অনেকেই ভ্যাকসিন পেয়ে গেছেন। আর ভ্যাকসিন দেওয়ার কারণেই করোনা নিয়ন্ত্রণে আছে। সেজন্যই দেশের অর্থনীতির চাকা সচল রয়েছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দেওয়া হয়েছে, খেলাধুলা সচল হয়েছে। দেশে-বিদেশে যাওয়া-আসা শুরু হয়েছে। টিকা দেওয়ার কারণে মানুষ আর করোনা নিয়ে আগের মতো ভয় পান না। বর্তমানে দেশের পরিস্থিতি যতটা স্বাভাবিক অবস্থায় রয়েছে করোনা শুরুর দিকে ততটা স্বাভাবিক ছিল না। করোনার মহামারির এই দুর্যোগে বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশকেও নানা সংকটের। স্বাস্থ্যকর্মীর অপ্রতুলতা, পর্যাপ্ত ও কার্যকরি পিপিইর ঘাটতি, কোভিড-১৯ রোগ নির্ণয়ের যন্ত্রপাতির অভাব, আইসিইউ সুবিধা ও সংশ্লিষ্ট ওষুধপত্রের অপর্যাপ্ততার মতো কঠিন পরীক্ষার মুখোমুখি হতে হয়েছে। 

কোভিড-১৯ মহামারি আসার পর তা মোকাবিলার ক্ষেত্রে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও স্বাস্থ্য বিভাগের দায়িত্বজ্ঞানহীনতা, ব্যর্থতা, অব্যবস্থাপনার প্রকৃষ্ট উদাহরণ হলো রিজেন্ট হাসপাতালজেকেজি হেলথ কেয়ার নামের বেসরকারি দুই প্রতিষ্ঠানকে করোনা শনাক্তকরণ পরীক্ষার অনুমতি দেওয়া হয়েছিল তাদের সম্পর্কে খোঁজখবর না নিয়ে। তারা করোনার নমুনা পরীক্ষা না করেই হাজার হাজার মানুষকে পরীক্ষার ভুয়া রিপোর্ট দিয়েছে এবং তার ফলে দেশের ভেতরে তো বটেই, আন্তর্জাতিক পরিসরেও বাংলাদেশের করোনা পরীক্ষার বিশ্বাসযোগ্যতা ভীষণভাবে ক্ষুণ্ন হয়েছে। প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে এ দেশের পুরো স্বাস্থ্যব্যবস্থা। এ ছাড়াও করোনা রোগীদের চিকিৎসা ব্যবস্থাপনায় চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যসেবাকর্মীদের ব্যক্তিগত সুরক্ষার সরঞ্জাম, বিশেষত এন-৯৫ মাস্ক ও পিপিই কেনা ও সরবরাহের ক্ষেত্রে ব্যাপক দুর্নীতির ফল। এসব ছাড়া চিকিৎসকদের খাবার কেনার খরচ, ভার্চুয়াল সভার খরচ ইত্যাদি ক্ষেত্রে যেসব পুকুরচুরির খবর গণমাধ্যমে বেরিয়েছে, তাও মানুষকে বিস্ময় করে।

দেশে ডেল্টা ভ্যারিয়েন্টের দাপটের সময় ২০২১ সালের ২৮ জুলাই এক দিনে ১৬ হাজার ২৩০ জন সর্বাধিক রোগী শনাক্ত হয়েছিল। আর ওই বছরের ৫ অগাস্ট ও ১০ আগস্ট ২৬৪ জন করে মৃত্যু হয়েছিল, যা মহামারির মধ্যে এক দিনের সর্বোচ্চ সংখ্যা। এরপর ধীরে ধীরে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসতে শুরু করলে প্রায় সব কিছু স্বাভাবিক হয়ে ওঠে। অর্থাৎ করোনার প্রথম ও দ্বিতীয় ঢেউয়ের প্রভাবে ১১ মাস দেশ কার্যত অচল ছিল।

করোনাভাইরাসের দ্বিতীয় ঢেউ ভারতীয় ভ্যারিয়েন্ট দ্রুত সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ায় রাজধানী ও রাজধানীর বাইরের হাসপাতালগুলোতে শয্যার জন্য হাহাকার পড়ে যায়। করোনায় আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বাড়ায় আইসিইউর (নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র) জন্য কোনো কোনো হাসপাতালে কয়েকদিন ধরে আইসিইউর শয্যার জন্য অপেক্ষা করতে করতে মৃত্যুবরণ করতেও দেখা গেছে। অনেকে আবার অ্যাম্বুলেন্সের মধ্যেই মারা যাচ্ছেন। তা ছাড়া সাধারণ শয্যার চাহিদার থেকে শুরু করে অক্সিজেন সরবরাহের যন্ত্র হাই ফ্লো নাজাল ক্যানুলারও সংকটও প্রকট আকার ধারণ করে। তখন গুরুতর করোনা রোগীদের নিয়ে স্বজনরা এক হাসপাতাল থেকে অন্য হাসপাতালে ছুটে গেছেন একটি আইসিইউ শয্যার জন্য এবং বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তা পেতে ব্যর্থ হয়েছেন। 

আইসিইউ দূরের কথা, সাধারণ শয্যাও পাচ্ছিলেন না অনেকে। সরকার-নির্ধারিত কোভিড ডেডিকেটেড হাসপাতালগুলোয় রোগীর স্থান সংকুলান করা সম্ভব হচ্ছিল না। ওই সময় পিতা-মাতা, স্ত্রী-সন্তান, ভাই-বোনকে করোনার কারণে নিষ্ঠুর হতে দেখা গেছে। এমনও দেখা গেছে, করোনা সন্দেহে মাকে জঙ্গলে ফেলে রেখে পালিয়ে গেছে তার সন্তানেরা। হাসপাতালে পিতাকে ফেলে পালিয়েছে সন্তানরা। সন্তানরা বাবার লাশ নিতেও অস্বীকৃতি জানিয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেখা গেছে অসুস্থ পিতাকে মাঠের মাঝখানে রেখে যাওয়ার ঘটনা। পরে সেখানেই তার মৃত্যু হয়েছে। মৃত স্বজনের লাশ রেখে চলে গেছে আত্মীয়রা। পরিবারও খবর নেয়নি। দাফন কাফনে এগিয়ে আসেনি। সারি সারি কবর ছিল। 

হাসপাতালে অ্যাম্বুলেন্সের দীর্ঘ লাইন ছিল এমনকি মারা যাচ্ছিলেন বহু মানুষ। দীর্ঘক্ষণ মৃতদেহ বাড়িতে পড়ে থাকার মতো ঘটনা ঘটেছে অহরহ। বিনা চিকিৎসায় রোগী মৃত্যুর অভিযোগ উঠে আসছিল দিক দিক থেকে। কার্যত ভাইরাসের সামনে বেহাল হয়ে পড়েছিল চিকিৎসা ব্যবস্থা। এ এক ভয়াবহ বাস্তবতা।

স্বাস্থ্য অধিদফতরের গত এক বছরের তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণে দেখা যায়, দেশে একমাত্র আইইডিসিআর ছাড়া করোনা পরীক্ষার জন্য আর কোথাও আরটি-পিসিআর ল্যাবরেটরি ছিল না। বর্তমানে দেশে সরকারি ও বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় ৮৭৬টি ল্যাবরেটরিতে নমুনা সংগ্রহ ও পরীক্ষা হচ্ছে। এর মধ্যে আরটি-পিসিআর ল্যাব ১৫৮টি, জিন-এক্সপার্ট ৫৭টি, র‌্যাপিড অ্যান্টিজেন ৬৬১টি রয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে এসব ল্যাবে পরীক্ষা বন্ধ রয়েছে। টেস্ট করতে মানুষের ভোগান্তি ও অপেক্ষা আগের মতোই আছে। যদিও গত ৫ বছরে নতুন করে ১৫ হাজার চিকিৎসক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। আর আগে দেশে নার্স ছিল মাত্র ২০ হাজার। গত ৫ বছরেই আরও নতুন করে ২০ হাজার নিয়োগ দেওয়া হয়েছে এবং আরও অনেক নার্স, চিকিৎসক ও টেকনোলজিস্ট নিয়োগ দেওয়া হবে।

তবে করোনাকালে টেকনোলজিস্ট সংকট ও ল্যাবরেটরিতে কর্মরত জনবলকে কাজে উদ্বুদ্ধ করতে সঠিক ব্যবস্থাপনার অভাবে টেস্টের হার বাড়ানো যাচ্ছে না বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। করোনা মহামারির দুই বছর কেটে গেলেও জেলা পর্যায়ের হাসপাতালগুলোয় করোনা চিকিৎসাব্যবস্থার পরিস্থিতি খুব নাজুক। জেলার হাসপাতালগুলোতে ‘পর্যাপ্ত’ শয্যার ব্যবস্থা করার কথা বলা হলেও আইসিইউ সুবিধা খুবই অপ্রতুল।

সরকারি তথ্য অনুযায়ী, দেশের ৮ বিভাগে এই মুহূর্তে মোট কোভিড-১৯ ডেডিকেটেড সাধারণ শয্যা সংখ্যা ১৩ হাজার ৭৫৭টি এবং মোট আইসিইউ শয্যা রয়েছে ১ হাজার ২৪৬টি। তবে দেশের ৬৪ জেলার মধ্যে অনেক জেলায় কোভিড চিকিৎসার জন্য আইসিইউ শয্যা নেই। ঢাকা ও চট্টগ্রাম বাদে বিভিন্ন জেলায় ‘হাই ফ্লো নেজাল ক্যানুলা’ সংবলিত আইসিইউ সমতুল্য শয্যাও অপ্রতুল। করোনাকালে দেশের সব সরকারি বেসরকারি হাসপাতালে শয্যাসংখ্যার আনুপাতিক হারে আইসোলেশন ইউনিট খোলার নির্দেশ দেওয়া হলেও এখনও বাস্তবায়ন করা হয়নি। স্বাস্থ্যব্যবস্থা সুষ্ঠুভাবে না চললে তার ফল ভোগ করতে হয় সাধারণ মানুষকে। এর সবচেয়ে বড় প্রমাণ পাওয়া গেছে এই করোনা মহামারিতে। যদিও সেই সব বিশ্বের উন্নত দেশগুলোকে মহামারি সামাল দিতে নাস্তানাবুদ হতে হয়েছে। 

করোনাভাইরাস সংক্রমণ শুরুর পর প্রস্তুতি হিসেবে প্রথমে রাজধানীর কুয়েত মৈত্রী হাসপাতালকে কোভিড-১৯ বিশেষায়িত হাসপাতাল নির্ধারণ করে সরকার। পরে কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালসহ কয়েকটি সরকারি হাসপাতালকে কোভিড বিশেষায়িত হাসপাতাল ঘোষণা করা হয়। রোগীর সংখ্যা বাড়তে থাকায় কোভিড-১৯ আক্রান্তদের চিকিৎসা দিতে বিভিন্ন বেসরকারি হাসপাতালকেও অনুমোদন দেয় স্বাস্থ্য অধিদফতর।

গত বছরের ডিসেম্বর থেকে দেশে আবার করোনার নতুন ভ্যারিয়েন্ট ওমিক্রন ছড়িয়ে পড়ে। করোনাভাইরাসের দক্ষিণ আফ্রিকান ধরন ওমিক্রনের সংক্রমণ দেখা দেওয়ায় অধিকতর সতর্কতার অংশ হিসেবে ১৫ দফা নির্দেশনা জারি করেছে স্বাস্থ্য অধিদফতর। পরে তা কমিয়ে ১১ দফা বিধিনিষেধের প্রজ্ঞাপন জারি করে সরকার। ১৩ জানুয়ারি থেকে তা কার্যকর হয়। এর মধ্যে ২১ জানুয়ারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ করার নির্দেশনা দেয় মন্ত্রিপিরষদ বিভাগ। তাতে ৬ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়। এরপর আরও দুই সপ্তাহ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছুটি বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। সরকারের ১১ দফা বিধিনিষেধের মধ্যে ছিল উন্মুক্ত স্থানে সব সামাজিক, রাজনৈতিক, ধর্মীয় অনুষ্ঠান এবং সমাবেশ নিষিদ্ধ। এ ছাড়াও দোকান, শপিংমল ও বাজারে ক্রেতা-বিক্রেতা এবং হোটেল-রেস্তোরাঁসহ সকল জনসমাগমস্থলে বাধ্যতামূলক সবাইকে মাস্ক পরার নির্দেশনা দেওয়া হয়। 

এ ছাড়াও ট্রেন, বাস এবং লঞ্চে সক্ষমতার অর্ধেক সংখ্যক যাত্রী নেওয়ার কথা প্রজ্ঞাপনে বলা হলেও এর আগের দুই দফা লকডাউনের সময় যেমন বাস্তবায়ন হয়নি, বাস্তবায়নে কার্যকর পদক্ষেপও গ্রহণ করা হয়নি, এবারও তার ব্যতিক্রম হয়নি। আর তা নিয়ে সমালোচনাও কম হয়নি। মূলত দেশে করোনা পরিস্থিতি প্রায় সাড়ে তিন মাস নিয়ন্ত্রণে থাকার পর গত ডিসেম্বরের শেষদিকে বাড়তে শুরু করে। করোনার নতুন ধরন ওমিক্রনের প্রভাবে দ্রুত বাড়তে থাকে রোগী শনাক্ত ও শনাক্তের হার। গত ৬ জানুয়ারি দৈনিক শনাক্ত রোগীর সংখ্যা হাজার ছাড়ায়। এর দুই সপ্তাহের মাথায় গত ২০ জানুয়ারি দৈনিক শনাক্ত ১০ হাজার ছাড়িয়ে যায়।

সংক্রমণ বৃদ্ধির ধারাবাহিকতায় দৈনিক রোগী শনাক্ত ১৫ হাজারের ওপরে উঠেছিল। ৩ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত তা ১০ হাজারের ওপরে ছিল। তারপর সংক্রমণ বাড়তে বাড়তে একপর্যায়ে দৈনিক শনাক্ত রোগীর সংখ্যা ১৬ হাজারও ছড়িয়ে গিয়েছিল। জানুয়ারির শেষদিক থেকে তা আবার কমে আসছে। তাই ২২ ফেব্রুয়ারি থেকে মাধ্যমিক ও বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দেওয়া হয়। এমনকি প্রত্যাহার করে নেওয়া হয় করোনার বিধিনিষেধ। 

দেশের সার্বিক করোনাভাইরাস পরিস্থিতিতে স্বাস্থ্য বিভাগের সক্ষমতা, সমন্বয়হীনতা এবং ব্যর্থতার বিষয়গুলো নিয়ে নানা রকম আলোচনা হচ্ছে। মন্ত্রণালয় ও অধিদফতরের অব্যবস্থাপনা, সমন্বয়হীনতা ও বিশৃঙ্খলার অবসান হওয়ার সময় এসেছে। স্বাস্থ্য খাতে বাজেট বাড়ানো যেমন সময়ের দাবি, তেমনি হাসপাতালগুলোতে আধুনিক যন্ত্রপাতি ও বিপুল পরিমাণে জনবল নিয়োগ করে জনগণের যথাযথ স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে হবে, এটাই মূল চাওয়া। 

করোনার মোকাবিলায় সব হাসপাতালে আইসিইউ স্থাপন, ভেন্টিলেটর স্থাপন, স্থাস্থ্যকর্মীদের প্রশিক্ষণসহ গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প রয়েছে এ খাতে। স¤প্রতি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বিভিন্ন দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার ওপর মহামারির প্রভাব নিয়ে একটি সমীক্ষা পরিচালনা করেছে। এতে এ পর্যন্ত ৮২টি দেশ সাড়া দেয়। এর মধ্যে অর্ধেকের বেশি দেশে অন্তত একটি স্বাস্থ্যসেবা, যেমন হাসপাতালের বহির্বিভাগ অথবা কমিউনিটি স্বাস্থ্যসেবা, সীমিত অথবা স্থগিত করেছে। 

প্রায় তিন-চতুর্থাংশ দেশে দাঁতের চিকিৎসা ও পুনর্বাসন সেবা আংশিক বা পুরোপুরি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। আর প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ দেশে নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচি, অসংক্রামক রোগ শনাক্ত ও চিকিৎসা এবং পরিবার পরিকল্পনা ও জন্মনিয়ন্ত্রণ সেবা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। অর্ধেকের বেশি দেশে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা, গর্ভকালীন সেবা, ক্যানসার শনাক্ত ও চিকিৎসা এবং শিশু চিকিৎসা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। 

বাংলাদেশের সরকারি হিসাবের তথ্য বলছে, দেশে এখন স্বাস্থ্য খরচ অনেক ব্যয়বহুল হয়ে পড়েছে। আমাদের স্বাস্থ্যের পেছনে যত খরচ হয়, তার ৬৭ শতাংশই মানুষ নিজের পকেট থেকে খরচ করছে। অথচ বৈশ্বিক মান হচ্ছে ৩৪ শতাংশের মতো। তার প্রায় দ্বিগুণ আমরা খরচ করছি। আমাদের কাছে স্বাস্থ্য খরচ একটা বড় বোঝা। এ ছাড়াও অবকাঠামো ও জনশক্তির মধ্যে ভারসাম্যহীনতা একটা বড় সমস্যা। স্বাস্থ্য খরচ নির্বাহ করতে গিয়ে শুধু দরিদ্র নয়, অনেক মধ্যবিত্ত পরিবারকেও নিঃস্ব হতে দেখা গেছে। 

কারণ, এখন অসুখের ধরনও পাল্টে গেছে। তবে আমাদের শহরগুলোতে স্বাস্থ্যব্যবস্থা কিছুটা উন্নত হলেও বিপরীত চিত্র রয়েছে প্রত্যন্ত অঞ্চলে। যার পুরো চিত্র ফুটে ওঠে করোনাকালীন দুর্যোগের সময়। বিশ্বজুড়ে করোনার তাণ্ডব এখনো থামেনি। বিশেষজ্ঞদের মতে, উচ্চ আয়ের উন্নত প্রযুক্তির রাষ্ট্রগুলো সব সুযোগ-সুবিধা থাকার পরও নতুন করোনাভাইরাসে মহামারি ঠেকাতে চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছে। এই ব্যর্থতার মূল কারণ, ওই দেশগুলোর নীতিনির্ধারকরা প্রকৃত পরিস্থিতি অনুধাবন করতে ব্যর্থ হয়েছে। তারা সময়ের কাজ সময়ে করতে পারেনি। এসব দেশের প্রতিটিতেই ভাইরাসের সংক্রমণ শুরু হয়েছিল আক্রান্ত দেশ থেকে আসা দু-একজন ব্যক্তির মাধ্যমে। 

তাই কোভিড মহামারি কবে শেষ হবে? অথবা আবার কবে মানুষ স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যেতে পারবে? গত দুই বছরে এমন প্রশ্ন করেননি এমন কাউকে খুঁজে পাওয়া যাবে না। কারণ ভাইরাস মাত্রই বারবার রূপান্তরিত বা পরিবর্তিত হয়। এই পরিবর্তনকে বলে ‘মিউটেশন’। বিজ্ঞানীরা ভাইরাসের আচরণ পরিবর্তন হচ্ছে কি না, সেদিকে নজর রাখাটাকে জরুরি মনে করেন। ভাইরাসের এই রূপান্তরের ঘটনা কখনও কখনও খুব আক্রমণাত্মক বা ভয়ঙ্কর হয়। 

করোনা মহামারির প্রভাব ও প্রতিক্রিয়া নিয়ে বিশ্বে প্রতিনিয়ত বিভিন্ন ধরনের গবেষণা হচ্ছে। এর মধ্যে করোনার কারণে আর্থিক লাভ-ক্ষতির খতিয়ান যেমন আছে, তেমনিভাবে রয়েছে স্বাস্থ্য বিষয়ক বিভিন্ন ইস্যু। করোনার চেয়েও ভয়ঙ্কর মহামারি অথবা অন্য কোনো প্রাকৃতিক বিপর্যয় মোকাবিলায় সবার প্রস্তুত থাকা উচিত। করোনাকালের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো প্রকৃতিকে তার মতো বাঁচতে দিতে হবে, অন্যথায় রেহাই নেই।

লেখক: সাংবাদিক।




https://www.shomoyeralo.com/ad/Google-News.jpg

সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত


ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: কমলেশ রায়, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড
এর পক্ষে প্রকাশক গাজী আহমেদ উল্লাহ
নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।

ফোন : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৭৫। ই-মেইল : shomoyeralo@gmail.com