ই-পেপার বিজ্ঞাপনের তালিকা শনিবার ৩ ডিসেম্বর ২০২২ ১৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৯
ই-পেপার শনিবার ৩ ডিসেম্বর ২০২২
https://www.shomoyeralo.com/ad/Amin Mohammad City (Online AD).jpg

করোনার থাবায় গতিহীন ছিল বিচার বিভাগ
হিরা তালুকদার ও মোহাম্মদ গাফফার হোসেন
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ৫ এপ্রিল, ২০২২, ৩:২৭ পিএম | অনলাইন সংস্করণ  Count : 409

মহামারি করোনার কারণে গত দুই বছর ধরে অনেকটা ধীরগতিতে চলছে দেশের বিচারালয়। এই সময়ে সুপ্রিমকোর্ট ও দেশের সব বিচারিক আদালতে কখনও ভার্চুয়াল ও কখনও শারীরিক উপস্থিতিতে বিচার চললেও মামলা নিষ্পত্তির হার কমেছে। বেড়েছে মামলাজট। যে কারণে বিচারপ্রার্থী জনগণের ভোগান্তি পৌঁছেছে চরমে। 

সর্বশেষ চলতি বছরের শুরুতে করোনা পরিস্থিতির অবনতির কারণে গত ১৯ জানুয়ারি থেকে শুধু ভার্চুয়ালি চলছে সুপ্রিমকোর্টের হাইকোর্ট ও আপিল বিভাগ। তবে বর্তমানে করোনা পরিস্থিতির উন্নতি হওয়ায় ৬ মার্চ রোববার থেকে পুনরায় সুপ্রিমকোর্টে বিচারকাজ শুরু হচ্ছে শারীরিক উপস্থিতিতে। করোনার প্রাদুর্ভাবে উদ্ভূত পরিস্থিতিতে ২০২০ সালের মার্চে সরকার ঘোষিত সাধারণ ছুটির সঙ্গে মিল রেখে দেশের সব আদালতে সাধারণ ছুটি শুরু হয়। পরে ওই বছরের ৯ মে আদালত কর্তৃক তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহার অধ্যাদেশ জারি করা হয়। এর মধ্য দিয়ে ওই বছরের ১১ মে থেকে ভার্চুয়াল আদালতের কার্যক্রম শুরু হয়। পরে অধ্যাদেশটি আইনে পরিণত হয়। তবে পরিস্থিতি বিবেচনায় এরপর কখনও ভার্চুয়ালি ও ক্ষেত্রবিশেষে শারীরিক উপস্থিতিতে আদালতের কার্যক্রম চলে।

২০২০ সালের মার্চের শেষদিকে উচ্চ ও অধস্তন আদালতের সব বিচারিক কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। চার মাস বন্ধ থাকার পর বিচারিক আদালতের কার্যক্রম আবার শুরু হয়। একই সঙ্গে উচ্চ আদালতেও ভার্চুয়ালি বিচারকাজ শুরু হওয়ার পর ২০২১ সালের শুরুর দিকে নিয়মিত আদালতের কার্যক্রম আরম্ভ হয়। কিন্তু বিচারাঙ্গনের ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়ার আগেই গত এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহ থেকে ফের বন্ধ হয়ে যায় সুপ্রিমকোর্টের নিয়মিত কার্যক্রম। আড়াই মাস বন্ধ থাকার পর গত বছরের ২০ জুন সুপ্রিমকোর্ট বিচারিক আদালতের নিয়মিত বিচার কার্যক্রম চলার অনুমতি দিলেও সংক্রমণ আবারও বেড়ে যাওয়ায় ১০ দিনের মাথায় আবারও বন্ধ হয়ে যায়। মধ্য জুলাইতে কয়েক দিনের জন্য বিচারিক আদালতে শুধু সাক্ষ্যগ্রহণ ছাড়া কিছু বিষয়ে বিচারকাজ শুরু হলেও নিয়মিত বিচার ফের বন্ধ হয়ে যায়। এরপর উচ্চ আদালতে অল্প কয়েকটি বেঞ্চে সীমিত পরিসরে বিচারকাজ চলে। ধীরে ধীরে পরিস্থিতির উন্নতি হলে আবার শারীরিক উপস্থিতিতে পুরোদমে শুরু হয় সুপ্রিমকোর্টের বিচারকাজ। 

গত ৩০ নভেম্বর সুপ্রিমকোর্টের এক বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ‘প্রধান বিচারপতি জ্যেষ্ঠ বিচারপতিদের সঙ্গে আলোচনাক্রমে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছেন যে ১ ডিসেম্বর থেকে স্বাস্থ্যবিধি কঠোরভাবে মেনে শারীরিক উপস্থিতিতে সুপ্রিমকোর্টের উভয় বিভাগের বিচার কার্যক্রম পরিচালিত হবে।’ তবে সংক্রমণ আবার বেড়ে যাওয়ায় ১৬ জানুয়ারি থেকে সুপ্রিমকোর্টের চেম্বার জজ আদালতে ভার্চুয়ালি বিচারকাজ শুরু হয়। আর হাইকোর্ট ও আপিল বিভাগে গত ১৯ জানুয়ারি থেকে আরম্ভ হয় ভার্চুয়ালি বিচারকাজ। এর আগের দিন ১৮ জানুয়ারি আপিল বিভাগের এক নম্বর এজলাস কক্ষে মামলার শুনানিকালে করোনাভাইরাস সংক্রমণ দ্রুত বাড়তে থাকায় উদ্বেগ প্রকাশ করেন প্রধান বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী। 

আবার ভার্চুয়াল আদালত পরিচালনার ইঙ্গিত দিয়ে তিনি উপস্থিত আইনজীবীদের বলেন, ‘বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে ভাবা হচ্ছে।’ প্রধান বিচারপতি বলেন, ‘ইতোমধ্যে আমাদের বেশ কয়েকজন বিচারপতি ও নিম্ন আদালতের বিচারক আক্রান্ত হয়েছেন। আদালতের অনেক স্টাফ আক্রান্ত হয়েছেন। আমরা হয়তো আবার ভার্চুয়াল কোর্টে ফিরে যাব।’ 

এ সময় ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল বিশ্বজিত দেবনাথ আদালতের উদ্দেশে বলেন, ‘অ্যাটর্নি জেনারেল এএম আমিন উদ্দিন, একজন অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেলসহ বেশ কয়েকজন আইন কর্মকর্তা এবং আইনজীবীদের অনেকেই করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন।’ ভার্চুয়াল আদালত নিয়ে প্রধান বিচারপতির অভিমতের পর ওইদিন বিকালে এ-সংক্রান্ত বিজ্ঞপ্তি জারি করে সুপ্রিমকোর্ট প্রশাসন। সুপ্রিমকোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেল মো. আলী আকবর স্বাক্ষরিত বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, “করোনা সংক্রমণজনিত উদ্ভূত পরিস্থিতিতে বুধবার থেকে ‘আদালত কর্তৃক তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহার আইন, ২০২০’ এবং এ-সংক্রান্ত জারিকৃত প্র্যাকটিস ডাইরেকশন অনুসরণ করে তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহার করে শুধু ভার্চুয়াল উপস্থিতির মাধ্যমে আপিল বিভাগের বিচারিক কার্যক্রম পরিচালিত হবে।”

এদিকে, করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে সুপ্রিমকোর্ট ও নিম্ন আদালতে বেশ কয়েকজন বিচারক মারা গেছেন। এর মধ্যে অন্যতম বিচারপতি এফআরএম নাজমুল আহাসান। হাইকোর্ট থেকে আপিল বিভাগে উন্নীত হওয়ার পর শপথ নেওয়ার আগেই করোনার কাছে হার মানেন তিনি। গত ৪ ফেব্রুয়ারি সকাল ৬টা ১৫ মিনিটে রাজধানীর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান বিচারপতি নাজমুল আহাসান। এর আগে রাষ্ট্রের প্রধান আইন কর্মকর্তা অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম করোনায় আক্রান্ত হওয়ার পর ২০২০ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর মারা যান। ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান। 

এ ব্যাপারে সাবেক আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ সময়ের আলোকে বলেন, ‘করোনার কারণে গত দুটি বছর অনেকটা সীমিত পরিসরে চলেছে সুপ্রিমকোর্ট। এখনও পরিস্থিতি স্বাভাবিক না। ভার্চুয়াল কোর্ট চলছে। এভাবে দুটি বছর বিচারকাজ চলার কারণে মামলাজট বেড়েছে। কমেছে মামলা নিষ্পত্তির হার। আর আইনজীবী ও বিচারপ্রার্থী জনগণের ভোগান্তি উঠেছে চরমে। করোনাকালীন বিচার বিভাগের এই ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়ার নয়।’ তবে করোনা পরিস্থিতির উন্নতি হলে দ্রুত মামলা নিষ্পত্তি করে ক্ষতি কিছুটা হলেও কাটিয়ে ওঠার তাগিদ দিয়েছেন সুপ্রিমকোর্টের এই সিনিয়র আইনজীবী। 

এদিকে, করোনা মহামারির মধ্যেও ২০২১ সালে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ মামলার বিচার হয় সুপ্রিমকোর্টে। এর মধ্যে ২০২১ সালে হাইকোর্ট ও আপিল বিভাগে অন্যতম আলোচিত মামলা ছিল রাজারবাগ পীরের কর্মকাণ্ড নিয়ে করা রিট। রাজারবাগ দরবারের পীর দিল্লুর রহমান তার মুরিদদের কার্যক্রম ‘জঙ্গিদের কার্যক্রমের সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ’ বলে হাইকোর্টে একটি প্রতিবেদন দেয় ঢাকা মহানগর পুলিশের কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি)। ওই প্রতিবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে গত ৫ ডিসেম্বর মামলার তদন্তের স্বার্থে সিআইডি, কাউন্টার টেররিজম ও দুদক চাইলে রাজারবাগ দরবার শরীফের পীরসহ চারজনের বিদেশযাত্রায় নিষেধাজ্ঞা দিতে পারবে বলে আদেশ দেন হাইকোর্ট। একই সঙ্গে রাজারবাগ দরবার শরীফ ও পীরের কর্মকাণ্ডের ওপর সার্বক্ষণিক নজরদারি করতে কাউন্টার টেররিজম ইউনিটকে নির্দেশ দেন হাইকোর্ট।

দেশের ছয়টি জেলায় পৃথক ৩৪টি মামলা দিয়ে হয়রানির অভিযোগ এনে রাজারবাগের পীর ও তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে নির্দেশনা চেয়ে আট ব্যক্তি হাইকোর্টে একটি রিট করেন। এছাড়া ধর্ষণ, মারধর, চুরি, মানবপাচারসহ নানা অভিযোগে দেশের বিভিন্ন জেলায় করা ৪৯ মামলার আসামি এসব মামলা থেকে অব্যাহতি ও ষড়যন্ত্রকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশনা চেয়ে রাজধানীর শান্তিবাগের বাসিন্দা ব্যবসায়ী একরামুল আহসানও রিট করেন হাইকোর্টে। ওই রিট হাইকোর্ট ও আপিল বিভাগ ঘুরে এখন আবার শুনানি হচ্ছে হাইকোর্টে।

২০২১ সালের ১৭ মার্চ আলজাজিরা টেলিভিশন নেটওয়ার্কে প্রচারিত ‘অল দ্য প্রাইম মিনিস্টার্স মেন’ দেশের অনলাইন প্লাটফর্ম থেকে তাৎক্ষণিক সরানোর নির্দেশ দেন হাইকোর্ট। নির্দেশনায় ফেসবুক, ইউটিউব, টটুইটার ও ইনস্টাগ্রাম কর্তৃপক্ষ যেন প্রতিবেদনটি জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে অনলাইন থেকে সরিয়ে ফেলে এবং পুনরায় আপলোড যেন না করে সে বিষয়ে অনুরোধ জানাতে বলেন হাইকোর্ট। বিটিআরসিকে এ নির্দেশ বাস্তবায়ন করতে বলা হয়।
 
হাতিরঝিল-বেগুনবাড়ী প্রকল্পে সব ধরনের বাণিজ্যিক স্থাপনা উচ্ছেদসহ ১০ দফা নির্দেশনা দিয়ে গত বছরের ৩০ জুন রায় দেন হাইকোর্ট। এই বিষয়ে জারি করা রুল যথাযথ ঘোষণা করে ওই রায় দেন হাইকোর্ট।

গত ১৬ আগস্ট দেশের সব অনলাইন প্ল্যাটফর্ম থেকে পাবজি ও ফ্রি ফায়ারের মতো ক্ষতিকারক গেম বন্ধের নির্দেশ দেন বিচারপতি মো. মজিবুর রহমান মিয়া ও বিচারপতি মো. কামরুল হোসেন মোল্লার হাইকোর্ট বেঞ্চ।

বাংলাদেশি বাবা ও জাপানি মায়ের দুই শিশ কন্যা জেসমিন মালিকা ও লাইলা লিনার জিম্মা নিয়ে হাইকোর্টে বছরের অনেকটা সময় ধরে আইনি লড়াই চলেছে। হাইকোর্ট থেকে এই আইনি লড়াই এখন আপিল বিভাগে চলমান। সর্বশেষ গত ১৫ ডিসেম্বর আপিল বিভাগ আদেশে বলেছেন, শিশু জেসমিন মালিকা ও লাইলা লিনা পরবর্তী ৩ জানুয়ারি পর্যন্ত জাপানি মা নাকানো এরিকোর কাছে থাকবেন। আদেশে এই সময় শিশুদের নিয়মিত স্কুলে নিয়ে যেতেও বলা হয়। একই সঙ্গে প্রতিদিন সকাল ৯টা থেকে রাত ৯টার মধ্যে যেকোনো সময় বাংলাদেশি বাবা ইমরান শরীফ শিশুদের সঙ্গে দেখা করতে পারবেন। ৩ জানুয়ারি পরবর্তী আদেশ দেবেন প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বাধীন আপিল বিভাগ বেঞ্চ।

স্থগিতাদেশ থাকার পরও ধর্ষণ মামলার এক আসামিকে জামিন দেওয়ায় গত ২২ নভেম্বর ঢাকার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-৭-এর সাবেক বিচারক বেগম মোছা. কামরুন্নাহারের বিচারিক ক্ষমতা কেড়ে নেন (সিজ) সর্বোচ্চ আদালত। ওই বিচারক বনানীর রেইনট্রি হোটেলে দুই শিক্ষার্থী ধর্ষণ মামলায় ৭২ ঘণ্টা পর ধর্ষণ মামলা নেওয়া যাবে না মর্মে পর্যবেক্ষণ দিলে দেশব্যাপী ব্যাপক সমালোচনা শুরু হয়। এই ঘটনায় কামরুন নাহারকে বিচারকাজ থেকে প্রত্যাহার করে সুপ্রিমকোর্ট প্রশাসন। যদিও লিখিত রায়ে বিতর্কিত পর্যবেক্ষণ পরে বাদ দেন তিনি। এর পরই আলোচনায় আসে তিন বছরের পুরনো এক ধর্ষণ মামলায় আসামির জামিন কাণ্ড। যার ধারাবাহিকতায় তাকে তলব করেন সুপ্রিমকোর্টের আপিল বিভাগ।

ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান ইভ্যালি পরিচালনার জন্য গত ১৮ অক্টোবর আপিল বিভাগের সাবেক বিচারপতি এইচএম শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিককে প্রধান করে পাঁচ সদস্যের বোর্ড গঠন করে দেন হাইকোর্ট। বোর্ডের অন্য সদস্যরা হলেন- স্থানীয় সরকার ও পল্লী উন্নয়ন বিভাগের সাবেক সচিব মোহাম্মদ রেজাউল আহসান, ওএসডিতে থাকা অতিরিক্ত সচিব মাহবুব কবীর মিলন, চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট ফখরুদ্দিন আহম্মেদ ও কোম্পানি আইন বিশেষজ্ঞ ব্যারিস্টার খান মোহাম্মদ শামীম আজিজ। ইভ্যালির ব্যবস্থাপনায় গঠিত বোর্ড কী ধরনের কাজ করবে সে বিষয়েও নির্দেশনা দেন হাইকোর্ট। 

আদালত বলেন, লিখিত আদেশ পাওয়ার পরপরই তারা বোর্ড মিটিংয়ে বসবেন। কোথায় কী আছে সবকিছু বুঝে নেবেন। কোম্পানি যেভাবে চলে, সেভাবে প্রথমে বোর্ড মিটিং বসবে। সবকিছু বিবেচনার পর বোর্ড যদি দেখে প্রতিষ্ঠানটির চলার যোগ্যতা নেই, তখন অবসায়নের জন্য প্রসিড করবে। আর যদি বলে চালানো সম্ভব, তাহলে চলবে।

২০২১ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর দেশে অনুমোদনহীন সুদের কারবারি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে মামলার নির্দেশ দেন হাইকোর্ট। বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃপক্ষকে এ নির্দেশ বাস্তবায়ন করতে বলা হয়। একই সঙ্গে অননুমোদিত আর্থিক প্রতিষ্ঠান, ক্ষুদ্র ঋণদানকারী প্রতিষ্ঠানের কর্মকাণ্ডের বিষয়ে তদন্ত করতে একটি বিশেষ কমিটি গঠনেরও নির্দেশনা দেন আদালত।

গত ২৮ নভেম্বর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ তদন্তের জন্য একটি স্বাধীন পুলিশ তদন্ত কমিশন গঠন করতে রুল জারি করেন হাইকোর্ট। 

২০২১ সালের ৪ আগস্ট রাতে প্রায় চার ঘণ্টার অভিযান শেষে বনানীর বাসা থেকে চিত্রনায়িকা পরীমণিকে গ্রেফতার করা হয়। পরে তিন দফায় মোট সাত দিনের রিমান্ডে নেওয়া হয় পরীমণিকে। ৫ আগস্ট প্রথম দফায় চার দিন, ১০ আগস্ট দ্বিতীয় দফায় দুই দিন এবং ১৯ আগস্ট তৃতীয় দফায় আরও এক দিনের রিমান্ড মঞ্জুর হয় তার। এই চলচ্চিত্র নায়িকাকে দ্বিতীয় ও তৃতীয় দফা রিমান্ডে পাঠানোর ঘটনায় দুই বিচারক দেবব্রত বিশ্বাস ও আতিকুল ইসলামকে গত ২ সেপ্টেম্বর তলব করেন হাইকোর্ট। পারিবারিক আদালতগুলোর আদেশ ও রায় অবমাননায় শাস্তির বিধান সংশোধন করে আরও কঠোর করাতে পরামর্শ দিয়ে গত ২৭ নভেম্বর হাইকোর্টের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশিত হয়।

জনপ্রিয় ‘মাসুদ রানা’ সিরিজের ২৬০টি বইয়ের মালিকানা কার, সে বিষয়ে গত ১৩ ডিসেম্বর রায় দেন হাইকোর্ট। রায়ে উল্লেখ করা হয়, মাসুদ রানা সিরিজের ২৬০টি বইয়ের স্বত্ব কাজী আনোয়ার হোসনের নয়। এর স্বত্ব আব্দুল হাকিমের।

গত ১৫ ডিসেম্বর সারা দেশের অবৈধ থ্রি হুইলার ইজিবাইক চিহ্নিত ও অপসারণ করতে নির্দেশ দেন হাইকোর্ট। অবৈধ থ্রি হুইলার ইজিবাইক আমদানি ও উৎপাদন থেকে বিরত রাখতে বিবাদীদের নিষ্ক্রিয়তা কেন বেআইনি ঘোষণা করা হবে না, তা জানতে চেয়ে রুল জারি করেন হাইকোর্ট।

প্রাণঘাতী করোনাভাইরাসের (কোভিড-১৯) ভয়ানক ছোবলে ২০২০ সালে দেশ এক বিচ্ছিন্ন-অবরুদ্ধ পরিস্থিতির মধ্যে পড়ে। মানুষের মধ্যে বিরাজ করতে থাকে আতঙ্ক আর উৎকণ্ঠা। মুহূর্তে যেন সব কিছু থেমে যায়। ২৫ মার্চের পর থেকে দেশে শুরু হয় অবরুদ্ধ অবস্থা। বন্ধ হয়ে যায় আদালতসহ সকল সরকারি-বেসরকারি অফিস। তবে দীর্ঘদিন ধরে বিচার কার্যক্রম বন্ধ থাকায় দেশের বিভিন্ন আইনজীবী সমিতির পক্ষে শারীরিক উপস্থিতিতে আদালত খুলে দেওয়ার দাবিতে আন্দোলন করেন আইনজীবীরা। যদিও আইনজীবীদের আরেকটি পক্ষ ভার্চুয়াল আদালতের ওপর নির্ভর করতে বিভিন্ন সময় তাদের অভিমত প্রকাশ করতে থাকেন।

তাই সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে এবং বিচারপ্রার্থীদের দুরবস্থার কথা ভেবে ভার্চুয়াল কোর্ট পরিচালনায় আইন প্রণয়নের সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। একপর্যায়ে ২০২০ সালের ৭ মে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে মন্ত্রিসভার বৈঠকে ‘আদালত কর্তৃক তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহার অধ্যাদেশ-২০২০’-এর খসড়া চূড়ান্ত অনুমোদন দেওয়া হয়। এরপর ৯ মে ভার্চুয়াল উপস্থিতিকে সশরীরে উপস্থিতি হিসেবে গণ্য করে আদেশটি জারি করেন রাষ্ট্রপতি মো. আব্দুল হামিদ। এরপর একই বছরের ১০ মে ভার্চুয়াল আদালত পরিচালনা সংক্রান্ত নির্দেশনা জারি করে এবং ১১ মে থেকে সীমিত পরিসরে বিচারিক কার্যক্রম শুরুর মাধ্যমে দেশে ভার্চুয়াল আদালত চালু হয়েছিল। 

কিন্তু ভার্চুয়াল আদালত পরিচালনায় আরও কিছু আইনি প্রতিবন্ধকতা দূর করতে বাংলাদেশের তৎকালীন প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন কর্তৃক প্রণীত প্র্যাকটিস ডাইরেকশন সংশোধন করেন। এরপর থেকে দেশে অধস্তন আদালতে ভার্চুয়াল কোর্টে বিচার কার্যক্রম শুরু হয়। তারপর আর বিজ্ঞ বিচারক-আইনজীবী কিংবা বিচারপ্রার্থীকে করোনার ঝুঁকি নিয়ে যেতে হয়নি জনাকীর্ণ আদালতগুলোতে। সুবিধাজনক স্থানে থেকেই মোবাইল কিংবা ল্যাপটপে ‘জুম’ অ্যাপের মাধ্যমে যুক্ত হতে পেরেছেন ভার্চুয়াল আদালতে। এক্ষেত্রে অডিও-ভিডিও সংযুক্ত একেকটি মোবাইল কিংবা ল্যাপটপের স্ক্রিনই হয়ে যায় সংশ্লিষ্টদের জন্য উন্মুক্ত আদালত। ভার্চুয়াল উপস্থিতিতে যখন আদালত চলছে তখন আসামির আদালতে উপস্থিতি কীভাবে নিশ্চিত হবে? এমন প্রশ্নের সমাধানও খুঁজতে হয়েছে দেশের বিচার বিভাগকে। আর এক্ষেত্রেও ভরসা হয়েছে ডিজিটাল মাধ্যম। দেশে করোনার সংক্রমণ বৃদ্ধি পেলে কারাগার হতে হাজতি আসামিদের আদালতে হাজির করা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ে। এমন বাস্তবতায় প্রধান বিচারপতির আদেশক্রমে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে কারাগারে থাকা আসামির রিমান্ড শুনানি এবং হাজতি আসামিকে আদালত কক্ষে হাজির না করে কারাগারে রেখেই জামিন শুনানির ব্যাবস্থা করা হয়। এর মধ্য দিয়ে ডিজিটাল বিচারিক কার্যক্রমের অনন্য এক উদাহরণ তৈরি হয়। এভাবে চার মাস চলার পর পরবর্তীতে একই বছরের ৫ আগস্ট সারা দেশে সশরীরে নিম্ন আদালত খুলে দেন সুপ্রিমকোর্ট।

কিন্তু বছর পেরুতে আবারও করোনাভাইরাসের দ্বিতীয় ঢেউ উদ্বেগজনক হারে বাড়তে থাকায় ২০২১ সালের ৫ এপ্রিল দেশব্যাপী আবারও বিধিনিষেধ (লকডাউন) জারি করে সরকার। এ বিধিনিষেধের ফলে নিম্ন আদালতের বিচারিক কার্যক্রম (বিচার ফাইল) আবারও বন্ধ হয়ে যায়। তাই আলোচিত মামলাসহ সকল ধরনের মামলার বিচার কার্যক্রম থমকে যায়। আর এতে করে মামলার জট দিনে দিনে বৃদ্ধি পেতে থাকে। যার ফলে বিচারপ্রার্থীরা তাদের বিচার পাওয়া নিয়ে চরম উৎকণ্ঠার মধ্যে পড়েন। 

অপরদিকে আদালত দুই দফায় বন্ধের কারণে এ অঙ্গন ও আইন পেশার সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত সকলেই আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে চরম হতাশার মধ্যে দিন কাটাতে থাকেন। তা ছাড়া ভার্চুয়াল কোর্টে মামলা পরিচালনায় অসন্তুষ্টি প্রকাশ করেন দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ আইনজীবী। তাই বিচারপ্রার্থী ও আইনজীবীরা দাবি জানাতে থাকেন- স্বাস্থ্যবিধি মেনে সশরীরে আদালত খুলে দেওয়া হোক। এ নিয়ে প্রধান বিচারপতির নিকট সাধারণ আইনজীবীরা তাদের দাবির পক্ষে বারবার স্মারকলিপি দেন। 

এ বিষয়ে সুপ্রিমকোর্টের আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি অ্যাডভোকেট জয়নুল আবেদীন বলেন, ‘লকডাউনের কারণে দীর্ঘদিন আদালত বন্ধ থাকায় পেশাজীবী আইনজীবী ও বিচারপ্রার্থীরা বিপাকে পড়েছিলেন। পরে ভার্চুয়াল কোর্টের মাধ্যমে আদালতের কার্যক্রম পরিচালিত হয়। কিন্তু দেশের ৩ শতাংশ আইনজীবী ভার্চুয়াল কোর্ট পদ্ধতিতে সম্পৃক্ত হতে পারেননি এবং ৫ শতাংশ বিচারপ্রার্থী এর সুফল ভোগ করতে পারেননি। যে কারণে সাধারণ আইনজীবীদের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছিল। পরবর্তীতে একই বছরের ১১ আগস্ট সারা দেশে সশরীরে নিম্ন আদালত খুলে দেন সুপ্রিমকোর্ট।

সর্বোপরি দেশের জনগণের সাংবিধানিক অধিকার রক্ষার্থে করোনাকালীন উদ্ভূত পরিস্থিতিতে ভার্চুয়াল আদালত পরিচালনার মাধ্যমে দুই দফায় কয়েক লাখ মানুষ ন্যায়বিচার পেয়েছেন। সুপ্রিমকোর্টের মুখপাত্র ও হাইকোর্ট বিভাগের স্পেশাল অফিসার ব্যারিস্টার মোহাম্মদ সাইফুর রহমান জানান, ২০২০ সালের ১১ মে থেকে ২০২১ সালের ১০ আগস্ট পর্যন্ত ভার্চুয়াল পদ্ধতিতে আদালতের কার্যক্রম পরিচালনা হয়। এ সময় সারা দেশের অধস্তন আদালত এবং ট্রাইব্যুনালে ভার্চুয়াল শুনানিতে মোট ৩ লাখ ১৫ হাজার ৫৬৮টি মামলায় জামিন-দরখাস্ত নিষ্পত্তি হয়। এর মধ্যে ১ লাখ ৬০ হাজার ৭৬৮ জন অভিযুক্ত ব্যক্তি জামিন পেয়ে কারামুক্ত হন। এই জামিনপ্রাপ্তদের মধ্যে শিশু আদালতে ভার্চুয়াল শুনানির মাধ্যমে আইনের সংঘাতে আসা মোট জামিনপ্রাপ্ত শিশুর সংখ্যা ২ হাজার ২৬১ জন।

লেখকদ্বয় : সাংবাদিক


আরও সংবাদ   বিষয়:  করোনার থাবা   বিচার বিভাগ  




https://www.shomoyeralo.com/ad/Google-News.jpg

সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত


ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: কমলেশ রায়, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড
এর পক্ষে প্রকাশক গাজী আহমেদ উল্লাহ
নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।

ফোন : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৭৫। ই-মেইল : shomoyeralo@gmail.com