ফুটপাথে বসা অসংখ্য দুস্থ নারী, পুরুষ ও শিশু। রাস্তার পার ধরে লাইনে লাইনে রিকশায় বসা রিকশাচালকরা। লাইনে দাঁড়ানো আরও শতাধিক মানুষ। ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবাইকে ইফতার দিতে ব্যস্ত ‘মেহমানখানা’র স্বেচ্ছাসেবকরা। কেউ রিকশায় বসে খাচ্ছেন, কেউ বা নিয়ে যাচ্ছেন। প্রতিদিন ইফতারের আগে হাজারো মানুষের মুখে খাবার তুলে দেওয়ার এমন বিরল দৃশ্য দেখা যায় লালমাটিয়ার ডি ব্লকের ‘মেহমানখানা’য়। শুধু লালমাটিয়া নয়, ফার্মগেট ও মোহাম্মদপুরের বিজলি মহল্লায়ও ইফতারি বিতরণ করে তারা। এ ছাড়া সারা বছরই রাজধানী জুড়ে অসহায় দুস্থদের খাবার বিতরণ করা হয়।
মেহমানখানার স্বেচ্ছাসেবকরা বলছেন, ২০২০ সালে লকডাউনের সময় অনাহারী মানুষদের কথা চিন্তা করে কয়েকজন তরুণ-তরুণীর উদ্যোগে মেহমানখানার আত্মপ্রকাশ। এরপর থেকে প্রায় প্রতিদিনই অনাহারী মানুষদের মুখে খাবার তুলে দেওয়ার কাজটি করে যাচ্ছেন তারা।
তারা বলছেন, এখানে মূলত রিকশাওয়ালা, অসহায় গরিব, সিকিউরিটি গার্ডসহ অনেকে প্রতিদিন ইফতারি খেতে আসেন। অনেকেই পরিবার বা সহকর্মীর জন্য নিয়ে যান। মেহমানখানা সবার জন্য উন্মুক্ত। এখানে যে কেউ আসতে পারেন। যারা আসবেন তাদেরকেই আমরা খাবার খাওয়াতে পেরে আনন্দিত।
শুক্রবার দুপুরে লালমাটিয়ার ডি-ব্লকে সরেজমিন দেখা যায়, রাস্তার ওপর কেউ থালা-প্লেট ধুচ্ছেন, কেউ সবজি কাটছেন, কেউ জিলাপি-খেজুর সাজাচ্ছেন। কিছুক্ষণ পর শুরু হয়ে গেল একটি বিশাল ডেগে সবজি ও মুরগি দিয়ে খিচুড়ি রান্না। আরেকটি ডেগে ছোলা। এ ছাড়া রয়েছে মুড়ি। শুক্রবার মানুষ বেশি হবে, তাই আয়োজনও বেশি, ২ হাজার ৫০০ মানুষের খাবারের আয়োজন করা হচ্ছে। একপাশে গ্লাসের স্তূপ, তো আরেক পাশে প্লেটের। কেউ বা বিশাল ড্রামে লেবু চিপে সরবত বানাতে ব্যস্ত।
কথা বলে জানা গেল, যারা খাবার রান্না করছেন তারাও স্বেচ্ছাসেবক। নেই কোনো অভিজ্ঞতা। তারপরও তাদের রান্না খারাপ হয়েছে, এমন অভিযোগ নেই।
বিকাল সাড়ে ৫টায় রান্না শেষ হতেই শুরু হয়ে গেল থালায় খাবার সাজানো। প্রতিটি থালায় দেওয়া হলো খেজুর, জিলাপি, খিচুড়ি, মুড়ি ও ছোলা। এরপর শুরু হলো বিতরণ। কেউ ফুটপাথে যারা বসে আছেন তাদের ইফতারি দিচ্ছেন, কেউ লাইনে দাঁড়ানোদের দিচ্ছেন। কেউ বা ভ্যানগাড়িতে ইফতার সাজিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন অপেক্ষমাণ রিকশাচালকদের কাছে। ৪০ জন স্বেচ্ছাসেবীর যেন দম ফেলার সময় নেই। নিজেরা ইফতার না করে মাগরিবের আজানের পরও প্রায় আধা ঘণ্টা ইফতার বিতরণ করলেন তারা।
ইফতার খেতে আসা রিকশাচালক ইদ্রিস সময়ের আলোকে বলেন, এই নিয়ে দুদিন ইফতার করলাম। খাবার ভালোই দেয়। রাতের আগে আর খাওয়া লাগে না। রোজা ছাড়াও তাদের দেওয়া খাবার খাইসি। গত বছর গরু জবাই দিয়া খাওয়াইসে। আল্লাহ তাগো ভালো করুক।
রোজাদার গৃহকর্মী সালেহা বলেন, তারা মানুষদের কাছ থেইকা সহযোগিতা নিয়ে আমাদের মতো গরিবদের খাওয়ায়। সবার জন্য অনেক দোয়া। বড়লোকরা সহযোগিতা করলে তো দেশে গরিব থাকত না।
লেবুর সরবত দেওয়ার কাজে নিয়োজিত স্বেচ্ছাসেবক রিফাত সময়ের আলোকে বলেন, আগে মেহমানদারী পরে নিজেদের খাবার। আমরা স্বেচ্ছাসেবকরা সাধারণত ইফতার বিতরণ শেষ করার পর সবাই মিলে খাই। এ ছাড়া সময় পাওয়া যায় না।
অন্যতম উদ্যোক্তা আসমা আক্তার লিজা সময়ের আলোকে বলেন, করোনার সময় লকডাউনে নিম্নআয়ের মানুষের কথা চিন্তা করে এটা (মেহমানখানা) শুরু করি। আমরা যতদিন পারি ততদিন খাওয়াব। এখানে যে বাচ্চাগুলো আসে তাদের যদি পড়াশোনা করানো সম্ভব হয়, এমনটা ভাবা হচ্ছে বলে উল্লেখ করেন তিনি। তিনি বলেন, এই একবিংশ শতাব্দীর সভ্য সমাজে কোনো মানুষ রাতে না খেয়ে ঘুমোতে যাবে না। সব দায়িত্ব রাষ্ট্রের না, মানবিক দায়িত্ব বলেও কথা থাকে। সেই মানবিকতা থেকে কেউ যদি এগিয়ে আসতে চায় আসবে। আমার যতটুকু সামর্থ্য আমি করে যাব।
তদারকিতে ব্যস্ত মেহমানখানার অন্যতম উদ্যোক্তা সৈয়দ সাইফুল আলম। এর ফাঁকেই কথা হয় তার সঙ্গে। তিনি সময়ের আলোকে বলেন, ২০২০ সালে করোনার লকডাউনের সময় ঢাকা শহরে থাকা অসংখ্য মানুষ যারা আমাদের নানাভাবে সহযোগিতা করেন, তাদের পাশে থাকার ভাবনা থেকে আমি আর আসমা আক্তার লিজা মিলে মেহমানখানার শুরুটা করি। লালমাটিয়ার ডি-ব্লকে শুরু হয় রান্না করে খাবার খাওয়ানো। এরপর থেকেই চলছে। ধীরে ধীরে এর বিস্তৃতি বেড়েছে। বেড়েছে স্বেচ্ছাসেবক। ধর্ম, বর্ণ, পেশা কিছুই আমাদের কাছে গৌণ বিষয় হলো না, যারা এলেন, সবাই হলেন আমাদের মেহমান। এই মেহমানখানা আমার বা লিজার না এটা সবার। এখানে সবাই সহযোগিতা করতে পারেন, স্বেচ্ছাসেবকের কাজ করতে পারেন। এলকাবাসী সহযোগিতা না করলে এত বড় কর্মযজ্ঞ চালিয়ে নেওয়া সম্ভব হতো না।
প্রতিদিন ইফতার আয়োজন করতে ৫০ হাজারের অধিক টাকা খরচ হয়। টাকার উৎস প্রসঙ্গে তিনি বলেন, প্রতিদিনই মনে হয় কাল থেকে হয়তো আর রান্না হবে না। কারণ টাকা একটা বড় ফ্যাক্টর। তবে প্রতিদিনই কেউ না কেউ সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেন। কিন্তু কেউ প্রচার চান না। আমরাও চাই না। অনেক সময় দোকানে বাকি রাখতে হয়। তবে কোনো না কোনোভাবে চলছে।
হঠাৎ দেখা গেল একটি ভ্যানগাড়িতে বিশাল ২ বস্তা মুড়ি চলে এলো। সেটা দেখিয়ে শোভন বলেন, দেখেন এভাবেই চলছে মেহমানখানা। আমাদের পারিবারিক অবস্থাও কারও এমন কিছু নয় যে আমরা দিনের পর দিন এ আয়োজন চালু রাখতে পারব। অসংখ্য মানুষ দায়িত্ব নিয়েছেন আর তাই মেহমানখানা চলছে। হাজার মানুষ আসেন, খাবার খেয়ে যান। মেহমানখানার সত্যিকারের নায়কদের নাম কেউ জানে না।
/এসকে