ই-পেপার বিজ্ঞাপনের তালিকা শনিবার ৩ ডিসেম্বর ২০২২ ১৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৯
ই-পেপার শনিবার ৩ ডিসেম্বর ২০২২
https://www.shomoyeralo.com/ad/Amin Mohammad City (Online AD).jpg

স্বাস্থ্য খাতের দুর্নীতি
আবদুল্লাহ আল মামুন
প্রকাশ: শনিবার, ৭ মে, ২০২২, ৫:২৮ পিএম | অনলাইন সংস্করণ  Count : 1497

করোনা সংক্রমণের শুরুর দিকে বিশ্বের অন্যান্য দেশের ন্যায় থমকে যায় বাংলাদেশের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা। তবে এই মহামারিকালে ভয়াবহভাবে বেড়েছে অনিয়ম-দুর্নীতি। অন্যান্য খাতের তুলনায় স্বাস্থ্য খাতের দুর্নীতি বেড়ে যায় কয়েকগুণ। মাস্ক ও ব্যক্তিগত সুরক্ষাসামগ্রী (পিপিই) কেনাকাটা থেকে শুরু করে কোভিড-১৯ পরীক্ষায় জালিয়াতি, নামসর্বস্ব অটোমোবাইল কোম্পানিকে সুরক্ষাসামগ্রী সরবরাহের কাজ দেওয়া, স্বাস্থ্য অধিদফতরের কর্মচারী ও গাড়িচালকের অঢেল সম্পদসহ আরও বেশ কিছু ঘটনা ছিল আলোচনার তুঙ্গে। এর বাইরে সাহেদ-সাবরিনাদের মতো নতুন নতুন নামও উঠে আসে দুর্নীতিবাজদের তালিকায়। অবস্থা এমন হয়েছে, করোনাভাইরাসের আলোচনাকে ছাপিয়ে বছরজুড়ে আলোচনা-সমালোচনার কেন্দ্রে চলে আসে স্বাস্থ্য খাতের দুর্নীতির বিষয়। স্বাস্থ্যমন্ত্রী নিজেও করোনাকালের দুর্নীতির বিষয়টি স্বীকার করেছেন। করোনাকালে বিশে^ দুর্নীতিগ্রস্ত দেশের তালিকায় ২০২১ সালে বাংলাদেশ একধাপ এগিয়ে ১৩তম অবস্থানে উঠে আসে।

স্বাস্থ্যসংশ্লিষ্টরা করোনা শুরুর দিকে বলেছেন, ভাইরাসটি নিয়ে আমাদের চিকিৎসকদের কোনো ধরনের ধারণা ছিল না। এটি কেমন রোগ বা এর প্রভাব কতটা ভয়াবহ হতে পারে, সে ধারণাও ছিল না। ঠিক কোন ওষুধে বা কীভাবে চিকিৎসা দেওয়া হবে তারও ছিল না সঠিক দিকনির্দেশনা। শুরুতে শহরে-গ্রামে সবাইকে গণহারে মাস্ক পরিধানসহ বাইরের মেলামেশায় বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়। চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের জন্য সরকারের পক্ষ থেকে মাস্ক ও পিপিসহ বিভিন্ন প্রতিরোধী সরঞ্জাম সরবরাহ করা হয়।

চীনে করোনার উৎপত্তি বলা হলেও, আমাদের দেশে প্রথম করোনা রোগী শনাক্ত হয় ২০২০ সালের ৮ মার্চ। আর প্রথম মৃত্যুর ঘটনা ঘটে ১৮ মার্চ। এর পরপরই দেশবাসীর মধ্যে রোগটির বিষয়ে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। করোনা সংক্রমণরোধে একই বছরের ১৭ মার্চ দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা করা হয়।

দেখা গেল, করোনা শনাক্তের হার বাড়ার সঙ্গে মাস্কসহ প্রতিরোধী সরঞ্জামের চাহিদা বাড়তে থাকে। সরকারের পক্ষ থেকে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে এসব সরঞ্জাম সরবরাহের চুক্তি করা হয়। কিন্তু তারা মানসম্মত পণ্যের পরিবর্তে নিম্নমানের পণ্য সরবরাহ শুরু করে। বিষয়টি গণমাধ্যমে উঠে এলে করোনা নিয়ে স্বাস্থ্য খাতের দুর্নীতি ও অনিয়মের বিষয়টি সবাইকে বিচলিত করে তোলে। করোনার মতো ভয়াবহ রোগের চিকিৎসার নামে যে প্রতারণা করা যায়, সেটি বিশ^াস করতে পারছিল না দেশবাসী। তবে এমন দুর্নীটির বিষয় টের পেয়েই হয়তো একই বছরের শুরুতে ২ ফেব্রুয়ারি স্বাস্থ্য খাতে কেনাকাটা ও নিয়োগসহ দুর্নীতির ১১টি খাত চিহ্নিত করে এসব দুর্নীতি প্রতিরোধে স্বাস্থ্যমন্ত্রীকে ২৫ দফা সুপারিশ দিয়েছিল দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।
সংক্রমণের শুরুর দিকে একটি প্রতিষ্ঠানের দুর্নীতির বিষয়টি প্রথম গণমাধ্যমে উঠে আসে। আর সেটি হলো ‘জেএমআই’ নামে একটি প্রতিষ্ঠান। তারা বিভিন্ন হাসপাতালে এন-৯৫ মাস্ক সরবরাহের চুক্তি করলেও সরবরাহ করে নিম্নমানের মাস্ক। এ ঘটনায় ওই বছর (২০২০) সেপ্টেম্বর মাসে প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান আবদুর রাজ্জাককে দুদক গ্রেফতার করে।

শুরুর দিকে দেখা গেছে, সরকারের বিশেষায়িত কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে পরীক্ষা ও চিকিৎসা শুরু করে। ধীরে ধীরে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বাড়তে থাকলে সরকারি হাসপাতালগুলোর পক্ষে এত রোগীর পরীক্ষা কুলিয়ে ওঠা সম্ভব হচ্ছিল না। তখন সরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি বেসরকারি বেশ কিছু প্রতিষ্ঠানকেও কোভিড-১৯ শনাক্তের পরীক্ষা করার অনুমতি দেয় স্বাস্থ্য অধিদফতর। বেসরকারি এরকম একটি প্রতিষ্ঠান ছিল ‘জেকেজি হেলথ হেলথকেয়ার’। প্রতিষ্ঠানটি নমুনা পরীক্ষা না করেই অনিয়ম-দুর্নীতির আশ্রয় নিয়ে পরীক্ষার ফলাফল ও সনদ দেওয়া শুরু করে। বিষয়টি জানাজানি হলে ২০২০ সালের ২৩ জুন জেকেজির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা আরিফুল হক চৌধুরীসহ ছয়জনকে পুলিশ গ্রেফতার করে। পরে ১২ জুলাই প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান সাবরিনা চৌধুরীকেও গ্রেফতার করা হয়।

পরীক্ষার মতো করোনার চিকিৎসার জন্য সরকার নির্ধারিত হাসপাতালগুলোর একটি ছিল ‘রিজেন্ট হাসপাতাল’। এই হাসপাতালের উত্তরা ও মিরপুরে দুটি শাখায় চিকিৎসা দেওয়া শুরু হলেও তাদের লাইসেন্সই নবায়ন করা ছিল না। এ ছাড়া অনুমোদন না থাকা সত্ত্বেও আরটি-পিসিআর পরীক্ষার নামে ভুয়া রিপোর্ট দেওয়া শুরু করে হাসপাতালটি। বিনামূল্যে চিকিৎসা দেওয়ার কথা থাকলেও তারা চিকিৎসার নামে রোগীদের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা আদায় করে। বিষয়টি গণমাধ্যমে উঠে এলে একই বছরের জুলাই মাসে র‌্যাব উত্তরার মূল শাখায় অভিযান চালালে অনিয়মের বিষয়টি জনসম্মুখে আসে। এ ঘটনায় রিজেন্ট গ্রুপের চেয়ারম্যান সাহেদকে প্রধান আসামি করে ১৭ জনের নামে মামলা ও পরবর্তীতে ১৫ জুলাই সাতক্ষীরার দেবহাটা সীমান্ত থেকে র‌্যাব তাকে গ্রেফতার করে।

এ ঘটনার পরপর রিজেন্টের মতো লাইসেন্সবিহীন একটি হাসপাতালকে করোনার মতো স্পর্শকাতর একটি রোগের চিকিৎসার দায়িত্ব দেওয়ায় স্বাস্থ্য অধিদফতরের বিরুদ্ধে সারা দেশে সমালোচনার ঝড় ওঠে। এ বিষয়ে অধিদফতরের এক ব্যাখ্যায় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের ‘ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের’ নির্দেশে রিজেন্ট হাসপাতালের সঙ্গে সমঝোতা স্মারক সই করার কথা বলা হয়। এ ঘটনার রেশে স্বাস্থ্য অধিদফতরের সে সময়ের মহাপরিচালক আবুল কালাম আজাদ পদত্যাগও করেছিলেন।

করোনা পরীক্ষা ও সরঞ্জাম কেনাকাটার মতো আরেক দুর্নীতির ঘটনা ছিল স্বাস্থ্য অধিদফতরের গাড়িচালক আবদুল মালেক ওরফে বাদলের অঢেল সম্পদের তথ্য সামনে আসা। নিজের পরিবারের সাত সদস্যের চাকরির ব্যবস্থা করা ছাড়াও স্বাস্থ্য সহকারী পদে শতাধিক লোককে নিয়োগ পাইয়ে দেন এই গাড়িচালক। ঢাকায় তার দুটি সাত তলা ভবন, নির্মাণাধীন একটি দশ তলা ভবন, জমি, গরুর খামারসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান খুঁজে পায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। দুদকও ঢাকার একটি মৌজাতেই মালেক ও তার স্ত্রীর সাতটি প্লটের সন্ধান পায়। পরে ওই বছরের ২০ সেপ্টেম্বর তুরাগ থেকে মালেককে গ্রেফতার করে র‌্যাব।

গণমাধ্যমের তথ্যে দেখা যায়, স্বাস্থ্য খাতের আরেকটি বড় দুর্নীতি ছিল ‘জাদিদ অটোমোবাইলস’ নামে একটি অখ্যাত প্রতিষ্ঠানকে করোনার সুরক্ষাসামগ্রী সরবরাহের কাজ দেওয়া। মাল সরবরাহের জন্য প্রতিষ্ঠানাটিকে সাড়ে ৯ কোটি টাকা আগাম দেওয়া হলেও তারা যথাসময়ে কোনো মালামাল দিতে পারেনি। পরবর্তীতে নামসর্বস্ব এ প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে অর্থ আত্মসাতের অভিযাগ উঠলে কিছু মাস্ক ও গ্লাভস সরবরাহ করে তারা। যার মধ্যে ২৪ হাজার মাস্ক ব্যবহারের অনুপযোগী বলে গণমাধ্যমে প্রকাশ পায়।

স্বাস্থ্য খাতের এসব দুর্নীতির ঘটনায় দেখা যায়, দুর্নীতির বিষয় ধরা পড়লে জড়িতদের একপক্ষকে আইনের মুখোমুখি করা হলেও টেবিলের ওপারের কর্তারা আড়ালে থেকে গেছেন। স্বাস্থ্য অধিদফতরের তৎকালীন ডিজি আবুল কালাম পদত্যাগ করলেও তিনি কেন পদত্যাগ করেছেন এবং কেনইবা তাকে বড় ধরনের শাস্তির মুখোমুখি করা হয়নি, সেসব প্রশ্ন থেকে গেছে। এ ছাড়া কর্মচারী মালেক ও অন্যদের পেছনে যারা চালিকাশক্তি ছিলেন তারাও থেকে গেছেন আড়ালে। আবার কোনো কর্মকর্তা কথা বলতে গেলে প্রভাবশালীদের চাপে তাদেরও পড়তে হয়েছে নানা ঝামেলায়। কাউকে ওএসডি আবার কাউকে নিজ দফতর থেকে বদলির ঘটনা ঘটেছে। সাংবাদিক রোজিনা স্বাস্থ্য খাতের দুর্নীতির একাধিক প্রতিবেদন করায় তাকেও কর্মকর্তাদের রোষানলে পড়ে কারাবরণ করতে হয়েছে।

 স্বাস্থ্য খাতের এসব দুর্নীতি-অনিয়ম নিয়ে সে সময়ে দুদকের এক প্রতিবেদনে স্বাস্থ্য খাতে বিদেশি অর্থায়নে পরিচালিত প্রকল্পে কেনাকাটার ‘পাবলিক প্রকিউরমেন্ট বিধিমালা ২০০৮’ অনুসরণ করা হয়নি বলে উল্লেখ করা হয়েছিল। ওই প্রতিবেদনে মৌখিক আদেশে যন্ত্রপাতি কেনাকাটাসহ স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, স্বাস্থ্য অধিদফতর, সিএমএসডি এবং বিভিন্ন হাসপাতালের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের কয়েকটি সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণ রয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়েছিল। যদিও এতদিনেও সেসব রহস্যের কোনো সুরাহা হয়নি।

/এমএইচ/




https://www.shomoyeralo.com/ad/Google-News.jpg

সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত


ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: কমলেশ রায়, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড
এর পক্ষে প্রকাশক গাজী আহমেদ উল্লাহ
নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।

ফোন : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৭৫। ই-মেইল : shomoyeralo@gmail.com