ই-পেপার বিজ্ঞাপনের তালিকা বৃহস্পতিবার ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২২ ১৪ আশ্বিন ১৪২৯
ই-পেপার বৃহস্পতিবার ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২২
http://www.shomoyeralo.com/ad/Amin Mohammad City (Online AD).jpg

http://www.shomoyeralo.com/ad/Untitled-1.jpg
এপিক মনোলোগ 'আমাদের বঙ্গমাতা' (পর্ব ২)
আনিসুর রহমান
প্রকাশ: সোমবার, ১৫ আগস্ট, ২০২২, ২:৩৯ পিএম আপডেট: ২০.০৮.২০২২ ৩:৩২ পিএম | অনলাইন সংস্করণ  Count : 159


দ্বিতীয় পর্ব ১৯৪৪ - ১৯৭১
ইতোমধ্যে জীবনে বড় আকর্ষণ দ্বিতীয় কন্যাসন্তান হাসু এসেছে।  
১৯৪৯ সালে উনি জেলে বসে সংবাদ পেলেন কামালের জন্মের। 
মানুষটা বড়ই ভোলানাথ। 
কিছুই তার খেয়ালে নাই, সংসার আমার উপর ছেড়ে দিয়ে উনি নিশ্চিন্ত। 
আছেন দেশ নিয়ে, দেশের মানুষ নিয়ে। 
আমার চাওয়াও এমনটাই। 
থাকুন উনি দেশ নিয়ে। 
সবাই যদি সংসার নিয়েই থাকে তাহলে দেশের মুক্তি হবে কেমনে?

আমি এতেই ধন্য।  
আমি আমার জীবনের সবটা দিয়ে উনার পেছনে অন্দর থেকে শক্তি জুগিয়ে যাবো। 
উনার বাড়ি তো দুইটা একটা জেলখানা আরেকটা আমাদের ৩২ নম্বরে। 
উনি সংসারী হবেন সেই সুযোগ কোথায়। 
উনি কয়দিনই বা বাড়িতে ঘুমাতে পারেন। 
আর্থিক টানাপোড়েন, নানাদিক অনটন, সব তো আমাকে সামলাতে হয়।  
ভয় করি না, ভেঙেও পড়ি না।  
মানুষটা আমার মাথার উপর এক ঠিকানা। 
এই মানুষের জন্যে জীবনের রক্ত পানি করতেও সমস্যা আমার নাই।  

আমার বাসায় ফ্রিজ, আমার স্বামী আমেরিকা যখন গিয়েছেন ফ্রিজ নিয়ে এসেছেন। 
সেই ফ্রিজটা বিক্রি করে দিলাম। 
সন্তানদের বললাম, ঠাণ্ডা পানি খেলে সর্দি কাশি হয়, গলা ব্যাথা হয়, ঠাণ্ডা পানি খাওয়া ঠিক না।  
কাজেই এটা বিক্রি করে দেই। '
ওদেরকে বলবো না আমার টাকার অভাব।  
সংসার চালাতে হচ্ছে, আওয়ামী লীগের নেতাদের সাহায্য করতে হচ্ছে।  
কে অসুস্থ তাকে টাকা দিতে হচ্ছে। 
অভাব কথাটা সন্তানদের বলতে চাই না।   
ভাতে তরকারির সামর্থ্য নাই, তাই খিচুড়ি রান্না করি খাদ্যের বৈচিত্র্য হিসেবে। 
সন্তানরাও খায় খুশি মনে।  

বছরের পর বছর আমার স্বামী জেলে  --  তার অবর্তমানে পার্টিকে সংগঠিত করা, সংগঠনকে ধরে রাখা উনার সঙ্গে যোগাযোগ করা, 
উনার বিরুদ্ধে একটার পর একটা মিথ্যা মামলা, প্রতিটি মামলা  লড়ে যাওয়া, আআমাকেই তো করতে হচ্ছে। 

১৯৫৩ সাল, জামালের জন্ম। 
এখন আমাকে মানুষটার পাশে থাকতে হবে, কোথাও একটা অবহেলা হয়ে যাচ্ছে। 
ঢাকায় চলে এলাম, বাসা নিলাম গেন্ডারিয়ার রজনী চৌধুরী লেনে। 
মানুষটার স্বপ্ন বাংলার মাটিতে মানুষ মানুষ হিসেবেই থাকবে, হিন্দু, মুসলমান, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান হিসেবে নয়।  

আমার স্বামী মন্ত্রী হলেন আবার। 
আমার উৎসাহ নাইমন্ত্রীর ঘরনি হতে।  
প্রথমবার উনার মন্ত্রিত্ব হবার সাধ বড় কঠিন ছিল আমার জন্যে, আমাদের সকলের জন্যে। 
মন্ত্রিত্ব হারাবার সময়টা আরও কঠিনতর। 
মানুষটা সোভিয়েত আর চীন গেলেন। 
সংসারটা আমাকেই সামলাতে হবে।  

এবার দলের দায়িত্ব নিয়ে মন্ত্রিত্ব ছাড়লেন, দলের সাধারণ সম্পাদক হলেন। 
এরপর হলেন টি বোর্ডের চেয়ারম্যান। 
মার্শাল ল এলো, জেনেরাল আইয়ুব খানের মার্শাল ল। 
টি বোর্ডের চাকরি আর বাড়ি সব গেলো একসঙ্গে।  

মানুষটা কারারুদ্ধ। 
বাড়ি ছাড়লাম।  
বাড়ি খুঁজো এবার।  

তিন দিনের মধ্যে  বাড়ি ছাড়ার নোটিশ।  
বাড়ি খুঁজে পেলাম, ঠিকানা ৭৬ সেগুন বাগিচা; 
নির্মাণাধীন বাড়ি, তিনশো টাকা ভাড়া 
গানের মাস্টার বিদায়, প্রাইভেট টিউটর বিদায় 
কি বলবো বাচ্চাদের?  
নিজেই পড়াবো, আরো ভালো মাস্টার খুঁজবো।  
বাচ্চাদের কিছু একটা বলে বুঝিয়ে রাখি। 

আমার স্বামী শেখ মুজিবুর রহমানের মাথার উপর চৌদ্দটা মামলা 
এ মামলা তো মানুষটার মাথার উপর নয় 
এ মামলা আমার মাথার উপরেই 
উকিলের বাড়ি দৌড়ানো 
কাগজপত্র গোছানো 
পার্টি সদস্যদের নির্দেশ পৌঁছানো 
সব ঠিক আছে।  
তবে সব থেকে কঠিন কাকাজ টাকা জোগাড় করা।  
কত কি হাত ছাড়া হলো, বেহাত হলো নানা জায়গায় কত জিনিস রেখেও পরে আর পেলাম না 
অনেক জিনিস তো বিক্রি করে দিতে হলো 

মানুষটার অনেক শখের, অনেক দরকারি জিনিস রেডিওগ্রামটা 
এটা রক্ষা করতে পেরেছি 
একাকী সময়ে এটাই একমাত্র সঙ্গী 
গান শুনে সময়টা তবু কাটে 
মানুষটাও গুনগুন করে রবীন্দ্র সংগীত গায় 
এই জিনিসটা রক্ষা করতেই হবে 

১৯৬১ সালে মানুষটা ছাড়া পেলেন 
রাজনীতি নিষিদ্ধ
ইন্সুরেন্সের চাকরি 
মানুষটা অফিস আর বাসা 
টাকার চিন্তাও নাই 
শ্বশুর শাশুড়িও আসেন ঢাকায় 
ছেলেমেয়েরা পড়াশোনা নিয়ে ব্যস্ত
মাস্টারদের যাতায়াত শুরু হয়েছে 

১৯৬২ সালে ধানমন্ডির ৩২ নম্বর সড়কের বাসায় উঠেছিলাম। 
একই বছর মানুষটা আবার বন্দী হলেন। 
১৯৬৩ সালে সোহরাওয়ার্দী সাহেব অসুস্থ হয়ে বিলেত গেলেন, মানুষটাও সেখানে গেলেন। 
কিন্তু বৈরুতেই সোহরাওয়ার্দী সাহেব মারা গেলেন।
উকিলরা পয়সা ছাড়া কেস করতে চাচ্ছে না।  
কেউ ভয়ে কেস করতে চাচ্ছে না।  
কি আর করবো? 
মইজুদ্দিন সাহেব আর গাজী সাহেব এদেরকে নিয়ে ঢাকার সমস্ত জায়গা ঘুরে টাকা সংগ্রহ করি।
মামলা চালাই, দলের বিপদগ্রস্ত কর্মীদের খোঁজ খবরও রাখি। 

আইয়ুব-মোনায়েমের বড় খায়েশ মানুষটাকে বন্দী রেখে শায়েস্তা করে গোটা দেশটাকে শোষণ করে যাবে। 
ছয় দফা আন্দোলন দমন করবে?
ওরা কি ভেবেছে? 
মানুষটা বন্দী আর কর্মীরা সব ভয়ে পালাবে? 
উনি বন্দী তাতে কি?
উনার হুকুম মতো সবকিছু চলছে, সবকিছু চলবে। 
আমি উনাকে যেমন বুঝতে পারি। 
বুঝতে পারি মানুষের চাওয়া পাওয়া। 
দেশের মানুষ জীবন দিয়ে হলেও ছয় দফার জন্যে লড়ে যাবে। 
আমিও হাল ছাড়ার মানুষ না। 
যত ঝড় ঝাপ্টা আসুক আমি মোকাবিলা করবো। 
উনিও মুক্তি পাবেন, সকল বন্দী মুক্তি পাবে। 
ছয় দফাও মানতে হবে।  

বাসার সামনে গোয়েন্দা দাঁড় করিয়ে রাখে। 
বসার জায়গা নাই।  
ঝড় বৃষ্টি রোদ।  
খাবারদাবারের ঠিক নাই।  
ওদেরকে ডাক, ওরা আমাদের বসার ঘরে বসুক। 
ওদেরকে জলখাবার চা পানি দে।  
ওরাই বা কি করবে?
ওরাও তো মানুষ।  
গোয়েন্দাগিরি ওদের চাকরি। 
ওরা হুকুম তালিম করে।  
বিনিময়ে বেতন পায়, পরিবার পরিজন নিয়ে চলে।  
মানুষ হয়ে মানুষের কষ্ট সইতে পারি না। 
যা হবার হবে, ওরা গোয়েন্দা হোক। 
ওদেরকে মেহমানদারি করবো। 
যা হবার হবে।  

উচ্চ পর্যায়ের সব নেতাদের আমার চেনা আছে।  
এদের কেউ কেউ একেকটা ভীতুর ডিম।  
উনাদের সুবিধাধাবাদী চরিত্রও আমায় জানি। 
তারা উঠেপড়ে লেগেছে উনাকে পেরোলে মুক্তি নিয়ে পশ্চিম পাকিস্তানে বৈঠকে পাঠাতে। 
এটা কিছুতেই হতে দেয়া যাবে না।  
এটা একটা চক্রান্ত শাসকগোষ্ঠীর। 
একবার বন্দী  থাকা অবস্থায় পেরোলে মুক্তি নিয়ে পশ্চিম পাকিস্তানে গেলে, এদিকে জনরোষ প্রশমিত হবে।  
অন্যদিকে বন্দীরাও কারাগারেই থাকবে। 
এরপরে ওদের উদ্দেশ্য মতো সকল রাজবন্দীর শাস্তি হবে।  
মুক্তি দিলে পুরোপুরি নিঃশর্ত মুক্তিই দিতে হবে।  

উনি যদি আমার এই উপলদ্ধির বাইরে উচ্চপর্যায়ের নেতা আর সম্পাদকদের পরামর্শে পেরোলে মুক্তি নেন, তাহলে ৩২ নম্বরের দরজা উনার জন্যে বন্ধ। 
আমি বটি নিয়ে বসে থাকবো। 
পাঠাব হাসুকে ওয়াজেদের সঙ্গে। 
এই ওয়াজেদ তুমি হাসুকে নিয়ে ক্যান্টনমেন্টে চলো ।  

কী হাসু?  কী মা! 
মন খারাপ করিস না, নেতারা কে কী বললে ওতে কিছু মনে করিস না।  
তোর আব্বার কিছু হবে না, উনি মুক্তি পাবেন আগে পরে।  
উনারা তোকে তোকে বলেছে, তোমার আব্বা সারাজীবন জেলে থাকবে অথবা মৃত্যুদণ্ড পাবে। 
উনাদের কথা সত্য হবে না।  
উনারা মানুষের ভাষা বোঝেন না।  
দেশের মানুষ কোনো বাঁধ মানবে না।  
ওদের গদি  নড়বড় হয়ে গেছে। 
মুক্তি দিতেই হবে।  
তাছাড়া কোনো উপায় নাই।  

আমার স্বামীকে দেশের মানুষ ভালোবাসে। 
তার এতো জনপ্রিয়তা। 
এতা আমার গর্ব। 
তার টাকাপয়সা বিষয় আশয়ের দিকে মনোযোগ দেবারসময় কোথায়?
তাই আমি কষ্ট করে হলেও টাকা জমিয়ে রাখি, উনার যাতে সমস্যা না হয়, উনার যাতে কষ্ট না হয়।  
উনার ভালো মানে আমার ভালো। 
উনি সফল হলে আমার চেয়ে আর কে বেশি খুশি হবে, আর কে সুখী হবে?
জীবন দিয়ে হলেও উনাকে আগলে রাখবোই। 

১৯৫২ সাল, ভাষা আন্দোলনের সময়কার কথা মনে পড়ে, উনি জেলে।  
তিনি অসুস্থ, প্রায় মৃত্যুপথযাত্রী। অনশন করে প্রায় নিজেকে শেষ করে দিয়েছেন। 
উনাকে এই অবস্থায়  দেখে আমার মনের অনুভূতি কী তা কে বুঝবে?

''তোমার চিঠি পেয়ে আমি বুঝেছিলাম, তুমি কিছু একটা করে ফেলব। 
আমি তোমাকে দেখবার জন্যে ব্যস্ত হয়ে পড়েছিলাম। 
কাকে বলব নিয়ে যেতে, আব্বাকে বলতে পারি না লজ্জায়। 
নাসের ভাই বাড়ি নাই।  
যখন খবর পেলাম খবরের কাগজে, তখন লজ্জা শরম ত্যাগ করে আব্বাকে বললাম। 
আব্বা ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। তাই তাই রওয়ানা করলাম ঢাকায়, সোজা আমাদের বড় নৌকায় তিনজন মাল্লা নিয়ে। 
কেন তুমি অনশন করতে গিয়েছিলে?
এদের কি দয়ামায়া আছে?
আমাদের কারও কথা তোমার মনে ছিল না?
কিছু একটা হলে কি উপায় হতো? 
আমি এই দুইটা দুধের বাচ্চা নিয়ে কি করে বাঁচতাম। 
হাসিনা, কামালের কি অবস্থা হতো?

তুমি বলবা, খাওয়া দাওয়ার কষ্টতো হতো হতো না?
মানুষ কিব শুধু খাওয়া পরা নিয়েই বেঁচে থাকতে চায়? 
আর তুমি মরে গেলে দেশের কাজই বা কিভাবে করতে?

বলতে গেলে আমার স্বামী আমার কাছে আত্মসমর্পণ করেছেন। 
সন্তানদের দায়িত্ব আমার হাতে তুলে দিয়েছেন। 
আমিও ঠিক করলাম আর কত দূরে দূরে থাকবো। 
উনি কলকাতায়, আমরা টুঙ্গিপাড়ায়। 
এরপর উনি ঢাকায়, আমরা টুঙ্গিপাড়ায়।  
এভাবে চলতে পারে না। 
তারপর ককলহং উনি জেলে ঢুকেন আর আবার কে উনাকে উকিলের পেছনে দৌড়াদৌড়ি করে জেল থেকে বাইরে নিয়ে আসবেন। 
এরকম সাত পাঁচ ভেবে ঢাকায় চোখেরচলে এলাম। 
এরপর উনি মন্ত্রী হলেন। 
মিন্টু রোডের ৩ নম্বরে বাসা পেলাম। 
মন্ত্রিত্ব চলে গেলো 
উনি গ্রেফতার হলেন 
বাসা থেকে বের করে দিলো তিন দিনের নোটিশে। 
এরপর কেউই বাসা দিতে চায় না।  
এরপর আবার মন্ত্রী। 
আবার সরকারি বাসা। 
মন্ত্রিত্ব ছেড়ে দলের সাধারণ সম্পাদক হলেন। 
আবার সরকারি বাসা ছাড়ো। 
এরকম চলতে থাকলো। 
সব ঝক্কি আর ঝামেলা তো আমার উপর দিয়েই যায়।  
তবু যদি দেশটার মানুষের মঙ্গোল হয়, আমার স্বামী  দেশের মানুষের ভাগ্য ফিরিয়ে আন্তে পারেন, তাতেই আমার সুখ।  
আমি আমার সন্তানদের পড়াশোনা করিয়ে দাঁড় করবো, বিলাসিতা ওদেরকে স্পর্শ করতে পারবে না।  

১৯৫৮ সাল। আইয়ুবের মার্শাল ল ।

রাজনীতি নিষিদ্ধ। 
স্বামী কারাবন্দি। 
গয়না বিক্রি করে সংসার চালাই মামলা লড়ি। 
আমার স্বামী মুক্তি পেলেন। 
আবার রাজনীতি নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। 
তিনি ছয় দফা ঘোষণা করলেন। 
তার জনপ্রিয়তা তুঙ্গে। 
অর্থ 
মন্ত্রিত্ব 
পারমিট 
লাইসেন্স 
অনেককিছু দিয়ে আইয়ুব খান অনেককে করায়ত্ব করে ফেললেন।
কেবল কিনতেও পারলেন আমার স্বামীকে। 
পারবেন না কোনোদিন। 
আমার স্বামীকে আমি চিনি। 
তিনি তাঁর নীতি থেকে সরবেন না. 
আমি বেঁচে থাকতে সেরকম হতে দেব না। 
ছয়দফা বাঙালির মুক্তির দফা। 
দমন পীড়ন জেল জুলুম অত্যাচার শোষণ বঞ্চনার করাল গ্রাস থেকে মুক্ত করার জন্যে একজন মাত্র মানুষ আছেন আমাদের দেশে 
সে আর কেউ নন, তিনি আমার স্বামী শেখ মুজিবুর রহমান। 
তিনিই হবেন এদেশের মানুষের মুক্তির দূত।  
যে যাই বলুক, যে যাই জানুক। 
আমি জানি তিনি তাঁর লক্ষে পৌঁছবেন। 
এদেশের মানুষের মমুক্তির পথ তিনি খুঁজে বের করবেন।

’যদি তোর ডাক শুনে কেউ শোনে তবে একলা চলরে’
(রবীন্দ্রনাথের এই গানটি বাজতে থাকবে) 

আমার স্বামী শেখ মুজিবুর রহমান এবং   তাঁর দল একলা চলার সিদ্ধান্ত নিলেও, তাঁর ডাক শুনে তাঁর পেছনে আছেন প্রগতিশীল রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, বুদ্ধিজীবী এবং ছাত্রসমাজ। 
আমার স্বামী শেখ মুজিবুর রহমানকে গ্রেফতার করেছে। 
আমাদেরকে বাস্তুচ্যুত করেছে, 
ছেলেমেয়েদের শিক্ষার ক্ষেত্রে বৈরিতা করেছে 
আমাদের জীবনযাপনে, বেঁচে থাকার পথে সমধরণে বাধা আর হুমকি তৈরী করেছে। 
এসব ঘাত প্রতিঘাত আমাকে মোকাবেলা করতে হচ্ছে। 
কবি সুফিয়া কামাল আমাদের বড় বোনের মতন।  
ধানমন্ডির ৩২ নম্বর সড়কে ওনারও বাসা।  
যখনই আমার স্বামী শেখ মুজিবুর রহমানকে পুলিশ এসে গ্রেফতার করে নিয়ে যায়, খবর পেয়ে তিনি ছুটে আসেন। 
আমাকে সঙ্গ দেন, দুঃসময়ে সাহস দেন, ভরসার কথা শোনান।  
আজকেও এসেছিলেন। 
যে অন্যায় আমাদের উপর দিয়ে হচ্ছে, দেশের মানুষের উপর দিয়ে হচ্ছে, আমার স্বামীর উপর যে জুলুম করা হচ্ছে, এর শেষ একদন হবে, হতেই হবে।  
অন্যায় করার জন্যে কেউ চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত পেতে পারে না।  
আমি আমার কাজ করে যাব নিঃশব্দে।  
আমি পথের কাঁটা সরিয়ে যাব - এর পর যারা আসবেন কাঁটা না ফোটে তাদের পায়ে, তারা যেন কণ্টকবিদ্ধ পদে পিছিয়ে না পড়ে।  
ওইটুকু আমি করবো আমার যতটুকু শক্তি আছে তা দিয়ে।  
আওয়ামী লীগ আর ছাত্রলীগ কর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা, আমার স্বামীর নির্দেশ তাদের অবগত করা 
আমার কাজ।
দল আর পরিবার সামলানো, তার সঙ্গে মামলা মোকাবেলা করা, বন্দিদের মুক্তির জন্যে আন্দোলনে আমার স্বামীর দিকনির্দেশনা মতো সোমকিছুর সমন্বয় করা --এসব কিছু আমাকেই দেখতে হচ্ছে। 
আর কে দেখবে। 
অনেকে জেলবন্দী, অনেকে পলাতক।  
আইয়ুব খানের রক্তচক্ষুর ভয়ে অনেকে চুপসে গেছে। 
আবার সুদিন আসলে এদের অনেকে সামনের সারির জায়গা দখলে নিবে। 
আমি জেনেও জন্য না, বুঝেও বুঝবো না, কিছু বলবো না।  
আর আমার না´স্বামী সকলের নেতা, উনি তো দয়ার সাগরের সবাইকে আপন করে নিবেন। 
রবি ঠাকুরের গানের মতো উনার চলার গতি।  
যদি উনার ডাক শুনে কেউ না আসে তবে তিনি একলা চলেন, উনার চলন দেখে সবাই এসে যায়, এই হলো উনার কারিশমা। 
সম্মোহনী ক্ষমতার অধিকারী একজন মানুষ তিনি। 
সকলের আশ্রয়, সেদেশের মানুষের আশা ভরসার প্রতীক তিনি।
নেতৃবৃন্দকে আইয়ুব সরকার জেলে ঢুকালো। 
আমার স্বামী যেখানেই বক্তৃতা করেন তারপর গ্রেফতার করে জেলে ঢুকিয়ে দেয়। 
তাঁকে জেল থেকে বের করে নিয়ে আসি।  
আবার জনসভায় বক্তৃতা করেন, গ্রেফতার হন। 
এরকম চলছে।  

তবে ছয় দফা নিয়ে সরকার ভয়ে আছে।  
ছয় দফা আইয়ুব সরকারের এমন দফা রফা করে দিয়েছে একদম ভিত নড়ে গেছে। 
আমার আমার স্বামীকে আগেই বলেছি তোমাকে এমন এক মামলায় ফাঁসিয়ে দিবে এরপরে যাতে সহজে বের হতে না পারো, যাতে পার পেতে না পারো। 
ভয় পেয়ো না।  
তুমি তোমার লক্ষ্য থেকে সরে এস না।  
ঠিক তাই।  
আমার কথাই ঠিক হলো।  
উনাকে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার এক নম্বর আসামি করা হলো। 
এখন তিনি ক্যান্টনমেন্টের অফিসার্স নেসের একটি কক্ষে বন্দী করে রেখেছে। 
যেখানে কোনো বাতাস ঢুকে না. 
কেবল একটি বাল্ব জ্বলে। 
সর্বক্ষণ সৈন্যরা পাহারায় থাকে। 
প্রথম তিন মাস পর এসব খবর পেলাম। 
এর আগে তো জানতেই পারিনি তিনি কোথায় আছেন?
ব্রেঞ্চে আছেন কিনা?
কত গুজব আকাশে বাতাসে। 
যখন সেনাবাহিনীর লোকজন আমাকে জিজ্ঞাসাবাদ করতে এলো তখন বুঝে গেলাম তিনি তাদের হেফাজতে আছেন। 
তারা আমার কাছ থেকে তাদের সুবিধা মতো কোনো উত্তর না পেয়ে আমাকেও গ্রেফতার করে ক্যান্টনমেন্টে নিয়ে যাবার হুমকি দিয়ে গেলো। 
আমার স্বামী শেখ মুজিবুর রহমান যেমন ভয় পাবার মানুষ না।  
তাঁর স্ত্রী শেখ ফজিলাতুন্নেসা মুজিবও ভয় পাবার মত মানুষ না।  
এটা ওদেরকে বুঝতে হবে।  

উনারা আমার মেয়ে হাসিনাকে বলে কিনা, 'তুমি কেমন সন্তান যে পিতাকে রাজি হতে দিলে না। তোমার মাকে কি বিধবার বেশে দেখতে চাও?
আমার মেয়েও উনাদেরকে ঠাসাঠাসি বলে দিয়েছে, 'আমার মাকে বিধবার বেশে দেখতে পারবো, কিন্তু আমার বাবা বাংলার মানুষের সঙ্গে বেইমানী করতে পারবেন না। '
আমার কথাই ঠিক হলো।  
আমার স্বামীর শর্ত মত মামলা প্রত্যাহার করে সবাইকে মুক্তি দিলো। 
আমার স্বামী আজ মুক্তি পেলো। 
সব নেতা মুক্তি পেলো।  

২৩ ফেব্রুয়ারি ১৯৬৯।
ছাত্রজনতার বিপুল সম্বর্ধনায় আমার স্বামীকে বঙ্গবন্ধু উপাধি দেয়া হলো. 
এরপর এই উপাধি নিয়ে তিনি সরকারের সঙ্গে গোল টেবিল বৈঠকে যোগ দিলেন। 
এরপর এখন?
সেই লৌহমানব আইয়ুব খান তো লাপাত্তা, তিনি পদত্যাগ করে পালালেন। 
সত্যের জয় হবেই। 

গান তো আছেই ---

আমরা করবো জয় একদিন
(এই গানটি বাজতে থাকবে। )

জেনারেল আইয়ুব গেলেন। 
জেনেরাল ইয়াহিয়া এলেন।
জাতীয় নির্বাচনের ঘোষণা। 
আমি জানি আমার স্বামী এদেশের মানুষের মুক্তির সংগ্রামের প্রতীক হয়ে উঠছেন। 
তাঁর দোল আওয়ামী লীগ নির্বাচনে জিতে যাবে। 
মানুষটা সুষ্ঠ থাকলে হয় সৃষ্টিকর্তার রহমতে আর এদেশের মানুষের ভালোবাসায়। 
১৯৬৬ সালের মে মাস থেকে আমার স্বামী শেখ মুজিবুর রহমান স্থায়ীভাবে জেলে বন্দী।  
এরপর হলে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার একনম্বর আসামী।  
আত্মীয়-পরিজন, রাজনৈতিক সহযোগী, ছাত্র শ্রমিকরা ধরেই নিয়েছে এবার বুঝি শেখ সাহেব মুক্তি পাবে না। 
তাঁর জবন শেষ।  
পরিবার শেষ হয়ে যাবে।  
তার রাজনীতি খতম হয়ে যাবে।  
কিন্তু আমি শেখ ফজিলাতুন্নেসা হাল ছাড়ার মানুষ না।  
তোমাদের আশংকা ভুল প্রমাণিত হবে।  
আমার সহায়ক শক্তি তরুণ ছ্যাট্রনেতারা, ওরাই স্ফুলিঙ্গের মতো জ্বলে উঠবে।
সেই প্রত্যযে আমি ওদের প্রত্যয়ী করে তুলবো।  
শেখ সাহেব মুক্ত হবেন।  
তার রাজনীতি খতম হবে না।  
তিনিও টিকে থাকবেন।  
তার পরিবারও ধ্বংস হবে না।  

১৯৬৭ সালে অনেক ভেবেচিন্তে  হাসিনার বিয়ে দিলাম ওয়াজেদ মিয়ার সঙ্গে --- মেধাবী ছেলে, 
ছাত্রলীগ থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ফজলুল হক হলের ছাত্র সংসদের  ভিপি নির্বাচিত হয়েছিল। 
১৯৬৯, ৭ই জুনের হরতাল সফল করতেই হবে। 
এজন্যে আমাদের অনেক কৌশল করে আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে।  বাসা থেকে বের হই, আত্মীয়দের বাসায় যাই।  
ওখানে গিয়ে পোশাক পাল্টে স্পঞ্জের স্যান্ডেল আর বোরখা পরে বের হতে হবে।  
টিকটিকিদের চোখ ফাঁকি দিতে হবে।  
ছয় দফা এখন মানুষ বুঝে গেছে। 
এর থেকে মানুষকে আর বিভ্রান্ত করা যাবে না। 
কোন ক্ষমতা নাই ছয়দফা থেকে এদেশের মানুষকে সরাতে পারে। 
এখন এই ছয় দফাকে এক দফায় নিতে হবে।  
এই এক দফা হলো সকল শেখ মুজিবুর রহমানসহ সকল রাজবন্দীর নিঃশর্ত মুক্তি। 
দেরকে মুক্তি দিতেই হবে। 
মুক্তি এরা পাবেনই। 
যে গণজোয়ার, এই জোয়ারে সবকিছু ভেসে যাবে। 
রাজবন্দীদের মুক্তির পর দাবি হবে একটাই এদেশের মানুষের মুক্তি।  
আর কেউ মানুক আর না মানুক, এদেশের মুক্তি হবেই। 
আমাকে গ্রেফতারের হুমকি দিয়ে লাভ নাই। 
আমার স্বামী শেখ মুজিবুর রহমানকে মুক্ত করবই সেই সঙ্গে বাকিরাও মুক্ত হবে। 
ক্ষমতায় আজ যারা আছে তাদের কি বস্তা হয় সেটাই দেখবো। 
অন্যায় কখনো চিরস্থায়ী হতে পারে না। 
মানুষের দোআ, দাবি ক্ষোভের মুখে সামরিক জনতা টিকতে পারবে না।  
এদেশের মানুষের মুক্তি আসবেই। 
ভয় আমি পাই না।  
আমি আমার চেষ্টা থেকে সরেও আসবো না।  
গ্রেফতার করবে তো, গ্রেফতার করুক, 
মেয়ে ফেলবে, মেরে ফেলুক, তবু নীতি থেকে সরে আসবো না।
এদেশের মানুষে ভালবাসার সঙ্গে বেইমানি আমার স্বামী শেখ মুজিবুর রহমান করেনি, করতে পারে না, বেঈমানি আমিও করবো না।  
আমি আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা পরিচালনার জন্যে প্রবাসী শুভাকাঙ্খী বাঙালিদের সহযোগিতায় লন্ডন থেকে আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন আইনজীবী স্যার টমাস উইলিয়ামকে নিয়ে এসেছি। 
আমলাও লড়বো। 
আন্দোলনও চালাবো। 
অন্যায়ের শেষ দেখে ছাড়বো।
আমার কোথায় ঠিক হলো।  
আমি ১৭ ফেব্রুয়ারি রাওয়ালপিন্ডিতে পেরোলে মুক্তি নিয়ে




http://www.shomoyeralo.com/ad/Google-News.jpg

সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত


ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: কমলেশ রায়, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড
এর পক্ষে প্রকাশক গাজী আহমেদ উল্লাহ
নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।

ফোন : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৭৫। ই-মেইল : shomoyeralo@gmail.com