ই-পেপার বিজ্ঞাপনের তালিকা বৃহস্পতিবার ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২২ ১৪ আশ্বিন ১৪২৯
ই-পেপার বৃহস্পতিবার ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২২
http://www.shomoyeralo.com/ad/Amin Mohammad City (Online AD).jpg

http://www.shomoyeralo.com/ad/Untitled-1.jpg
আক্রান্ত সাহিত্য স্রষ্টারা
উদয় শংকর দুর্জয়
প্রকাশ: শুক্রবার, ১৯ আগস্ট, ২০২২, ৫:২১ পিএম | অনলাইন সংস্করণ  Count : 293

রুশদিকে আমি প্রথম দেখি ২০১৯ সালের অক্টোবর মাসে, ন্যাশনাল ম্যানবুকার পুরস্কারের শর্ট লিস্টেড ছয় লেখককে নিয়ে লন্ডনের সাউথ ব্যাংক সেন্টারে অনুষ্ঠিত প্রোগ্রামে। এই প্রোগ্রামটা সাধারণত পুরস্কার বিজয়ী ঘোষণার এক বা দুদিন আগে হয়ে থাকে। কয়েক হাজার শ্রোতা-দর্শকের এই অডিটোরিয়ামে, রুশদির একই মঞ্চে বসে আছেন কানাডিয়ান লেখক মার্গারেট অ্যাটউড, তার্কিশ লেখক এলিফ সাফাক, বিটেনের লেখক বার্নারডিন এভারিস্টো, নাইজেরিয়ান লেখক চিগোজি ওবিওমা এবং অ্যামেরিকান লেখক লুচি এলম্যান। সেবার রুশদি ডায়াসে দাঁড়িয়ে হাস্যোজ্জ্বল মুখে তার বই ‘ছঁরপযড়ঃঃব’ নিয়ে বলে  যাচ্ছেন আর শ্রোতারা মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুনছেন। তার সেই উজ্জ্বল হাসি আমার মনের মধ্যে আজও ভীষণ রকম মিশে আছে।
 
গত সপ্তাহে মিডনাইট’স চিলড্রেনের সেই লেখক সালমান রুশদির ওপর আক্রমণ করে তাকে ছুরিকাঘাত করার সংবাদটি যেন আবার পুরনো ক্ষতকে জাগিয়ে দিল। রুশদি যখন স্যাটানিক ভার্সেস লিখে সারা পৃথিবীতে সাড়া ফেলে দেন তখন রাতারাতি তার মাথার দাম ঘোষণা করা হয়। মুক্তচিন্তা তখন হুমকির সামনে দাঁড়িয়ে। যুক্তিবাদীদের চিন্তার বিরুদ্ধে এই শ্বাসরুদ্ধকারীদের কঠোর অবস্থান নতুন কিছু নয়। যুগ যুগ ধরে ধাবমান বিশ্বাসের কোনোটি সত্য আর কোনোটি সত্য নয়, যেহেতু তার কোনো অকাট্য রেফারেন্স নেই তখন তা অবশ্যই বিশ্বাসের ওপর টিকে আছে। সেই বিশ্বাসকে টিকিয়ে রাখতে গিয়ে বেপরোয়া কিছু মানুষ আরও প্রকাণ্ড হিংস্র হয়ে ওঠে। স্যাটানিক ভার্সেস প্রকাশের পরবর্তী বছর অর্থাৎ ১৯৮৯ সালে ইরানের ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ খোমেনি রুশদির বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ড জারি করে একটি ফতোয়া দেন। ইরানসহ সারা বিশ্বে তখন এই বইয়ের বিরুদ্ধে তথা রুশদির বিরুদ্ধে একদল উগ্রবাদী মানুষ রোষানলে ফেটে পড়ে। শুধু যে রুশদি এই উগ্রবাদীদের আক্রমণের শিকার তা শুধু নয়; পৃিথবীর বহু লেখক যারা প্রথাবিরোধী তারা বারবার মানসিক এবং শারীরিকভাবেক্ষক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। এমনকি খুনিদের হাতও এড়াতে পারেননি। সম্প্রতি রুশদি উগ্রবাদী আক্রমণের শিকার হওয়ার পর হ্যারিপটারের স্রষ্টা জে কে রোলিং, রুশদির ওপর সহমর্মিতা দেখিয়ে যে টুইটার বার্তা দেন তার পরিপ্রেক্ষিতে তিনি মীর আসিফ আজিজ নামের এক যুবকের কাছ থেকে সরাসরি মৃত্যুর হুমকি পান। এ সময়ে একজন লেখকের পক্ষ নিয়ে অন্য লেখকের কথা বলাটাও কঠিন হয়ে পড়ছে। 
মুক্তচিন্তা বা নিজস্ব মতপ্রকাশ বাধা সেই আদিকাল থেকেই। আর ধর্মীয় অনুশাসনের মধ্য দিয়ে মানুষ যখন একটি নতুন অধ্যায়ের কাছে অনুগত হলো তখন থেকে চিন্তা এবং চেতনার একটি গণ্ডি তৈরি হলো। ধর্মীয় জ্ঞানের মর্মমূলে যে কঠিন এবং দুর্ভেদ্য আস্তরণ তৈরি হলো তা থেকে দূরে সরে আসা বা সে মর্মমূলে কেউ আঘাত হানবে তা কিছুতেই ঘটতে দেয়া যায় না। তাই পৃথিবীর সমস্ত কোনায় কোনায় মুক্তচিন্তকদের ওপর ক্ষীপ্র খড়্গ নেমে এসেছে চিরকাল। লেখকদের ওপর হুমকির পাশাপাশি তাদের সৃষ্টিকর্মকে, তাদের দর্শন, তাদের চেতনাকে চিরতরে মুছে ফেলার জন্য বারবার পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে বই, পাঠাগারসহ লেখকদের বাসস্থান পর্যন্ত। আর এই ধ্বংসযজ্ঞের সূচনা হয় ৫৫৩ সালের দিকে। সম্রাট জাস্টিনিয়ান গ্রিক এবং ল্যাটিনদের জন্য বাইবেল নিষিদ্ধ করেন। জাস্টিনিয়ানের আরও বহু পূর্বে স্বাধীন মতপ্রকাশের দায়ে সক্রেটিসকে বিষ পান করিয়ে হত্যা করা হয়।
 
রক্ষণশীল সমাজ শুধু এখানেই থেমে থাকেনি, ১২৪৪ সালের দিকে ইহুদিদের ধর্মীয় বই ‘তালমুদ’ পুড়িয়ে দেয় হয়। ‘ডেকামেরন’ নামের একটি গল্পগ্রন্থ ১৩৫৩ সালে নিষিদ্ধ হয়। প্রকাশ হওয়ার পর ১৯২৭ সাল থেকে ১৯৩৬ সাল পর্যন্ত অস্ট্রেলিয়াতে নিষিদ্ধই থেকে যায়। ১৯২৮ সালে ডি হেয়িস লরেন্সের উপন্যাস ‘লেডি চ্যাটারলিজ লাভার’ উপন্যাসটি প্রকাশ হলেও ১৯৬৫ সাল পর্যন্ত পাঠকদের পড়তে দেওয়া হয় না, যৌনতার দায়ে নিষিদ্ধ করা হয়। এর ধারা একবিংশ শতাব্দীতে এসেও প্রবহমান। ২০২০ সালে, জেসিকা টেইলর (ফরেনসিক এবং ক্রিমিন্যাল সাইকোলজি বিভাগের সিনিয়র লেকচারার) যখন তার বই ‘হোয়াই উইমেন আর বে ইমড ফর এভরিথিং’ প্রকাশ পায় তখন একদল কট্টরপন্থি তাকে ধর্ষণ এবং খুনের হুমকি দিতে শুরু করে। তার ব্যক্তিগত কম্পিউটার হ্যাক করে নেয়। মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পুলিশের শরণাপন্ন হতে হয় তাকে। তার ফেসবুক পেজ দুই হাজার ফলোয়ারের অ্যাকাউন্ট ব্লক্ড করে দেওয়া হয়। তার্কিশ ঔপন্যাসিক এলিফ সাফাক, ২০১৯ সালে সরকারের রোষানলে পড়েন এবং সে দেশের মিনিস্ট্রি অব কালচার অ্যান্ড ট্যুরিজম, শিশু যৌন হেনস্তা বিষয়ক লেখালেখির জন্য তার বিরুদ্ধে কেস ফাইল করে এবং তাকে বিচারের আওতায় আনা হয়। 

পাশ্চাত্যে বহু লেখক বহুভাবে নির্যাতিত, নিগৃহীত হয়েছেন, এমনকি মৃত্যুবরণ করেছেন। তাদের বই নিষিদ্ধ হয়েছে, বাড়ি-ঘর জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছে। সিগমন্ড ফ্রয়েডের পাঠাগার পুড়িয়ে দেওয়ার পর তিনি ইংল্যান্ডে এসে আশ্রয় নেন এবং মৃত্যুর আগ পর্যন্ত এখানেই থেকে যান। ‘টু কিল এ মোকিং বার্ড’ প্রকাশ হয় আমেরিকার সিভিল রাইটস মুভমেন্টের আগমুহূর্তে, যা সুশীল সমাজের কাছে সমালোচিত হয়ে ওঠে এবং হারপার লীর এই বইটি নিষিদ্ধ তালিকার অন্তর্ভুক্ত হয়ে যায়। টনি মরিসনের ‘বই দ্য ব্লুইস্ট আই’ আমেরিকার নিষিদ্ধ বইয়ের তালিকায় দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে, পর্নোগ্রাফিক ভাষার আখ্যা দিয়ে তার মুক্তচিন্তাকে বারবার রুখে দেওয়া হয়েছে। রুখে দেওয়া হয়েছে তার ‘সং অব সলোমোন’-এর মতো বইও। ১৯৫৩ সাল থেকে ১৯৮৮ সাল পর্যন্ত আয়ারল্যান্ড থেকে শুরু করে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে নিষিদ্ধ এবং বাজেয়াপ্তও করা হয়েছে জন স্টেইনবেকের বই ‘অফ মাইস অ্যান্ড মে’। সুশীল রক্ষণশীল সমাজের নজর থেকে বাদ পড়েনি আফ্রিকান লেখক চিনুয়া আচেবের বই ‘থিংক্স ফল অ্যাপার্ট’। 
মিসরের লেখক আহমেদ নাজির প্রথম উপন্যাস ‘ইউজিং লাইফ’ যখন প্রকাশ হয় তখন সমালোচনার ঝড় ওঠে। তার উপন্যাসে সেক্স, ড্রাগস এবং খুন-খারাবি যতসব অনৈতিক কর্মকাণ্ড উঠে এসেছে। মিসরীয় সংস্কৃতির মুখে এসব সামাজিক অবক্ষয়ের বিষয় রাজনীতিবিদের ব্যর্থতার পরিচয় হয়ে ওঠে, যা রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে সাড়া ফেলে দেয়। মিসরীয় কোর্ট তাকে দুই বছর কারাবাসের আদেশ জারি করে। আরেকজন মিসরীয় কবি এবং গীতিকার জালাল এল-বেহায়রি গান লিখে পুলিশের কাছে গ্রেফতার হন এবং নির্যাতনের শিকার হন। রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের আগে নির্বাসিত বিপ্লবী গায়ক রামি এসামকে নিয়ে তিনি যে গান লিখে মানুষের মাঝে সাড়া ফেলে দেন, তা শাসকগোষ্ঠীকে রীতিমতো থাপ্পড় মারার মতো। আর এ কারণে তাকে কারাভোগ করতে হয়। সিরিয়ার কবি ফারাজ আহমেদ বার্কদার তিনবার পুলিশের হাতে গ্রেফতার হন। ১৯৯৩ সালের কোর্ট তাকে তেরো বছর জেলে থাকার নির্দেশ দেয়। জেলে বসে লেখেন ‘এ ডাব উইথ উইংস আউটস্প্রেড’-এর মতো কাব্যগ্রন্থ। তেরো বছর জেলে থাকতে হয়নি শেষ পর্যন্ত, ২০০০ সালে মুক্তি পেয়ে সুইডেন চলে আসেন সারা জীবনের জন্য। সৌদি আরবের কবি আশরাফ ফায়াদের কথা অনেকেরই জানা। তার কাব্যগ্রন্থ ‘ইন্সট্রাকসন্স উইদিন’-এ নাকি নাস্তিকবাদী কবিতা রয়েছে, যা নবী মোহাম্মদকে অসম্মান করে লেখা এবং সম্পূর্ণ কোরআনবহির্ভূত। ২০১৫ সালে মৃত্যুদণ্ডের আদেশ জারি হয় কিন্তু শেষ মুহূর্তে আপিল করে ফাঁসির হাত থেকে রেহাই পেলেও আট বছরের জেল আর আটশ চাবুকের আঘাত মেনে নিতে হয় ফায়াদকে। কাতারের কবি মোহাম্মদ আল-আজামলকে  লেখার  কারণে যাবজ্জীবন কারাভোগের আদেশ  দেওয়া হয়। পরবর্তী সময়ে ক্ষমা প্রার্থনা করার মাধ্যমে সাজার মেয়াদ পাঁচ বছর করা হয়। ‘দ্য মেটামরফোসিসে’র লেখক ফ্রান্ৎস কাফকার সকল বই দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধের সময় রাশিয়াতে নিষিদ্ধ এবং জার্মানিতে নাৎসি পার্টিরাও কাফকার বই বিক্রি বন্ধ করে দেয়। তিনি নিজ দেশ চেকোস্লোভাকিয়াতেও তার বিরুদ্ধে কঠোর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়, কারণ তিনি চেক ভাষায় লিখতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন। তবু কাফকা সৃষ্টি করেছেন সাহিত্যের অসামান্য কিছু দিক, যা আজও বহুল পঠিত।
 
এমন সংখ্যক কবি-সাহিত্যিক, মুক্তচিন্তক পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে আছেন, যারা প্রতিনিয়ত হুমকির সম্মুখীন হচ্ছেন, তবু তারা লিখে যাচ্ছেন। নিজের দেশ থেকে নির্বাসিত হচ্ছেন, তবু থেমে থাকছেন না। তাদের এই যুক্তিবাদী চিন্তার কাছে হেরে গিয়ে অনেকেই তাদেরকে খুন করতে দ্বিধাবোধ করছে না। কিন্তু এভাবে কি সব থামিয়ে দেওয়া যায়! বিষ পান করিয়ে যেমন সক্রেটিসের দর্শনকে নষ্ট করা যায়নি, তেমনি কোনো লেখকের ওপর আক্রমণ করলেও তার চিন্তা সেখানে থেমে যাবে না, বরং সে আরও বেসি অনুসন্ধিৎসু হয়ে উঠবে।




http://www.shomoyeralo.com/ad/Google-News.jpg

সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত


ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: কমলেশ রায়, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড
এর পক্ষে প্রকাশক গাজী আহমেদ উল্লাহ
নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।

ফোন : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৭৫। ই-মেইল : shomoyeralo@gmail.com