ই-পেপার বিজ্ঞাপনের তালিকা বৃহস্পতিবার ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২২ ১৪ আশ্বিন ১৪২৯
ই-পেপার বৃহস্পতিবার ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২২
http://www.shomoyeralo.com/ad/Amin Mohammad City (Online AD).jpg

http://www.shomoyeralo.com/ad/Untitled-1.jpg
অচলায়তন ভাঙা আঙুল
রাকিবুল রকি
প্রকাশ: শুক্রবার, ১৯ আগস্ট, ২০২২, ৫:২৬ পিএম | অনলাইন সংস্করণ  Count : 114

কিছুটা এগিয়ে যেতেই পেছন থেকে কেউ একজন লাঠি দিয়ে সজোরে আঘাত করল নজরুলের মাথায়। আকস্মিক আক্রমণে নজরুল হকচকিয়ে গেল।
কেউ একজন বলল, দীলিপ রায়ের টেকো মাথাটা ফাটাতে পারিনি, তোর ঝাঁকড়া চুলের মাথাটা এবার ফাটাব। নজরুল ফিরছিল রানু সোমকে (প্রতিভা বসু) গান শিখিয়ে। সেদিন কিছুটা রাত বেশি হয়ে গিয়েছিল। সেবার ঢাকায় যাওয়ার পর কাজী নজরুল ইসলাম রানুকে গান শেখানোর জন্য সময়ে-অসময়ে তাদের বাড়িতে গিয়ে পড়ে থাকতেন। সনাতন ধর্মাবলম্বী বাড়িতে মুসলমান যুবকের এহেন যাতায়াত আশপাশের ওই যুবকদের পছন্দ হয়নি। তারা সুযোগের অপেক্ষায় ছিল। সেদিন রাত কিছুটা বেশি হয়ে গেলে, সেই সুযোগই নিয়েছিল তারা।
 
নজরুল প্রথমে কিছুটা হকচকিয়ে গেলেও সেটা সঙ্গে সঙ্গেই সামলে নেন। একজন যুবকের কাছ থেকে লাঠি কেড়ে নিয়ে পাল্টা প্রতিরোধ গড়েন। নিজের মার খান ঠিকই কিন্তু দশ-বারো জনের দলকে ভাগিয়ে দিতে তাকে বেগ পেতে হয়নি। সময়টা ছিল ১৯২৮ সালের ২৪ জুন । 

নজরুল তখন ২৯ বছরের টগবগে যুবক। যুদ্ধফেরত। নানা কায়দা-কানুন জানা লোক। ফলে দশ-বারো জন যুবকও তার সঙ্গে লেগে পারেনি। কিন্তু সবাই নজরুলের মতো এমন ডাকাবুকো নয়। অন্ধকারের সুযোগ নিয়ে নজরুলকে এইসব প্রতিক্রিয়াশীল যুবকের দল কাবু করতে না পারলেও বুদ্ধি মুক্তির আন্দোলনের অন্যতম প্রবক্তা আবুল হুসেনকে ঠিকই প্রকাশ্যে জনসমক্ষে নাকে খত দিতে হয়েছিল। তার অপরাধ? অপরাধ ছিল তার কথাবার্তা নাকি শরিয়তের সঙ্গে সাংঘর্ষিক, ফলে তাকে এই শাস্তি মেনে নিতে হয়েছিল। প্রকাশ্যে। সাধারণ মানুষ তাকিয়ে তাকিয়ে এ ঘটনা প্রত্যক্ষ করেছে। কিছু বলেনি। তাদেরও মনে হয়েছিল, উচিত বিচার হয়েছে। লোকটির বড় বাড় বেড়েছিল। 
চিন্তার স্বাধীনতা, বুদ্ধির মুক্তি প্রতিক্রিয়া সমাজ মেনে নিতে চায় না। তাই তো কাজী নজরুল ইসলাম সখেদে বলেছিলেন,
‘বিশ্যষখন এগিয়ে চলেছে, আমরা তখনও বসে
বিবি তালাকের ফতোয়া খুঁজেছি ফিকাহ ও হাদিস চষে।’
গত শতকে বলা কথাগুলো এখনও একইভাবে প্রাসঙ্গিক। প্রসঙ্গত বলা যায়, হিন্দুরা সেদিন নজরুলের ওপর আক্রমণ করেছিল তার কর্মকাণ্ডের জন্য। আর মুসলমানেরা নজরুলকে কাফের উপাধি দিয়েছিল তার লেখার জন্য। অথচ সেই নজরুলের গজল না বললে অনেক ধর্মীয় অনুষ্ঠান পূর্ণতা পায় না, নজরুলের গান ছাড়া আজ আমরা রমজানের ঈদের কথা ভাবতে পারি না।
লেখক, সাহিত্যিকদের সমাজে আপাতত দৃষ্টিতে নিরীহ, গোবেচারা হিসেবে কল্পনা করা হয়। আদতে লেখা ছাড়া, নিজেদের বক্তব্য প্রকাশ ব্যতীত তাদের কোনো কাজ নেই। কোনো অস্ত্র নেই। ঢাল নেই। তবে তাদের লেখা, বক্তব্যকেই যত ভয় প্রতিক্রিয়াশীল সমাজের। চোখের কাঁটা এইসব লেখা, বক্তব্য। ফলে কখনও রাষ্ট্রের কাছ থেকে, কখনও সমাজের কাছ থেকে, কখনও বা গোষ্ঠীর কাছ থেকে আসা নির্মম আঘাত লেখকদের, শিল্পীদের সহ্য করতে হয়েছে।
রাজবাড়ির পাংশায় একসঙ্গে ২৮ বাউলদের চুল-দাড়ি কেটে ফেলা হয়েছিল, খুব বেশি বছর আগের কথা নয় তা। হয়তো অনেকেরই তা মনে আছে। সেদিন দূর-দূরান্ত থেকে বাউলেরা মোহাম্মদ ফকিরের বাড়িতে আমন্ত্রিত হয়ে এসেছিলেন। এলাকার প্রভাবশালী ব্যক্তিরা তাদের ধরে নিয়ে দা-কাঁচি দিয়ে চুল-দাড়ি কেটে ফেলা হয়। তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ, তারা ধর্মচ্যুত হয়ে গেছে। অথচ বাউলদের ঐতিহ্য এই দেশে সুপ্রাচীন।
প্রকৃতপক্ষে কতিপয় ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর স্বার্থ হাসিলের জন্য চলে এইসব হীন কর্মকাণ্ড। ধর্মের ট্যাগ লাগিয়ে, সাধারণ মানুষের ধর্মানুভূতিকে ব্যবহার করে স্বার্থান্ধরা এই কর্মকাণ্ড সম্পন্ন করে। 
ফলে ২০১৪ সালে বিশ^বিদ্যালয় থেকে ক্লাস নিয়ে বাড়িতে ফেরার সময় চাপাতির আঘাতে প্রাণ দিতে হয় রাজশাহী বিশ^বিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক শফিউল আলমকে। তার অপরাধ, তিনি ছিলেন লালন ভাবধারায় বিশ্বাসী মানুষ। 
চাপাতির কথা যখন উঠল, তখন ফিরে যাই আরও বছর দশেক আগে। ২০০৪ সালে। তারিখটি ছিল ২৭ ফেব্রুয়ারি। মনে পড়ে?
রাতে বইমেলা শেষে হেঁটে হেঁটে হুমায়ুন আজাদ বাড়ি ফিরছিলেন। রাত তখন সোয়া ৯টা। বাংলা একাডেমি এবং টিএসসির মাঝামাঝি এলে আততায়ীরা হুমায়ুন আজাদের ওপরে হামলা করে। প্রথমে তারা হুমায়ুন আজাদকে ঘেরাও করে ফেলে। তারপর ব্যাগ থেকে ছুরি-চাপাতি বের করে হুমায়ুন আজাদের মুখ, ঘাড়, মাথা, গলা, হাতসহ শরীরের বিভিন্ন স্থানে উপর্যুপরি আঘাত করে। দুজন বোমা বিস্ফোরণ করে এলাকায় আতঙ্ক সৃষ্টি করে। তারপর ঘাতকের দল সাধারণ মানুষের সঙ্গে মিশে যায়। সেই যাত্রায় হুমায়ুন আজাদ মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে আসেন। তবে কয়েক মাস পরেই তিনি জার্মানিতে মারা যান। এই আক্রমণের কারণ কী? হুমায়ুন আজাদ ছিলেন নির্ভীক। সত্যভাষী। প্রথাবিরোধী। সমাজের, ধর্মের অনেক অচলায়তনের বিরুদ্ধেই তিনি আঙুল তুলেছিলেন। ফলে হয়ে উঠেছিলেন অনেকেরই চক্ষুশূলÑ বিশেষ করে ধর্মান্ধ, স্বাধীনতাবিরোধী শক্তির।
তার ওপর ২০০৪ সালের বইমেলায় হুমায়ুন আজাদের ‘পাক সার জমিন সাদ বাদ’ উপন্যাস প্রকাশ হয়। বই আকারে প্রকাশ হওয়ার আগে অবশ্য উপন্যাসটি একটি পত্রিকার ঈদসংখ্যায় পত্রস্থ হয়। এই উপন্যাসে হুমায়ুন আজাদ ধর্মব্যবসায়ীদের ভীষণ রূঢ়ভাবে আক্রমণ করেন। ফলে ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে ধর্মান্ধ-জঙ্গিরা। এক জঙ্গি লিডার হুমায়ুন আজাদকে হত্যার নির্দেশ দেন। তারই ফলে হুমায়ুন আজাদের ওপর এই আক্রমণ। হুমায়ুন আজাদ বিদেশ থেকে উন্নত চিকিৎসা নিয়ে কিছুটা সুস্থ হয়ে দেশে ফেরার পর এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, তার আততায়ীদের তিনি শুধু একবার দেখতে চান। মুখোমুখি বসিয়ে তাদের চা পান করাতে চান। এই মানবিকতা একজন লেখক ছাড়া আর কে দেখাতে পারেন?
হুমায়ুন আজাদের মতো বইমেলা থেকে ফেরার সময় জঙ্গিদের হামলায় আক্রান্ত হন প্রবাসী লেখক অভিজিৎ রায় এবং তিনি মারা যান। 
ফয়জুর রহমান নামে এক যুবক এর ফলে স্বপ্রণোদিত হয়ে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে মুহম্মদ জাফর ইকবালকে ছুরিকাঘাত করেন। তবে ফয়জুর রহমান সেখান থেকে পালিয়ে যেতে পারেনি। শিক্ষার্থীদের হাতে ধরা পড়ে। তার চেয়ে বেশি আশ্চর্যের বিষয় হলো, যে ফয়জুর রহমান নিশ্চিত মৃত্যু জেনেও মুহম্মদ জাফর ইকবালকে হত্যা করতে গিয়েছিল, সে কিন্তু উপন্যাসটি পাঠ করেনি। বিভিন্ন মাধ্যমে এই ধরনের কথা শুনে তার মনে ধারণা জন্মে মুহম্মদ জাফর ইকবাল নবীকে ব্যঙ্গ করেছেন, তাই সে নিজের মৃত্যু একপ্রকার নিশ্চিত জেনেও এই কিলিং মিশনে অংশগ্রহণ করে। নিশ্চিত মৃত্যুর কথা বললাম এইজন্য গণপিটুনিতে সেদিন তার প্রাণ নাশ হওয়া অসম্ভব কিছু ছিল না। 
সাধারণ মানুষদের ধর্মানুভূতিকে ব্যবহার করে তাদের ধর্মান্ধ করে তোলা হয় কতিপয় ধর্মব্যবসায়ী, স্বাধীনতাবিরোধীদের হাত শক্তিশালী করে তোলার উদ্দেশ্যে। ব্যক্তিগত স্বার্থ চরিতার্থ করার উদ্দেশ্যে। কারণ ধর্ম হচ্ছে একজন মানুষের ভীষণ সংবেদনশীল অনুভূতির জায়গা। এই জায়গা ব্যবহার করে তাকে খুব সহজেই প্রভাবিত করা যায়। সমস্যা হলো, আমরা ভুলে যাই, বাকস্বাধীনতা মানেই যা খুশি তা বলে কারও অনুভূতিকে আঘাত করা নয়, তেমনি ধর্মবিরোধী হলেই তাকে হত্যা করতে হবে, সেটিও ধর্মের শিক্ষা নয়, সৌন্দর্য নয়। ধর্ম শেখায় সহনশীলতা। ক্ষমা। উদারতাশ- এই কথা বিস্মৃত হলে চলবে না। কিন্তু তারপরও ধর্মের নামে কেউ কেউ অশান্তি সৃষ্টি করার পাঁয়তারা করেই চলেছে। আরেকটি ঘটনার উল্লেখ করে এ লেখা শেষ করছি। ১৯৯৯ সালের ১৮ জানুয়ারি। কবি শামসুর রাহমানকে শ্যামলীর বাসভবনে খুন করতে গিয়েছিল কতিপয় ঘাতক। দুর্বৃত্তের দল ধারালো অস্ত্র দিয়ে তাকে আঘাত করে। কবি জখম হন। তবে সেই যাত্রায় বেঁচে যান কবি। এই ঘটনার পর ইত্তেফাককে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে কবি বলেন, ‘আমি শান্তিপ্রিয় মানুষ। শান্তিতে থাকিতে চাই। যাহারা ধর্মের নামে অশান্তি সৃষ্টি করিতে চায় মানুষ কি তাদের ক্ষমা করিবে?’




http://www.shomoyeralo.com/ad/Google-News.jpg

সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত


ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: কমলেশ রায়, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড
এর পক্ষে প্রকাশক গাজী আহমেদ উল্লাহ
নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।

ফোন : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৭৫। ই-মেইল : shomoyeralo@gmail.com