ই-পেপার বিজ্ঞাপনের তালিকা মঙ্গলবার ৬ ডিসেম্বর ২০২২ ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৯
ই-পেপার মঙ্গলবার ৬ ডিসেম্বর ২০২২
https://www.shomoyeralo.com/ad/Amin Mohammad City (Online AD).jpg

গল্প: প্রত্যাবর্তন
তাহমিনা কোরাইশী
প্রকাশ: শুক্রবার, ১৬ সেপ্টেম্বর, ২০২২, ১:৪১ পিএম | অনলাইন সংস্করণ  Count : 134

বহু বছর পর নিজের শহরে পা রেখেছে সুমিত। সকালের অপেক্ষায় সময় হিসাব করে দেখে রাত পোহাতে আর বেশি বাকি নেই। একটু পরেই বেরিয়ে পড়ে হোটেলের রুম থেকে। রিকশা নেয় পদ্মার পারে সেই পাঠানপাড়া ‘মিনহাজ ভিলার’ দিকে যাবে। সবই কেন আজ অজানা-অচেনা লাগে! বদলে গেছে পুরো শহরটাই-ঘরবাড়ি, রাস্তাঘাট। তবুও যেখানে জন্মেছে, যে শহরে শৈশব-কৈশোর কেটেছে তা আর কত অচেনা থাকতে পারে। 

এখানে রয়েছে তার নাড়িপোঁতা। তবে আগে কেন মিনহাজ ভিলায় যেতে মন ছুটেছে? কত কাল পালিয়ে বেরিয়ে কি পড়ল নিজেকে বেঁধে রাখতে। ওই যে একটু দূরেই এখান থেকে দেখা যায় ঝোপঝাড়ে পরিপূর্ণ একতলা একটি পোড়োবাড়ি ‘শুভ্রা মঞ্জিল’, সুমিতের মায়ের নামে।

চারদিকে যেন উৎসবের আমেজ। সুমিত মনে মনে ভাবে, তবে কি শরৎকাল চলছে? প্রকৃতি ঋতুর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয় মহা আনন্দে। নীল আকাশ সাদা মেঘের ভেলা সে তো চিরন্তন। চিরচেনা এক রূপ। শিউলির শুভ্রতায় চারদিক নেয়ে আছে। নদী পাড়ে কাশবন, শিউলি ঝরে পড়ে আছে গাছতলায়। সুবাসিত মিষ্টি মিষ্টি বাতাস কানাকানি করে ফুল পাতাদের সঙ্গে। পাতাদের সংসারে তুমুল আনন্দ।

ওই দূর থেকে ভেসে আসে ঢাকঢোল কাঁসর ঘণ্টাধ্বনি। রিকশা থেকে নেমে কিছুটা হাঁটতে থাকে সুমিত। বাড়িটা কোথায়? সেই জল উথালপাথাল আনন্দে উচ্ছ্বসিত এই পদ্মার পারেই তো ছিল! এ কি মরা পদ্মা! চর পড়ে গেছে কতটা! বেশ অনেকটা দূর চলে গেছে জল। আমারই মতো ওর হাল। ফিরে দেখে বাড়িটা তেমনই আছে।

 জরাজীর্ণতায় বর্ণহীন বার্ধক্যের এক রূপ। সেই ছোট ছোট গাছের বাগান আয়ু বৃদ্ধিতে বয়সি কাঠ বনে পরিণত হয়েছে। গেটের পাশে শিউলি গাছ তার বংশবিস্তার করেছে। সেই পুরনো গাছটার নিচে আরও অনেক গাছে ভরে গেছে। শিউলিতলায় ফুলেদের মেলা বসেছে। শরতের ফুলের সঙ্গে নামের যার মিল সেই শিউলি একলাই থাকে এই বাড়িটিতে। সে কোনো বাঁধনের বলয়ে সম্পর্কের আগড়ে আবদ্ধ নয়। এমনই ছিল দুটি প্রাণের আকুতি আর অঙ্গীকার। শারদীয় দুর্গাপূজায় যেমন ছিল মহাআনন্দ। আমাদের মিলন উৎসব তেমনি ছিল ঈদের চাঁদ দেখার সঙ্গে। ঈদের দিনে যেমন ছিল সেমাই জর্দা পোলাওয়ের মাতানো সুগন্ধী দিন। আনন্দ-ফুর্তিতে ভরপুর সময়। কখনো কোথাও বিন্দুমাত্র মনে হয়নি আমরা কেউ আলাদা। এমনিভাবে ধর্মীয় অনুষ্ঠান হয়ে উঠেছিল সর্বজনীন।

ভাবতে ভাবতে গেট ফেলে সামনে এগোয় সুমিত দৃষ্টি কেড়ে নেয় বৃদ্ধ এক নারী, সে কে? তুমি কি সেই জুলমতের মা? বৃদ্ধা হাঁ করে তাকিয়ে থাকে দুই হাত দিয়ে চোখ রগড়াতে থাকে আর বলে আমি তো তোমাকে চিনতে পারছিনে বাবা।

‘আমাকে চেনো না? আমি এ পড়ার ‘শুভ্রা মঞ্জিলের’ সুমিত গো।’

সুমিতকে জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কেঁদে ওঠে বুড়ি। ওর হাত ধরে টেনে ভেতরে নিয়ে যেতে যেতে বলে, ‘এতকাল তোমার সম্পদ আগলে রেখেছি। আর লয় এবারে এসেছ তুমি তাকে দেখে রাখো গো। আমার বয়স হয়েছে আজ বাদে কাল চলইয়ে যাবনে।’

আর কথা বলার সুযোগ পায় না সুমিত। ঘরের দারজার ভাঁজ খুলে সামনে এসে দাঁড়ায় শিউলি। কথা নেই কারো মুখে অনুভূতির চরে পদ্মার ঢেউ তোলপাড়। এত দিনের জমানো জল উবে গেছে বাষ্পিত বাতাসে। এসো ঘরের ভেতরে এসো বলে, ‘ শিউলি’! সুমিতের দৃষ্টিতে হয় আবদ্ধ।
‘কেমন আছ? আজ কত কাল পর দেখছি তোমায়? মনে পড়ে আমাদের পালামির সেই দিনগুলোর কথা?’
‘সেই সব দিনের মধ্যেই তো থিতু হয়ে আছি। ফেরার পথ জানি নাই যে আর।’

‘ওই বয়সে আমাদের পালিয়ে যাওয়া! পারিবারিক সম্পর্ককে অমান্য করা। আমরা দুটি বন্ধু বন্ধুত্বের দাবিকেই মান্যতা দিয়েছি। বিয়ে বা সংসার ধর্মকে নয়। কোনো গণ্ডিতে আবদ্ধ হওয়া নয়। ধর্ম-বর্ণ বিভেদ নয়।’
‘এখন কি তোমার কাছে পাগলামো মনে হয় আমাদের পালিয়ে যাওয়ার ব্যাপারটা?’

‘না তো, তা বলিনি। তবে তো আমিও বদলে যেতাম। তোমাকে ছাড়া এতটা সময় পার করতে পারতাম বলো! আমার ধ্যানে-জ্ঞানের নিবিষ্টতায় ছিলে কেবল তুমি। কোনো গণ্ডিতে আবদ্ধ নয় উড়ন্ত ডানায় তুমি আর আমি। কারো প্রতি দায়বদ্ধতা নয়। তবু কেমন একটা মোহ-আকর্ষণ।’

‘তবুও বলয় একটা ছিল, আজও আছে। আমরা ভাঙতে পারিনি। নতুবা কেন মনে হবে তুমি ছাড়া আমার জীবন বৃথা, আমি ছাড়া তুমি মূল্যহীন।’

‘কেন বোঝ না, আমরা দুজন তো বন্ধু। বন্ধুত্বের দাবি কি অস্বীকার করতে পারি।  তোমার পরানের সুবাস লেগে আছে এখানে। সম্পর্ক একটা আমাদের আছে, ছিল, থাকবে সেই অলিখিত এক সম্পর্ক। স্বামী-স্ত্রীর মতো গণ্ডিতে আবদ্ধ জীবন নয়। দায়িত্ব-কর্তব্যের বালাই নেই। নেই কোনো আদিখ্য।’
‘ ঠিক তাই। আমরা আজ আছি তেমনি।’

‘চল আজ বেরিয়ে পড়ি পুরনো দিনে ফিরে যাই। চরকির মতো ঘুরে বেড়াই পুরো শহরটা। শরতের এমন দিনে শিউলি-শুভ্রতায় নদীর ধারে কাশবন বিহারে। মন্দ হয় না বলো! শারদীয় উৎসবের আনন্দ লুটে নেব যতটুকুতে তৃপ্ত হবে এই মন।’
‘আবার কি উড়াল পাখি হবে?’

‘না। এসেছি বাকি সময়টা তোমার আশপাশেই কাটাতে চাই বলে। কলেজে চাকরি নিয়ে স্থায়ী হতে এসেছি।’
‘তোমাদের বাড়িতে যাওনি?’

‘যাব। তোমাকে না দেখে কীভাবে যাই! বড়দি একলাই থাকেন। বাবা-মা গত হয়েছেন। বিদেশে থাকতেই জেনেছি। বড়দা আর দিদি ভাই বাইরে থাকেন। এ বাড়ির জন্য কারো তেমন আগ্রহ আছে বলে মনে হয় না। দেখছ না কেমন পোড়োবাড়ি হয়ে আছে!’

‘তাই, দেখছ না আমাদের বাড়ির একই হাল। বড়দির সঙ্গেই থেকে যাও নিজের বাড়িতে।’

‘আজকের দিনটা হোটেলেই থাকব। কাল থেকে আবার ঘরের জীবনে। অবশ্য বড়দি আমাকে বোঝে ভালো। সে আমাকে সংসারের মোহ-মায়া কুহকে জড়াবেন না। এটুকু বিশ্বাস আমার আছে।’

ঘুরে ঘুরে সারাটা দিন সেই কৈশোরে ফিরে গেছি। আনন্দকে দেখে ভয় পেয়েছে বয়স লেজ গুটিয়ে পালিয়েছে। আগে তো বুঝিনি প্রকৃতির কাছে নিজেকে এমনিভাবে সঁপে দেওয়া যায়! দিনগুলো পায়রার ডানায় বাঁধা।

হঠাৎই অনাসৃষ্টি। বড়দির বাসায় সন্ধ্যা থেকেই কে বা কারা ঢিল ছুড়ছে প্রতিদিনই ক্ষণে ক্ষণে। প্রাচীন প্রাচীরের গায়ে সাদা চকে কিছু লেখালেখি।
‘বুড়ো বয়সে ভীমরতি! চলবে না। চলবে না।’

লক্ষণ তো ভালো ঠেকছে না। সুমিত শিউলির সঙ্গে বড়দিও ভূমিকম্পের আভাস পেল।

/জেডও




https://www.shomoyeralo.com/ad/Google-News.jpg

সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত


ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: কমলেশ রায়, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড
এর পক্ষে প্রকাশক গাজী আহমেদ উল্লাহ
নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।

ফোন : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৭৫। ই-মেইল : shomoyeralo@gmail.com