ই-পেপার বিজ্ঞাপনের তালিকা মঙ্গলবার ৬ ডিসেম্বর ২০২২ ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৯
ই-পেপার মঙ্গলবার ৬ ডিসেম্বর ২০২২
https://www.shomoyeralo.com/ad/Amin Mohammad City (Online AD).jpg

হারান মাঝির গল্প
আজাদ মণ্ডল
প্রকাশ: শুক্রবার, ২৩ সেপ্টেম্বর, ২০২২, ১২:০৭ পিএম | অনলাইন সংস্করণ  Count : 157

হারান মাঝি ইদানীংকালের অনেক কিছুই ঠিকঠাক বুঝতে পারে না। সে কারণ খুঁজে তেমন কিছু পায়ও না। মূর্খ বলে জ্ঞান-পরিসীমার দোষ চাপাতে তার মনে বাধা আসে। সব জ্ঞান তো বইয়ের পাতায় লুকিয়ে থাকে না। সব না হোক, কিছু কিছু বোঝার জন্য তো বয়সই যথেষ্ট। সেই বয়স তো তার হয়েছে। সময়ের ফেরে ঘাট-আঘাট হয় আবার আঘাট-ঘাট হয়। 

এ ধারা সেই আদিকাল থেকেই। কিন্তু কিছু কিছু জীবনপ্রবাহের ঘাট থাকে সেগুলোর ওপর রঙিন প্রলেপ দিতে গেলে সুন্দরের চেয়ে অসুন্দরই হয় বেশি। সামান্য একজন খেয়াঘাটের মাঝির গভীর রাতে নানা রকমের দার্শনিক চিন্তা করা, আদার বেপারি জাহাজের খবর রাখার মতো মনে হয়। কিন্তু চারপাশে যে-রকম আঘাটের ছড়াছড়ি, তাতে খেয়ানৌকার মাঝিই কী, আর বিশাল জাহাজের ক্যাপ্টেন কী, পথের একজন ভিক্ষুকও তো রাতের গভীরে একাকী চিন্তা করতে পারে!

আলম বেপারির হাঁকে, মাঝির বুঝতে না পারার চিন্তায় ছেদ পড়ে।
‘মাঝি ঘুমাইয়া পড়ছ নাকি?’

নদীর সঙ্গে লাগোয়াই মাঝির ছইঘর, সেই ছইঘরের ছিদ্র দিয়ে আকাশ দেখা যায়, আকাশ দেখেই মাঝি মাঝে মাঝে দার্শনিক হয়ে ওঠে। বেপারির ডাকে সে বিছানা থেকে উঠে বিড়ি ধরায়, কানটুপি আর চাদর জড়িয়ে কাশতে কাশতে বাইরে বেরিয়ে আসে, ‘তোমারে পার না কইরা ঘুমাই কেমনে বেপারি?’

বেপারি এগিয়ে কৃতজ্ঞ স্বরে বলে, ‘এই বয়সে, শীতের মদ্দে আমার জন্যি জাইগা থাহো, খারাপ লাগে মাঝি। কী করমু কও?’

বেপারি প্রায় প্রতিদিনের একই কথা, মাঝি আমলে নেয় না। তার কাজ খেয়ানৌকায় মানুষ পারাপার করা, এতে দিনদুপুর কী আর রাতদুপুর কী? মাঝি বেপারির জন্য প্রস্তুতও থাকে, যত রাত হোক একজন এসে তাকে দুঃখস্বরে ডাকবে, ‘মাঝি ঘুমাইয়া পড়ছ নাকি?’ বহুদিনের অভ্যাসে এই ডাকের প্রতি তার আলাদা একটা মায়ার জন্ম নিয়েছে। তা ছাড়া গভীর রাতে নদীর বুকে নৌকা চালানো অন্যান্য সময়ের চেয়ে তার অধিক মধুর মনে হয়, চারদিক পরিপূর্ণ নীরবতা, সারা পৃথিবীর মানুষ ঘুমের ঘোরে, এমন ক্ষণে চাঁদের আলোয় রুপালি ঢেউ খেলানো পানির মধ্য বৈঠা চালানোর ঝপঝপ শব্দ কিংবা ঘুটঘুটে অন্ধকারে নৌকা নির্দিষ্ট ঘাটে বেয়ে নেওয়ার মধ্যে মনভরা সুখ আছে, এই সুখকে তার স্বর্গ মনে হয়।

মুখ থেকে ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে মাঝি হাঁক ছাড়ে,‘কী আর করবা, কপাল বইল্যাও তো কিছু একটা আছে! কপালের নাম গোপাল তো মাইনসে হুদাহুদি রাহে নাই! উইঠা বসো।’

বেপারি নৌকায় উঠে বসে, মাঝি নৌকা ছেড়ে দেয়, প্রায় ঘণ্টাখানেক সময়ের যাত্রা, শীতের দাপটে চুপসে যাওয়া নদীতে মাতাল হাওয়া বয়ে যায়, অন্যান্য রাতে মাঝি গান ধরে, কিন্তু আজ তার মাথায় দার্শনিক চিন্তা ঘুরপাক খাচ্ছে, গলার সুরটা নদীর ঢেউয়ের মতোই ওঠানামা করছে। এক জায়গায় স্থির নেই। সে তাল মেলাতে পারছে না। স্বর্গের অমৃত সুধা কেন যেন চিরতা পাতার রসের মতো মনে হচ্ছে।

বেপারি মাঝির চুপচাপ বৈঠা চালানোর সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নিতে পারে না, বহু রাতের অভিজ্ঞতার সঙ্গে আজকে কোনো মিল নেই।
‘কী ব্যাপার মাঝি চুপ মাইরা গেলা ক্যা? গান ধরো।’
‘আর গান! কিচ্ছু ভালা লাগে না বেপারি।’

‘ভালা লাগে না ক্যা? বউ তো নাই। নাকি ছাওয়াল মাইয়া দেখবার পারে না হেই জন্যি?’
‘আরে রাহো ছাওয়াল মাইয়া, বাপে খেয়া বায় তার জন্যি হেগোর শরম করে, এডা কুনো কথা অইলো কও?’ 
‘তাগো তো দোষ না, বুইড়াকালে তোমারে ওরা সুকে রাখবের চায়।’

‘বোগাস কথা, আমার কিসে সুক হিডা আমি বুঝুম, ওরা নাক গলাইবের কেরা?’

বেপারি খিলখিল করে হেসে ওঠে, সেই হাসি নিস্তব্ধ নদীর বুকে কুয়াশা ভেদ করে অনেক দূর গড়িয়ে যায়।
‘বয়েস বাড়ার লগে লগে তোমার জ্ঞান-বুদ্ধিও গাঙের পানির হাতে ধুয়া গেলোনি।’

‘বাদ দেও তো পোলাপানের কথা, হাট-বাজারের খবর কী, হিডা কও?’
‘হাট-বাজারের খবর আর কইও না মাঝি, দ্যাশে নেতামেতা কাউয়ার মতো বাইড়া গেছে, খালি চান্দা দেও আর চান্দা দেও। স্কুলের মাঠে পালাগান হুনবার গেছিলানি?’ 

মাঝির দার্শনিক চিন্তাভাবনার মূলে হাত দেয় বেপারি। শীতের মধ্যে গ্রামের স্কুলে পালাগানের আয়োজন সেই বহুকাল আগে থেকে। কিন্তু ইদানীং পালাগানের প্রাচীন ঐতিহ্যের আয়োজনে যেন বাড়াবাড়িই লক্ষ্য। গ্রামের উঠতি বয়সের নেতাকর্মীদের অযথা আস্ফালনের হাঁকডাকে গানের মূল স্রোত বিপরীত দিকে বইতে থাকে। গানের চেয়ে, যাদের গানের সঙ্গে কোনো সম্পৃক্তা নেই তাদের গুণকীর্তনের সুরই বেশি বাজে। মাঝি গত রাতে গান শুনতে গিয়ে ধৈর্যহারা হয়ে গিয়েছিলেন। নেতানেত্রীদের গুণগান গাওয়ার পর, প্রায় শেষ রাতের দিকে, গায়ক একজন উঠে যখন বন্দনা শুরু করলেন-‘সত্য সনাতনও, নিত্য নিরঞ্জনও, পতিত পবনও নিরঞ্জন।’ ব্যস লাগল প্যাঁচ, দর্শকসারি থেকে ক’জন দাঁড়িয়ে বন্দনার প্রতিবাদ শুরু করল, এই বন্দনা চলবে না। প্যাঁচ, পেঁচাতে পেঁচাতে যখন মাঠের সমস্ত মানুষকে পেঁচিয়ে ফেলল, মাঝি ফাঁক দিয়ে বেরিয়ে এসে আকাশসমান একবুক দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বিড়ি ধরিয়েছিলেন।
বেপারির প্রশ্ন শুনে গত রাতের দীর্ঘশ্বাস মাঝির আবারও লতিয়ে উঠল, ‘গেছিলাম তো।’

‘গান কেমন হুনল্যা? হুনলাম বাঘা বাঘা শিল্পী আনছে? চান্দা তো ডবল দিলাম।’
‘চান্দা ডবল দিছ ঠিক আছে, গায়কও ভালা, তয় তাগো গলা তো হুনবার পারলাম না, হুনলাম খালি পাতি কাকগো কা-কা।’
‘তাই তো হুনলাম, বন্দনাতে নাকি হাউকাউ লাইগ্যা গেছিল।’

‘হ, ঠিকই হুনছ, মেলা কষ্ট পাইছি বেপারি, কী সব জাতপাত সবকিছুর মধ্যে ডুইকা যাইতাছে, এডা কুনো কথা অইল কও?’

‘হ বড়ই চিন্তার কথা, সমেস্যা অইল যেনেসেনে পুলাপান মাতবরি করতেছে, পুলাপানের কাছে মাতবরি গেলে তো হাউকাউ অইবই।’
‘কতাটা খারাপ কও নাই, বাপদাদার নাম নাই, নেতাপেতাগো ফটোর নিচে নিজের ফটো লাগাইয়া সব জায়গায় টানাইয়া রাখছে।’

‘কী করবা মাঝি, দুনিয়ার ক্ষ্যামতা সব অযোগ্যদের হাতে চইল্যা যাইতেছে। দুনিয়ার নিয়মকানুনও সব উল্টায়্যা যাইতেছে। দেহো না, এই টালের মধ্যি গাছে নতুন পাতা অইতেছে!’

মাঝি কোনো কথা বলে না, সে বহু বছরের খেয়াঘাটের মাঝি, দীর্ঘ জীবনে একমাত্র দেশ স্বাধীনের সময় সে জাতপাত নিয়ে কথা শুনেছে, তখন তার বয়সও কম ছিল। জ্ঞান হওয়ার পর থেকে সেই জাতপাত নদীর পানির মতো ভাটির দেশে চলে গেছে, কিন্তু গত রাতে যেভাবে গান শুরুর বন্দনা নিয়ে জাতপাত নদীর বুকে চর জাগার মতো জেগে উঠল তাতে দুনিয়ার বাতাস যে এলোমেলো হয়ে দিক পরিবর্তন করছে, সেটা বড়ই চিন্তার ব্যাপার। বহু বছরের মানুষ পারাপারে তার জানামতে কেউ তো কোনোদিন কারও জাতপাতের হিসাব করেনি। কারও সেটা মনেই হয়নি। গত রাতে হঠাৎ করেই গানের বন্দনার কথা নিয়ে প্যাঁচ লাগল কেন? কোন অসুর শান্ত গ্রামে ভর করল? আর কেন করল? তাহলে আর কোনো আশঙ্কার ঝড় সামনে সৃষ্টি হয়ে আছে?

মাঝির মনের আকাশে অশনি ঝড়ের আগামী দিনের জন্য অপেক্ষা করতে হলো না, সামনে বসা বেপারিই অন্তর জ¦ালার ঘিয়ে আগুন জে¦লে দিলেন-
‘তৈইরি থাইকো মাঝি, এই টালের মধ্যি তোমার ঘাটেও মনে অয় ঝড় আইব।’

বেপারির কথা মাঝি বুঝতে পারে না, সে ঠাট্টা ভাবে, তবুও তার মনে সন্দেহ জাগে, ঘাটে ঝড় আসবে মানে কী? এই ধরনের কথার অর্থ কী? সে বিড়ি ধরায়।
‘এই টালের মধ্য মশকরা করো বেপারি?’
‘মশকরা করি না মাঝি, তুমি আমার গভীর রাতের সাথি, তোমার হাতে মশকরা করা যায়?’

মাঝির বৈঠা চালানোর বেগ কমে যায়। তার বুক কাঁপতে থাকে। সত্যিই তো বেপারির সঙ্গে তার ঠাট্টা-তামাশা করার সম্পর্ক না।
‘তয় টালের মধ্য আমার ঘাটে ঝড় আইব কেন? এহন কি ঝড়-তুফানের দিননি?’
‘এহন তো গাছে পাতা গজানোর দিনও না, গাছে পাতা অইতিছে কী জন্যি?’
‘বেপারি, প্যাঁচ মাইরা কথা কইও না, বুক কাঁপতেছে।’

‘আরে বাবা, তোমার ছইঘরের পাশে নতুন টিন দিয়া চেয়ারমেন ঘর বানাইছে ক্যা?’

মাঝি ভেবে পায় না, বেপারি এমনভাবে কথা বলছে কেন, যার জায়গা সেখানে সে ঘর বানাক না চুলা বানাক সেটা তার ইচ্ছা, তা এত ঘুরিয়ে-পেঁচিয়ে বলার কী আছে?
‘ঘর তো বানাইছে মানুষের আরামের জন্যি, খেয়া নাও ওপারে থাকলে মানুষ যাতে রইদে কষ্ট না পায়।’

‘মাঝি হারা জীবন বোকা থাইকা চিনির বস্তা টাইনা গেলা, হাড়কাঁপা টালের মধ্যি গাছে নতুন পাতা কেন অয় হেইডা বুঝলা না।’
‘বেপারি তোমার দুইখান পায়ে ধরি কথায় প্যাঁচ মাইরো না।’

‘করব কি না জানি না, বাজারে কানাঘুষা হুনলাম তোমার নাম বাদ দিয়া ঘাট অইব চেয়ারমেনের নামে।’

বেপারির কথা শুনে মাঝির সারা শরীর ঠকঠক করে কাঁপতে লাগল। এ কী শুনল সে? শীতের মধ্যও তার সারা শরীর ঘামতে লাগল। হাতের আঁজলা ভরে জল খেতে গেলে, কাঁপা হাতের ফাঁক গলে জল পড়ে গেল। 

‘দিন বদলাইছে মাঝি, এহন চেয়ারমেন এই ঘাটে মেশিন দিয়া নৌকা চালাইব। তোমার ভাঙা কোষা নাও কি এই জমানায় চলে? আর তুমি বুইড়া অইয়া গেছাও, ছাওয়ালও লায়েক অইছে, শেষ বয়সে একটু আরাম-আয়েশে কাটাও।’

হারান মাঝি নির্বাক হয়ে গেছে। বেপারির সংকেত কথা সে ঠিকঠাক বুঝতে পারছে না। নৌকা ঘাটে থামলে বেপারি অন্ধকারের মধ্যে ধীরে ধীরে অদৃশ্য হয়ে যায়। কিন্তু মাঝির বুকের মধ্যে সে যে ঝড় তুলে দিয়ে গেল সেই ঝড় কিছুতেই অদৃশ্য হচ্ছে না, বনের মধ্যে আগুন লাগার মতো দাউদাউ করে কেবল বাড়তেই লাগল।

/জেডও




https://www.shomoyeralo.com/ad/Google-News.jpg

সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত


ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: কমলেশ রায়, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড
এর পক্ষে প্রকাশক গাজী আহমেদ উল্লাহ
নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।

ফোন : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৭৫। ই-মেইল : shomoyeralo@gmail.com