ই-পেপার বিজ্ঞাপনের তালিকা শনিবার ৩ ডিসেম্বর ২০২২ ১৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৯
ই-পেপার শনিবার ৩ ডিসেম্বর ২০২২
https://www.shomoyeralo.com/ad/Amin Mohammad City (Online AD).jpg

সোশ্যাল মিডিয়ায় আলোচিত মামলায় ‘মিডিয়া ট্রায়াল’: কৌতূহলী মন্তব্যে ‘লাইনচ্যুত’ তদন্ত
আলমগীর হোসেন
প্রকাশ: বুধবার, ২৮ সেপ্টেম্বর, ২০২২, ৩:২৬ পিএম আপডেট: ২৮.০৯.২০২২ ৩:৩৪ পিএম | অনলাইন সংস্করণ  Count : 131

আলোচিত কোনো ঘটনা মানেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মন্তব্যের ঝড়। পক্ষে-বিপক্ষে নানা মত। যেখানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সেভাবে তদন্তই শুরু করেনি, সেখানেও ‘আমজনতার’ সিদ্ধান্তমূলক মন্তব্য-মতামতের ছড়াছড়ি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এমন কৌতূহলী আলোচনা-মতামতে তৈরি হচ্ছে শক্ত জনমত বা ‘পাবলিক সেন্টিমেন্ট’। যার কারণে ঘটনার তদন্তে নেমে বেকায়দায় পড়ছেন সংশ্লিষ্টরা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের জনমতের কারণে অনেক ক্ষেত্রে তদন্ত কার্যক্রম হচ্ছে লাইনচ্যুত।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কিছু ঘটনায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মতামত-মন্তব্য ইতিবাচক কাজে লাগলেও অধিকাংশ ঘটনায় তদন্ত বা বিচার প্রক্রিয়ায় নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। ওইসব নেতিবাচক প্রভাবে অনেক ক্ষেত্রেই প্রকৃত ঘটনা যা-ই হোক, সাধারণ মানুষের মনের মধ্যে আগেই একধরনের বিচার-বিশ্লেষণ হয়ে যাচ্ছে। সেই জায়গা থেকে মূল ঘটনা বের করে আনা তদন্তকারীদের জন্য প্রচণ্ড কঠিন একটা কাজ হয়ে দাঁড়ায়। এ প্রসঙ্গে সাবেক পুলিশ মহাপরিদর্শক এ কে এম শহীদুল হক সময়ের আলোকে বলেন, ‘সামাজিক  যোগাযোগমাধ্যমসহ বিভিন্ন মিডিয়ায় যখন কোনো ঘটনা বেশি আলোচিত হয় তখন একধরনের জনমত তৈরি হয়। অনেক সময় সেই জনমতকে গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত হয়ে থাকে। এগুলো মূলত আলোচিত ঘটনার ক্ষেত্রে বেশি হয়।’

একই প্রসঙ্গে সামাজিক অপরাধ বিশ্লেষক এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক তৌহিদুল হক সময়ের আলোকে বলেন, ‘স্বাধীন মতামতের নামে বর্তমানে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যা হচ্ছে তা খুবই ভয়াবহ। যেকোনো আলোচিত ঘটনায় একশ্রেণির মানুষ ব্যাপক কৌতূহলী হয়ে ওঠে। আবার অনেকে ইন্টেনশনালি (উদ্দেশ্যপ্রণোদিত) ফেসবুকসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঘটনার নানা দিক থেকে তথ্য ছড়িয়ে থাকে। যা থেকে সাধারণ মানুষের মনে একধরনের জাজমেন্ট বা বিচার হয়ে যায়। এমন ক্ষেত্রে তখন তদন্তকারীরাও বেকায়দায় পড়ে জনমতের দিকে গুরুত্ব দেন। যার ফলাফল হিসেবে তদন্ত লাইনচ্যুত হয়। সঠিক বিচার থেকে বঞ্চিত হন ভুক্তভোগীরা। এ অবস্থা থেকে আমাদের উত্তরণ খুব জরুরি।’

ঘটনা বিশ্লেষণে যেমনটি দেখা যায়, গত বছরের আগস্টে ঘটা চিত্রনায়িকা পরীমণির মামলা-মাদকসহ আটকসংক্রান্ত বিষয়ে ফেসবুকসহ বিভিন্ন মাধ্যমে ব্যাপক মন্তব্য-মতামত দেখা যায়। প্রথমদিকে যেভাবে ঘটনা এগোচ্ছিল 
তার কয়েক দিনের মধ্যেই পরিস্থিতি আবারও উল্টে যেতেও দেখা যায়। অন্যদিকে ২০১৬ সালের ৫ জুন সকালে চট্টগ্রামে মাহমুদা খানম মিতু হত্যাকাণ্ডের পর একইভাবে ঘটনাটি জঙ্গিদের বলে ফেসবুকে মন্তব্যের ঝড় ওঠে। অথচ পরবর্তীতে মিতু হত্যায় তার স্বামী সাবেক পুলিশ সুপার বাবুল আক্তার জড়িত অভিযোগে গ্রেফতার হন। সম্প্রতি আবার বাবুল আক্তারের পক্ষে ফেসবুকে এবং কিছু গণমাধ্যমে নানা মন্তব্য ও মতামত ছড়িয়ে পড়েছে। অন্যদিকে গত ২০ আগস্ট ফেসবুক মেসেঞ্জারে নিজ বিভাগের বন্ধুদের ‘চ্যাট গ্রুপে’ দেওয়া একটি বার্তাকে ‘রাষ্ট্রবিরোধী কর্মকাণ্ড ও জঙ্গি সংগঠনের সঙ্গে সম্পৃক্ততা’ আখ্যা দিয়ে বিশেষ পরিস্থিতি সৃষ্টি করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) এক ছাত্রকে পুলিশে সোপর্দ করেছিল হল প্রশাসন। ওই ছাত্র হলেন রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের ২০১৯-২০ শিক্ষাবর্ষ ও মুক্তিযোদ্ধা জিয়াউর রহমান হলের আবাসিক ছাত্র মেফতাহুল মারুফ। খোঁজখবর নেওয়ার পর পুলিশ জানায়, মেফতাহুল মারুফ নামের ওই শিক্ষার্থীর সঙ্গে জঙ্গিবাদ ও রাষ্ট্রবিরোধী কাজের কোনো সংশ্লিষ্টতা পাওয়া যায়নি। তাই মুচলেকা নিয়ে মারুফকে ছেড়ে দেওয়া হয়। মাঝখানে ভয়ানক বিষয়ে ফেঁসে যাচ্ছিলেন মেধাবী ছাত্র মারুফ। এ ছাড়াও গত এপ্রিলের শুরুতে রাজধানীর ফার্মগেটে তেজগাঁও কলেজের প্রভাষক লতা সমাদ্দার টিপ পরা নিয়ে হেনস্তার শিকার হওয়ার অভিযোগ করেন পুলিশ সদস্য নাজমুলের বিরুদ্ধে। এ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ওই কনস্টেবলসহ পুরো পুলিশ বাহিনীকেও দোষারোপ করে ফেসবুকসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মন্তব্যের ঝড় ওঠে। এ নিয়ে ব্যাপক জনমত তৈরি হওয়ায় নাজমুলকে শনাক্ত করে চাকরি থেকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। এর পর গত মাসে চাকরিচ্যুত হয়েছেন তিনি। চাকরি হারানো সেই পুলিশ কনস্টেবল নাজমুল তারেক এখন নিজেকে নির্দোষ দাবি করেছেন। গত ১৫ সেপ্টেম্বর বৃহস্পতিবার ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে স্ত্রী ও শিশু সন্তানের উপস্থিতিতে এক সংবাদ সম্মেলনে নাজমুল তারেক বলেন, ‘আমি ভুক্তভোগী। চাকরিরত অবস্থায় ছিলাম, এ জন্য কথা বলতে পারিনি। ঘটনায় কোনো তথ্য-প্রমাণ ছাড়াই আমার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।’ এসবের বাইরেও এমন ঘটনা অহরহ ঘটছে। এমনকি পরিকল্পিতভাবে বিদেশে বসেও কতিপয় ব্যক্তি নানা ইস্যুতে বিরূপ মন্তব্য বা উস্কানি ছড়িয়ে নেতিবাচক জনমত তৈরি করছে। আবার আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কিছু ক্ষেত্রে মিডিয়া কভারেজের প্রবণতায় তড়িঘড়ি ব্রিফিং, একশ্রেণির গণমাধ্যমে আলোচিত ঘটনায় ধারণাভিত্তিক বা মনগড়া প্রতিবেদন প্রকাশের কারণেও একধরনের জনমতের সৃষ্টি হচ্ছে। এর নেতিবাচক প্রভাবে মামলার তদন্ত বা ঘটনার বিচারিক কর্মকাণ্ড মারাত্মক বাধাগ্রস্ত হচ্ছে বলেও জানা যায়।

এ প্রসঙ্গে মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) নির্বাহী পরিচালক নূর খান লিটন সময়ের আলোকে বলেন, ‘এটা তো স্পষ্ট যে ফেসবুকসহ অন্যান্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এমন কিছু নিয়ে প্রচার-প্রচারণা বা মন্তব্য করা হয় যা, একধরনের মিডিয়া ট্রায়াল হয়ে যায়। তখন এটি সাধারণ মানুষের মধ্যে ধারণা পাকাপোক্ত করে ফেলে। সেই জায়গা থেকে মূল ঘটনা বের করে আনা তদন্তকারীদের জন্য প্রচণ্ড কঠিন একটা কাজ। মিডিয়া ট্রায়াল বলতে আমরা যা বুঝি, এটিও ঠিক তেমন একটা ব্যাপার। এটির মাধ্যমে একজন মানুষের বিচার পাবার যে অধিকার তা হারিয়ে ফেলছে।’

এমন পরিস্থিতিতে করণীয় প্রসঙ্গে মানবাধিকার কর্মী নূর খান বলেন, ‘এ ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের করণীয় হলো-অবাধ তথ্যপ্রবাহ নিশ্চিত করা। যখন এটি নিশ্চিত হবে, তখন মানুষ ফেইক বা মিথ্যার ওপর আস্থা আনবে না। আমরা নিজেদের নিউজের ওপর বিশ্ব^াস হারিয়ে, অনেক সময়ে বিদেশি গণমাধ্যমের ওপর নির্ভরশীল হয়ে যাই। এটির কারণ হলো-অবাধ তথ্যপ্রবাহ না থাকা। তাই অবাধ তথ্যপ্রবাহ নিশ্চিত থাকলে এটির মাত্রা অনেক কমে আসবে।’
ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) মো. আবদুল্লাহ আবু একই প্রসঙ্গে সময়ের আলোকে বলেন, ‘যে ঘটনাগুলো বিচারাধীন সেগুলো নিয়ে কোনো কথা না বলাই ভালো। পাশাপাশি তদন্তাধীন বিষয়ে ফেসবুকসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ধারণাভিত্তিক মন্তব্য করলে তদন্ত ভিন্ন খাতে প্রভাবিত করা হয়। সেখানে বিচার প্রক্রিয়াতেও ঝামেলা হয়। ফলে এ ধরনের বিষয়ে যেকোনো মন্তব্য খুব সাবধানে করতে হবে। যাতে মামলা ক্ষতিগ্রস্ত না হয়। তা ছাড়াও হাইকোর্টের সরাসরি নির্দেশনাও আছে যে, তদন্তাধীন বা বিচারাধীন বিষয়ে এমন কোনো মন্তব্য করা যাবে না, যা দ্বারা মামলা ক্ষতিগ্রস্ত হয়।’





https://www.shomoyeralo.com/ad/Google-News.jpg

সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত


ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: কমলেশ রায়, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড
এর পক্ষে প্রকাশক গাজী আহমেদ উল্লাহ
নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।

ফোন : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৭৫। ই-মেইল : shomoyeralo@gmail.com