ই-পেপার বিজ্ঞাপনের তালিকা বৃহস্পতিবার ৮ ডিসেম্বর ২০২২ ২৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৯
ই-পেপার বৃহস্পতিবার ৮ ডিসেম্বর ২০২২
https://www.shomoyeralo.com/ad/Amin Mohammad City (Online AD).jpg

দৌড়
শেলী সেনগুপ্তা
প্রকাশ: শুক্রবার, ১৮ নভেম্বর, ২০২২, ৫:৫৬ এএম | অনলাইন সংস্করণ  Count : 91

রমিজের মেজাজ আজ খুব খারাপ। বাড়ি থেকে বের হওয়ার সময় বউ খ্যাঁচ খ্যাঁচ করে উঠল। মেয়ের স্কুলের বেতন আর ছেলেটার একটা প্যান্ট কেনার জন্য টাকা চাইল। 
গজ গজ করছে , ‘হুদাই ট্যাহা, ট্যাহা, ট্যাহা ছাড়া কিছছু বোঝে না।’
রমিজ রেগেমেগে বের হয়ে এলো। বাজারে এসে সান্টুর দোকানে এক কাপ চায়ের সঙ্গে একটা বনরুটি নিয়ে বসল। বারবার রাস্তার দিকে তাকাচ্ছে, খলিল আর কাসেম আসার কথা। কাল রাতের ধান্দার টাকা ভাগ-বাটোয়ারা করতে হবে। তারপর বাড়িতে কিছু টাকা পাঠিয়ে গঞ্জে যাবে জোছনার কাছে। জোছনার জন্য 
বুকটা শিরশির করে ওঠে। 
ওরা চলে আসে। কথা বলতে বলতে আখক্ষেতের মাঝামাঝি চলে এলো। কাসেম কাঁধের গামছাটা বিছিয়ে বসল। ওরাও বসল, গুনে টাকা ভাগাভাগি করে নিয়ে নিল। রাতের ধান্দার পরিকল্পনা করে যার যার পথে চলে গেল। 
জোছনার ঘর থেকে বের হয়ে গামছায় মুখ মুছতে মুছতে বড় রাস্তার দিকে যাচ্ছে রমিজ। ওরা বারবার ফোন দিচ্ছে, ধান্দার নাকি দেরি হয়ে যাচ্ছে। শালারা বুঝবে কী করে যে, জোছনার কাছ থেকে উঠে আসা কত কঠিন। বেশ বিরক্ত নিয়ে হেঁটে যাচ্ছে বড় রাস্তার দিকে। বড় রাস্তার পাশে আখক্ষেতের ভেতরে বসে শিকারের চলাচল দেখতে হয়। বড় রাস্তা তখন নির্জন থাকে, অনেকক্ষণ পর পর বেশ কিছু গাড়ি রাগী ষাঁড়ের মতো হুস হুস করে ছুটে যায়। কখনো কখনো দুয়েকটা রিকশা, দুয়েকটা ভ্যান যায়। তাদের কেউই রমিজদের হাত থেকে মুক্তি পায় না। যার কাছে যা থাকে কেড়ে নিয়ে দু-চার ঘা লাগিয়ে দেয়। শিকার তখন প্রাণ নিয়ে পালাতে পারলে বাঁচে। দূরেই একটা গার্মেন্টস ফ্যাক্টরি আছে। মাঝে মাঝে গার্মেন্টসের মেয়েরা এ পথ দিয়ে আসা-যাওয়া করে। রমিজের দল ওদেরও ছাড় দেয় না। ওদের কাছে খুব বেশি টাকা থাকে না। কম দামি মোবাইলটা কেড়ে নেয় আর টাকা না থাকার মাশুল হিসেবে শরীরটা ছেড়ে দিতে হয় ওদের কাছে। প্রতিবাদ করলে বা পালিয়ে যেতে চাইলে বিপদ আরও বাড়ে। গত বছর একটা মেয়ে চিৎকার করে উঠেছিল। সঙ্গে সঙ্গে কলিম ও গলা চেপে ধরেছে। কোক করে একটা শব্দ করেই শেষ।
রমিজ কলিমকে বকাবকি করল এভাবে ক্ষেপে ওঠার জন্য। তারপর ওরা তিনজন আখক্ষেতের মধ্যেই লাশটার ঠিকানা লাগিয়ে দিল। সেদিন ওরা আর ধান্দা করেনি। যার যার বাড়ি ফিরে গেছে। 
আজও ওরা সেখানে জড়ো হয়েছে। অপেক্ষা করছে শিকারের জন্য। কাসেম বলেই ফেলল, ‘আইজ জিনিস পাইলে কইলাম আমার।’
রমিজ ক্ষেপে উঠে বলল, ‘ধান্দা কইরতে আইলেই জিনিস খুঁজস ক্যান, যা মালই পাইবি, ট্যাহা পাইবি না কইলাম।’
‘রমিজ ভাই, কাইল তুমি জিনিস দখল করলা, আমারে আর খলিলরে দিলা ট্যাহা আর মুবাইল।’
‘ত, কী অইছে, ট্যাহা মুবাইল তো পাইছস?’
‘ হর লাইগাই তো কইতাছি, আইজ তুমি আর খলিল নিবা ট্যাহা মুবাইল, জিনিস কিন্তুক আমার।’
‘আইচ্ছা যা, আইজ  তোর, ট্যাহা মুবাইল কিন্তুক পাবি না। খইল্যারে জিনিসের ভাগ দিস।’
‘আইচ্ছা আইচ্ছা, আইজ জিনিস পাইলেই চলব, শরীলডা ম্যাজ ম্যাজ করতাছে। তয় আগে কিন্তুক আমি নিমু।’ বলেই খ্যাঁক খ্যাঁক করে হেসে উঠল।
অনেক দূর থেকে একটা মেয়েকে হেঁটে আসতে দেখা গেল। কালো বোরকাতে শরীর ঢাকা। রমিজ একবার দেখে নিয়ে বলল, ‘হোন, আমি ক্ষেতের শেষ মাথার আইলের ধারে বইতাছি। খইল্যা, তুই আমারে মুবাইল আর ট্যাহা কিছু পাইলে দিয়া যাবি। কাম শেষ অইলে একলগে বাইত যামু। দেহিস কুনু ঝামেলা য্যান না অয়।’
‘অইবো না, কুনু ঝামেলা অইবো না, তুমি যাইয়া বও, আমরা আইতাছি।’ 
রমিজ আইল ধরে হেঁটে ক্ষেতের শেষ সীমানায় চলে গেল। আইলের ওপরে পা ছড়িয়ে বসল। দুহাত দিয়ে বাতাস আড়াল করে একটা বিড়ি ধরিয়ে সুখ টান দিল, ধোঁয়া ছাড়ার জন্য মুখটা আকাশের দিকে দিকে তুলতে দেখল পূর্বদিক থেকে একটা বাদুড়ের মতো কিছু একটা উড়ে যাচ্ছে, মুখে একটা ছোট্ট পাখি ধরা। পাখিটা মুক্ত হওয়ার জন্য কাতর স্বরে চেঁচাচ্ছে, শব্দটা ধীরে ধীরে ক্ষীণ হতে হতে একসময় মিলিয়ে গেল। দৃশ্যটা দেখতে দেখতে রমিজ আবারও বিড়িতে সুখটান দিল। রাস্তার দিক থেকে হুটোপুটির শব্দ আসছে। শিকার ধরা পড়েছে। কলিম আর কাসেম এ ব্যাপারে খুব দক্ষ।
আখক্ষেত থেকে গোঙানির শব্দ আসছে। দুদ্দাড় করে কাসেম ছুটে এসে একটা মোবাইল দিয়ে ছুটে চলে যাচ্ছে। রমিজ ওর লুঙ্গির কোণ ধরে টান দিয়ে বলল, ‘মুবাইল দিছস, ট্যাহা কই?’
লুঙ্গি সামলে, ‘উস্তাদ, ছাড় ছাড়, বুইল্যা গেছি’, বলেই পকেট থেকে একটা গিট্টু দেওয়া রুমাল হাতে দিয়ে দৌড় দিল। পেছন ফিরে বলে গেল, উস্তাদ, এক্কেরে খাসা, আইবা নি তুমি?
রমিজের জবাব শোনার সময় নেই ওর, ছুটতে ছুটতে চলে গেল।
আখক্ষেতে থেকে গোঙানির শব্দ ভেসে আসছে, রমিজের চোখের সামনে তখন দুলছে জোছনার শরীর।  রমিজ জানে না কতক্ষণ এভাবে ছিল।
রাতের নিস্তব্ধতা ভেদ করে হাতে ধরা ফোনটা বেজে উঠল। চমকে উঠে শব্দ বন্ধ করতে ব্যস্ত হয়ে হয়ে গেল। 
কিন্তু বন্ধ তো হলোই না, চাপ পড়ে রিসিভ হয়ে গেল, তখনই বউয়ের গলা শোনা গেল, ‘রাহেলারে, রাইত হইয়া গেছে, তুই কনে মা? চিন্তা লাগতাছে তো।’
রমিজের মাথায় বাজ পড়ল। মোবাইলটা ওখানে ফেলে তড়িঘড়ি করে ছুটছে, খলিল আর কাসেমের কাছে পৌঁছাতে হবে। একবার হুমড়ি খেয়ে আইল থেকে গড়িয়ে পড়ল, আবার ছুটে যাচ্ছে, যতই ছুটছে, পথটা যেন দীর্ঘ হয়ে যাচ্ছে। আর কতক্ষণ ছুটলে ওদের কাছে পৌঁছাতে পারবে রমিজ?




https://www.shomoyeralo.com/ad/Google-News.jpg

সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত


ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: কমলেশ রায়, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড
এর পক্ষে প্রকাশক গাজী আহমেদ উল্লাহ
নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।

ফোন : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৭৫। ই-মেইল : shomoyeralo@gmail.com