ই-পেপার বিজ্ঞাপনের তালিকা বৃহস্পতিবার ৮ ডিসেম্বর ২০২২ ২৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৯
ই-পেপার বৃহস্পতিবার ৮ ডিসেম্বর ২০২২
https://www.shomoyeralo.com/ad/Amin Mohammad City (Online AD).jpg

দুইশো বছরের ঐতিহ্য হারিয়ে ফেলছে বানারীপাড়া
বানারীপাড়া (বরিশাল) প্রতিনিধি
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ২৪ নভেম্বর, ২০২২, ৬:৩০ পিএম | অনলাইন সংস্করণ  Count : 109

বানারীপাড়ার দুইশো বছরের ঐতিহ্যবাহী ধানচালের ব্যবসা জৌলুস হারিয়ে ফেলেছে। কালের পরিক্রমায় বন্ধ হওয়ার পথে এ ব্যবসা। ধান চালের বিক্রি ও প্রক্রিয়াজাতকরনের জন্য ব্রিটিশ শাসন আমল থেকেই বানারীপাড়া দক্ষিণাঞ্চলের অন্যতম ব্যবসা কেন্দ্র হিসেবে সুপরিচিত। 

ওয়ার্ল্ড হেরিটেজেও বানারীপাড়ার ঐতিহ্যবাহী এ ধান-চালের ভাসমান হাটটি স্থান পেয়েছে। বরিশালকে বালাম চালের জন্য যে বিখ্যাত বলা হয় সেই বালাম চাল বানারীপাড়ায়ই প্রক্রিয়াজাতকরণ করা হয়। সাম্প্রতিক সময়ে এ সুনাম ও সুখ্যাতিতে ভাটা পড়েছে। হাটবাজারের পরিধি সংকুচিত হয়েছে।  দূরদুরন্তের ব্যবসায়ী, কৃষক ও কুটিয়ালরা ক্রমেই মুখ ফিরিয়ে নিতে শুরু করে নানা কারণে। 

যেভাবে গড়ে উঠেছিল:

প্রায় দুইশো বছর পূর্বে বানারীপাড়ায় ধানচালের ব্যবসার গোড়াপত্তন হয়। কালক্রমেই এর বিস্তৃতি ঘটে। বরিশালের বালাম চালের সুনাম দেশের সর্বত্র এমনকি পার্শ্ববর্তী দেশগুলোতেও। বালাম চাল বানারীপাড়ায়ই প্রক্রিয়াজাতকরণ হয়। বালাম ছাড়াও অন্যান্য চালের চাহিদা ও সুনামের জন্য ঢাকা, রংপুর, দিনাজপুর, খুলনা, ফরিদপুর, পটুয়াখালী, সন্দ্বীপসহ বিভিন্ন এলাকার শত শত ফরিয়া এখানে এসে চাল ক্রয় করে নিয়ে যেতো। সিলেট, ভৈরব, আশুগঞ্জ, ময়মনসিংহ, পটুয়াখালী, সন্দ্বীপ, মাদারীপুর, শরিয়তপুর, ভোলা, ঝিনাইদহ, যশোর প্রভৃতি স্থানের ব্যবসায়ীরা তাদের এলাকায় উৎপন্ন ধানের প্রচুর চাহিদার কারণে ধানবিক্রি করতে বানারীাড়ায় আসত। 

প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে ধানচালের ব্যবসার উপর বানারীপাড়ার অন্যান্য ব্যবসা নির্ভরশীল ছিল। বানারীপাাড়ায় নব্বই দশকের শেষ অবধি ৫ সহস্রাধিক পরিবার কুটিয়ালী পেশার উপর নির্ভর করে জীবিকা নির্ভর করত। এ উপজেলায় ৭০ ভাগ মানুষ একসময় এ ব্যবসার সাথে কোন না কোন ভাবে জড়িত ছিল। অত্র অঞ্চলে চাল উৎপাদনকারীদের স্থানীয় ভাষায় কুটিয়াল বলা হয়। কুটিয়ালদের সংখ্যা একসময় ছিল প্রায় ২৫ হাজার। উপজেলায় শতাধিক রাইস মিল ছিল। বানারীপাড়ায় ধানচালের হাট বসে শনি ও মঙ্গলবার। 

তবে রবি ও বুধবারেও ধান চাল বেচাকেনা হয়। সন্ধ্যা নদীতে নৌকায় ভাসমান হাটে মূলত ধান-চাল বিক্রি হয়। একসময় বানারীপাড়া বন্দর বাজার, পশ্চিমপাড় দান্ডয়াট থেকে শুরু করে  রায়েরহাট পর্যন্ত  কয়েক কিলোমিটার জুড়ে  সন্ধ্যা নদী ও এর শাখা নদী-খালে ভাসমান অবস্থায় হাজার হাজার নৌকায় ধান -চালের হাট বসত। বর্তমানে বানারীপাড়ার লঞ্চঘাট সংলগ্ন সন্ধ্যা নদীতে ভাসমান চালের হাট এবং নদীর পশ্চিমপাড় দান্ডহাটে ভাসমান ধানের হাটটি বসে অতীত ঐতিহ্যকে ধারণ করে কোনমতে টিকে আছে। 

রোব ও বুধবারের হাটকে বলা হয় গালার হাট। উপজেলার নলশ্রী, দিদিহার, দান্ডয়াট, বাইশারী, মসজিদবাড়ী, আউয়ার, কালিরবাজার, খোদবখশ, মলঙ্গা, চাখার, বাকপুর, জিরারকাঠী, ভৈৎসর, চালিতাবাড়ী, চাউলাকাঠী, কাজলাহার, ব্রাহ্মণকাঠী, জম্বদীপ, নাজিরপুরসহ আশপাশের এলাকায় শতকরা ৯০ ভাগেরও বেশি মানুষ এ কাজে জড়িত ছিল। হাট থেকে ধান কিনে বাড়িতে নিয়ে নারী-পুরুষ সকলের সম্মিলিত শ্রমে তা প্রক্রিয়াজাত করে চাল তৈরি করে পরবর্তী সেই ভাসমান হাটে বিক্রি করা হয়। এক সময় তাদেরকে স্থানীয় মহাজনদের হাতে শোষিত ও বঞ্চিত হতে হতো। 

কুটিয়াল বিদ্রোহ:

১৯৮৯ -৯০ সালে এ নিয়ে মহাজনদের সাথে ব্যাপক সংঘাত বাধে যা নিয়ে আন্দোলন হয়। যার প্রভাব পড়ে ধান চালের হাটের ওপর। মহাজনদের সাথে কুটিয়ালদের দীর্ঘস্থায়ী বিরোধে সাধারণ ব্যবসায়ীরা মুখ ফিরিয়ে নেয় এবং বিভিন্ন জেলা ও উপজেলা সদরে হাটবাজার গড়ে উঠে।  ফলে গত  দু’দশকে কুটিয়াল পরিবারের সংখ্যা ৫ হাজারে নেমে আসে। 

বর্তমান অবস্থা এবং কিছু কারণ:

গত প্রায় দুই দশক ধরে বানারীপাড়ায় ধানচালের ব্যবসা ক্রমশ খারাপের দিকে যাচ্ছে। বেশিরভাগ কুটিয়াল তাদের মূলধন খুইয়ে ফেলেছে। অনেকেই নৌকা বিক্রি করে দিয়েছে। আড়ৎদাররা তাদের ঐতিহ্যবাহী এ ব্যবসা ছাড়তে বাধ্য হয়েছে। বানারীপাড়ার আড়ৎদার পট্টির বহুঘর এখন ভাড়াটিয়া বিহীন অবস্থায় পড়ে আছে। এ ব্যবসার সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত  হাজারো পরিবার এখন অর্থকষ্টে দিনাতিপাত করছে।

বানারীপাড়ার সুপ্রাচীন এ ব্যবসা বন্ধ হওয়ার কারণ সম্পর্কে জানা যায় যেসব স্থান থেকে অতীতে দলে দলে ব্যবসায়ীরা আসত ধান-চাল কেনা বেচার জন্য সেসব স্থানে মোকাম ও অটো রাইস মিল গড়ে উঠেছে এবং আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে চাল উৎপাদন হওয়ায় খরচ অনেক কম হয়। সেকারণেই ব্যবসায়ীরা দলে দলে এখন আর বানারীপাড়ায় আসছে না। প্রায় একই অভিমত ব্যক্ত করেছেন অনেক ব্যবসায়ী ও কুটিয়াল। 
এছাড়া মুনফা অর্জনের জন্য কুঠিয়ালরা চালকে অত্যন্ত নরম করে ছাটাই করে এতে ওজন অনেকটা বেড়ে যায়। এ ছাড়া দুর অঞ্চল থেকে চাল বহন খরচ, চাইলসা ও কয়ালি প্রথা, কমিশন, নিরব চাঁদাবাজি, অতিরিক্ত টোল আদায়, অসাধু ব্যবসায়ীদের জালিয়াতি ইত্যাদির ব্যয়ভার বহন করার পর আশানুরূপ মুনফা অর্জিত হয়না বলে এখন আর ব্যবসায়ীরা বানারীপাাড়ায় আসছে না। এছাড়া আধুনিকতার ছোঁয়ায় পূর্ব পুরুষদের এ ব্যবসাকে নিম্নমানের ও কষ্ট সাধ্য মনে করে অনেকেই অন্য পেশার দিকে ঝুঁকছে। ফলে একসময়ের ঐতিহ্যবাহী এ ব্যবসা আজ বন্ধ হওয়ার উপক্রম  হয়েছে। এ ব্যাপারে সাধারণ কুটিয়ালদের বক্তব্য কিছু অসাধু মহাজনদের কারণে তারা উৎপাদিত চালের সঠিক মূল্য না পাওয়ায় ও নানাভাবে নিষ্পেষিত হওয়ায় মূলধন খুইয়ে ফেলাসহ বিভিন্ন কারণে এ ব্যবসার প্রতি নিরুৎসাহিত হয়ে পড়েন। 

এ বিষয়ে ব্যবসায়ী ও বিশিষ্ট চিত্র শিল্পী মীর সহিদুল ইসলাম বলেন, অটো রাইস মিলে বিভিন্ন জাতের চালকে আকারে চিকন ও প্যাকেটজাত করে নামীদামী কোম্পানিগুলো বিভিন্ন বাহারি নামে বাজারজাত করার কারণে স্থানীয় পর্যায়ে উৎপাদিত চালের কদর কমে গেছে। 

এ প্রসঙ্গে বানারীপাড়া উপজেলা  আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক ও বন্দর বাজার ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি সুব্রত লাল কুণ্ডু বলেন, দক্ষিণ ও পশ্চিমাঞ্চলসহ যেসব স্থান থেকে কৃষক ও ব্যবসায়ীরা বানারীপাড়ায় ভাসমান হাটে ধান বিক্রয় করতে আসতো। আধুনিকতার ছোঁয়ায় সেইসব স্থানে যোগাযোগ ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তনসহ অটোরাইস মিল ও মোকাম গড়ে ওঠায় তারা ধান বিক্রি করতে এখন আর বানারীপাড়ার এ ভাসমান হাটে আসেন না। ধান-চালের ব্যবসার হারানো হৃদ গৌরব ফিরিয়ে আনতে বানারীপাড়ায় অটোরাইস মিল প্রতিষ্ঠাসহ সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা প্রয়োজন। 

এ বিষয়ে বানারীপাড়া উপজেলা ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি ও কুটিয়াল সমিতির সাবেক সভাপতি অধ্যাপক মন্টু লাল কুণ্ডু বলেন, বানারীপাড়ায় এক সময় ৬০ থেকে ৭০ ভাগ মানুষ এ ধান-চালের ব্যবসার সঙ্গে জড়িত ছিলেন। সিংহভাগ কুটিয়ালের নিজস্ব পুঁজি ছিল না। এ সুযোগকে কাজে লাগিয়ে আড়তদার ও মহাজনরা নানাভাবে তাদের বঞ্চিত ও নিষ্পেষিত করতেন। এর ফলে ১৯৮৯-৯০ সালে কুঠিয়ালরা আন্দোলন করে এ অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। এক পর্যায়ে প্রভাবশালীরা পুঁজিপতিদের পক্ষাবলম্বন করায় কুঠিয়ালরা ক্ষতিগ্রস্ত হন। এছাড়া দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে হাট-বাজার ও  অটো বয়লার রাইস মিল গড়ে ওঠায় বানারীপাড়ার ভাসমান ধান-চালের ব্যবসায় ধ্বস নামে।




https://www.shomoyeralo.com/ad/Google-News.jpg

সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত


ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: কমলেশ রায়, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড
এর পক্ষে প্রকাশক গাজী আহমেদ উল্লাহ
নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।

ফোন : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৭৫। ই-মেইল : shomoyeralo@gmail.com