ই-পেপার বিজ্ঞাপনের তালিকা শনিবার ২৮ জানুয়ারি ২০২৩ ১৪ মাঘ ১৪২৯
ই-পেপার শনিবার ২৮ জানুয়ারি ২০২৩
https://www.shomoyeralo.com/ad/Amin Mohammad City (Online AD).jpg

https://www.shomoyeralo.com/ad/780-90.jpg
মোহমায়া
সাহানা শিমু
প্রকাশ: শুক্রবার, ২ ডিসেম্বর, ২০২২, ১:২৪ পিএম | অনলাইন সংস্করণ  Count : 120

যেন ঝুপ করে নদীর ধারে অন্ধকার নামল। একটু আগেও কেমন চারদিক ফর্সা ছিল! 
 না, এবার উঠতে হবে, না-হলে মা রাগ করবে। এ নদীর পাড় শান্তার সবচেয়ে পছন্দের জায়গা। নদীটি খরস্রোতা নয়। শান্ত, নিরিবিলি ধীরে বহমান। নয়ন ভরে নদীর এরূপ দেখতে ইচ্ছে করে। হাল্কা তালে ছোট ছোট ঢেউ তুলে ধীরে ধীরে অগ্রসরমান। যেন গন্তব্যে পৌঁছানোর তার কোনো তাড়া নেই।

শান্তারা স্কুলের পাঁচ বান্ধবী সব সময় একসঙ্গে থাকত। কুমোর পাড়ার প্রভাত কাকার দুই মেয়ে স্বপ্না, রত্না এবং উত্তর পাড়ার বেলি, নূপুর আর শান্তা। ওদের একসঙ্গে ঘুরে বেড়ানো, চলাফেরা দেখে অনেকেই ওদেরকে পঞ্চরত্ন বলে ডাকত। স্কুলজীবনে ওরা পাঁচ বান্ধবী প্রায়ই নদীতে নেমে গোসল করত, ন-হয় হেঁটে বেড়াত। কোনো একদিন নদীর ধারে না আসতে পারলে ওদের খুব খারাপ লাগত। তবে শান্তার যেন একটু বেশিই মন খারাপ হতো। দম বন্ধ বন্ধ লাগত। 

মনে পড়ে যায়, এক ভরা বর্ষায় স্বপ্না আর বেলি পানির গভীরতা আন্দাজ করতে না পেরে প্রায় ডুবতে বসেছিল। বাঁচার তীব্র হাহাকারে একজন পানির ওপরে উঠে এলেই অন্যজন তাকে টেনে নামিয়ে দিচ্ছিল। রত্না বোনের জন্য কান্নাকাটি করলেও এগিয়ে যাওয়ার সাহস পাচ্ছিল না। এ সময় নিজের বিপদের সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও মুহূর্তের সিদ্ধান্তে শান্তা হাত বাড়িয়ে দিয়ে জীবন বাঁচিয়েছিল দুজনেরই। সে এক ভয়াবহ অভিজ্ঞতা, খুব কাছ থেকে মৃত্যুর চেহারা দেখা। নদীর কিনারে এসে স্বপ্না আর বেলি গলগল করে বমি করে স্বস্তি পেয়েছিল। সেবার শুধু স্বপ্না, বেলিই নয়, রত্না নূপুরও শান্তাকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ভাসিয়েছিল। এ কান্না আনন্দের, এ কান্না কৃতজ্ঞতার। 

অন্ধকার খুব দ্রুত জমাট বাঁধছে। তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরতে মূল সড়কে না গিয়ে গ্রামের ভেতরের পথটাই ধরল শান্তা। পথে নেমে বুঝল, এ পথটা অনেক নিরিবিলি, বেশ দূর দূর একেকটা ঘর বাড়ি। চারপাশে ঘন গাছগাছালিতে ভরা। গাছগাছালির যেটুকু ফাঁকফোকরে আছে সেটুকুতেও অন্ধকার যেন ঠেসে বসে আছে। কেমন ভয় ভয় লাগছে। শান্তা ভাবছে মূল সড়ক দিয়ে গেলে পথের দূরত্ব বেশি হলেও মানুষজন থাকত নিশ্চয়ই। মায়ের মানা না শুনে ভুল করেছে, ভাবছে শান্তা। নদীর ধারে কি খুব বেশি সময় কাটিয়ে ফেলেছে! সব শক্তি দিয়ে মনের সব ভয় ঝেড়ে ফেলতে চায়। খুব দ্রুত পা চালিয়ে পথটা দ্রুত শেষ করার ইচ্ছে শান্তার। 

কয়েক কদম মাত্র এগিয়েছে, হঠাৎ পেছনের ডাকে ফিরে তাকায়
‘মা শান্তা, কবে আসছ ঢাহা থন?’
একজন পরিচিত মানুষের কণ্ঠস্বরে ভয় অনেকটা কাটিয়ে ওঠে শান্তা।
‘প্রভাত কাকা যে! প্রণাম কাকা। চার দিন হলো এসেছি। আপনারা কেমন আছেন?’
 ‘আমগের আর থাহা

 ভেতর বাড়ি থেকে হাপর টানার সেই পরিচিত শব্দটা ধীর তালে একটানা একই সুরে বেজে যাচ্ছে। 
 ছোটবেলা কাকিমার হাপর টেনে টেনে দা, খুন্তি, বঁটি, কুড়াল বানানো দেখতে ভালো লাগলেও, ভয়ও সঙ্গে ছিল। আগুনের গরমে দা, খুন্তিগুলো যখন টকটকে লাল বর্ণ নিত, ভয় হতো শান্তার। আর প্রভাত কাকা যখন সেই লাল বর্ণের দা খুন্তিগুলো হাতুড়ি দিয়ে পেটাত তখন ভয় লাগলেও তাকিয়ে তাকিয়ে দেখতে খারাপ লাগত না। 
‘কাকিমা কাজে ব্যস্ত বুঝি!’
‘ কী আর করবার আছে!’

 ‘কাকা, স্বপ্না রত্নারা কই? আমি কতদিন পর গ্রামে আসলাম। ওরা একবারও আমায় দেখতে এলো না!’
অভিমানে যেন গলা বুজে আসে শান্তার। কাকাও ততধিক বিষণ্ন কণ্ঠে বলে,
‘স্বপ্না রত্নারা গ্রামে থাকলে তোমার লগে দেখা না করি কি ঘরত বসি থাকত! ওরা কলকাতা মামাবাড়ি গেইছে। তা তুমি এই ভর সন্ধ্যাকালে এই পথে একা একা! কোথ থন আসলা?’
‘নদীর পাড়ে গিয়েছিলাম, এখন বাড়ি ফিরছি
আপনি চিন্তা করবেন না।’ 
‘সন্ধ্যাকালে এই পথ তেমন সুবিধার নয় গো মা, চলো তোমাক খানিক আগায়ে দিয়ে আসি। কই গো রতনের মাও, আমি মেয়েটাক বাঁশের সাঁকোটুক পাড় করে দিয়ে আসলাম। ’
‘আপনার কাজ ফেলে যাওয়া লাগবে না কাকা
।’

 প্রভাত কাকা লম্বা পা ফেলে হাঁটা শুরু করায় শান্তার কথা মাঝপথেই থেমে যায়। তা ছাড়া কাকা সঙ্গে আসাতে মনের ভয়টাও চলে গেছে। 
কাকার সঙ্গে পা মিলিয়ে চলতে গিয়ে শান্তাকে রীতিমতো দৌড়াতে হচ্ছে। হাঁপিয়ে উঠছে,তবুও না থেমে দ্রুত পায়ে পথ চলছে। বাঁশের সাঁকো পার হতেই শান্তাদের বাড়িটা নজরে আসে।
‘এবার তুমি বাড়ি যাও মা। আমিও ফিরে যাই। তোমার কাকিমা অপেক্ষা করি আছে। 
 ‘জি কাকা,এবার আমি যেতে পারব। অনেক ধন্যবাদ কাকা
।’
 ঘুরে তাকিয়ে কাউকে আর দেখতে পেল না। এত দ্রুত কাকা কীভাবে অদৃশ্য হয়ে গেলেন! তবে কি কাকা
আর ভাবতে চায় না শান্তা, মনের কুচিন্তাগুলো সরিয়ে দিয়ে দ্রুত পা চালায়, হাঁপাতে হাঁপাতে বাড়ি পৌঁছে আসরে বসে পড়ে দাওয়ায়। মা এসে জড়িয়ে ধরে, ‘মা পানি, পানি দাও
।’
পানি নিয়ে দৌড়ে আসে কান্তা, ঢকঢক করে এক নিশ্বাসে গ্লাস খালি করে দেয় শান্তা। 

‘কী হয়েছে আপু তোর! হাঁপাচ্ছিস কেন! এত দেরি করলি যে! মা তোর জন্য চিন্তায় চিন্তায় অস্থির। বাবা এখনও ফিরে নাই না হলে বাবা পুরো গ্রাম এক করে ফেলত। কই ছিলি আপু! কে তোকে তাড়া করছে! বল আপু বল।’

আমি কত করে বললাম, ‘কান্তা স্কুল থেকে ফিরলে দুই বোন একসঙ্গে যাস। সে বলে, ‘কাল বাদে পরশু রফিক এলে ফিরে যেতে হবে ঢাকায়, তখন কোথায় পাব নদীর পার, মিহি ঠান্ডা বাতাস, বিশাল সবুজ প্রান্তর! আমার ভালোবাসার এই গ্রাম!’ 
একটু থেমে মা আবার শুরু করে, ‘যাক, শান্তা তুই ভালোয় ভালোয় বাড়ি ফিরে এসেছিস, খুব ভালো হয়েছে। না-হলে রফিককে আমি কী জবাব দিতাম।’
 শান্তা কোনো কথা না বলে মায়ের কোলে মাথা রেখে শুয়ে থাকে।

 ২.
 বাড়ি এলে শান্তা মায়ের সঙ্গেই ঘুমায়, আজও এর ব্যতিক্রম হলো না। মা মেয়ের মাথায় বিলি দিতে দিতে বলে, মারে, তুই ঢাকায় সারাদিন একা ঘরে থাকিস। এই গ্রাম, নদীর পাড়, তোর বান্ধবীদের কথা মনে করে কত মন খারাপ করিস। তারপর এমন কথা শুনলে তোর মন খারাপ হবে তাই বলিনি। তুই আসার পরও বলতে পারিনি। কিন্তু রফিক আসবে কালকে। পরশু তোকে নিয়ে চলে যাবে। এখন না বললে নয়
‘তুমি এত পেঁচাচ্ছ কেন! যা বলার সরাসরি বলো তো মা, কী বলতে চাও।’ 

 নিস্তেজ বিষণ্ন কণ্ঠে মা বলছে, ‘তোর বান্ধবী স্বপ্না, রত্নার বাবা প্রভাত দাস আর তার স্ত্রী হঠাৎ একদিনের জ্বর ও বমিতে স্বর্গবাসী হলেন। রতন বাবার মুখাগ্নি করে ফিরে এসে দেখে মাও পরপারে চলে গেছে। এত বড় শোক ছেলে মেয়েরা কীভাবে সইবে, আমরা গ্রামের লোকেরাই সইতে পারি না। ওদের মামা তিন ভাইবোনকে কলকাতায় নিজের বাড়ি নিয়ে গেছেন। এতে যদি মা-বাবা হারানোর বেদনা কিছুটা ভুলতে পারে,শোক কাটিয়ে উঠতে পারে। কামার বাড়িটা এখন সুনসান হয়ে পড়ে আছে। ভেতর বাড়ির হাপর, দা-বঁটি সবই তেমনি পড়ে রয়েছে। ওরা তিন ভাইবোন ফিরলে হয়তো আবার আগুন জ্বলবে, হাপর চলবে
মা অনেক কষ্টে একটি দীর্ঘশ্বাস গিলে ফেলল।

অবাক বিস্ময়ে হতবাক হয়ে মায়ের মুখের দিকে নিষ্পলক চেয়ে শান্তা। 
‘প্রভাত কাকা কি তবে আমাকে বিপদ থেকে বাঁচাতে ছুটে চলে এলেন! একি স্বপ্নাকে বাঁচানোর প্রতিদান দিয়ে গেলেন!’

https://www.shomoyeralo.com/ad/Local-Portal_728-X-90 (3).gif



https://www.shomoyeralo.com/ad/Google-News.jpg

সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত


ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: কমলেশ রায়, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড
এর পক্ষে প্রকাশক গাজী আহমেদ উল্লাহ
নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।

ফোন : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৭৫। ই-মেইল : shomoyeralo@gmail.com