ই-পেপার বিজ্ঞাপনের তালিকা শনিবার ২৮ জানুয়ারি ২০২৩ ১৪ মাঘ ১৪২৯
ই-পেপার শনিবার ২৮ জানুয়ারি ২০২৩
https://www.shomoyeralo.com/ad/Amin Mohammad City (Online AD).jpg

https://www.shomoyeralo.com/ad/780-90.jpg
পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তি চুক্তির রজত জয়ন্তী
লে. কর্নেল মাসুদ পারভেজ চৌধুরী, পিএসসি
প্রকাশ: শুক্রবার, ২ ডিসেম্বর, ২০২২, ২:৩৪ পিএম | অনলাইন সংস্করণ  Count : 397

সাল ১৯৭১, পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানে জনগণের মৌলিক অধিকারের বিস্তর ফারাক ও চাওয়া-পাওয়ার বৈষম্যের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়ে ৯ মাস রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর জাতি হিসেবে বাঙ্গালীর স্বীকৃতি আর স্বাধীনতার স্বাদ সবেমাত্র পেয়েছিলাম আমরা। যুদ্ধবিদ্ধস্ত একটি দেশের খুঁটিগুলোকে সবেমাত্র সংস্কারের উদ্যোগ নিয়েছিলেন জাতিকে স্বাধীনতার স্বাদ পাইয়ে দেয়া বাঙালী জাতির স্বপ্নদ্রষ্টা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। পার্বত্য চট্টগ্রাম তথা খাগড়াছড়ি, রাঙামাটি ও বান্দরবানে শুরু হয় অন্য একটি ঘৃণ্য ষড়যন্ত্র। সদ্য স্বাধীন একটি রাষ্ট্রে সৃষ্টি হয় একটি সশস্ত্র দল 'শান্তিবাহিনী। তখন থেকে পার্বত্য চট্টগ্রাম ক্রমেই অশান্ত হয়ে পড়ে। দিনে-দুপুরে শান্তিবাহিনীর হাতে খুন হতে থাকে নিরীহ পাহাড়ি ও বাঙালিরা। চাঁদাবাজি, খুন, গুম, ধর্ষণ, লুটপাট, অগ্নিসংযোগ ছিলো সেখানকার নিত্যদিনের সাধারণ ঘটনা। এককথায় কয়েক হাজার নিরীহ জনসাধারন প্রাণ হারায় সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের হাতে। এ সময় অরক্ষিত সীমান্তসহ ভূখণ্ড রক্ষা ও শান্তি ফেরাতে সেখানে মোতায়েন করা হয় সেনাবাহিনী। এরপর সেনা-বিজিবি-পুলিশ ও আনসার মিলে দিনের বেলায় নিরাপত্তা নিশ্চিত করলেও রাতের বেলা গ্রামকে-গ্রাম পুড়িয়ে বিলীন করে গণহত্যা চালাতে থাকে শান্তিবাহিনীর সদস্যরা।

এরপর বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় এসে সরকার গঠন করে, কিন্তু পাহাড়ের সমস্যা আর সমাধান হয় না। এভাবে কেটে যায় প্রায় দুই যুগ। ১৯৯৬ সালে সাধারণ নির্বাচনে জয়লাভ করে দেশের সরকার গঠন করে বাংলাদেশ আওয়ামীলীগ। বঙ্গবন্ধু কণ্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকার দেশ পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণের পর পার্বত্য জেলাগুলোতে দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক সমাধানের লক্ষ্যে দফায় দফায় বিভিন্ন মাধ্যমে আলোচনা শুরু করেন শান্তিবাহিনীর সাথে। এরই ফলশ্র“তিতে ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর বাংলাদেশের সংবিধান ও দেশের বিধিবিধান ও আইন যথাযথ অনুসরণ করে কোন তৃতীয় পক্ষের সহায়তা ছাড়াই মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বলিষ্ঠ নেতৃত্বে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে তৎকালীন শান্তিবাহিনী ও বর্তমান পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির মধ্যে পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। ২’রা ডিসেম্বর উক্ত পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তির রজত জয়ন্তী অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে।

দুই যুগের কালো অধ্যায় শেষে পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তির মধ্য দিয়ে আলো ফিরে পাহাড়ে। ধীরে ধীরে শান্ত হয়ে আসে পরিবেশ। পাল্টাতে থাকে সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক চিত্রও। অবকাঠামোগত উন্নয়নের পাশাপাশি সরকারের ও বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর নানা যুগোপযোগী সিদ্ধান্তের কারণে পর্যটনেও ভূমিকা রাখতে শুরু করে পাহাড়।
 
শান্তিচুক্তির মাধ্যমে পার্বত্য জেলায় শান্তি আনয়নের পাশাপাশি ওই এলাকায় অবকাঠামো এবং যোগাযোগ ব্যবস্থার অভূতপূর্ব উন্নতি সাধনের মাধ্যমে পার্বত্য জনগোষ্ঠীর সামাজিক ও অর্থনৈতিক মানোন্নয়নে সরকার যথেষ্ট সচেষ্ট ভূমিকা রেখেছে।

চুক্তি অনুযায়ী সরকার, পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয় ও আঞ্চলিক পরিষদ গঠন করেছে এবং স্থানীয় সরকার পরিষদকে জেলা পরিষদে রুপ দিয়ে পাহাড়ের অভূতপূর্ব উন্নয়নে ভূমিকা রেখেছে। এছাড়া ‘তিনটি পার্বত্য জেলা পরিষদ’ এবং নিয়ন্ত্রণাধীন ৩৩টি দফতর-সংস্থার মধ্যে রাঙ্গামাটিতে ৩০টি, খাগড়াছড়িতে ৩০টি এবং বান্দরবানে ২৮টি হস্তান্তর করা হয়েছে। ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি করতে গঠন করা হয়েছে ভূমি কমিশন। প্রত্যাগত ১২, ২২৩টি উপজাতি শরণার্থী পরিবারকে পুনর্বাসন করা হয়েছে ও শরণার্থী টাস্কফোর্স গঠন করা হয়েছে। শান্তিবাহিনীর সদস্যদের সাধারণ ক্ষমা এবং ৭২৫ জনকে পুলিশ বাহিনীতে নিয়োগ দেয়া হয়েছে। সংসদ উপনেতার নেতৃত্বে পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়ন মনিটরিং কমিটি গঠন করা হয়েছে। পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক সংসদীয় স্থায়ী কমিটি গঠন করা হয়েছে। ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান বিল-২০১০ জাতীয় সংসদে গৃহীত হয়েছে। তিন পার্বত্য জেলায় ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী সাংস্কৃতিক ইন্সটিটিউট প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। বিভিন্ন দফতরে চাকরির ক্ষেত্রে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীদের নির্ধারিত কোটা অগ্রাধিকার প্রদান করা হয়েছে। বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে চরম প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ থাকা সত্ত্বেও প্রয়োজনীয় যোগ্যতা উপেক্ষা করে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীদের জন্য কোটা সংরক্ষণ করা হচ্ছে। পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ, জেলা পরিষদ এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডের শীর্ষস্থানীয় পদে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর মধ্য থেকে প্রতিনিধি নিয়োগ প্রদান করা হয়েছে। পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয়ে একজন ক্ষদ্র নৃ-গোষ্ঠী সম্প্রদায়ের মাননীয় সংসদ সদস্যকে প্রতিমন্ত্রী সমমর্যাদায় নিয়োগ প্রদান করা হয়েছে। ১৯৯৮ সালে পার্বত্য জেলা পরিষদ আইনের প্রয়োজনীয় সংশোধন করা হয়েছে। ১৯৭৬ সালে জারিকৃত পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড অধ্যাদেশ বাতিল করে পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড আইন ২০১৪ জাতীয় সংসদে পাস করা হয়েছে।

বর্তমানে পার্বত্য চট্টগ্রামে আর্থ-সামাজিকভাবেও অনেক উন্নয়ন হয়েছে। ভূমি বিষয়ক আইন ও বিধিমালা ছিল না। এখন ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি আইন ২০০১ প্রণয়ন এবং ২০১৬ সালে আইনটি সংশোধন করা হয়েছে যা চলমান রয়েছে। শান্তিচুক্তির পূর্বে যেখানে এডিপিভুক্ত প্রকল্প ছিল ১টি, এখন সেখানে ১৭টি প্রকল্প বাস্তবায়নাধীন রয়েছে। চুক্তির পর পার্বত্য অঞ্চলের জেলাগুলোয় স্বাস্থ্য খাতে দ্রুত অগ্রগতি হয়েছে। পূর্বে পার্বত্য অঞ্চলে কোনো মেডিকেল কলেজ, নার্সিং ট্রেনিং ইন্সটিটিউট ও কমিউনিটি ক্লিনিক ছিল না। ট্রাইবাল স্বাস্থ্য কর্মসূচির আওতায় তিন পার্বত্য জেলায় স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রম চলমান রয়েছে।

পার্বত্য চট্টগ্রামের শিক্ষা বিস্তারে সরকারের অবদান অনস্বীকার্য, চুক্তির পূর্বে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা খুবই কম ছিল। চুক্তির পর প্রায় ২শতাধিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নির্মাণ, পুনর্নিমাণ করা হয়েছে। শিক্ষা ক্ষেত্রে উপজাতি ছাত্রছাত্রীদের জন্য বিশেষ কোটার সংখ্যা বৃদ্ধি করা হয়েছে। প্রতিবছর বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে প্রায় ৪শ উপজাতি ছাত্র-ছাত্রী বিশেষ কোটায় ভর্তির সুযোগ পাচ্ছে। পাবলিক, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় এবং কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে এর সংখ্যা আরও বাড়ানো হয়েছে। সরকারি চাকরির ক্ষেত্রেও বিশেষ কোটার ব্যবস্থা রয়েছে পার্বত্য উপজাতিদের জন্য। প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে মেডিকেল কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, টেকনিক্যাল কলেজ, ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজও। 

একসময় পাহাড়ের শিক্ষার্থীরা কলেজ-ভার্সিটিতে পড়ার জন্য নানা প্রতিকূলতা জয় করে সমতলে আসত। তাদের শিক্ষার সুযোগ ছিল সীমিত। মাতৃভাষায় শিক্ষার সুযোগ ছিল না। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এ সমস্যা সমাধান করে দিয়েছেন। ওই এলাকায় দুর্গম হিসেবে পরিচিত বসতিতেও উন্নয়ন বোর্ডের মাধ্যমে পাড়াকেন্দ্র স্থাপন করা হয়েছে, প্রাথমিক বিদ্যালয় স্থাপন করা হয়েছে এবং শিক্ষার্থীরা পড়ছে নিজের মাতৃভাষায়।

চুক্তির পর পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে তিন জেলায় এ পর্যন্ত ৫৬০ কিমি. (৩৩ কেভি), ৯৮৪ কিমি. (১১ কেভি), ১৩৫৫ কিমি. (৪ কেভি) বিদ্যুৎ লাইন নির্মাণ করা হয়েছে। প্রত্যন্ত অঞ্চলে যেখানে জাতীয় গ্রিডের মাধ্যমে বিদ্যুৎ সরবরাহ সম্ভব নয়, এরকম প্রায় লক্ষাধিক পরিবারকে এ পর্যন্ত ধাপে ধাপে সৌর বিদ্যুৎ সুবিধা প্রদানের জন্য একটি প্রকল্প       বাস্তবায়নাধীন রয়েছে; শান্তিচুক্তির পূর্বে পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে বিদ্যুৎ সরবরাহ পর্যন্ত ছিল না। চুক্তির সুফল হিসেবে রাতের আঁধারেও দূর্গম পাহাড়ের কুড়েঘরগুলোতে জ্বলছে সোলারের বাতি। 

চুক্তির পূর্বে পার্বত্য অঞ্চলে মাত্র ২০০ কিলোমিটার রাস্তা ছিল। বান্দরবানের রুমা ও ধানচি উপজেলার সাংগু নদীর ওপর কোনো সেতু ছিল না। এখন যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের তত্ত্বাবধানে সড়ক ও জনপথ বিভাগের ব্যবস্থাপনায় বাংলাদেশ সেনাবাহিনী পার্বত্য চট্টগ্রামের দুর্গম এলাকায় উল্লেখযোগ্য সংখ্যক রাস্তা ও বিভিন্ন আকারের সেতু-কালভার্ট নির্মাণ করছে। চুক্তির পর ৩৪৪০ কিঃমিঃ পাকা রাস্তা ও গুরুত্বপূর্ণ কিছু সেতু নির্মাণ করা হয়েছে। প্রায় ২৫০ কিলোমিটার সড়ক নির্মাণ কাজ চলমান রয়েছে এবং প্রায় ৮৬০ কিলোমিটার রাস্তা নির্মাণের পরিকল্পনা বর্তমান সরকারের রয়েছে। 

একটা সময় পাহাড়ি সড়কের ঝুঁকিপূর্ণ অস্থায়ী ‘বেইলি সেতু’ ছিল একমাত্র ভরসা। প্রতিদিন সড়ক দুর্ঘটনায় হতাহত যেন নিত্যদিনের ঘটনা ছিল। এতে মানুষের শঙ্কা ও দুর্ভোগ ছিল সীমাহীন। তবে সময়ের সাথে বদলেছে পাহাড়ের যোগযোগ ব্যবস্থার চিত্রও। বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর খাগড়াছড়ির অধিকাংশ পাটাতনের বেইলি সেতু সরিয়ে নির্মাণ করা হয় স্থায়ী সেতু। অতিসম্প্রতি শুধুমাত্র খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলায়ই ৪২টি স্থায়ী সেতু নির্মাণ করা হয়। এতে পরিবর্তন আসবে খাগড়াছড়ির সড়ক যোগাযোগে। ইতোমধ্যে সেতুগুলোর নির্মাণকাজ শেষ হয়েছে।
 
শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরের পর পার্বত্য চট্টগ্রামে টেলিযোগাযোগ, মোবাইল ফোন নেটওয়ার্কের আওতা বৃদ্ধি এবং ইন্টারনেট ব্যবস্থার উন্নতি সাধন করা হয়েছে, যা চুক্তির আগে ছিল না বললেই চলে। ইন্টারনেট ব্যবস্থার উন্নয়নে মোবাইল অপারেটরগুলোর পাশাপাশি পাহাড়ে ব্রডব্যান্ড ওয়াইফাইয়ের বিস্তার ঘটেছে। এছাড়া নেটওয়ার্কের জটিলতা নিরসন করে পাহাড়ের আনাচে-কানাচে নিরবিচ্ছিন্ন সংযোগ দিয়েছে সরকারী টেলিকম কোম্পানী টেলিটক।

 পূর্বাঞ্চলীয় সমন্বিত কৃষি উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় কৃষকদের উদ্বুদ্ধ করার জন্য প্রদর্শনী ক্ষেত্র স্থাপন কার্যক্রম এবং চাষী পর্যায়ে উন্নতমানের ধান-গম ও পাট বীজ উৎপাদন, সংরক্ষণ ও বিতরণ প্রকল্পের আওতায় প্রদর্শনী ক্ষেত্র স্থাপন কার্যক্রম চলমান রয়েছে। কৃষি ব্যবস্থার উন্নয়নের পাহাড়ে কৃষি বিভাগের মাধ্যমে মধু, কফি, আম, কমলাসহ নানা অর্থকরী ফসল আবাদ হচ্ছে। ইতিমধ্যেই যা প্রতিবছর সমতলে এমনকি বিদেশেও রপ্তানী হচ্ছে। 

শান্তিচুক্তি বাস্তবায়নের পরিপ্রেক্ষিতে সরকার উপজাতিদের নিজস্ব ভাষা, শিক্ষা ও সংস্কৃতি চর্চার জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। এরই ধারাবাহিকতায় ২০১৭ সাল থেকে উপজাতিদের নিজস্ব পাঠ্যপুস্তকের আওতায় শিক্ষা প্রদানের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। এছাড়া পাহাড়ীদের ভাষা সংরক্ষণে রাঙামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদের মাধ্যমে সাতটি শব্দকোষ প্রকাশ করা হয়েছে। 

পর্যটনের জন্য পার্বত্য ভূখন্ড বরাবরই আকর্ষণ। কত কিছু সেখানে দেখার আছে! যোগাযোগ ও আবাসন সুবিধা পর্যাপ্ত না থাকায় সম্ভাবনা পুরোপুরি কাজে লাগানো যাচ্ছিল না। এখন পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটছে। পর্যটনের অবকাঠামো গড়ে উঠছে।

পার্বত্য শান্তিচুক্তির পর বঙ্গবন্ধু কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সরকারের আহ্বানে তিন পার্বত্য জেলাকে পর্যটন শিল্পকে ঢেলে সাজানোর লক্ষ্যে সেনাবাহিনী নিবেদিত প্রাণ হয়ে কাজ করছে। পার্বত্য জেলা শহর, নদী, সর্পিল রাস্তা, পাহাড় ও সবুজে ঘেরা সারি সারি গাছ, পাহাড়ের গুহা, ঝর্ণা, বিভিন্ন জাতি গোষ্ঠীর ঐতিহ্যময় সংস্কৃতি, জীবনধারা ও বিনোদনের জন্য পর্যটকদের আকর্ষণ বাড়াতে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সদস্যগণ সড়কপথ, অবকাঠামো উন্নয়ন সাধন করে অত্যন্ত সাহসী ভূমিকা নিয়ে বৈরী পরিবেশে কাজ করছে। পাহাড়ি সন্ত্রাসীদের হুমকি এবং দুর্গম পাহাড়ি পথে সড়ক নির্মাণ করে উল্লেখযোগ্য স্থানে পর্যটন শিল্প উন্নয়নে সেনাবাহিনীর সদস্যগণ নিরলসভাবে দায়িত্ব পালন করছে। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর নিরলস পরিশ্রমে নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ, অবকাঠামো নির্মাণ এবং রাত্রীযাপন করার সুবিধা তৈরীকরণের ফলে আজ হাজার হাজার সৌন্দর্য পিপাসু মানুষ পার্বত্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন দূর্গম স্থানে ভ্রমণ করার সুযোগ পাচ্ছে। 

জেলা সদর হাসপাতালগুলোতে স্বতন্ত্র কোভিড ইউনিটে কোভিড রোগীদের চিকিৎসা, ফ্লু কর্নার, আরটি পিসিআর ল্যাব, বেড সাইড সেন্ট্রাল অক্সিজেন সরবরাহ, বহি:বিভাগ সেবা: জেনারেল বহি:বিভাগ, শিশু বহি:বিভাগ, সার্জারি বহি:বিভাগ, গাইনী বহি:বিভাগ, শিশুবিকাশ কেন্দ্র (অটিজম রোগীদের সেবাসহ), দন্ত বহি:বিভাগ, চক্ষু বহি:বিভাগ, চর্ম বহি:বিভাগ, নাক, কান ও গলা বহি:বিভাগ, আন্ত:বিভাগ সেবা, জরুরী বিভাগ সেবা, সার্জারী, মেজর সার্জারী, মাইনর সার্জারী, নবজাতকের জন্য শেখ রাসেল স্কেন্যু সেবা, মাতৃ স্বাস্থ্য সেবা, প্রসব পূর্ব ও পরবর্তী সেবা, নরমাল ডেলিভারী (২৪ ঘন্টা), সিজারিয়ান সেকশনে (২৪ ঘন্টা) সেবা প্রদান করা হচ্ছে। এর পাশাপাশিও রোগ নির্ণয়, প্যাথলজি বিভাগ, এক্স-রে বিভাগ, ইসিজি, আল্ট্রাসনোগ্রাফি, জরায়ু ক্যান্সার সনাক্তকরণ (ভিআইএ), নিরাপদ রক্ত সঞ্চালন, সম্প্রসারিত টিকা দান কার্যক্রম, পুষ্টি সেবা (আইএমসিআই), সমাজ সেবার রোগী কল্যাণ কার্যক্রম, ওসিসি (সারভাইবলদের সহায়তা) প্রদান অব্যাহত রয়েছে। 

এর বাইরে দূর্গম এলাকাগুলোতে নিয়মিত চক্ষু সেবা ক্যাম্প, মেডিক্যাল ক্যাম্পেইনসহ নানা ভাবে চিকিৎসা সেবা দিচ্ছে সেনাবাহিনী। সব ছাড়িয়ে সম্প্রতি করোনার টিকা প্রদান কার্যক্রমে নিজেদের হেলিকপ্টার ব্যবহার করে পাহাড়ের দূর্গম এলাকায় পাহাড়ীদের টিকা দিয়ে অভাবনীয় প্রসংশা কুড়িয়েছে সেনাবাহিনী।

শান্তিচুক্তির পর পাহাড়ে সরকার ও সেখানকার আইন-শৃঙ্খলায় নিয়োজিত বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় কমে এসেছে চাঁদাবাজি। বেড়েছে পাহাড়ি-বাঙ্গালি সম্প্রীতি। পূর্বে যেখানে দিনে-দুপরে গাড়ি থামিয়ে, ব্যবসায়ীদের জিম্মি করে, অপহরণ করে বিরাট অঙ্কের চাঁদাবাজি হতো সেখানে তা এখন প্রায় নেই বললেই চলে। একটা সময় ছিলো, পাহাড়ি সড়কে বিকেল ৩টার পর কোন যানবাহন চলাচল করতো না সন্ত্রাসীদের ভয়ে, সেখানে আজ ২৪ ঘন্টাই বিলাশবহুল গাড়ি চলাচল করছে, যা শান্তিচুক্তির অভাবনীয় সাফল্য। 

শান্তিচুক্তির ২৫ বছরে এসে কি পরিবর্তন হলো পাহাড়ের? জানতে চেয়েছিলাম কয়েক জনের কাছে। কেউ বলছেন, বান্দরবান এলাকায় নির্মিত বাংলাদেশের সবচেয়ে উঁচু ৭২ কিলোমিটার সড়কের কথা। কেউ বলছেন, মেডিকেল কলেজ এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় জন-প্রত্যাশা পূরণ করেছে। তবে সাধারণ মানুষ বলতে চাইছেন, পার্বত্য ভূখন্ডে এমন অনেক দুর্গম এলাকা রয়েছে, যেখানে পাকা সড়ক নির্মাণ কখনও হবে- এমনটি ভাবনায় আসত না। এখন তা বাস্তব। মিজোরাম সীমান্ত পর্যন্ত নির্মিত সীমান্ত সড়কের কথাও বলছেন অনেকে। কেউ বলেন, বিদ্যুৎ সংযোগ ও মোবাইল-ইন্টারনেট সেবার কথা। কারও বিবেচনায় সরকার তো রেলপথ নির্মাণের কথাও ভাবছে। স্বাধীনতার ৫০ বছরে এসে দেশের অর্থনৈতিক, সামাজিক ও পারিপার্শি¦ক কর্মকান্ড নিয়ে বিশ্বব্যাপী প্রশংসা শুনতে পাই। পাশাপাশি চুক্তির ২৫ বছরে এসে পার্বত্য চট্টগ্রাম দেশের মূল ভূখন্ডের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলবে, এটা অনেকের ভাবনায় না আসলে আজ তা বাস্তবতা। চুক্তি এবং এর বাস্তবায়ন নিয়ে শুরুতে উপকারভোগীদের মধ্যে কিছু দ্বিধা-দ্বন্দ থাকলেও এ কথা অনস্বীকার্য যে, এ চুক্তির কারণেই পার্বত্য চট্টগ্রামের উপজাতি জনগোষ্ঠীর বাংলাদেশের সংবিধানের আওতায় রাজনৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক অধিকার এবং জাতিসত্তাগত স্বাতন্ত্র্য অক্ষুন্ন রাখার পাশাপাশি জাতীয় মূলধারার সঙ্গে সম্পৃক্ত হওয়ার বাতাবরণ সৃষ্টি হয়েছে। এছাড়া, পাহাড়ি-বাঙালি সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষা করে উন্নয়ন-অবকাঠামো দিন দিন বিকশিত হচ্ছে পাহাড়ে। পার্বত্য চট্টগ্রামে শান্তি ফেরাতে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সরকারের প্রচেষ্টায় শান্তিচুক্তি বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক, চুক্তির পূর্ণ বাস্তবায়নে সবাই একযোগে কাজ করতে পারলে শান্তির পথ সুগম হবে।

https://www.shomoyeralo.com/ad/Local-Portal_728-X-90 (3).gif

আরও সংবাদ   বিষয়:  লে. কর্নেল মাসুদ পারভেজ চৌধুরী   পিএসসি  




https://www.shomoyeralo.com/ad/Google-News.jpg

সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত


ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: কমলেশ রায়, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড
এর পক্ষে প্রকাশক গাজী আহমেদ উল্লাহ
নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।

ফোন : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৭৫। ই-মেইল : shomoyeralo@gmail.com