ই-পেপার বিজ্ঞাপনের তালিকা শনিবার ২৮ জানুয়ারি ২০২৩ ১৪ মাঘ ১৪২৯
ই-পেপার শনিবার ২৮ জানুয়ারি ২০২৩
https://www.shomoyeralo.com/ad/Amin Mohammad City (Online AD).jpg

https://www.shomoyeralo.com/ad/780-90.jpg
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ‘ক্যাম্পাস এলাকা’ হতে নিরাপদে থাকুন
সামি আল মেহেদী
প্রকাশ: রোববার, ৪ ডিসেম্বর, ২০২২, ৭:০০ এএম | অনলাইন সংস্করণ  Count : 220

আজ থেকে সাত-আট বছর আগের ঘটনা হবে বোধ করি। ঢাকা শহরে তীব্র যানজট এবং বেশুমার সড়ক দুর্ঘটনা, মানুষের মৃত্যু ইত্যাদি নিয়ে ফেসবুকে কোনো একটা র‌্যানডম পোস্টে আলাপ চলছিল। আমার একজন সহপাঠী, তার বছরখানেক আগে তখন বিয়ে হয়েছে। সঙ্গীর পেশাগত পরিচয়ের সুবাদে তিনি তখন আমাদের দেশের এমন এক বিশেষায়িত এলাকায় থাকেন (যেগুলো সারা দেশের বিভিন্ন জেলাতেও রয়েছে) যেখানে যানবাহনের প্রবেশাধিকার এবং চলাচল কঠোরভাবে সুনিয়ন্ত্রিত, ওই এলাকার বাসিন্দাদের বাইরের কোনো যানবাহন সেখানে ঢুকলেও নিয়মের যদি একচুল এদিক-ওদিক করে তাহলেই ‘খবর আছে’। 

তিনি তখন উদাহরণ দিয়ে বলছিলেন, ‘আমাদের এই এলাকায় তো কী সুন্দর সব নিয়ম মেনে চলে। এই নিয়ম তোমাদের এলাকাগুলোয় মানলেই তো হয়।’ তাকে পাল্টা এইটুকুই এভাবে বলেছিলাম, ‘তাহলে তো দেশের সব এলাকা তোমার বর্তমান এলাকার মতো করে দিতে হবে। তা কি সম্ভব? বিয়ের আগে যে এলাকায় থাকতে, সেখানে কি পেরেছিলে?’ এ নিয়ে বেশ হাসিঠাট্টাও হয়েছিল সে সময়। পুরোনো কথা। কোন এলাকায় কীভাবে চলাফেরা করা দরকার, দুর্ভাগ্যবশত একমাত্র সেই বন্ধুটির বিশেষায়িত এলাকা ছাড়া আর কোথাও আমাদের মানা তো হয়ই না, বরং পুরোটাই উল্টো।

আমরা একটি বিচিত্র জনপদে বসবাস করি, যেখানে ঠিক যেখানে দেয়ালে লেখা থাকে ‘এখানে ময়লা ফেলা নিষেধ’-সেখানেই এলাকার সব মানুষ এসে নিত্যদিনের ময়লা ফেলেন, যেখানে লেখা থাকে ‘এখানে প্রস্রাব করিলে ৫০ টাকা জরিমানা’-সেই জায়গাটাতেই মানুষ গিয়ে চলার পথে মূত্র বিসর্জনের প্রয়োজনটি সেরে নেন, যেখানে লেখা ‘সামনে হাসপাতাল জোরে হর্ন বাজাবেন না’-সেখানে সবচেয়ে তারস্বরে বাস, ট্রাক, রিকশা, বাইক, গাড়ি সবাই একযোগে হর্ন বাজাবেন, যেখানে লেখা ‘সামনে স্কুল ধীরে গাড়ি চালান’-সেখানে এত জোরে গাড়ি চালানো হয় যে ওভারব্রিজওয়ালা জায়গার সামনেও দুর্ঘটনা ঘটে।

আচ্ছা একটা প্রশ্ন করি? একটি বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের ভেতরে কোন ধরনের বাইরের গাড়ি চলাচল করা উচিত? বা যদি চলেও সেগুলোর গতি কেমন হওয়া উচিত? এর জন্য কোনো নীতিমালা বা নিয়ন্ত্রণের কেমন ব্যবস্থা থাকা উচিত? আর সব প্রশ্নের শেষে একটি সম্পূরক প্রশ্ন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতরে যানবাহন কীভাবে চলা উচিত? অন্য প্রশ্নগুলোর উত্তর এবং ব্যাখ্যা থাকতে পারে বা নীতিমালার যথাযথ প্রয়োগও বোধ করি হতে পারে। তবে সম্পূরক প্রশ্নটির কোনো উত্তর আমি একজন সাবেক শিক্ষার্থী হিসেবে আশা করি না। এর কারণ হিসেবে আমি দ্ব্যর্থভাবেই বলব যে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আমাদের ক্যাম্পাসটি আর যাই হোক কার্যত কোনো বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস হিসেবে নেই। বিভিন্ন প্রয়োজন, পরিস্থিতি আর প্রাসঙ্গিকতার একটি ব্যবহারিক পরিসর হয়ে উঠেছে এখানকার ‘ক্যাম্পাস’। 

আর ঠিক সেই কারণেই, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকার ভেতরে কীভাবে এমন একটি মর্মান্তিক দুর্ঘটনা ঘটল বলে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তুমুল আলাপ চলছে, সেই ‘কীভাবে’ প্রশ্নটির উত্থাপনার আমি ভিত্তি খুঁজে পাচ্ছি না। আরে বাবা, যেমন ইচ্ছে তেমন গাড়ি-ঘোড়া (টেকনিক্যালি, এই ক্যাম্পাসের ভেতরে নিয়মিত ঘোড়ার গাড়িও চলে) চালানোর জন্য তো এটিই সবচেয়ে ‘আদর্শ’ জায়গা। আমাদের এই বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের মধ্যে নিয়মিত চুরি, ছিনতাই, ডাকাতি, খুনোখুনি সব করা যায়। আর ঢাকা শহর বা দেশের অন্তত এই একটি জায়গা রয়েছে যেখানে ট্রাফিকের কোনো ধরনের নিয়ম বলেন বা নিয়ন্ত্রণ, তার কোনো কিছুই নেই। তো দুর্ঘটনা এখানে হবে না তো কোথায় হবে? এখানে যে প্রতিদিন দুর্ঘটনা আর প্রাণহানি ঘটছে না, তা তো নেহাত ভাগ্যের ব্যাপার মাত্র প্রাইভেট কারের আক্রমণে এবং নির্যাতনে যে নারী প্রাণ হারিয়েছিলেন, তিনি হয়তো এই এলাকা ব্যতিরেকে অন্য কোনো এলাকায় এই অ্যাক্সিডেন্টে প্রাণ হারাতেন না। 

সেখানে বাইকটিকে ধাক্কা দেওয়ার পর গাড়িটি বেশিদূর যেতে পারত না, বা থেমে যেতে হতো ট্রাফিকের জন্য। আঘাতকারী চালক এই বিশ্ববিদ্যালয়েই শিক্ষকতা করেছেন, আর সেই সুবাদে এই এলাকায়, আর কেবলমাত্র এই এলাকাতেই যে এমন ভয়াবহ বেপরোয়া এবং হিংস্র নৃশংস কাজ করে পার পেয়ে যাওয়ার সুযোগ রয়েছে; সেটি তার চেয়ে ভালো আর কেইবা জানতে পারতেন? আর এ জন্যই তিনি অত্যন্ত সচেতনভাবে দ্রুতগতিতে গাড়ি নিয়ে এই এলাকা দিয়ে অন্য কোনোদিকে চলে যাওয়ার চেষ্টা করেছিলেন হয়তো। তিনি জানতেন এখানে নিয়মনীতির বালাই তো নেই, বরং আরও বেশি বেশি অপরাধ করে আরাম করে পার পেয়ে যাওয়ার জন্য এমন দারুণ এলাকা আর হয় না। যে কারণে তিনি নেহাত তার অপরাধটিকে ফাঁকি দেওয়ার জন্যই দ্রুত পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছেন, যে মানুষটিকে তিনি পুরোটা সময় ধরে হিংস্র এবং অন্ধভাবে হত্যা করেছেন, তার জন্য সামান্যতম করুণাও তার হয় না।

অবশ্য বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতার পেশায় নিয়োজিত থাকার সময়েও তার তেমন করুণ প্রদর্শন বা নিয়মনীতির প্রতি ন্যূনতম অনুরাগের তেমন কোনো খতিয়ান পাওয়া সম্ভব নয় বলেই বোধ করি। এমন ‘ভয়াবহভাবে’ গাড়ি চালানো এই এলাকায় কীভাবে সম্ভব ভেবে বা বলে যারা শিউরে উঠছেন, তাদের জন্য বলতে চাচ্ছি, এই এলাকাটি এ রকম ভয়াবহভাবে গাড়ি চালানোর জন্য সবচেয়ে ‘সুবিধাজনক’ জায়গা। এখানে রাতের বেলা নিয়মিত বিভিন্ন এলাকা থেকে রাতের বেলা প্রাইভেট কার, মোটরসাইকেল ইত্যাদি গাড়ি এসে রেসিং খেলে থাকে। রাত-বিরাতে সেসব রেসিং খেলার বা গতি পরীক্ষার তুমুল আওয়াজ বিশ্ববিদ্যালয় এলাকার বাসিন্দারা ভালোভাবেই জানেন। আর বিশাল বিশাল সব ট্রাক, বাস, লরিও এই এলাকার মধ্য দিয়ে দিনে-রাতে সব সময় ‘আরামসে’ যেতে পারে। এই দুর্ঘটনাটি যদি রাতের বেলা ঘটত, নিশ্চিত থাকুন, আক্রমণকারী চালক নাকে তেল দিয়ে ঘুমোতে ঘুমোতে এই এলাকা পার হয়ে যেতে পারতেন। অন্য কোথাও এমন ‘নিরাপত্তা’ আপনি আর কোথায় পাবেন, বলুন?

এমতাবস্থায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ‘ক্যাম্পাসের ভেতরে’ এমন ঘটনা কীভাবে ঘটল তাতে বিস্ময় প্রকাশ করার কিছু নেই। সারা দেশের সড়কপথের যে অনিরাপত্তা, প্রাণহানি আর সেই সংক্রান্ত আইনের প্রয়োগহীনতা, সেটি এখানেও একই দশায়। বরং বলা যায়, এখানে সর্বোচ্চ অনিরাপত্তায় বহাল তবিয়তে বিরাজমান। আর সেই কারণেই, আর ১০টি সচরাচর সড়কপথের মতো এই বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন সড়কগুলোতেও পূর্ণাঙ্গ ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা এবং নিয়ন্ত্রণ জরুরিভাবে প্রয়োজন। এই এলাকায় সড়ক দুর্ঘটনা নতুন কিছু নয়, আর ভবিষ্যতে আরও ঘটতে থাকবে। কারণ দিন দিন এখানে মানুষের আগমনের হার বাড়ছে, মেট্রোরেল চালু হয়ে যাওয়ার পরে সেটি আরও বৃদ্ধি পাবে। কাজেই ‘বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস’ ধারণায় হ্যাংওভার না থেকে এখানে সড়ক নিরাপত্তার জন্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রয়োগ প্রয়োজন। প্রশাসন কিংবা যে বা যারাই এর দেখভাল করে, তারা যদি একটু দয়া করে মনে করে যে মিছিল-মিটিং-সমাবেশ নিয়ন্ত্রণের মতো যানবাহন নিয়ন্ত্রণও একটু জরুরি, তাহলে একটু হয়তো কিছু প্রাণ বাঁচবে।

আপনি কি কোনোভাবে কল্পনা করতে পারেন যে, ক্যান্টনমেন্ট এলাকায় একটি প্রাইভেট কার কোনো একজন সাধারণ আরোহীকে গাড়ির তলায় পিষতে পিষতে তুমুল গতিতে মাইলখানেক এলাকা পার করে ফেলতে পারে? বা ধাক্কা দিয়ে গাড়ি না থামিয়ে দিব্যি দিনের বেলা তুমুল গতিতে পালিয়ে যাওয়ার চিন্তা করতে পারে? যদি সেভাবে কল্পনা করতে পারেন, তাহলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে এমন দুর্ঘটনায় অবাক হতে পারাটা আপনার জন্য ঠিক আছে। আর যদি করতে না পারেন, তাহলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস এলাকায় এলে সাবধানে চলাফেরা করুন। মনে রাখবেন, সড়ক থেকে যেকোনো ধরনের দুর্ঘটনা বা বিপদ ঘটার জন্য এর চেয়ে অনিরাপদ জায়গা খুব বেশি একটা নেই।

লেখক: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী

https://www.shomoyeralo.com/ad/Local-Portal_728-X-90 (3).gif



https://www.shomoyeralo.com/ad/Google-News.jpg

সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত


ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: কমলেশ রায়, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড
এর পক্ষে প্রকাশক গাজী আহমেদ উল্লাহ
নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।

ফোন : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৭৫। ই-মেইল : shomoyeralo@gmail.com