ই-পেপার বিজ্ঞাপনের তালিকা শনিবার ২৮ জানুয়ারি ২০২৩ ১৪ মাঘ ১৪২৯
ই-পেপার শনিবার ২৮ জানুয়ারি ২০২৩
https://www.shomoyeralo.com/ad/Amin Mohammad City (Online AD).jpg

https://www.shomoyeralo.com/ad/780-90.jpg
‘এই ছাত্রলীগ’ দিয়ে কী হবে?
আনিসুর রহমান
প্রকাশ: সোমবার, ৫ ডিসেম্বর, ২০২২, ১১:০৮ এএম | অনলাইন সংস্করণ  Count : 173

দিন কয়েক আগে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের ছাত্রলীগের এক সম্মেলনে বিরক্তমাখা কিছু কথা ঝেড়েছেন, যা অতীব সঙ্গত, প্রাসঙ্গিক এবং তাৎপর্যপূর্ণ।

একবার দলের সভা আহ্বান করার জন্য দলের নেতা মওলানা ভাসানীর সঙ্গে কথা বলা দরকার। ভাসানী নানা জায়গায় ছুটে বেড়ান দেশের আনাচে-কানাচে। অনেক সময় খবর থাকে, অনেক সময় খবর থাকে না। তখন তো আজকের মতো মোবাইল ছিল না, যোগাযোগ ব্যবস্থাও যাচ্ছেতাই। একবার ভাসানীর তালাশে বের হয়েছেন। খুঁজতে খুঁজতে পেয়েছেন সিরাজগঞ্জের এক অজপাড়াগাঁয়ে। ইতিমধ্যে রাত হয়ে গেছে। কী করবেন? ভাসানী এবং তরুণ শেখ মুজিব গ্রামের এক দরিদ্র পরিবারের কুঁড়েঘরেই রাতযাপন করেছেন

ওই সমাবেশের বিশাল মঞ্চে উপবিষ্ট ছাত্রলীগের নেতাদের বহর দেখে মন্ত্রী যেমন হতবাক, হতবাক অনেকেই। ওবায়দুল কাদের কোনো রাখঢাক না রেখে খোলামেলা কিছু সত্যবচন করেছেন ছাত্রলীগ এবং এই সংগঠনের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের নাম উল্লেখ করে। এই মহামহিম নেতৃদ্বয় অনুষ্ঠানের যাবতীয় সময়ের প্রায় পুরোটাই নিজেরা বক্তৃতা করেছেন। আমন্ত্রিত ডজনখানেক কেন্দ্রীয় নেতাকে বক্তৃতা করার মতো সুযোগ দেওয়া হয়নি। 

এ অবস্থা যে কেবল ছাত্রলীগের তা কিন্তু নয়। ‘যে যায় লঙ্কায় সেই হয় রাবণ’-এ রকম কথার প্রতিধ্বনি করে বলা যায় সামরিক শাসন আর বিএনপি-জামায়াত আমলের ছাত্রদল-‘রগকাটা বাহিনী’খ্যাত ছাত্রশিবির, জাতীয় পার্টির এরশাদের সামরিক জমানার জাতীয় ছাত্রসমাজ আর আওয়ামী লীগ শাসনামলের ছাত্রলীগের আচরণের মধ্যে মোটাদাগের পার্থক্য কী? অতীতের সোনালি ইতিহাস দিয়ে তো বর্তমানের কলঙ্ক ঢেকে দেওয়া যাবে না।

ওবায়দুল কাদের খোলাখুলি বলেছেন তারা ‘এই ছাত্রলীগ’ চান না। তাহলে কি ওবায়দুল কাদেরের মতো দেশের মানুষের অনেকের কাক্সিক্ষত ছাত্রলীগ হাল আমলের ছাত্রনেতৃত্বের দাপটে কোণঠাসা এবং কার্যত অদৃশ্য?

ওবায়দুল কাদের ‘এই ছাত্রলীগ’ বলতে যাই বুঝিয়ে থাকুন, আদতে দৃশ্যমান ছাত্রলীগের যে চেহারা তা ওবায়দুল কাদের বলতে যাই বুঝিয়ে থাকুন, আদতে দৃশ্যমান ছাত্রলীগের যে চেহারা তা কার্যত একটা ‘ককটেল ছাত্রলীগ’ এই ককটেলে যেমন রয়েছে খাঁটি বঙ্গবন্ধুর চেতনায় বিশ্বাসী, তেমনি এর বাইরের ছাত্রদল, ছাত্রসমাজ, ছাত্রশিবির এমনকি বামধারার উপাদানও কি এর ভেতরে নেই? সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ছাত্রলীগের ভেতরে বঙ্গবন্ধুর আদর্শের ধারা এবং প্রগতিশীল বামধারাটা বড়ই কোণঠাসা অবস্থায় থাকেনি কি বরাবর? এদের খুঁজে পাওয়া যায় আওয়ামী লীগ যখন বিরোধী দলে থাকে তখন। টানা প্রায় দেড় দশক ক্ষমতায় থাকার পর গঠনমূলক ইতিবাচক ধারাটি যারপরনাই ম্রিয়মাণ।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশব্যাপী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর ছাত্র সংসদের নির্বাচন কেন হচ্ছে না? সরকার যদি চায় এমন কোনো শক্তি কি আছে ছাত্র সংসদের নির্বাচন ঠেকাতে পারে?

ক্ষমতাসীন ছাত্র সংগঠনগুলোর কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া নেতাদের এমনতর ভাবমূর্তি ছাত্র সংসদের নির্বাচনে ভোটে জিতে আসা তাদের জন্য অত সহজ নয়। অন্যদিকে প্রায় সব ছাত্র সংগঠনের নেতা পর্যায়ের বেশিরভাগই হয় আদু ভাই নয়তো ছাত্রত্বই নেই। যে কারণে ছাত্রলীগসহ প্রায় সব ছাত্র সংগঠন ছাত্র সংসদের নির্বাচনের ব্যাপারে চুপসে থাকে।

দেশে এত এত গবেষণা, এত এত ‘পিএইচডি’ তকমাধারী, এদের কেউ কি ‘এই ছাত্রলীগ’ নিয়ে একটা গবেষণা করেছেন? করে না থাকলে আসন্ন সময়ের কোনো গবেষক কি এগিয়ে আসবেন ‘এই ছাত্রলীগ’ নিয়ে একটা গবেষণা করতে। পত্রিকায় খবর বেরিয়েছে ‘এই ছাত্রলীগের’ সভাপতি এবং সাধারণ সম্পাদক পদের জন্য ফরম জমা দিয়েছেন ২৫৪ জন। এতই যদি নেতা থেকে থাকে তাহলে কর্মী কারা?

গল্প এবং প্রশ্ন থাক। অন্যান্য দেশের ছাত্ররাজনীতির হালহকিকতের একটা নিশানা করা যাক। বেশি দূরে যেতে হবে না। প্রতিবেশী ভারত, নেপাল, শ্রীলঙ্কার খোঁজ নিয়ে দেখুন। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অছাত্র ঢুকে খবরদারি করা এতটা ডালভাত, পান্তাভাত নয় যতটা আমাদের বাংলাদেশে। আর ছাত্ররাজনীতির নামে ক্ষমতাসীন দলের ছাত্র সংগঠনের এরকম নির্লজ্জ কাণ্ডজ্ঞানহীন মহড়াও কোনো দেশে আছে কি?

চার দশক আগে যারা ছাত্ররাজনীতির নেতৃত্বের নানা পর্যায়ে থাকতেন তারা পরে সবাই যে রাজনীতি বা প্রশাসনে জায়গা দখল করে নিতেন তা কিন্তু নয়। তাদের তাৎপর্যপূর্ণ অবস্থান এবং অবদান থাকত জ্ঞানবিজ্ঞান, সমাজ-সংস্কৃতি, সাহিত্য ও ব্যবসা-বাণিজ্যের নানা পর্যায়ে। তখন মেধা ও উৎকর্ষের দরদ যত্ন ও কদর করা হতো। এমনকি প্রয়াত পরমাণু বিজ্ঞানী এমএ ওয়াজেদ মিয়া ছাত্রলীগ থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফজলুল হক হল ছাত্র সংসদের সহসভাপতি ছিলেন।

এখন তেলায়ে চামচায়ে তুঘলকি মস্তানি খেদমতে জিন্দেগি করে করে ছাত্ররাজনীতি আজকের রূপান্তর বা মেটামরফোসিস হয়নি কি? এ রকমটা নিশ্চয় একদিনে হয়নি। আর তা ওবায়দুল কাদেরের মতো প্রাজ্ঞ নেতাদের অগোচরে অবশ্যই হয়নি। কেলেঙ্কারি যে কেবল বিদায়ি সভাপতি সাধারণ সম্পাদক করেছেন তা নয়। যাদেরকে খেদিয়ে এদেরকে নেতৃত্বে বসানো হয়েছিল তাদের বিরুদ্ধেও ছিল বিস্তর অভিযোগ।

এখন প্রশ্ন হলো দেশের হাজার হাজার কর্মী, নেতা এবং সাধারণ ছাত্র থেকে নেতা বাছাইয়ের ছাকনি বা দ্রবণপ্রক্রিয়া কী? তুলনামূলক গ্রহণযোগ্য নেতা ছেনে-ছেঁকে তুলে আনার কার্যকর প্রক্রিয়া হচ্ছে নিয়মিত ছাত্র সংসদ নির্বাচন। দেশে যদি ছাত্র সংসদের প্রয়োজন না থাকে, ছাত্র সংসদের নির্বাচনের গুরুত্ব ক্ষমতাসীনরা উপলব্ধি না করেন। তাহলে পরিষ্কার করে বলে দিন, ছাত্র সংসদের দরকার নেই। এরপরের কথা সাফ সাফ তাহলে ছাত্ররাজনীতিরও দরকার নেই।

এভাবে চলতে থাকলে ভবিষ্যতে কার্যত একটা নেতৃত্বের বন্ধ্যত্ব দেখা দেবে। এখানে বলে নিই, পদ মানেই কিন্তু নেতৃত্ব না। নেতৃত্ব একটা গুণ, যার মধ্যে থাকবে যোগ্যতা, বিবেচনাবোধ বিবেক এবং ব্যক্তিত্বের সমাহার-যা ‘এই ছাত্রলীগে’র বিদায়ি নেতাদ্বয়ের মধ্যে ঘাটতি ছিল না কি? যা ওবায়দুল কাদের পরিষ্কার ইঙ্গিত করেছেন।

বৃক্ষ তার নাম কী, ফলে পরিচয়। নেতার নেতৃত্বও প্রকাশ পাবে আচরণে কথা ও কাজে, ‘পদে নয়’। আমার জানতে ইচ্ছা করে এই ছাত্রলীগের বিদায়ি নেতার বহর এবং পদপ্রত্যাশী ভাইবোনদের উদ্দেশে একটা প্রশ্ন, তারা কি বঙ্গবন্ধুর লেখাজোখা নিদেনপক্ষে তাঁর তিনটি বই ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’, ‘আমার দেখা নয়াচীন’ এবং ‘কারাগারের রোজনামচা’ পড়েছেন? আপনাদের কি মনে আছে তরুণ বঙ্গবন্ধু কলকাতায় এক রাতে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর সঙ্গে মতভেদ হয়। সোহরাওয়ার্দীর একটি কথার যুক্তিসঙ্গত প্রতিবাদ করে তরুণ শেখ মুজিব বেরিয়ে আসেন। সোহরাওয়ার্দী সঙ্গে সঙ্গে তরুণ শেখ মুজিবকে কাছে টেনে নিয়ে অভিমান ভাঙান।

১৯৪০-এর দশকে সোহরাওয়ার্দীর নির্দেশে কলকাতা থেকে বাংলাদেশের উত্তরবঙ্গে এসেছেন দিনরাত দীর্ঘ যাত্রা করে দলের এক প্রাদেশিক পরিষদ সদস্যের কাছে বার্তা নিয়ে। এত রাতে সেই নেতা তরুণ শেখ মুজিবকে আপ্যায়নও করেনি রাতটা থেকে যেতেও বলেনি। এই নেতার বাড়ি থেকে গভীর রাতে বের হয়ে তরুণ শেখ মুজিব আক্ষেপের সুরে স্বগতোক্তি করেছেন আর যাই হোক এসব এমএলএ দিয়ে দেশের মানুষের মঙ্গল হবে না।

এ রকম হাজারটা ঘটনা ঘটেছে বঙ্গবন্ধুর জীবনে। একবার দলের সভা আহ্বান করার জন্য দলের নেতা মওলানা ভাসানীর সঙ্গে কথা বলা দরকার। ভাসানী নানা জায়গায় ছুটে বেড়ান দেশের আনাচে-কানাচে। অনেক সময় খবর থাকে, অনেক সময় খবর থাকে না। তখন তো আজকের মতো মোবাইল ছিল না, যোগাযোগ ব্যবস্থাও যাচ্ছেতাই। একবার ভাসানীর তালাশে বের হয়েছেন। খুঁজতে খুঁজতে পেয়েছেন সিরাজগঞ্জের এক অজপাড়াগাঁয়ে। ইতিমধ্যে রাত হয়ে গেছে। কী করবেন? ভাসানী এবং তরুণ শেখ মুজিব গ্রামের এক দরিদ্র পরিবারের কুঁড়েঘরেই রাতযাপন করেছেন।

এর বিপরীতে হাল আমলের ‘এই ছাত্রলীগে’র একজন নেতা ঢাকা থেকে পাবনায় সভা করার জন্য হেলিকপ্টারে চড়েন। এমন ঘটনা ঘটেনি কি? এই পর্যায়ে বলে নিতে চাই, মূলত তারুণ্যকে দমিয়ে রাখতেই ১৯৭৫ সালের পর থেকে সামরিক জমানায় অর্থ আর অস্ত্রের সমাহার ঘটিয়ে ছাত্ররাজনীতিকে কলুষিত করা হয়েছিল। তার ধারাবাহিকতা থেকে ছাত্ররাজনীতি বের হয়ে আসতে পারেনি। 

তবে টানা দেড় দশক ক্ষমতায় থাকার পর আওয়ামী লীগ নেতাদের এখন আর অন্যের ওপর দোষ চাপানোর সুযোগ খুব একটা নেই। তাই অগ্রপশ্চাৎ বিবেচনা করে কেবল নিজেদের স্বার্থে নয়, দেশ ও জাতির স্বার্থেই ছাত্ররাজনীতিকে তার নিজস্ব ধারায় ফিরিয়ে আনার কাজটি ক্ষমতাসীন মহলকেই করতে হবে। তা কেবল জয়-লেখক নেতৃত্বের ওপর দোষ চাপিয়ে নয়। এমনকি ‘বিচ্ছিন্নভাবে’ উষ্মা প্রকাশ করে বা সবক দিয়ে এই ‘ছাত্রলীগ’-এর পুনরুদ্ধার সম্ভব নয়।

ছাত্ররাজনীতির কলুষমুক্ত করার কার্যকর উপায় হচ্ছে কেবল সবক না দিয়ে সব ছাত্র সংসদের নিয়মিত নির্বাচনের উদ্যোগ নেওয়া।

লেখক: বাঙালি সুইডিশ কবি ও নাট্যকার, সুইডিশ 
লেখক সংঘের পরিচালনা বোর্ডের সদস্য

https://www.shomoyeralo.com/ad/Local-Portal_728-X-90 (3).gif



https://www.shomoyeralo.com/ad/Google-News.jpg

সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত


ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: কমলেশ রায়, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড
এর পক্ষে প্রকাশক গাজী আহমেদ উল্লাহ
নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।

ফোন : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৭৫। ই-মেইল : shomoyeralo@gmail.com