ই-পেপার বিজ্ঞাপনের তালিকা শনিবার ২৮ জানুয়ারি ২০২৩ ১৪ মাঘ ১৪২৯
ই-পেপার শনিবার ২৮ জানুয়ারি ২০২৩
https://www.shomoyeralo.com/ad/Amin Mohammad City (Online AD).jpg

https://www.shomoyeralo.com/ad/780-90.jpg
শীতার্তদের পাশে দাঁড়ান
মোহাম্মদ শাহাবুদ্দিন
প্রকাশ: বুধবার, ২৫ জানুয়ারি, ২০২৩, ৬:২০ এএম | অনলাইন সংস্করণ  Count : 99

শীতে কাঁপছে সারা দেশ। হাড় কাঁপানো শীতে মানুষের ত্রাহি ত্রাহি অবস্থা। সাধারণ মানুষের জীবন যেন অচল। ঘর থেকে বের হতে পারছে না। কাজকর্ম তো করার উপায় নেই। কাজ না করতে পারলে টাকা পাবে কোথায়? চাল-ডাল কিনবে কী দিয়ে? কীভাবে নিজে বাঁচবে? বাঁচাবে পরিবার? এ রকম হাজারটা প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে খেটেখাওয়া মানুষের মাথায়। 

প্রশ্নে প্রশ্নে প্রশ্নবিদ্ধ কিন্তু কোনো উত্তর খুঁজে পাচ্ছে না। কে দেবে উত্তর তা-ও জানে না সাধারণ অসহায় মানুষ। তীব্র শীত আর কুয়াশায় বিপর্যস্ত তাদের জীবন। যে জীবনে দুঃখবেদনা আছে কিন্তু সুখের এতটুকু ছোঁয়া নেই। চরম বিপাকে আছে তারা। ছিন্নমূল খেটে খাওয়া মানুষের অবস্থা আরও নাজুক। একে তো নুন আনতে পান্তা ফুরায় তার মাঝে আবার শীতের কষ্ট। দুয়ে মিলে নাকাল সাধারণ ও অতি সাধারণ মানুষ। 

বাংলাদেশের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা নেমেছিল পঞ্চগড়ে, ৬ দশমিক ৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস। যার বিরূপ প্রভাব পড়েছে জনজীবনে। উত্তরবঙ্গের মানুষের অবস্থা বেগতিক। তারা জীবন বাঁচাবে নাকি জীবিকার খোঁজে বের হবে? আগুন জ¦ালিয়ে, অতিরিক্ত গরম কাপড় পরিধান করেও শীতে কাঁপছে গরিব অসহায় মানুষ। 

হিমেল হাওয়া ও ঘন কুয়াশায় স্থবির দেশের উত্তর জনপদ। দিনের বেশির ভাগ সময় ঘন কুয়াশায় ঢাকা থাকে রাস্তাঘাট। কনকনে ঠান্ডায় থেমে গেছে জীবন। কাজ না থাকায় কষ্ট আরও বেড়েছে শ্রমজীবী মানুষের। ব্যাহত হচ্ছে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা। উত্তরাঞ্চলসহ দেশের অধিকাংশ জেলায় বইছে মৃদু শৈত্যপ্রবাহ। তীব্র শীতে মানুষের ভোগান্তির পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে শীতকালীন ফসল। শীতে জবুথবু মানুষ জীবিকার তাগিদে কুয়াশা ও ঠান্ডা উপেক্ষা করে কর্মস্থলে ছুটতে বাধ্য হচ্ছেন। তবে ঘন কুয়াশার কারণে রাস্তাঘাট বন্ধ থাকায় কাজে যেতে পারছে না অনেক দিনমজুর, ছিন্নমূল মানুষ। পরিবার-পরিজন নিয়ে তারা মানবেতর জীবন কাটাচ্ছেন।

মাঘের হাড় কাঁপানো শীতে কাঁপছে রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশ। রাজশাহী, পাবনা, দিনাজপুর, পঞ্চগড়, নীলফামারী, যশোর, চুয়াডাঙ্গা ও কুষ্টিয়ার ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া শৈত্যপ্রবাহে অসহায় মানুষ আরও অসহায় হয়ে পড়েছে। শীতের এমন দাপটের অন্যতম প্রধান কারণ পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হয়ে যাওয়া। পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা ঘুরেফিরে এই কথাটাই বলছেন। 

পরিবেশের ভারসাম্য ঠিক থাকলে ঠান্ডা গরম দুটোই পরিমিত অনুভব নয়। গাছপালা কেটে পরিবেশ বিনষ্ট করলে এর খেসারত দিতে হয় সমানতালে। একটা দেশে কমপক্ষে ২৫ শতাংশ বনভূমি থাকতে হয়। বাংলাদেশে বনভূমির পরিমাণ ১৫ শতাংশের নিচে। পরিবেশবিদরা বলছেন, এই কারণে বাংলাদেশের পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হয়ে গেছে। সামনের দিনগুলোতে আরও নষ্ট হবে। 

‘পরিবেশ বাঁচলে মানুষ বাঁচবে’- এই স্লোগানটির কথা যদি মানুষ মনে রাখত তাহলে অকালবন্যা, ঝড়-জলোচ্ছ্বাস প্রচণ্ড শৈত্যপ্রবাহ সবকিছু থেকেই অনেকটা রেহাই পেত। 

বাংলাদেশের মানুষের কপাল এতটাই খারাপ যে নানা কারণে গাছপালা কেটে উজাড় করছে সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন সংস্থা। বিপাকে পড়ছে সাধারণ মানুষ। সারা দেশে বয়ে যাওয়া শৈত্যপ্রবাহ শীতকালের জন্য স্বাভাবিক ঘটনা। কিন্তু বাংলাদেশের জন্য তা কতটা স্বাভাবিক এ প্রশ্ন সহজেই এসে যায়। 

শীতপ্রধান দেশের জন্য ৭ ডিগ্রি তাপমাত্রা কোনো শীতই নয়। কারণ তারা শূন্য ডিগ্রির নিচে বসবাস করে অভ্যস্ত। বাংলাদেশের জন্য ৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস মানে অনেক বড় ঘটনা। এ দেশের বেশির ভাগ মানুষেরই অতটা শক্তিশালী শীতবস্ত্র নেই, যা দিয়ে তারা ৭ ডিগ্রি তাপমাত্রা হতে রেহাই পাবে। সাধারণ শীতের প্রকোপ থেকে বাঁচার প্রস্তুতি বেশিরভাগ মানুষেরই আছে। এত প্রচণ্ড শীত থেকে নিজেকে রক্ষা করার ব্যবস্থা হাতে গোনা কয়েকজনের আছে। তারা আবার উচ্চবিত্ত কিংবা উচ্চ মধ্যবিত্ত। নিম্নবিত্তের মানুষের যত জ¦ালা। তারা না পারে পেটের খাবার জোগাড় করতে না শীতবস্ত্র ক্রয় করতে। 

সরকারি-বেসরকারি সংস্থা শীতার্ত মানুষের সেবায় এগিয়ে আসে। তবে এর পেছনে বেশিরভাগই সময়ই থাকে ব্যবসার ধান্দা। মানবসেবার সঙ্গে ব্যবসাকে জড়ালে আর যাই হোক মানবসেবা হয় না। কোনো কোনো বেসরকারি সংস্থা মানবসেবার নামে লোক-দেখানো কিংবা ডোনারদের দেখানোর কাজ করছে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। 

শীতবস্ত্র বিরণের আগে তারা খুঁজে টেলিভিশন ক্যামেরা। শীতবস্ত্র হাতে দাঁড়িয়ে আছে কোনো বেসরকারি সংস্থার (এনজিও) বড় কর্তা, অপেক্ষা করছেন টিভি ক্যামেরার জন্য। এদিকে হাড় কাঁপানো শীতে অপেক্ষারত মানুষগুলোর অবস্থা বারোটা। এমন দৃশ্যের অভাব নেই। টেলিভিশন খুললে পাওয়া যায় ভূরি ভূরি প্রমাণ। 

ছেলে-বুড়ো, বৃদ্ধ-বৃদ্ধা দাঁড়িয়ে আছে আর ঠক ঠক করে কাঁপছে। তীর্থের কাকের মতো অপেক্ষা করছে একটা কম্বল কিংবা অন্য কোনো শীতবস্ত্র পাওয়ার। তার অপেক্ষার যেন অন্ত নেই। অসহায় মানুষদের অসহায়ত্ব নিয়ে ব্যবসারও অন্ত নেই। 

গণমানুষের কষ্ট নিয়ে ব্যঙ্গবিদ্রƒপ করার মতো মানুষও আছে আমাদের সমাজে। ফেসবুকে আছে এর অসংখ্য প্রমাণ। সামাজিক এই মাধ্যমটি খুললেই দেখা যায় অসহায় মানুষ দাঁড়িয়ে আছে আর এনজিওর লোকজন ভিডিও করছে। মনে প্রশ্ন জাগে, সভ্যতা আসলে কোথায়? মানুষের অসহায়ত্বকে নিয়ে ব্যবসা করা আর যাই হোক মানবিকতার কাতারে পড়ে না। 

আদিম যুগের মানুষের মাঝেও একটা মানবিকতা ছিল। তারা গাছের ছাল-বাকল দিয়ে লজ্জা নিবারণ করত কিন্তু একজন আরেক জনের পাশে থাকত। বিপদে-আপদে, সময়ে-দুঃসময়ে সবসময় সহায়তার হাত বাড়াত। দলবদ্ধভাবে চলত সবাই। বন্যপশু ও জীবজন্তুর হাত থেকে নিজেদেরকে রক্ষা করত যুথবদ্ধভাবে।

আদিম যুগ পার করে আমরা আধুনিক যুগে এসেছি বটে কিন্তু আমাদের মানবিকতার খুব বেশি উন্নয়ন হয়েছে বলে মনে হয় না। একে অপরের পাশে নিঃস্বার্থভাবে দাঁড়ানোর যে শিক্ষা পৃথিবীর জন্ম থেকে মানুষ পেয়েছে তা কেন যেন আজ ভুলতে বসেছে। শীতের প্রচণ্ড দাপটের সময় কোনো কোনো মানুষের আচরণ মানবিকতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। 

প্রকৃতির নিয়মে শীত গ্রীষ্ম বর্ষা শরৎ হেমন্ত বসন্ত সবই আসবে। ঋতুগুলোকে বরণ করা এবং মোকাবিলা করা মানুষের কাজ। সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় আমরা পাড়ি দেব বিপদসঙ্কুল মহাসমুদ্র। তা-ই স্বাভাবিক। কিন্তু স্বাভাবিক এই কাজটি স্বাভাবিক গতিতে হচ্ছে না। একেকটা বিপদ চোখে আঙুল দিয়ে তা দেখিয়ে দেয়। চলমান শৈত্যপ্রবাহ থেকে এমন অনেক অমানবিক শিক্ষা আমরা পেয়েছি, পাচ্ছি।

যেকোনো বিপদে-আপদে, দৈব-দুর্বিপাকে মানুষের পাশে দাঁড়ানো সরকারের প্রথম এবং প্রধান কাজ। সরকার এই কাজটি যথাযথ করছে কি না তা নিয়ে দেশের যে কোনো নাগরিক প্রশ্ন করার অধিকার রাখে। শীতে মানুষ কষ্ট পাচ্ছে বিষয়টা অবশ্যই সরকারকে ভাবাচ্ছে। দুঃখজনক হলেও সত্যি যে যেসব এলাকার মানুষ শীতের কারণে ঘর থেকে বের হতে পারছে না তারা কি খেয়ে আছে নাকি না খেয়ে আছে সে খবরটুকু জেলা প্রশাসকের কাছ থেকে পাওয়া যাচ্ছে না। বিষয়টিকে তারা দায়িত্বের আওতায় ধরছেন কি না সন্দেহ। 

সরকারি চাকরিজীবীদের বলা হয় প্রজাতন্ত্রের কর্মকর্তা-কর্মচারী। জনগণের টাকায় তাদের বেতন-ভাতা হয়। তারা হলেন দেশের মানুষের সেবক। সেবাদান করা তাদের দায়িত্ব ও কর্তব্য। সেই দায়িত্ব ও কর্তব্যে অবহেলার যথেষ্ট ছাপ পাওয়া যাচ্ছে শৈত্যপ্রবাহের এই বিপদকালে। 

উত্তরবঙ্গের কোনো একটা জেলার জেলা প্রশাসক নাকি শৈত্যপ্রবাহের যন্ত্রণা সামাল দিতে না পেরে সপরিবারে ঢাকায় চলে এসেছেন। নিজের পরিবারের লোকদেরকে রাজধানী ঢাকায় নিরাপদ আশ্রয়ে রেখে চলে গেছেন কর্মস্থলে। সেখানে যে মানুষগুলো অসহনীয় শীতযন্ত্রণা সহ্য করছে তাদের পাশে তিনি কতটা দাঁড়াবেন, আদৌ দাঁড়াবেন কি না সন্দেহ। 
মানবসেবার জন্য আলাদা একটা মন থাকতে হয়। সে মনটা কতজন সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীর আছে তা বলাবাহুল্য। একেকটা বিপদ তাই সাধারণ মানুষকে নানা শিক্ষা দেয়। তারা দেশের সেবকদের সম্পর্কে নেতিবাচক ইতিবাচক সব রকম ধারণা পায়। আসলে তারা সেবক নাকি নিজেদের আখের গোছাতে ব্যস্ত সে প্রশ্নটা চলে আসে সামনে। 

এবারের শৈত্যপ্রবাহটা বেশ কিছুদিন স্থায়ী হয়েছে। আবহাওয়া অধিদফতর বলছে আবার নাকি বড় শৈত্যপ্রবাহ আসবে। কদিনের মধ্যেই শুরু হবে বৃষ্টি। তারপর প্রচণ্ড শীতের মারণঘাতী আক্রমণ। সে আক্রমণ থেকে নিজেদের রক্ষার জন্য আগাম প্রস্তুতি আবশ্যক। সে প্রস্তুতি যতটা না মানুষ ব্যক্তিগতভাবে নেবে তার চেয়ে শতগুণ বেশি নিতে হবে সংশ্লিষ্টদের। তারা চাইলে সারা দেশের মানুষকে শীতের প্রকোপ থেকে রক্ষার ব্যবস্থা অবশ্যই করতে পারে। এনজিও এবং বড় বড় শিল্পপতির সহায়তায় সরকার এই কাজটি করতে পারে অতি সহজে। সারা দেশের মানুষ সেই অপেক্ষায় আছে।

লেখক: সাংবাদিক ও লেখক

https://www.shomoyeralo.com/ad/Local-Portal_728-X-90 (3).gif



https://www.shomoyeralo.com/ad/Google-News.jpg

সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত


ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: কমলেশ রায়, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড
এর পক্ষে প্রকাশক গাজী আহমেদ উল্লাহ
নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।

ফোন : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৭৫। ই-মেইল : shomoyeralo@gmail.com