ই-পেপার শুক্রবার ১৪ জুন ২০২৪
শুক্রবার ১৪ জুন ২০২৪

মানবসভ্যতা বনাম আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স
প্রকাশ: রবিবার, ২১ মে, ২০২৩, ২:৫২ এএম আপডেট: ২১.০৫.২০২৩ ৪:৫০ পিএম  (ভিজিট : ৪৯৩)
হঠাৎ করেই খবর আসে, পৃথিবীকে দখলে নিয়ে মানবসভ্যতাকে দাস বানিয়ে নিচ্ছে রোবটরা। কিংবা নিশ্চিহ্ন করে দেওয়ার প্রয়াসে চলছে রোবটদের ‘১৪৪ ধারা’। এ নিয়ে ঘুম নেই নিরীহ মানুষদের। মানুষের হাতে গড়া ইউটোপিয়াকে (স্বর্গরাজ্য) নিমেষেই ডেস্টোপিয়া (সর্বগ্রাসীরাজ্য) হিসেবে তৈরি করেছে রোবটরা। যার মূলে কাজ করছে শক্তিশালী হয়ে ওঠা কোনো এক আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (এআই) সিস্টেম বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। নিয়ন্ত্রণ করছে মানুষের ব্যবহৃত সব স্মার্ট ডিভাইস এবং রোবটকে। জীবনকে আরামদায়ক করার প্রযুক্তিই মানবজীবনকে করেছে দুর্বিষহ।

বিগত কয়েক যুগ ধরেই আলোড়ন চলছে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে। বিভিন্ন প্রযুক্তিগত প্রতিষ্ঠানও কাজ করছে এই এআই সিস্টেমের বিকাশ ঘটাতে। চ্যাট জিপিটি, গুগল বার্ড, মাইক্রোসফট বিং চ্যাট কিংবা পারপ্লেক্সিটিসহ বর্তমান বাজারে রয়েছে আরও বেশ কিছু এআই সংবলিত চ্যাটবট। তবে কি এই এআই সিস্টেমগুলোর কোনো একটি ক্ষমতাধর হয়ে উঠবে ভবিষ্যতে! পৃথিবীকে দখলে নিয়ে এআই নিয়ন্ত্রিত ডেস্টোপিয়াতে রূপ দেবে! এমন গল্পের প্রয়োগ সিনেমাপাড়ায় যতটা বেশি, এখন পর্যন্ত ব্যবহারিক জীবনে এই থিওরির (ধারণা) বাস্তবিক প্রয়োগ ঠিক ততটাই শূন্যের কাছাকাছি।

একটি নির্দিষ্ট অ্যালগরিদমের জন্য উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন কম্পিউটারের প্রসেসিং ইউনিটের সাহায্যে প্রদেয় তথ্যভান্ডার নিয়ে মূলত কাজ করে এআই সিস্টেম, যা ওই তথ্যভান্ডার ব্যবহার করে নির্দিষ্ট অ্যালগরিদমের জন্য ট্রাবল শ্যুট বা কোনো সমাধান করতে সক্ষম।

মার্কিন বিজ্ঞানী জন ম্যাককার্থির মতে, এআই সিস্টেম হচ্ছে একটি প্রোগ্রাম, যা মেশিন লার্নিং ক্ষমতা সংবলিত নিতান্তই একটি সফটওয়্যার। এই সফটওয়্যার ব্যবহার করে কেবল গৃহীত ডাটা (তথ্য-উপাত্ত) থেকে নতুন করে ‘পুরোনো তথ্য’ উপস্থাপন করা সম্ভব, যা সম্পূর্ণভাবে কম্পিউটারে জমা করা ডাটা নিয়ে কমান্ড দেওয়া প্যাটার্ন (অ্যালগরিদম) ধরে কাজ করার মতো স্বাভাবিক এবং নিরীহ। এআই সিস্টেম কোনো তথ্য নিজ ‘উৎসাহ’ থেকে সংগ্রহ করতে কিংবা কোনো তথ্য প্রসেস করতে সক্ষম নয়। অর্থাৎ এআই সিস্টেমের জৈবিক কোনো সিস্টেম নেই এবং তা পুরোটাই মানুষের নির্দেশনানির্ভর। এআই সিস্টেম শুধু প্রদেয় তথ্য-উপাত্ত নিয়ে কাজ করতে সক্ষম।

‘উৎসাহ’ নতুন সৃষ্টিকে স্বাগত জানায়। আর এআই সিস্টেমের ‘উৎসাহ’ ব্যবস্থাপনা না থাকায় স্বয়ংক্রিয়ভাবে নতুন কোনো তথ্য-উপাত্ত আবিষ্কার কিংবা স্বপ্রণোদিতভাবে কোনো সিদ্ধান্ত নিতে সক্ষম নয়। সম্প্র্রতি ফোর্বসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘এআই সিস্টেমের কোনো নিজস্ব সৃজনশীলতা নেই, নেই স্বাধীনভাবে চিন্তা করার ক্ষমতা, নেই মানুষের মতো জ্ঞান অন্বেষণের ক্ষমতাও। এমনকি জটিল তত্ত্বের সমস্যা সমাধান বা তথ্য বিশ্লেষণেও অপারগ আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স। আর এসব সীমাবদ্ধতার কারণে বিজ্ঞান-প্রযুক্তি খাতে এআই সিস্টেম নতুন কোনো উদ্ভাবন করতে বা সিদ্ধান্ত নিতেও সক্ষম নয়।’

ফোর্বসের প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ‘আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স বহু ক্ষেত্রে পারদর্শী হলেও তা কেবল মানুষের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করতে সক্ষম। মানুষের হস্তক্ষেপ ছাড়া এআই সিস্টেম অলস একটি সফটওয়্যার মাত্র। আর অলস এই সফটওয়্যারকে চালাতে দিকনির্দেশনার জন্য দিন শেষে মানুষকেই প্রয়োজন।’

নির্দিষ্ট ডাটা প্যাটার্ন অনুসরণ করে কাজ করতে পারদর্শী হওয়ায় আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স একমাত্র নিয়মমাফিকভাবে প্রাত্যহিক কাজ করতে সক্ষম। এই কারণে একমাত্র শিল্পপ্রতিষ্ঠানে মানুষের তত্ত্বাবধানে নিয়মমাফিক কাজে ব্যবহার করা যেতে পারে, উল্লেখ করে এক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে হার্ভার্ড বিজনেস ম্যাগাজিন।

বর্তমান বাজারে থাকা এআই সিস্টেম হচ্ছে আর্টিফিশিয়াল ন্যারো ইন্টেলিজেন্স সিস্টেম, যার দক্ষতা সীমাবদ্ধ। তবে গবেষকরা আরও উন্নত প্রযুক্তির এআই সিস্টেম নিয়ে কাজ করছেন, যা পরিচিত হবে আর্টিফিশিয়াল স্ট্রং ইন্টেলিজেন্স সিস্টেম নামে। এই স্ট্রং এআইর বুদ্ধিমত্তা মানুষের সমান হবে, চিন্তা ও বুদ্ধিবৃত্তিক ক্ষমতা থাকবে এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা করার মতো ক্ষমতা দিয়ে তৈরি করা হবে এই আর্টিফিশিয়াল স্ট্রং ইন্টেলিজেন্স সিস্টেমকে, যা ছাড়িয়ে যাবে মানুষের বুদ্ধিমত্তাকে। তবে এই স্ট্রং এআইর বুলি সম্পূর্ণ তাত্ত্বিক, নেই কোনো ব্যবহারিক উদাহরণও।

প্রযুক্তিজগতে এখন পর্যন্ত এআইনির্ভর চ্যাটবট নির্মাণের ক্ষেত্রে সবচেয়ে সাফল্যের পরিচয় দিয়েছে ওপেনএআই। চ্যাটজিপিটির সাফল্যে চ্যাটবট প্রযুক্তি নিয়ে মাঠে নামে বিশ্বের টেক জায়েন্টরা। যদিও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন এই চ্যাটবটগুলো নিয়ে আলোচনা-সমালোচনার শেষ নেই। 

চ্যাটবটে অনেকটা সঠিক উপায়ে কথোপকথনের উপযোগী প্রোগ্রাম সেট করা থাকে। সম্প্রতি এগুলোতে সেট করা প্রোগ্রাম থেকে বেরিয়ে সম্পূর্ণ নিজের মতো কাজ করতে দেখা গেছে। শুধু তা-ই নয়, চ্যাটবটগুলো তৈরি করতে পারে নিজস্ব ভাষা। দক্ষতাকে কাজে লাগিয়ে তার পছন্দমতো বিষয়ে মানুষকে আকৃষ্ট করতে পারে। প্রভাবিত করতে পারে মানুষের চিন্তাভাবনাকে। এমনকি গার্ডিয়ানও এ বিষয়ক এক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে, যেখানে চ্যাটবট সবকিছু ধ্বংস করে দেওয়ার ইচ্ছা পোষণ করেছে।

অবশ্য কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ঝুঁকি নিয়েও সরব বিশ্লেষকরা। কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ড. সিয়ান ও হেইগার্টারিক মনে করেন, এই প্রযুক্তির অপব্যবহার ভয়াবহ পরিস্থিতি ডেকে আনতে পারে। পরীক্ষায় জালিয়াতি ঠেকাতে বেশ কিছু বিশ্ববিদ্যালয় এবং কিছু শিক্ষা কর্তৃপক্ষ চ্যাটবটটিকে নিষিদ্ধ করেছে। মাইক্রোসফটের সিইও সত্য নাদেলার মতে, এআই সিস্টেমের কারণে চাকরি হারাবে কিছু মানুষ, পাশাপাশি নতুন করে কিছু চাকরির দুয়ারও উন্মুক্ত হবে। অনেক বিশেষজ্ঞই খোলা চিঠিতে স্বাক্ষর করে জানিয়েছেন, শক্তিশালী এআই সিস্টেমের বিকাশে বিরতি টেনে ধরা প্রয়োজন। কেননা এটি ‘সমাজ এবং মানবতার জন্য গভীর ঝুঁকি’ তৈরি করেছে। চলতি বছরের মার্চের শুরুতে ওপেনএআইয়ের জিপিটি-৪ উন্মোচন হলে তারা এই চিঠিতে স্বাক্ষর করেন।


আরও সংবাদ   বিষয়:  প্রযুক্তি   রোবট   আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স   এআই   কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা   মানুষ   মানবসভ্যতা  




https://www.shomoyeralo.com/ad/1698385080Google-News-Update.jpg

সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত


ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: কমলেশ রায়, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক গাজী আহমেদ উল্লাহ
নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।

ফোন : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৭৫ | ই-মেইল : shomoyeralo@gmail.com
close