ই-পেপার বৃহস্পতিবার ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২৪
বৃহস্পতিবার ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২৪

সাক্ষাৎকারে ড. আবু জাফর মোহাম্মদ শফিউল আলম ভূঁইয়া
গণমাধ্যম নিজস্ব নীতিতে চলবে
প্রকাশ: সোমবার, ৯ অক্টোবর, ২০২৩, ৮:৪১ এএম আপডেট: ০৯.১০.২০২৩ ৯:২১ এএম  (ভিজিট : ৪৯৭)
ড. আবু জাফর মোহাম্মদ শফিউল আলম ভূঁইয়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগে প্রভাষক হিসেবে যোগদান করেন ১৯৯৭ সালের সেপ্টেম্বরে। এরপর ২০১২ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চলচ্চিত্র ও ফিল্ম অধ্যয়ন বিভাগের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান হিসেবে যোগ দেন। এছাড়া কানাডার সায়মন ফ্রেজার ইউনিভার্সিটিতে বেশ কিছুদিন শিক্ষকতা করেছেন তিনি। গণযোগাযোগ বিষয়ে তিনি পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন সায়মন ফ্রেজার ইউনিভার্সিটি থেকে ২০১০ সালে। বাংলাদেশের গণমাধ্যমের ওপর মার্কিন ভিসানীতি আরোপের বিষয়ে সম্প্রতি তিনি কথা বলেছেন সময়ের আলোর সঙ্গে।

সময়ের আলো : যুক্তরাষ্ট্র বা যে কোনো দেশের অন্য দেশের গণমাধ্যম নিয়ে তৎপরতার সুযোগ ?

শফিউল আলম ভূঁইয়া : আমরা বিশ্বায়নের যুগে বসবাস করছি। সেই বিশ্বায়নের যুগে বিভিন্ন দেশের গণমাধ্যম নিয়ে কথা বলে এবং বিশেষ করে যারা বড় শক্তি আমেরিকার মতো পাওয়ার যারা, তারা তাদের মতাদর্শ সারা পৃথিবীতে প্রচার করতে চায়। এটা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতির একটা অংশ যে তারা সারা পৃথিবীতে ‘মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, মানবাধিকার রক্ষা’ এই বিষয়গুলো প্রচার করতে চায়। তারা দাবি করে সারা পৃথিবীতে গণতন্ত্রচর্চা এবং গণতন্ত্র বিকাশের জন্য তারা কাজ করে। 

কিন্তু একেবারে সেই ষাটের দশক থেকে শুরু করে যদি আমরা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কার্যক্রম বিভিন্ন দেশে দেখি, তাহলে দেখা যাবে যে, পৃথিবীর অনেক জায়গায় সামরিক শাসককে তারা প্রমোট করেছে বা রক্ষা করেছে, সেটার উদাহরণও কিন্তু আছে। যেহেতু আমেরিকা সারা বিশ্বের সুপার পাওয়ার, সে বিভিন্ন জায়গায় তার মতাদর্শ প্রচার করতে চায়, সে তার আইডিওলজি প্রচারের অংশ হিসেবে কালচারাল সফট পাওয়ার, কখনো মিলিটারি পাওয়ার, কখনো ইকোনমিক পাওয়ারও এক্সারসাইজ করে। 

সে বিশ্বটাকে তার মতো করে দেখতে চায়। সে একটা ওয়ার্ল্ড অর্ডার, বিশ্বব্যবস্থা তার মতো করে তৈরি করতে চায়। সেই উদ্দেশ্যে এবং সেই প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবেই দেশটি এ বিষয়গুলো সারা পৃথিবীতে করে। এটা করতে গিয়ে অনেক সময় তাদেরকে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হয় এবং চ্যালেঞ্জ করে অন্যান্য শক্তি। কিন্তু এই চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে একটা পরাশক্তির পতন হয়ে যায়। নতুন পরাশক্তির উদ্বোধন হয়। এটা হচ্ছে গ্রেট পাওয়ার পলিটিকসের একটা অংশ। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে গ্রেট পাওয়ার পলিটিকসের অ্যাভিনিউ হিসেবে দেখা যেতে পারে।

সময়ের আলো : কী কারণে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের গণমাধ্যমকেও ভিসানীতির আওতায় আনতে চাচ্ছে?

শফিউল আলম ভূঁইয়া : একটি দেশের ভিসানীতি তাদের অভ্যন্তরীণ ব্যাপার। একটি রাষ্ট্র কাকে ভিসা দিবে, কাকে দেবে না সেটা একান্তই তার ব্যাপার। সেটা যখন এভাবে জনসম্মুখে প্রচার এবং প্রকাশ করা হয়, তখন এটা একধরনের চাপ সৃষ্টির প্রয়াস থেকেই করা হয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র দেশে একটি সুষ্ঠু নির্বাচনের কথা বলেছে। সুষ্ঠু নির্বাচন তো আমরা সবাই চাই। সরকারও চায় সুষ্ঠু নির্বাচন। তো আমার মনে হয়, শুধুই যদি সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য এই প্রক্রিয়া হয় তাহলে সেখানে সমস্যার কিছু দেখছি না। কিন্তু এটার পেছনে যদি অন্য কোনো উদ্দেশ্য থাকে তাহলে অবশ্যই ক্রিটিক্যালি দেখার সুযোগ আছে।

সময়ের আলো : বাংলাদেশের গণমাধ্যমের ভূমিকা কি সুষ্ঠু নির্বাচনের অন্তরায়? 

শফিউল আলম ভূঁইয়া : গণমাধ্যম সবসময় একটা ভাইব্রেন্ট ফোর্স হিসেবে কাজ করে। বাংলাদেশে গণমাধ্যম অত্যন্ত শক্তিশালী এবং সক্রিয় ভূমিকা পালন করে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কেন, বিশেষ করে বাংলাদেশে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত, তিনি কী কারণে গণমাধ্যমকে ভিসানীতির অন্তর্ভুক্ত করার কথা বললেন, বিষয়টি আমার কাছে পরিষ্কার নয়। তবে তার বক্তব্য দেওয়ার পরে গণমাধ্যমের বিভিন্ন প্রতিনিধি, বিশেষ করে সম্পাদক পরিষদ ও এডিটরস গিল্ড উদ্বেগ প্রকাশ করার পরে কিন্তু রাষ্ট্রদূত ব্যাখ্যা দিয়েছেন। সেই ব্যাখ্যায় তিনি বলেছেন, গণমাধ্যমে মতপ্রকাশের ক্ষেত্রে যারা বাধা সৃষ্টি করবে, তাদেরকে এই ভিসানীতির আওতায় আনা হবে। যদি তা-ই হয়, তবে সেটাতে তো কোনো সমস্যা আমি দেখি না।

সময়ের আলো : গণমাধ্যমের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের ভিসানীতি প্রয়োগ মুক্ত বা স্বাধীন গণমাধ্যমের অন্তরায় কি? 

শফিউল আলম ভূঁইয়া : মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের যে রাষ্ট্রীয় পলিসি, সেখানে দুটি বিষয় খুব গুরুত্বপূর্ণ। একটি হচ্ছে ‘মতপ্রকাশের স্বাধীনতা; আরেকটি মানবাধিকার সংরক্ষণ’। এখন মতপ্রকাশের স্বাধীনতা তারা যেভাবে ব্যাখ্যা করে, সেটা হচ্ছে- প্রত্যেক ধরনের মতই গণমাধ্যমে প্রকাশ পেতে পারে। তাহলে নির্বাচনের পক্ষে-বিপক্ষে কিন্তু মত আসতে পারে। এখন কোনটাকে নির্বাচনবিরোধী মত হিসেবে গণ্য করা হবে এই প্রশ্নটা থেকে যায়। 

আরেকটি বিষয় হচ্ছে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাসে গুটিকয়েক মানুষ আছে, তারা কীভাবে সারা দেশের সাংবাদিকদের পর্যবেক্ষণ করবে? তারা কাদের কাছ থেকে তথ্য নেবে এবং সিভিল সোসাইটি নামে তারা যাদের সঙ্গে বসে, যারা তাদের সোর্স সেই সোর্সগুলো সঠিক কি না। কারণ তাদের সোর্সগুলো যদি ভুল তথ্য দেয় তাদেরকে, তাহলে কিন্তু তাদের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রেও বায়াসড হবে। এখন মতপ্রকাশের স্বাধীনতা প্রকাশের কথা একদিকে, আরেকদিকে আবার ভিন্নমত প্রকাশ করলে যদি তার ওপর চাপ প্রয়োগ করি তাহলে এটা কিন্তু কন্ট্রাডিকটরি হবে, দ্বিচারিতা-দ্বিমুখিতা হবে।

সময়ের আলো : গণমাধ্যমের ওপর মার্কিন ভিসানীতি প্রয়োগে কী ধরনের প্রভাব পড়তে পারে? ভিসানীতি গণমাধ্যমের বর্তমান কর্মপদ্ধতিতে কোনো পরিবর্তন আনবে কি? 

শফিউল আলম ভূঁইয়া : যারা আমাদের গণমাধ্যম মালিক, গণমাধ্যম পরিচালক তাদের সিদ্ধান্ত নিতে হবে তারা এটাকে কীভাবে দেখবে। গণমাধ্যমের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় নীতি আর গণমাধ্যমের নিজস্ব নীতি এই দুটির সমন্বয় করে চলতে হয়। এখন আমরা যদি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কথা বলি, তাদের গণমাধ্যম রাষ্ট্রীয় নীতি এবং গণমাধ্যমের নিজস্ব নীতির আলোকে পরিচালিত হয়। প্রত্যেকটি গণমাধ্যমের নিজস্ব পলিসি আছে এবং সারা পৃথিবীতেই গণমাধ্যমগুলো পলিটিক্যালি ডিভাইডেড থাকে, পোলারাইজড থাকে। 

আমরা যদি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কথা বলি, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনের আগে বড় বড় গণমাধ্যম নিউইয়র্ক টাইমস থেকে শুরু করে ফক্স, সিএনএন তারা সরাসরি কোনো না কোনো পার্টির পক্ষে প্রচার চালায়, কোনো না কোনো প্রেসিডেন্ট প্রার্থীর পক্ষে অবস্থান নেয়। আমাদের এখানে কিন্তু এভাবে সরাসরি কেউ অবস্থান নেয় না। তবে সাংবাদিকদের মধ্যে, মালিকদের মধ্যে রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি আছে। সেই দৃষ্টিভঙ্গি থেকে তারা সাংবাদিকতাকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করে থাকেন। কিন্তু সেটা তারা নীতিমালার আওতায় থেকে করে। আমি যতটুকু বুঝি, প্রত্যেকটি গণমাধ্যম তার নীতি অনুসারে পরিচালিত হবে।

সময়ের আলো : এ মুহূর্তে গণমাধ্যমের করণীয় কী?

শফিউল আলম ভূঁইয়া : প্রথমত গণমাধ্যমের যেটা করা উচিত, সে বিষয়টি সম্পর্কে পরিষ্কার হওয়া। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূতসহ মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আমাদের গণমাধ্যমের আলোচনা বাড়ানো। কারণ আমরা দুই ধরনের বক্তব্য শুনতে পেয়েছি। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ম্যাথিউ মিলার, তিনি বলেছেন- না, আমরা গণমাধ্যমকে ভিসানীতির আওতায় অন্তর্ভুক্ত করিনি। দ্বিতীয়ত এই প্রশ্নটি উত্থাপন করা তোমরা মতপ্রকাশের স্বাধীনতার কথা বলছ আবার গণমাধ্যমকে ভিসানীতির আওতায় আনতে চাচ্ছ এটা অনেকটা দ্বান্দ্বিক হয়ে যাচ্ছে কি না। গণমাধ্যমের দায়িত্ব হচ্ছে সকল মতকে তুলে ধরা, সত্যের পক্ষে কথা বলা, গণস্বার্থে কথা বলা। যেমন বাংলাদেশের স্বার্থ রক্ষা করা বাংলাদেশের গণমাধ্যমের দায়িত্ব এবং সেটাই হচ্ছে এই মুহূর্তে গণমাধ্যমের কাজ।

সময়ের আলো : ভিসা নিষেধাজ্ঞা স্বাধীন সাংবাদিকতার পরিবেশকে কি নষ্ট করবে? 

শফিউল আলম ভূঁইয়া : ভিসা নিষেধাজ্ঞা স্বাধীন সাংবাদিকতার পরিবেশ নষ্ট করতে পারে। এজন্য আমি আশা করব মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সরকারের পক্ষ থেকে গণমাধ্যমের ওপর ভিসানীতির বিষয়টি আরও বিশদভাবে পরিষ্কার করা হবে। আমাদের সাংবাদিকরা বিভিন্ন দেশে যান বিভিন্ন ইভেন্ট কাভার করতে। এখন ভিসানীতির কারণে কিন্তু তারা একটু শঙ্কার মধ্যে থাকবেন যে কাদের ওপর এটা প্রয়োগ করা হচ্ছে। সেজন্য একটা ভয়ের পরিবেশ তৈরি হওয়ার শঙ্কা আছে। আমি মনে করি, গণমাধ্যম যারা পরিচালনা করে, মালিক এবং ব্যবস্থাপনা পরিষদ, তাদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তারা এটাকে কীভাবে দেখে? তারা যদি শক্তভাবে মতপ্রকাশের পক্ষে থাকেন, গণতন্ত্রের পক্ষে থাকেন আমি অন্তত কোনো সমস্যা দেখি না। 
সময়ের আলো : সময় দেওয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ। 

শফিউল আলম ভূঁইয়া : সময়ের আলোকে ধন্যবাদ ও তার পাঠকের জন্য শুভকামনা।


সময়ের আলো/এএ/




https://www.shomoyeralo.com/ad/1698385080Google-News-Update.jpg

সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত


ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: কমলেশ রায়, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক গাজী আহমেদ উল্লাহ
নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।

ফোন : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৭৫ | ই-মেইল : shomoyeralo@gmail.com
close