ই-পেপার বৃহস্পতিবার ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২৪
বৃহস্পতিবার ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২৪

ফিলিস্তিনের সাহিত্য ও কবিতা
প্রকাশ: শুক্রবার, ২৪ নভেম্বর, ২০২৩, ১:০৪ এএম  (ভিজিট : ৯০৬)
এই মুহূর্তে সীমানাহীন, মানচিত্রহীন নিজস্ব ভূমির জন্য লড়াই করা জনপদের রচিত সাহিত্যের স্বাদ নিতে হলে ফিলিস্তিনকে খুঁজে নিতে হবে। ফিলিস্তিন সাহিত্যে গদ্যের চাইতে পদ্যের প্রভাব যুগ যুগ ধরে। আক্ষরিক অর্থেও তাদের নিজ বাসভূমি থেকেও নেই। শুরুতে বলেছি মানচিত্রহীন, সীমানাহীন। তারা তো লড়ছে একটা মানচিত্র একটা সীমানার জন্য। ১৯৪৮ সালের আরব-ইসরাইল যুদ্ধের পূর্ব পর্যন্ত ফিলিস্তিনি সাহিত্যও একটি এলাকার সঙ্গে সম্পর্কিত ছিল। কিন্তু ১৯৪৮ সালের নাকবার (বিপর্যয় দিবস) পর থেকে ফিলিস্তিনি সাহিত্য বলতে ফিলিস্তিনিদের রচিত সাহিত্যকে বোঝানো হয়, সেই ফিলিস্তিনি রচয়িতা যে দেশেই বাস করুন না কেন। 

যুগ যুগ ফিলিস্তিনিরা লড়ছে নিজেদের জাতিসত্তাকে পুনরুদ্ধারের জন্য। অস্ত্রের পাশাপাশি কবিতা ও সাহিত্যকেও এরা লক্ষ্যভেদী অস্ত্র বানিয়েছে। তাই তো জায়েনবাদীরা মাহমুদ দারবিশ, সামিহ আল কাসিম কিংবা সালেম জুবরানদের কলমকেও নিষেধাজ্ঞা দিয়ে থামিয়ে দিতে চেয়েছে।

মূলত ইসলামিক যুগের ক্লাসিক রীতির কবিতা ফিলিস্তিনে অত্যন্ত জনপ্রিয় ছিল। বেশ কিছুকাল আগেও স্থানীয় লোকসংগীত আবৃত্তি করা ফিলিস্তিনিদের সাধারণ বৈশিষ্ট্য ছিল। কিন্তু ১৯৪৮ সালের নাকবার পর কবিতা রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে দাঁড়ায়। ১৯৫২ সালের পর যেসব ফিলিস্তিনি ইসরাইলের করা নাগরিকত্ব আইনে ইসরাইলের আরব নাগরিক হয়েছিলেন, তাদের কেন্দ্র করে ইসরাইলবিরোধী এবং প্রতিবাদী একটি শক্তিশালী কবিতার ধারা প্রতিষ্ঠিত হয়। এই ধারাটির মূলে ছিলেন মাহমুদ দারবিশ, সামিহ আল কাসিম এবং তাওফিক আল জায়াদের মতো কবিরা। ইসরাইলবিরোধী এই কবিতাগুলো তখনো আরব বিশ্বে কিংবা বহির্বিশ্বে পরিচিতি পায়নি। 
কিন্তু ১৯৬৬ সালে ফিলিস্তিনের সাহিত্যিক গাসসান কানাফানি লেবাননে নির্বাসিত হওয়ার পর ফিলিস্তিনি কবিদের কবিতা সংকলন প্রকাশ করলে অবস্থার পরিবর্তন শুরু হয় এবং অতিদ্রুত ফিলিস্তিনি কবিতা আরব বিশ্বসহ বিশ্বময় পরিচিতি পেতে থাকে। 

ফিলিস্তিনিরা পুরো আরব বিশ্ব প্রথম থেকেই কবিতা ও সাহিত্যের ক্ষেত্রে তাদের শ্রেষ্ঠত্ব বজায় রেখেছিল। ফিলিস্তিনি সাহিত্য বিশ্বসাহিত্য দ্বারাও ভীষণভাবে প্রভাবিত, যার প্রমাণ তারা ইংরেজি, ফরাসি ও রাশিয়ান ভাষা থেকে তাদের সাহিত্যকে আরবি ভাষায় রূপান্তর করেছে। এমনকি আধুনিক কবিতার ক্ষেত্রে ফিলিস্তিনিরা টি এস ইলিয়ড, এজরা পাউন্ডের লেখা দ্বারাও প্রভাবিত। এদের অনেক লেখা আরবিতে অনূদিত হয়েছে।

ফিলিস্তিনি কবিতায় জীবন সংগ্রামের চিত্রকল্প প্রতিটি রন্ধ্রে রন্ধ্রে উপস্থিত। তবে মজার বিষয়, এমন কঠিন জীবন যাপন করেও অনেক দূরে দূরে খুঁজলেও ওদের কবিতায়, সাহিত্যে হতাশার সামান্যতম অস্তিত্বও পাওয়া যাবে না। ওরা ওদের লড়াকু জীবনকে চিত্রায়িত করে সংগ্রামের মাধ্যমে নিজের অধিকারের কথা বলে, এগিয়ে যাওয়ার কথা বলে। 

বলা হয়, ফিলিস্তিনি কবিতা হলো ফিলিস্তিন সংগ্রামের হৃৎপিণ্ড। ফিলিস্তিন সাহিত্যের বিশেষত্ব হলো প্রতিরোধ এবং প্রতিশোধ। ফিলিস্তিনিরা ওদের সাহিত্যে  কবিতাকে একটি শানিত অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে। অস্তিত্ববাদ এবং আত্মপরিচয়কে বিশে^র দরবারে তুলে  ধরা এবং ইহুদি দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ, নির্বাসন, বিচ্ছেদ জন্মভূমির প্রতি আশা এবং ভালোবাসাই ফিলিস্তিনের কবিতা। 

১৯৪৮ সালের নাকবা এবং ১৯৬৭ সালের  ছয় দিনের যুদ্ধের মধ্যবর্তী সময় ফিলিস্তিন প্রতিরোধ সাহিত্য ফিলিস্তিনিদের আত্মপরিচয় রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। দুই যুগের মধ্যে একটি সেতুবন্ধ রচনা করে সশস্ত্র প্রতিরোধের মধ্য দিয়ে ফিলিস্তিনিদের টিকিয়ে রাখতে সাহায্য করে। কবি ও সাহিত্যিক গাসসান কানাফানি যিনি ‘ফিলিস্তিনি প্রতিরোধের সাহিত্য’ পরিভাষাটি প্রথম ব্যবহার করেন। তিনি তার চধষবংঃরহরধহ জবংরংঃধহপব খরঃবৎধঃঁৎব টহফবৎ ঙপপঁঢ়ধঃরড়হ বইয়ের উল্লেখ করেন ‘সশস্ত্র প্রতিরোধের মতোই ফিলিস্তিনি প্রতিরোধ সাহিত্য ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতায় একটি নতুন মাত্রার সংযোজন করে, যা ফিলিস্তিনিদের জীবন থেকে গত অর্ধশতাব্দীতেও বিচ্ছিন্ন হয়নি।’ 

মূলত ১৯৬৭ সাল থেকে ফিলিস্তিনি সাহিত্যকে তিন ভাগ করা যায়, ইসরাইলের অভ্যন্তরে বসবাসরতদের সাহিত্য, অধিকৃত অঞ্চলের সাহিত্য এবং ডায়াসপোরা বা বিদেশে বসবাসরত ফিলিস্তিনিদের সাহিত্য। পুরো মধ্যপ্রাচ্যে আরবি ভাষায় ফিলিস্তিনি সাহিত্যিকদের সাহিত্যই ছিল সব থেকে সমৃদ্ধ। কিন্তু দখলদার ইসরাইলিরা সাহিত্যে নিষেধাজ্ঞা জারি করলেও সাহিত্য কি থেমে থাকে! আর বিশেষ করে কবিতাকে রুখে এমন সাধ্য কার! ছাপার অক্ষরে নিষেধাজ্ঞা জারি করলেও ফিলিস্তিনি স্বভাবমতো তা মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে। অনেকটা আমাদের দেশের খনার বচনের মতো। বিভিন্ন অনুষ্ঠানে এই কবিতাগুলো ব্যাপক উচ্চারিত হতে হতে হয়ে যায় ফিলিস্তিনের হৃদয়ের প্রাচীর। এই কবিতাগুলো কে, কখন, কীভাবে তৈরি করল তা মুখ্য না হয়ে এর কথাগুলোই মুখ্য হয়ে মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়ে এক হতে বহু ফিলিস্তিনির মাঝে। তাই তো এমনি একটি কবিতা ফিলিস্তিনিদের মাঝে হয়ে যায় শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার প্রার্থনাস্বরূপ-

‘হে রাত্রি/ বন্দিকে শেষ করতে দাও তার বিলাপ/ কারণ যখন ঝটপট করে উঠবে ভোরের সতেজ ডানা/ তখন তার দেহ বাতাসে/ বন্ধুরা বিচ্ছিন্ন এখন/ টুকরো হয়ে গেছে পাত্রগুলো/ হে রাত্রি, থেমে থাকো যতক্ষণ না শেষ হয় আমার শোকগাথা/ তুমি কি ভুলে যাবে আমার কথা/ ভুলবে আমার দীর্ঘশ^াস?/ হে অবিচার ভুলো না কেমন করে এই দুর্বিষহ সময় কাটালাম/ তোমার হেফাজতে/ ভেবো না আমার অশ্রু ঝরছে ভয়ে!/ ঝরছে আমার মাতৃভূমির দুঃখে/ আর বাড়ির ক’টি ভুখা বাচ্চার মুখের এক মুঠো অন্নের কথা ভেবে,/ আমি চলে গেলে তাদের খাওয়াবে কে?/ আমার তরুণ ভাই দুটিকেও ফাঁসিতে লটকালে?/ কেমন করে আমার স্ত্রী দিন গুজরাবে?/ আমার আর তার কোলের বাচ্চার জন্য চোখের জল ফেলে?/ তবুও কি আমি তার কঙ্কন তার বাহুতেই/ যাবো রেখে/ যখন পিতৃভূমি উদ্ধারের যুদ্ধ দিয়েছে ডাক/ বন্দুক কেনার।’

(ফিলিস্তিন : প্রতিরোধ, শাহাদাত এবং কবিতা। জাকির তালুকদার।) 

যখন চারদিক থেকে ফিলিস্তিনকে চেপে ধরা হচ্ছে। চেপে ধরা হচ্ছে তাদের কণ্ঠকে, তাদের কলমকে। তখনই অপ্রতিরোধ্য গতিতে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে যাচ্ছে ফিলিস্তিনি কবিতা। কবিতাকে কি কখনো রোখা যায়! বাধা পেলে কবিতা নজরুলের মতো বিদ্রোহী হয়ে মাথা ফুঁড়ে দাঁড়ায়, কবিতা আলেন্দের চিলি হয়ে দাঁড়ায়। প্রতিরোধে গর্জে ওঠে না শুধু অগ্নেয়াস্ত্র। কবি ও কবিতাও তখন হয়ে ওঠে মারণাস্ত্র।

ফিলিস্তিনের জাতীয় কবি মাহমুদ দারবিশ তার ইহুদি প্রেমিকা আর তার মাঝে দেখেছিলেন রাইফেল। তার জৈবিক প্রেম তার দেশপ্রেম থেকে বড় হতে পারেনি। তিনি লিখলেন তার প্রেমিকা তামের বেন আমির বা রিতাকে নিয়ে ‘রিতা ও রাইফেল’-

রিতা ও আমার চোখের মধ্যিখানে/ একটি রাইফেল আছে/ আর যারা রিতাকে জানে/ তারা তার মধুবর্ণ চোখের বেহেশতি প্রভায়/ হাঁটু গেড়ে বসে এবং খেলায় মজে/ আর আমি রিতাকে চুম্বন করেছি যখন সে তরুণী ছিল। ...
আহ রিতা/ এই রাইফেলের আগে কে তোমার ওপর থেকে আমার চোখ সরাতে পারত ব্যতিক্রম একটু ঘুম কিংবা মধুবর্ণ মেঘ।

মাহমুদ দারবিশের কবিতায় ভালোবাসা, বিদ্রোহ, আগুন প্রতিরোধ, স্বাধীনতার কথাগুলো পরস্পরকে আলিঙ্গন করে চলে। তার কবিতায় জীবনের কথা এবং মানবতার কথা এতটাই শক্তিশালী ছিল যে তার শত্রুপক্ষ, তৎকালীন ইসরাইলি শিক্ষামন্ত্রী ইয়েস সারিদ প্রস্তাব করেছিলেন যেন সেখানকার হাই স্কুল কারিকুলামে তার কবিতা অন্তর্ভুক্ত করা হয়। কিন্তু তখনকার ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী জানতেন যে মাহমুদ দারবিশের কবিতা পাঠ্যসূচিতে অন্তর্ভুক্ত করলে তাদের মসনদ কেঁপে উঠতে পারে। স্বাধীনতা সংগ্রামী যোদ্ধা এবং রাজনৈতিক এই কবির হাতেই ১৯৮৮ সালে রচিত হয় ফিলিস্তিনের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র। 

ফিলিস্তিনের সাহিত্যের ক্ষেত্রে তাদের নারীরাও পিছিয়ে নেই যেমনটা পদকজয়ী কবি নাট্যকার লেখক গবেষক নাতালি হানযালে। তার লেখা বিশ্বের বারোটি ভাষায় অনূদিত হয়েছে। সুতরাং স্বাভাবিকভাবেই তার পরিচয় বিশ্বময়। তার সম্পাদিত ঞযব চড়বঃৎু ঙভ অৎধন ডড়সবহ একটি কবিতা সমগ্র যার মাধ্যমে আরব মহিলা কবিদের তিনি পশ্চিমা বিশ্বে পরিচিত করে তোলেন।

ফিলিস্তিনের আরো একজন ঔপন্যাসিক, সাহিত্যিক সালমা জায়ুসি ফিলিস্তিনি সাহিত্যকে তীব্র রাজনৈতিক বলে উল্লেখ করেছেন। ফিলিস্তিনি কবিতার স্বাধীনতা এবং গভীরতাকে বোঝাতে কবি মউরিদ বারগউতি বলেন, ‘কবিতা কোনো সরকারি চাকুরে নয়, কোনো সৈনিকও নয়, কবিতা কারো অধীন নয়।’ কী দুর্দান্ত সাহসী উচ্চারণ।

কবিতা কি মানুষ বাঁচাতে পারে, অধিকার ছিনিয়ে আনতে পারে? কবিতা শুধু বিদ্রোহী বানাতে পারে, উত্তেজিত করতে পারে, আর এ উত্তেজনা যখন প্রেরণা হয়ে ছড়িয়ে পড়ে, তখনই ঝলসে ওঠে সংগ্রাম আর মুক্তির হাজারো কণ্ঠস্বর। এভাবেই কবিতা শিরোনাম হয় মুক্তির, স্বাধীনতার। সেদিন হয়তো বেশি দূরে নেই, যেদিন ফিলিস্তিনিরাও তাদের ভৌগোলিক স্বাধীন পরিমণ্ডলে নিজেদের সাহিত্যে স্বাধীনতার পথ পরিক্রমার শব্দের জাল বুনবে।

সময়ের আলো/আরএস/ 




https://www.shomoyeralo.com/ad/1698385080Google-News-Update.jpg

সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত


ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: কমলেশ রায়, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক গাজী আহমেদ উল্লাহ
নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।

ফোন : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৭৫ | ই-মেইল : shomoyeralo@gmail.com
close