ই-পেপার মঙ্গলবার ১৬ জুলাই ২০২৪
মঙ্গলবার ১৬ জুলাই ২০২৪

ফ্রানৎস কাফকার সঙ্গে পরিচয়
প্রকাশ: শুক্রবার, ৫ জুলাই, ২০২৪, ১:১৪ এএম আপডেট: ০৫.০৭.২০২৪ ৭:৫৬ এএম  (ভিজিট : ১৩৩)
জার্মান উপন্যাসিক ও গল্পলেখক ফ্রানৎস কাফকার জন্ম ৩ জুলাই ছিল। মৃত্যুর একশ বছর পর বিশ্ব সাহিত্যে তিনি শ্রদ্ধা ভরে আদৃত। তিনি বিংশ শতাব্দীর একজন অন্যতম প্রভাবশালী লেখক। বিচ্ছিন্নতাবোধ, সামাজিক বৈষম্য, মানুষের নিষ্ঠুরতা ও অস্তিত্ববাদ তার লেখায় বারবার উঠে এসেছে। যা আজও সাহিত্য বোদ্ধাদের আলোড়িত করছে। সময়ের আলোর পক্ষ থেকে তার প্রতি শ্রদ্ধাঞ্জলি

বোহেমিয়া রাজ্যের রাজধানী প্রাগে জার্মানভাষী ইহুদি চেক পরিবারে জন্ম নেন ফ্রানৎস কাফকা। তিনি একজন আইনজীবী হিসেবে প্রশিক্ষণ নেন এবং আইনি শিক্ষা শেষ করার পর তিনি একটি বীমা কোম্পানিতে কাজে নিযুক্ত হন। তার বাবাসহ পরিবার এবং ঘনিষ্ঠ বন্ধুদের সঙ্গে তার একটি উত্তেজনাপূর্ণ এবং আনুষ্ঠানিক সম্পর্ক ছিল। তিনি বেশ কয়েকজন মহিলার সঙ্গে বাগদান করলেও বিয়ে করেননি কাউকে। ১৯২৪ সালের ৩ জুন মাত্র ৪০ বছর বয়সে যক্ষ্মা রোগে মারা যান কাফকা।

কাফকার সঙ্গে আমার পরিচয় চুয়াল্লিশ বছর আগে। তখন আমি প্রায় প্রতিদিন বিকালে নিউ মার্কেটের আশপাশে, বলাকা সিনেমা হলের পাশে পুরোনো বইয়ের দোকানে ঘোরাঘুরি করি; একদিন ফ্রানৎস কাফকার লেখা ‘কাঠগড়া’ (দ্য ট্রায়াল) বইটি পেলাম এবং পাঁচ টাকায় কিনে নিলাম। যদ্দূর মনে পড়ছে বইটি বাংলা একাডেমির প্রকাশনা। কাঠগড়া বইটির সঙ্গে আমার যতটা পরিচয় হলো, তারচেয়ে বেশি পরিচয় হলো লেখক ফ্রানৎস কাফকার সঙ্গে। কাফকা আমার মনে রেখাপাত করে রইল; আজও কাফকার জীবনের বিষাদ আমাকে পোড়ায়।

জীবদ্দশায় খুব একটা সাড়া জাগাতে না পারলেও মৃত্যুর পর কাফকা বিশ্বের একজন প্রখ্যাত লেখক হিসেবে বিবেচিত হয়েছিলেন। নিজের অবসর সময়ের বেশিরভাগ সময়ই তিনি গভীর রাত জেগে লেখালেখি করতেন। আত্ম-সন্দেহ আর নিজের লেখালেখি নিয়ে অবিশ্বাস একসময় তাকে অস্থির করে তুলেছিল। 

অস্থিরতা থেকে মুক্তি পেতে কাফকা তার পাণ্ডুলিপি এবং বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত রচনা, যা নিজের কাছে সংরক্ষিত ছিল, তার সবই তিনি পুড়িয়ে ফেলেছিলেন; এবং তার বন্ধু ম্যাক্স ব্রডকে তার অসমাপ্ত কাজগুলো ধ্বংস করার নির্দেশ দিয়েছিলেন, যার মধ্যে তার উপন্যাস দ্য ট্রায়াল, দ্য ক্যাসেল এবং আমেরিকা রয়েছে; কিন্তু ব্রড এই নির্দেশ উপেক্ষা করে বেশিরভাগ লেখা প্রকাশের উদ্যোগ নিয়েছিলেন। ধারণা করা হয়, তার সৃষ্টির ৯০ শতাংশই ধ্বংস হয়ে যায়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর কাফকার লেখাগুলো জার্মানভাষী দেশগুলোতে বিখ্যাত হয়ে ওঠে এবং তা জার্মান-সাহিত্যকে প্রভাবিতও করে। ১৯৬০-এর দশকে এর প্রভাব বিশ্বের অন্যত্র ছড়িয়ে পড়ে। 

কাফকা তখন শিল্পী, সুরকার এবং দার্শনিকদেরও প্রভাবিত করেছেন। কাফকার কিছু কাজ তার জীবদ্দশায় প্রকাশিত হয়েছিল; গল্প সংকলন কনটেমপ্লেশন এবং অ্যা কান্ট্রি ডক্টর এবং স্বতন্ত্র গল্প যেমন তার উপন্যাস দ্য মেটামরফোসিস, সাহিত্য পত্রিকায় প্রকাশিত হলেও খুব কম পাঠকের মনোযোগ পায়। দ্বিতীয় দফায় দশ-বারো বছর আগে কলকাতার কলেজ স্ট্রিটে আমার নজরে পড়ে তার ‘দ্য মেটামরফোসিস’ বইটি। কাফকার নাম দেখে আমি এক পলকও বিলম্ব করিনি; বইটিকে নিজের করে নিয়েছিলাম; এবং দ্বিতীয়বার আমাদের পরিচয়কে ঝালাই করে নিলাম। এ বছর তার প্রয়াণের শতবছর পূর্তিতে তাকে স্মরণ করার অবকাশ তৈরি হলো; এ রচনার মাধ্যমে তার প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করছি। 

মাত্র চল্লিশ বছরের জীবনে অল্প কিছু লেখার মাধ্যমে নিজেকে বিংশ শতাব্দীর প্রভাববিস্তারী অন্যতম লেখক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন ফ্রানৎস কাফকা। মেটামরফোসিস (রূপান্তর) তার সবচেয়ে বিখ্যাত গল্প। তার গদ্যের শক্তিমত্তা বুঝতে আসুন গল্পটির প্রথম লাইনটি পড়ি-এক সকালে গ্রেগর সামসা অস্বস্তিকর সব স্বপ্ন থেকে জেগে উঠে দেখে, সে তার বিছানায় এক দৈত্যাকার পোকায় রূপান্তরিত হয়ে পড়ে আছে।

বিশ্বসাহিত্যের সব গল্পের মাঝে এটি সবচেয়ে বিখ্যাত বাক্য বলেও অনেকে মন্তব্য করেছেন। কী করে একটিমাত্র বাক্যে পুরো গল্পের আভাস দেওয়া যায় এবং একইসঙ্গে পুরো গল্পটি পড়ার জন্যে আগ্রহী পাঠককে আকৃষ্ট করা যায়, তার উৎকৃষ্ট উদাহরণ কাফকার ‘মেটামরফোসিস’।

তিনটি অংশে বিভক্ত এ গল্পের প্রতিটি ধাপেই দেখা যায় পরিবর্তন। কখনো তা ইতিবাচক, কখনো নেতিবাচক; আবার কখনোবা একের মিশেলে ভিন্ন আরেক রূপান্তর। মোটামুটি সমান ব্যাপ্তির তিন অংশের মাঝে প্রথম ও দ্বিতীয় অংশের মধ্যকার ব্যবধান একদিনের আর দ্বিতীয় ও তৃতীয় অংশের ব্যবধান অনিশ্চিত কালের। প্রথম অংশের শেষ হয় বাবার তাড়া খেয়ে গ্রেগরের ঘরে প্রবেশের মাধ্যমে, দ্বিতীয় অংশে আপেল দ্বারা প্রাণঘাতী আক্রমণ এবং সবশেষে গ্রেগরের মৃত্যুতে।

বিজ্ঞানভিত্তিক বাস্তবতা থেকে কাফকার এ গল্প অনেক দূরের প্রেক্ষাপটে তৈরি। এ গল্প যেন অবাস্তব কল্পনার ঘটনারাজিকে দাঁড় করিয়ে দেয় অদ্ভুত কোনো স্বপ্নের কাঠগড়ায়। রিয়ালিটির আবহে দাঁড়িয়ে যায় জাদুবাস্তবতার ধারণা। উদাহরণস্বরূপ পোকাটির কথা বলা যায়। প্রথমত একজন মানুষের বাহ্যিক পরিবর্তনকে এতটা সারল্যের সঙ্গে লেখক তুলে ধরেছেন, যেন এটি খুব স্বাভাবিক একটি ঘটনা। আবার সে পোকাটির বর্ণনাও কিছুতেই যৌক্তিক নয়। ব্যক্তিজীবনের ছাপ কাফকার প্রতিটি লেখার মতো এ গল্পেও দেখা যায়।

‘মনে হয়’, ‘বোধ হয়’, ‘যেন বা’- দিয়ে শুরু হয় তার সব বাক্য। সবকিছুই প্রতিষ্ঠিত হয় যেন সংশয়ে। এক্ষেত্রে অন্যদের দৃষ্টিকোণ জানা কিংবা বোঝার সুযোগ থাকে না পাঠকের। আবার অন্যদিকে আত্মসমালোচনায় মগ্ন গ্রেগরকে বারবার দেখা যায় দুটি পরস্পরবিরোধী দৃষ্টিভঙ্গি উপস্থাপনের মাধ্যমে একটি ভারসাম্য প্রতিষ্ঠার প্রয়াসে লিপ্ত। জটিল ও দ্বন্দ্বপীড়িত মনস্তত্ত্বের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হওয়া ঘটনারাজিতে একদিকে ফুটে ওঠে আত্মপক্ষ সমর্থনের চেষ্টা, অন্যদিকে ফুটে ওঠে নিরাবেগ আত্মসমালোচনা ও অপরাধবোধ। খুদে উপন্যাস বা নভেলা হিসেবেও পরিচিত এ গল্পটি ১৯১৫ সালের অক্টোবরে একটি মাসিক সাহিত্য পত্রিকায় প্রথম প্রকাশিত হয়। এ গল্পের মনস্তাত্ত্বিক উদ্বেগ আর জাদুবাস্তবতার গল্পকারকে অনন্য উচ্চতায় পৌঁছে দেয়।

দ্য ট্রায়াল (জার্মান : ডের প্রসেস) ফ্রানৎস কাফকার ১৯১৪ ও ১৯১৫ সালে লেখা একটি উপন্যাস এবং ২৬ এপ্রিল ১৯২৫ সালে, অর্থাৎ তার মৃত্যুর একবছর পর প্রকাশিত হয়। কাফকার সঙ্গে পরিচয়ের পর থেকে ভাবী, যদি সম্পূর্ণ কাফকাকে আবিষ্কার করা যেত; তবে বিশ্বসাহিত্যের এক বিরল প্রতিভাই আবিষ্কৃত হতেন তা-ই নয়; বরং কাফকার রচনার সুধা বিশ্বের কথাসাহিত্যের ভান্ডারকে আরও সমৃদ্ধ করে তুলত।.

সময়ের আলো/আরএস/ 




https://www.shomoyeralo.com/ad/1698385080Google-News-Update.jpg

সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত


ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: কমলেশ রায়, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক গাজী আহমেদ উল্লাহ
নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।

ফোন : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৭৫ | ই-মেইল : shomoyeralo@gmail.com
close