ই-পেপার মঙ্গলবার ১৬ জুলাই ২০২৪
মঙ্গলবার ১৬ জুলাই ২০২৪

আর্নেস্ট হেমিংওয়ে
মানুষ ধ্বংস হয় পরাজিত হয় না
প্রকাশ: শুক্রবার, ৫ জুলাই, ২০২৪, ২:৫০ এএম আপডেট: ০৫.০৭.২০২৪ ৭:৫৩ এএম  (ভিজিট : ২০৩)
মার্কিন সাহিত্যিক ও সাংবাদিক আর্নেস্ট হেমিংওয়ে মৃত্যুবার্ষিকী ছিল ২ জুলাই। তার নির্মেদ ও নিরাবেগি লেখনী বিংশ শতাব্দীর কথাসাহিত্যের ভাষাশৈলীতে ব্যাপক প্রভাব ফেলে; অন্যদিকে তার রোমাঞ্চপ্রিয় জীবন ও ভাবমূর্তি পরবর্তী প্রজন্মের কাছে তাকে প্রশংসিত করে তোলে। বিংশ শতাব্দীর বিশের দশকের মাঝামাঝি থেকে পঞ্চাশের দশকের মাঝামাঝি পর্যন্ত সময়ে তিনি তার অধিকাংশ সাহিত্যকর্ম রচনা করেছিলেন। সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার লাভ করেছিলেন ১৯৫৪ সালে। তার রচনা মার্কিন সাহিত্যের চিরায়ত হিসেবে বিবেচিত হয়। এই মহান লেখকের  প্রতি সময়ের আলোর পক্ষ থেকে বিনম্র শ্রদ্ধা

অতি সাধারণ পরিবারে ১৮৯৯ সালে জন্ম নেওয়া আর্নেস্ট হেমিংওয়ের বিশ্বখ্যাত লেখক হয়ে ওঠার পেছনে রয়েছে তার জীবনসংগ্রামের দীর্ঘ ইতিহাস। সতেরো বছর বয়সে লেখক হিসেবে পত্রিকায় কাজ শুরু করেন। এরপর ইতালির সেনাবাহিনীর হয়ে স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে প্রথম বিশ্বযুদ্ধে যোগ দেন। যুক্তরাষ্ট্র থেকে ফিরে আমেরিকা ও কানাডার পত্রিকায় গ্রিক বিপ্লবের খবর প্রেরণের জন্য যুক্তরাজ্যে গমন করেন। বিশ শতকের শুরুতে আর্নেস্ট হেমিংওয়ে লেখক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। এ সময় প্যারিসে একজন বহিরাগত মার্কিন হিসেবে তার অভিজ্ঞতা নিয়ে লেখা বই ‘দ্য সান অলসো রাইজেস’  প্রকাশিত হয় ১৯২৬ সালে। সহজ অথচ শক্তিশালী এ উপন্যাসকে ইংরেজি সাহিত্যের এক মাইলফলক হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এখানে  লেখক প্রথম বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে জ্যাক বার্ন এবং লেডি ব্রেট অ্যাসলে মুখ্য দুটি চরিত্রের নিখুঁত রূপায়ণ উপন্যাসটিকে সাহিত্যে বিশেষ স্থান করে দিয়েছে। ত্রিশ বছর বয়সে লেখা হেমিংওয়ের উপন্যাস ‘অ্যা ফেয়ারওয়েল টু আর্মস’ লেখক হিসেবে তাকে বিশেষ মর্যাদা দেয় এবং বৃহত্তর পাঠকমহলে তিনি পরিচিতি লাভ করেন। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পটভূমিতে লেখা বিশ্বখ্যাত উপন্যাসটিতে যুদ্ধে বিভিন্ন স্থানের ভৌগোলিক বর্ণনা, প্রকৃতিগত গুরুত্ব, সামাজিক বোধ জীবন্ত হয়ে ধরা দেয়।

মানবজীবনের দুঃখ-দুর্দশা, হতাশা আর মোহমুক্তির এক বাস্তব দলিল এই উপন্যাস। এর মুখ্য চরিত্র মার্কিন যুবক ফ্রেডরিক হেনরি ইতালিতে রেড ক্রসে যোগ দেন অ্যাম্বুলেন্স চালক হিসেবে। যুদ্ধের ভয়াবহতার মাঝে তার সঙ্গে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে মিলান হাসপাতালে কর্মরত নার্স ক্যাথরিনের। তাদের বিয়ে না হলেও তারা স্বামী-স্ত্রীর মতো বসবাস শুরু করেন এবং ক্যাথরিন সন্তানসম্ভবা হয়ে পড়েন। প্রসবব্যথা শুরু হলে তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সন্তান প্রসবের সময় অস্ত্রোপচারে অধিক রক্তক্ষরণে ক্যাথরিন মারা যান। জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে ক্যাথরিনের বেঁচে থাকার আকুতি এবং হেনরি- ভালোবাসার মানুষটিকে হারানোর মর্মজ্বালার বর্ণনা পাঠকমনকে বিশেষভাবে আলোড়িত করে। ক্যাথরিনের মৃত্যুতে শোকবিহ্বল হেনরির এক বৃষ্টিমুখর রাতে নিরুদ্দেশ যাত্রার মাধ্যমে শেষ হয় উপন্যাসটি। যুদ্ধের বিভীষিকার মাঝে নর-নারীর চিরন্তন প্রেমের অপরূপ গাথার সুরে অস্ত্রকে বিদায় জানানোর আকুতি মূর্ত হয়ে ওঠে। ঘটনাবিন্যাসে হেমিংওয়ের স্বকীয়তা তার উপন্যাসের অন্যতম মাধুর্য, যা ইংরেজি সাহিত্যে তাকে শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছে। রচনায় এক বিশেষ কারণে তার লেখাকে কখনো ‘হেমিংওয়ে স্টাইল’ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে। আগের অনেক লেখকের প্রচলিত ধারাকে অতিক্রম করতে সক্ষম হয়েছে সহজ, সাবলীল অথচ গাম্ভীর্যপূর্ণ লেখা হেমিংওয়ের উপন্যাস ‘দ্য সান অলসো রাইজেস’। 

অনেকের মতে, তিনি আমেরিকান ইংরেজি সাহিত্যে এক নতুন ধারার সূচনা করেছেন। ১৯৫৪ সালে তার শ্রেষ্ঠ লেখা বলে বিবেচিত ‘দ্য ওল্ডম্যান অ্যান্ড দ্য সি’ উপন্যাসের জন্য হেমিংওয়ে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন। অনেকের মতে, বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবতার অভিজ্ঞতা হেমিংওয়ের নিজের জীবনে এবং সঙ্গত কারণে তার লেখায় বিশেষ প্রভাব ফেলেছে। ফলে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে হেমিংওয়ে এবং ঊনবিংশ শতাব্দীর সমসাময়িক লেখকদের রচনার বিশদ বর্ণনার ধারায় এক পরিবর্তন আসে। গল্প লেখার মধ্য দিয়ে যাত্রা শুরু করায় ভাষা প্রয়োগের নৈপুণ্য ঔপন্যাসিক হিসেবে হেমিংওয়ের প্রতিষ্ঠালাভ সহজ করে দেয়। ফলে কিছু না বলেও অনেক কিছু বোঝানোর মাধ্যমে সত্যকে উদঘাটন তার লেখায় বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। এ যেন সমুদ্রে ভাসমান হিমশৈলের মতো। ইংরেজিতে কিছু অন্য ভাষার ব্যবহার কখনো তার লেখাকে চমৎকৃত করেছে, যা সচরাচর দেখা যায় না। 

কারও মতে, ভাষার ব্যবহার এবং ঘটনাবিন্যাসে তার সারল্যে একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য। আর্নেস্ট হেমিংওয়ের আরেকটি ভিন্নধারার বই ‘অ্যা মুভঅ্যাবল ফিস্ট’ ১৯২০ সালে প্যারিসে প্রবাসী সাংবাদিক হিসেবে তার অভিজ্ঞতার ওপর লেখা যা প্রকাশিত হয় ১৯৬৪ সালে। এটি একটি অতীত-পর্যালোচনামূলক গ্রন্থ। এখানে মানুষের একের সঙ্গে অন্যের সম্পর্ক, অভাব ও ক্ষুধার বিরুদ্ধে নিয়ত সংগ্রামের বিষয় স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। লেখক প্যারিসে অবস্থানকালে পাওয়া নির্মল আনন্দ এবং সহজলভ্য অনাবিল সুখের প্রতি গুরুত্ব আরোপ করেছেন। ‘মেন উইদাউট ওমেন’ হেমিংওয়ের জীবনের প্রথম দিকে প্রকাশিত আরেকটি উল্লেখযোগ্য উপন্যাস, যেখানে তিনি যুদ্ধের নৃশংসতার সঙ্গে নারী-পুরুষের অসহিষ্ণু সম্পর্ককে তুলে ধরেছেন। ‘স্নো অব ক্লিমানজারো অ্যান্ড আদার স্টোরিজ’ আর্নেস্ট হেমিংওয়ের চমকপ্রদ সৃষ্টি। এই গ্রন্থ তাকে একজন সেরা গল্পলেখক হিসেবে পরিচিতি এনে দেয়। বইটি লেখকের জীবনের প্রতিষ্ঠার বাঁক ঘুরিয়ে দেয়। নিজ অভিজ্ঞতার আলোকে গল্প লেখায় ঘটনা প্রকাশে সরল সহজ ও সাবলীলভাবে ফুটিয়ে তোলার এক অদ্ভুত কৌশল রয়েছে এখানে। একজন লেখক হিসেবে পরিপক্বতার ছাপ রয়েছে হেমিংওয়ের লেখা ‘দ্য কিলার’, ‘ফাদারস অ্যান্ড সন্স’ এবং অন্যান্য গল্প। 

আর্নেস্ট হেমিংওয়ের সাহিত্যকর্মের পরিধি বেশ ব্যাপক। তার লেখা অন্যান্য গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে- ‘থ্রি স্টোরিজ অ্যান্ড টেন পোয়েমস’, ‘দ্য স্টোরিজ অব স্প্রিং’, ‘ডেথ ইন দ্য আফটারনুন’ এবং ‘ উইনার টেক নাথিং’। স্পেনের অভিজ্ঞতা নিয়ে লেখা উপন্যাস ‘ফর হুম দ্য বেল টোলস’ বেরোয় ১৯৪০ সালে। আর্নেস্ট হেমিংওয়ে তার লেখায় প্রেম, যুদ্ধ, ভ্রমণ, নির্জনতা, মানুষের আশা-আকাংখা এবং হতাশার প্রতিফলন ঘটিয়েছেন। তার লেখা শ্রেষ্ঠ উপন্যাস হিসেবে স্বীকৃত ‘দ্য ওল্ডম্যান অ্যান্ড দ্য সি’ ভাগ্যে বিশ্বাসী হতাশ এক কিউবান বৃদ্ধের দীর্ঘ ধৈর্যের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার অভিজ্ঞতার নিখুঁত দলিল। 

বৃদ্ধ সান্টিয়াগো সমুদ্রে নৌকা ভাসিয়ে চুরাশি দিনেও একটি মাছ শিকারে ব্যর্থ হয় এবং দীর্ঘ সময় ধৈর্য ধারণ করে পরে এমন  বিশালাকার এক মার্লিন ধরতে সক্ষম হন যা ইতিপূর্বে কখনো তিনি পারেননি। এখানে মানুষের হতাশা দূর করে সাহসী হওয়ার প্রেরণা জুগিয়েছেন। সান্টিয়াগো একজন ব্যক্তির বাইরে তার অন্তর্নিহিত শক্তি এই উপন্যাসের প্রধান উপজীব্য।  পেছনে ফেলে আসা তার স্বপ্ন তাকে আগামীর পথে এগিয়ে যাওয়া সাহস দিয়েছে।

মানসিক শক্তি যে মানুষের যুদ্ধজয়ের প্রধান অবলম্বন তা এই উপন্যাসে অত্যন্ত স্পষ্ট। এখানে স্বপ্নে ‘সিংহের’ ব্যবহার একটি প্রতীক মাত্র। প্রকৃতির দুর্নিবার শক্তি এবং মানুষের অদম্য স্পৃহায় জয় সুনিশ্চিত। বৃহদাকার এক মাছ ধরার সাফল্যে বৃদ্ধ সান্টিয়াগোর অসীম শক্তি তাকে দিয়েছে বীরের মর্যাদা। 

এখানে শারীরিক জোরের চেয়েও চারিত্রিক দৃঢ়তার ওপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপিত হয়েছে। বয়োবৃদ্ধির সঙ্গে স্বাভাবিকক্রমেই শরীর ক্ষীণ, দুর্বল হলেও একজন মানুষের সম্ভাবনা এবং কর্ম তাকে উজ্জীবিত রাখতে পারে। হেমিংওয়ে সাহসের পুরনো দৃষ্টান্তকে আধুনিক, সাবলীল ভাষায় বিবৃত করে অভিনবত্ব দান করেছেন। এখানে সহজ সরল ভাষাকেও কত শক্তিশালী ও মধুময় করে তোলা যায় তার প্রমাণ মেলে।   

প্রথম বিশ্বযুদ্ধে একজন অ্যাম্বুলেন্স চালকের দায়িত্ব পালনকালে এবং স্পেনের গৃহযুদ্ধে সাংবাদিকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়ে তিনি যুদ্ধের ভয়াবহতাকে মরমে মরমে উপলব্ধি করেছেন। 

কোনো মানুষের ব্যক্তিগত জীবন বিতর্কের ঊর্ধ্বে নয়। আর্নেস্ট হেমিংওয়ের বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধের যে অভিযোগ রয়েছে, তার কোনো দালিলিক প্রমাণ মেলেনি। বর্ণাঢ্য জীবনের অধিকারী হেমিংওয়ে ১৯২১ সালে  হার্ডলি রিচার্ডসনকে বিয়ে করলেও ১৯২৭ সালেই তার সঙ্গে বিবাহবিচ্ছেদ ঘটে। পরে তিনি পলিন ফেফারের সঙ্গে বিয়েবন্ধনে আবদ্ধ হন এবং ইউরোপ ছেড়ে ফ্লোরিডায় বসবাস শুরু করেন। 

১৯৫৪ সালে সাহিত্যে নোবেল জয়ের পর তিনি অনেকটা নিরিবিলি জীবনযাপনে অভ্যস্ত হন। ১৫৫০ সালের শেষভাগে তিনি শারীরিক অসুস্থতাজনিত কারণে বেশ কয়েকবার হাসপাতালে ভর্তি হন। তার মৃত্যু নিয়ে কিছু বিতর্ক রয়েছে। বন্দুকের গুলির ক্ষতস্থানে সংক্রমণের কারণে ১৯৬১ সালের ২ জুলাই তার মৃত্যু হয়েছে বলে জানা গেলেও কোনো সূত্র বলছে, তার নিজের বন্দুকের নল পরিষ্কার করতে গিয়ে হঠাৎ নিজের গায়ে গুলি লেগে হেমিংওয়ের মৃত্যু ঘটে। তবে তার মৃত্যু ইংরেজি সাহিত্যের ক্ষেত্রে যে এক বিশাল শূন্যতার সৃষ্টি করে তা নিয়ে কোনো বিতর্ক নেই।

সময়ের আলো/আরএস/ 




https://www.shomoyeralo.com/ad/1698385080Google-News-Update.jpg

সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত


ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: কমলেশ রায়, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক গাজী আহমেদ উল্লাহ
নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।

ফোন : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৭৫ | ই-মেইল : shomoyeralo@gmail.com
close