ই-পেপার মঙ্গলবার ১৬ জুলাই ২০২৪
মঙ্গলবার ১৬ জুলাই ২০২৪

বৃক্ষায়ন ও বৃক্ষমেলা
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ৯ জুলাই, ২০২৪, ৩:৪৮ এএম  (ভিজিট : ১১৪)
প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষা, জলবায়ুর সমতা বজায় রাখা, জমির ক্ষয়রোধ, বনজসম্পদে সমৃদ্ধ হওয়া সবকিছুর জন্য চাই বন। বনকে অবহেলা করা মানে নিজের উন্নতিতে আঘাত হানা। এই ভয়াবহ অবস্থা থেকে বাঁচতে হলে প্রাকৃতিক পরিবেশে ভারসাম্য ফিরিয়ে আনতে হবে। তাই বৃক্ষরোপণ আধুনিক মানুষের জীবনে এক প্রাণপ্রদ উৎসব

জনসংখ্যার তুলনায় আমাদের দেশটি একেবারেই ছোট। ছোট এই দেশটি প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও সম্পদে ভরপুর। এদেশের মাটি খুব উর্বর। উর্বর মাটির দেশে যেনতেনভাবে একটি বীজ বা গাছের চারা পুঁতে রাখলেই এক বিশাল গাছে পরিণত হয়। এরপরও আমাদের গাছপালা ও সবুজের ঘাটতি রয়েছে কেন, তা ভেবে দেখার বিষয়। জীবন বাঁচাতে যেমন খাদ্যের প্রয়োজন, তেমনি অক্সিজেনেরও প্রয়োজন। 

অক্সিজেনের ৭০ ভাগ জোগান আসে গাছপালা থেকে। তাই বৃক্ষ আমাদের পরম বন্ধু, প্রকৃতির এক অমূল্য সম্পদ ও পরিবেশের ঢালস্বরূপ। গাছপালা না থাকলে পশুপাখি কীটপতঙ্গ হ্রাস পাবে। এর প্রভাব মানবজীবন ও কৃষিক্ষেত্রেও পড়ে থাকে।

বৃক্ষ আমাদের পরিবেশের অতি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান এবং অন্যতম বনজসম্পদ। বৃক্ষের পাতা, ফল ও বীজ আমরা খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করি। বৃক্ষ থেকে তন্তু আহরণ করে আমাদের পরিধেয় বস্ত্র প্রস্তুত করা হয়। বৃক্ষ থেকে প্রাপ্ত কাঠ দিয়ে আমাদের বাড়িঘর ও আসবাব তৈরি করা হয়। আমাদের অতি প্রয়োজনীয় লেখার সামগ্রী কাগজ ও পেনসিল বৃক্ষের কাঠ দিয়েই তৈরি করা হয়। বৃক্ষ পরিবেশের সৌন্দর্যও বৃদ্ধি করে। বৃক্ষ শুধু প্রাকৃতিক শোভাই বাড়ায় না বরং মাটির ক্ষয় রোধ করে, বন্যা প্রতিরোধ করে, ঝড়-তুফানে বাধা দিয়ে জীবন ও সম্পদ রক্ষা করে। আবহাওয়া নিয়ন্ত্রণেও বৃক্ষের ভূমিকা অপরিসীম। বৃক্ষ ছাড়া পৃথিবী মরুভূমিতে পরিণত হতো। জীবজগৎকে ছায়া দিয়ে তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করে বৃক্ষ। বিস্তৃত বনাঞ্চলের বৃক্ষ জলীয় বাষ্পপূর্ণ বায়ুকে ঘনীভূত করে বৃষ্টিপাত ঘট ায়। উদ্ভিদের অভাবে বৃষ্টিপাতেরও তারতম্য দেখা দেয়। বৃক্ষ বহুমূল্য বনজসম্পদ। তাই একদিকে বৃক্ষ যখন ধ্বংস করা হচ্ছে, অন্যদিকে তখন নতুন বৃক্ষের সৃষ্টি করতে হবে।

বৃক্ষ মানুষের জীবন ও জীবিকার সঙ্গে জড়িত। মানুষের মৌলিক চাহিদা পূরণের পাশাপাশি প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলা, জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব রোধ ও প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষাসহ নৈসর্গিক শোভাবর্ধনে বৃক্ষের গুরুত্ব অপরিসীম। পরিবেশের দূষণ রোধ ও বৈশ্বিক উষ্ণতা কমাতে গাছ সবচেয়ে বেশি ভূমিকা রেখে থাকে। অথচ নগরায়ণ, অপরিকল্পিত উন্নয়ন আর যন্ত্র-প্রযুক্তির মোহে অযাচিতভাবে বৃক্ষ নিধন করা হচ্ছে, উজাড় হচ্ছে বন। ফলে দেখা দিচ্ছে প্রাকৃতিক বিপর্যয়, বাড়ছে উষ্ণায়ন আর মানবসভ্যতা পড়ছে হুমকির মুখে। ঘাতকের কুঠারাঘাতে কত বনভূমি যে মরুভূমিতে পরিণত হলো তার ইয়ত্তা নেই। নগরজীবনে কার্বন ডাই-অক্সাইডের প্রভাবে মানুষ জটিল রোগের শিকার হচ্ছে। বৃক্ষ অনায়াসে এই বিষ কণ্ঠে ধারণ করতে পারে কিন্তু আমরা পারি না। আমাদের বেঁচে থাকার জন্য প্রচুর অক্সিজেন প্রয়োজন, যেটা বৃক্ষই দিতে পারে। 

বায়ুর দূষণরোধ ও পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় বৃক্ষের রয়েছে ব্যাপক ভূমিকা। সালফার ডাই-অক্সাইড, নাইট্রোজেন ডাই-অক্সাইড ইত্যাদি দূষণরোধে সক্ষম না হলে নগরজীবন দুরারোগ্য ব্যাধিতে ছেয়ে যাবে বলে আশঙ্কা করা হয়। অন্যদিকে পৃথিবীতে দেখা দেবে বিপুল প্রাকৃতিক বিপর্যয়। পৃথিবীর তাপমাত্রা বেড়ে যাবে ৪-৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস। কুমেরুর বরফ গলতে শুরু করবে। বৃক্ষহীনতায় বৃষ্টি কমবে, অতিরিক্ত সূর্যতাপে মাটি হয়ে উঠবে রুক্ষ। আফ্রিকার সুদান বা আমেরিকার আমাজান অববাহিকায় যে অসুরের পদধ্বনি ইতিমধ্যে শুনতে হচ্ছে তা পৃথিবীর অন্যত্রও দেখা যাবে। তাই আমাদের সচেতন হতে হবে এখনই।

প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষা, জলবায়ুর সমতা বজায় রাখা, জমির ক্ষয়রোধ, বনজসম্পদে সমৃদ্ধ হওয়া সবকিছুর জন্য চাই বন। বনকে অবহেলা করা মানে নিজের উন্নতিতে আঘাত হানা। এই ভয়াবহ অবস্থা থেকে বাঁচতে হলে প্রাকৃতিক পরিবেশে ভারসাম্য ফিরিয়ে আনতে হবে। তাই বৃক্ষরোপণ আধুনিক মানুষের জীবনে এক প্রাণপ্রদ উৎসব। দেখা গেছে, একটি বৃক্ষ যদি পঞ্চাশ বছর বাঁচে তবে তা থেকে পঞ্চাশ লাখ টাকার সমপরিমাণ প্রাণজ অক্সিজেন পাওয়া যেতে পারে। প্রাকৃতিক পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার জন্য দেশের মোট ভূখণ্ডের অন্তত দশ ভাগ বনভূমি থাকা দরকার। দেরিতে হলেও এখন সরকার বুঝেছে এবং মানুষও সচেতন হয়েছে বন সংরক্ষণের ব্যাপারে। বৃক্ষরোপণ ও চারার সযত্ন পালন তাই এখন অগ্রাধিকার পেয়েছে। সরকারি ও স্বেচ্ছাসেবী সংস্থাগুলোর এ ধরনের উদ্যোগের সুফল লক্ষ করা গেছে।

সুন্দরবন এলাকায় আলাদাভাবে ম্যানগ্রোভ লাগানো হয়েছে। এ কাজে পঞ্চায়েতগুলোও বেশ সাফল্য দেখাচ্ছে। অভয়ারণ্য নিশ্চিত করেছে পশুপাখির জীবন। বনে বাঘ ও অন্যান্য প্রাণীর সংখ্যাও বাড়ছে। খাবারের জন্য জন্তুদের এখন লোকালয়ে আসার ঘটনা কমেছে। সুদূর সাইবেরিয়া থেকে আসা অতিথি পাখিরা এখানে সুখে বাসা বাঁধে। তাই আর কোনোভাবেই বনভূমির ধ্বংস নয়, এবার বনভূমির সংরক্ষণে যত্ন নিতে হবে আমাদের। বনকে অবহেলা করায় আমাদের দুর্দশা এসেছে। এখন বনকে গুরুত্ব দেওয়ায় বনও আমাদের দুহাত ভরিয়ে দিচ্ছে। প্রবাদ আছে, ‘গ্রাম ঈশ্বরের সৃষ্টি এবং শহর মানুষের সৃষ্টি।’ দেখা গেছে যেখানেই মানুষ সৃষ্টির ওপর হস্তক্ষেপ করেছে, সেখানেই প্রকৃতি নিয়েছে নির্মম প্রতিশোধ। সুতরাং জীবনকে সুন্দর ও সুস্থরূপে উপভোগ করতে হলে বৃক্ষের শ্যামল স্নিগ্ধ আশীর্বাদ ধারায় অবগাহন করতেই হবে। শুধু কাব্যিক বিলাস নয়, নিতান্ত বাস্তব প্রয়োজনেই বৃক্ষরোপণের গুরুত্ব রয়েছে।

এর পরিণামে সভ্যতাগর্বী মানুষের জীবন জটিল ব্যাধিতে আক্রান্ত হচ্ছে। নগরজীবন বৃক্ষবিরল হয়ে আসায় মানুষের প্রাণের অস্তিত্ব আজ বিপন্ন। পৃথিবীর প্রতিটি দেশে তাই বিজ্ঞানীরা রব তুলেছেন পরিবেশ দূষণ থেকে বাঁচতে হলে তরুরাজির শ্যামল ছায়ায় প্রত্যাবর্তন করতে হবে। তাই বৃক্ষরোপণের প্রয়োজনীতা অপরিসীম। দেশের অর্থনীতি ও জনজীবনে স্বাচ্ছন্দ্য ফিরিয়ে আনার জন্য আমাদের প্রত্যেকের প্রতি বছর অন্তত দুটি করে বৃক্ষরোপণ করা দরকার। তাই এই সম্পদের ক্রমবর্ধমান ঘাটতি পূরণের জন্য লাগামহীন বৃক্ষনিধন বন্ধ করা দরকার। পাশাপাশি বৃক্ষরোপণ জোরদার করার প্রতি আমাদের আরও সচেতন হওয়া উচিত। আমাদের প্রত্যেকেরই উচিত পরিকল্পিতভাবে বৃক্ষরোপণে অংশগ্রহণ করা। ‘আসুন গাছ লাগাই, পরিবেশ বাঁচাই’- এ স্লোগানে যদি আমরা সম্মিলিতভাবে অংশগ্রহণ করি ও গাছ লাগাই তাহলে আমাদের বৃক্ষসম্পদ বৃদ্ধি পাবে এবং পরিবেশও সুন্দর হবে।

বৃক্ষরোপণ অভিযান সম্প্রসারণ করতে হলে সবার আগে প্রয়োজন ভালো বীজ, গাছের চারা ও গাছপালা পরিচর্যার জন্য প্রয়োজনীয় উপকরণ। সেই সঙ্গে এগুলো কোথায় পাওয়া যাবে সে বিষয়টি বেশ গুরুত্বপূর্ণ।

দেশকে সবুজে আচ্ছাদিত করতে গাছপালার যেমন প্রয়োজন, তেমনি প্রয়োজন উন্নতমানের নার্সারির। দেশের অধিকাংশ গাছপালার জোগান আসে নার্সারি মালিকদের কাছ থেকে। দেশের বিভিন্ন বৃক্ষমেলায় অংশগ্রহণকারী স্টল মালিকদের সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে, পর্যাপ্ত জায়গা ও সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা না থাকায় তারা কোনো রকমে এ ব্যবসায় টিকে আছেন। 

তারা মনে করেন, দেশকে গাছপালায় ভরিয়ে তুলতে এবং মানুষের কাছে তা পৌঁছে দিতে নার্সারির ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। দেশে মানসম্মত বীজ ও চারা উৎপাদনের জন্য হাতে গোনা দু-একটি সরকারি নার্সারি ছাড়া তেমন কোনো মাদার নার্সারি গড়ে ওঠেনি। কারণ বিদেশ থেকে প্রতি বছর প্রচুর গাছ আমদানি করতে হয়। ফলে প্রচুর অর্থ বিদেশে চলে যায়। তার ওপর গাছের গুণগত মানও ঝুঁকির মধ্যে থাকে। যদি সরকার অন্যান্য শিল্পের মতো অবহেলিত নার্সারি শিল্প ও মালিকদের প্রতি একটু সুনজর দেয়, তাহলে নার্সারি মালিকরা দেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে যেমন ভূমিকা রাখতে পারবেন, তেমনি জলবায়ুর অভিঘাত মোকাবিলায় হতে পারেন অংশীদার।

প্রতিটি জেলা-উপজেলা পর্যায়ে সরকারি উদ্যোগে একটি করে নার্সারি গড়ে উঠলে স্থানীয় লোকজন বৃক্ষরোপণের প্রতি আগ্রহী হয়ে উঠবেন। 

লেখক: পরিবেশবাদী ও উদ্যোক্তা

সময়ের আলো/জিকে




https://www.shomoyeralo.com/ad/1698385080Google-News-Update.jpg

সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত


ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: কমলেশ রায়, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক গাজী আহমেদ উল্লাহ
নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।

ফোন : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৭৫ | ই-মেইল : shomoyeralo@gmail.com
close