ই-পেপার মঙ্গলবার ১৬ জুলাই ২০২৪
মঙ্গলবার ১৬ জুলাই ২০২৪

মাদক ও তরুণসমাজ
সর্বাত্মক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে
প্রকাশ: বুধবার, ১০ জুলাই, ২০২৪, ১:১২ এএম আপডেট: ১০.০৭.২০২৪ ৭:৫৬ এএম  (ভিজিট : ৯৯)
দুর্নীতি আমাদের দেশের সবচেয়ে বড় শত্রু। সে দুর্নীতি বহুমাত্রিক। তার মধ্যে মাদক বাণিজ্য অন্যতম। দেশের সর্বত্র মাদক এখন সহজলভ্য। শহর-নগর, গ্রামসহ মফস্বল এলাকায়ও হাত বাড়ালেই পাওয়া যায়। রকমারি মাদকের সঙ্গে তরুণদের সংশ্লিষ্টতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। একজন মাদকাসক্ত সন্তানের কারণে একটি পরিবার ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। সেই সন্তানকে নিয়ে পরিবারগুলো দিশাহারা হয়ে পড়ছে। প্রতি মাসে মাদকসংক্রান্ত অপরাধে গ্রেফতার হচ্ছে সর্বাধিক, উদ্ধারও হচ্ছে বিপুল পরিমাণ মাদকদ্রব্য। তারপরও মাদক ব্যবসা বন্ধ হচ্ছে না।

মাদক দুর্নীতি বাংলাদেশের সমাজে শুধু যে নানা স্তরে বিস্তৃত হয়ে ব্যাপকতা অর্জন করেছে তাই নয়, এর চরিত্র হয়ে উঠেছে ভয়ংকর নিষ্ঠুর-খুনে, নির্যাতনে, সম্পত্তির জবরদখলে। এ অপতৎপরতায় গুটিকয় অসাধু পুলিশ কর্মকর্তার অংশগ্রহণ, যাদের দায়িত্ব দেশের নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। পরিণামে সরকারের ভাবমূর্তি প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে উঠছে। প্রথমে ছলেবলে, আলাপের ছলে বিনা মূল্যে মাদক দেওয়া হয়। পরে তারা মাদকে আসক্ত হয়ে পড়ে। বিভিন্ন মার্কেটের ব্যবসায়ীদেরও একইভাবে টার্গেট করা হচ্ছে। এই কায়দায় মাদক বিক্রির জন্য আসক্তের সংখ্যা বাড়ানো হয়।

মাদকাসক্তদের মধ্যে সব পেশার মানুষই রয়েছে। তবে বেশি আসক্ত তরুণরা। তাদের মেজাজ খিটখিটে থাকে, ঘুম হয় না। সব ধরনের রোগে তারা আক্রান্ত হয়।  দেশের তরুণ সমাজকে রক্ষা করতে হলে মাদকের বিরুদ্ধে দলমত নির্বিশেষে সব শ্রেণি-পেশার মানুষের সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। 

দেশের সীমান্তবর্তী ১৯ জেলার ৯৫ পয়েন্ট দিয়ে সবচেয়ে বেশি মাদক আসছে। কক্সবাজার ও বান্দরবান দিয়ে মিয়ানমার থেকে ইয়াবা পাচারের ১৫ রুট চিহ্নিত করা হয়েছে। পশ্চিমাঞ্চলের নওগাঁর সীমান্তবর্তী সাতটি নতুন রুট দিয়ে ফেনসিডিল আসছে। সাতক্ষীরার সাতটি পয়েন্ট দিয়ে আসছে ফেনসিডিল ও ইয়াবা। রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, জয়পুরহাট ও দিনাজপুরের ২৪ পয়েন্ট দিয়ে ফেনসিডিলের পাশাপাশি হেরোইন আসছে। মাদক বাণিজ্য, পাচার, আসক্তি ইত্যাদি মিলে মাদক একাই একশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। 

বাংলাদেশে বৈশ্বিকভাবে এই মাদক খুবই ব্যয়বহুল। তাই মাদক কারবারিরা এমন নেটওয়ার্ক সাজিয়েছে, এই মাদক বাংলাদেশে বিমানবন্দরসহ যেকোনো পথে আসছে। কীভাবে ও কোথায় চালানটি যাবে, কাকে টাকা দিতে হবে, এর একটা নকশা তৈরি করা থাকে। সামগ্রিকভাবে রুখে দিতে না পারলে সামনে আমাদের জন্য ভয়ংকর অবস্থা অপেক্ষা করছে। বিভিন্ন ধরনের অপরাধ বাড়তে পারে। এর বিরুদ্ধে টার্গেট করে সামগ্রিকভাবে কঠোর হাতে দমন করা না গেলে রোধ করা সম্ভব হবে না।

মাদকাসক্ত তরুণ প্রজন্মকে নিয়ে আগামীতে বাংলাদেশ ভয়াবহ ধরনের ঝুঁকির মধ্যে পড়তে যাচ্ছে।মাদকের কারণে অপরাধ বাড়ছে। দেশে খুন ও নারী নির্যাতন বৃদ্ধির অন্যতম কারণ হলো মাদক। সরকারের জিরো টলারেন্সসহ কঠোর নির্দেশনার পরও মাদকের চোরাচালান থামছে না। যে পরিমাণ কোকেন, হেরোইনসহ বিভিন্ন ধরনের মাদক সীমান্ত দিয়ে পাচার হয়ে দেশে আসছে তার ৫ শতাংশও জব্দ করা যাচ্ছে না।

মাদক কারবারিরা নৌ, সড়ক, রেল ও আকাশপথ ব্যবহার করে বিভিন্ন সীমান্তবর্তী এলাকা থেকে মাদক রাজধানীসহ সারা দেশে ছড়িয়ে দিচ্ছেন। আবার মাদক বিক্রির ক্ষেত্রেও নিত্যনতুন কৌশলের আশ্রয় নিচ্ছেন। বর্তমানে অনলাইন প্ল্যাটফরমকে টার্গেট করেও দেশে মাদকের ব্যবসা জমে উঠছে। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের একাধিক কর্মকর্তা জানান, আন্তর্জাতিকভাবে যতটুকু মাদকদ্রব্য উদ্ধার হয়, তা পাচার হয়ে আসার মাত্র ২০ শতাংশ। তবে এ দেশে মাদক উদ্ধারের হার শতকরা ৫ ভাগের বেশি।

ব্যবসার আড়ালে আকাশপথে দীর্ঘদিন ধরে আসছে ভয়ংকর মাদক। মাদকের ব্যবসা কিংবা ব্যবহারের দায়ে যাকে নেওয়া হচ্ছে কারাগারে সেই অপরাধীও সেখানে দেদার মাদক সেবনের সুবিধা পাচ্ছে। মাদক ব্যবসায়ীরা সবসময় মরিয়া হয়ে থাকেন কীভাবে কারাগারের ভেতরে কারাবন্দি মাদকসেবীদের সরবরাহ করতে পারবে। নানা কায়দায় মাদকদ্রব্য কারাগারে পৌঁছে যায়। তার মধ্যে লুঙ্গি, শার্টের কলারে, জুতার ভেতরে, খাবারের সঙ্গে, এমন কী গলায় ঝুলানো তাবিজেও মাদক সরবরাহ করা হয়। কতিপয় দুনীতিবাজ কারা কর্মকর্তা ও কারারক্ষী কারাগারের ভেতরে মাদক সরবরাহের সঙ্গে জড়িত। অর্থের বিনিময়ে মাদক ভেতরে সরবরাহ করে কারারক্ষীদের অনেকেই। 

সমুদ্রজল পথসংলগ্ন এলাকায় মাদক পাচারের বেশ বড়সড়ো নেটওয়ার্ক গড়ে উঠছে। আর তার তদারকিতে তেমনই বড়সড়ো সিন্ডিকেট যেখানে নানা স্তরের উঁচু মাপের ব্যক্তিরা দায়িত্ব পালনে তৎপর। মাদকের ছোবলে বিষাক্ত কালো বাংলাদেশের সমাজের অংশবিশেষ। এ ছাড়াও গার্মেন্টসসহ বিভিন্ন ব্যবসার অন্তরালে ভয়ংকর মাদক অহরহ আসছে, যার সামান্য কিছু ধরা পড়ে। বিমানবন্দরের একশ্রেণির অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীও জড়িত। এ কারণে বিমানবন্দরে নিরীহ যাত্রীদের লাগেজ চেকের নামে নানাভাবে হয়রানি করা হয়। অথচ মাদক পাচারকারী ও চোরাচালানিদের লাগেজে হাত দেওয়া হয় না। নিরাপদে তারা বিমানবন্দর ত্যাগ করতে পারে। এমন অভিযোগ অহরহ পাওয়া যায়। ভয়ংকর মাদক দেশে আসার জন্য মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে দোষারোপ করে লাভ হবে না। সত্যিকার অর্থে মাদক নিয়ন্ত্রণ করতে হলে সর্বস্তরের মানুষকে এগিয়ে আসতে হবে। যে যেই দায়িত্বে আছে, সেখান থেকে মাদকের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। 

বাংলাদেশে তরুণ প্রজন্মের একটি বড় অংশ মাদকাসক্ত হয়ে পড়ছে। তরুণদের মাদকাসক্ত হওয়ার পেছনে ব্যক্তিগত পর্যায়ে যত কারণ থাকুক না কেন মাদকের সহজলভ্যতা এর প্রধান কারণ। বাংলাদেশে এই প্রয়োজনীয় শিক্ষা উপকরণের ঘাটতি আছে বলেই কেউ হতাশ হয়ে পড়লে, একাকিত্ব সৃষ্টি হলে, সম্পর্ক ভেঙে গেলে কিংবা বন্ধু বা সঙ্গীর অনুরোধে মাদকাসক্ত হয়ে পড়ছে। পরিবার, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, জনপ্রতিনিধি, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানের মাদক প্রতিরোধে প্রচলিত কার্যক্রম সফলতার কোনো স্বাক্ষর সৃষ্টি করতে পারছে না। যতক্ষণ পর্যন্ত দেশে মাদক প্রবেশ ও অভ্যন্তরীণ মাদক উৎপাদন বন্ধ করা না হবে। ততক্ষণ পর্যন্ত মাদকের ভয়াবহতা বন্ধ হবে না। যে বা যারা মাদক নিয়ন্ত্রণে কাজ করবেন, মাদক প্রবেশে বাধা দেবেন এবং মাদক বাণিজ্যের সঙ্গে জড়িতদের আইনের মুখোমুখি করবেন তাদের একটি অংশ মাদক বাণিজ্যের সঙ্গে জড়িত। এখান থেকে আর্থিক সুবিধা নিয়ে থাকেন। তাই যারা প্রতিরোধ করবেন তারাই সমস্যার অংশ হলে সেই সমস্যা সমাধান করা সম্ভব নয়। মাদকদ্রব্য রোধে সর্বস্তরের জনগণের সর্বাত্মক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে

রেজিস্ট্রার, বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন নেছা মুজিব বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, জামালপুর



সময়ের আলো/আরএস/ 




https://www.shomoyeralo.com/ad/1698385080Google-News-Update.jpg

সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত


ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: কমলেশ রায়, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক গাজী আহমেদ উল্লাহ
নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।

ফোন : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৭৫ | ই-মেইল : shomoyeralo@gmail.com
close