ই-পেপার মঙ্গলবার ১৬ জুলাই ২০২৪
মঙ্গলবার ১৬ জুলাই ২০২৪

মিরপুর সরকারি ইউনানি ও আয়ুর্বেদিক মেডিকেল কলেজ
জাল সনদে ১০ বছর ধরে চাকরি চিকিৎসকের
প্রকাশ: বুধবার, ১০ জুলাই, ২০২৪, ৩:২৭ এএম  (ভিজিট : ৪২৬)
শিক্ষাগত যোগ্যতার জাল সনদ ও ভুয়া অভিজ্ঞতার সনদে চাকরি করার অভিযোগ উঠেছে এক চিকিৎসকের বিরুদ্ধে। তিনি ১০ বছর ধরে মিরপুরের সরকারি ইউনানি ও আয়ুর্বেদিক মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে সহকারী অধ্যাপক পদে কর্মরত। নিয়োগের আগে নিয়মানুযায়ী শিক্ষাগত যোগ্যতার যে সনদপত্র জমা দিয়েছেন তা ছিল জাল। এমনকি চার বছরের অভিজ্ঞতার যে সনদ দিয়েছেন সেটিও ভুয়া।

প্রতারণামূলকভাবে সনদ দাখিলের অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় তার বিরুদ্ধে মামলা করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। প্রতারণার মাধ্যমে সরকারি বেতন-ভাতা বাবদ ৬২ লাখের ওপরে টাকা আত্মসাৎ করেছেন বলে উল্লেখ করা হয় তদন্ত প্রতিবেদনে। এ ছাড়া স্বাস্থ্য অধিদফতরের অল্টারনেটিভ মেডিকেল কেয়ার (এএমসি) তদন্তেও জাল সনদ ও ভুয়া অভিজ্ঞতার সনদে চাকরি নেওয়ার সত্যতা পাওয়া গেছে। কিন্তু তারপরও অভিযুক্ত ব্যক্তির বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। তিনি এখন বহাল তবিয়্যতে চাকরি করছেন। নিয়মিত বেতন-ভাতা পাচ্ছেন। এ সংক্রান্ত যাবতীয় কাগজপত্র সময়ের আলোর হাতে এসেছে।
অভিযোগ উঠেছে, প্রশাসনকে ম্যানেজ করে টাকার বিনিময়ে সবকিছু নিয়ন্ত্রণে রেখেছেন অভিযুক্ত চিকিৎসক ডা. আ জ ম দৌলত আল মামুন। যদিও বিষয়টি অস্বীকার করেছেন তিনি।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, স্বাস্থ্য অধিদফতরের আওতাধীন স্বাস্থ্য, জনসংখ্যা ও পুষ্টি সেক্টর উন্নয়ন কর্মসূচির (এইচপিএনএসডিপি) আওতায় ২০১৪ সালের ১৮ মে অল্টারনেটিভ মেডিকেল কেয়ার (এএমসি) শীর্ষক অপারেশন প্ল্যানের অন্তর্ভুক্ত সহকারী অধ্যাপক পদসহ ৪ জনকে নিয়োগের একটি নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়। ওই পদে আবেদনের জন্য যোগ্যতা হিসেবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অনুমোদিত প্রতিষ্ঠান থেকে বিএএমএস (ব্যাচেলর অব আয়ুর্বেদিক মেডিসিন অ্যান্ড সার্জারি) ডিগ্রি ও সংশ্লিষ্ট বিষয়ে স্নাতকোত্তর ডিগ্রিসহ সরকারি ইউনানি ও আয়ুর্বেদিক মেডিকেল কলেজে ৪ বছরের শিক্ষকতার অভিজ্ঞতা চাওয়া হয়েছিল। ওই পদে আবেদন করেন ডা. দৌলত আল মামুন। পরে তাকে নিয়োগও দেওয়া হয়। অথচ এ বিষয়ে তার স্নাতকোত্তর ডিগ্রি ছিল না। এমনকি বাংলাদেশে ওই সময়ে এ বিষয়ে স্নাতকোত্তর করার কোনো সুযোগ ছিল না।

কিন্তু কাগজপত্র পরীক্ষা করে দেখা গেছে, নিয়োগপ্রাপ্ত ডা. আ জ ম দৌলত আল মামুন পোস্ট গ্র্যাজুয়েশন ডিগ্রি এবং অভিজ্ঞতার যে সনদ জমা দিয়েছেন সেগুলো সবই জাল ও ভুয়া। একটি এনজিও থেকে সাময়িক প্রশিক্ষণের সনদ নিয়ে সেটিকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি দেখিয়ে তিনি জমা দেন। আর নিয়োগ পেতে তিনি ‘এইড ফর ইন্টিগ্রেটেড মেডিসিন সোসাইটি অব বাংলাদেশ’-এর সিস্টার কনসার্ন ‘বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইন্টিগ্রেটেড মেডিসিন’ থেকে আয়ুর্বেদিক মেডিসিনের ওপর পোস্ট গ্র্যাজুয়েট সার্টিফিকেট তৈরি করেন। মূলত ওই প্রতিষ্ঠানটি ৪ বছরমেয়াদি মেডিকেল সহকারী সার্টিফিকেট প্রদান করে থাকে, যেটি কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের নিবন্ধিত (রেজি: ঝ-৩৭৭৬(৫৬৫/০০৪)।

এ ছাড়া আবেদনের শর্তানুযায়ী সহকারী অধ্যাপক হিসেবে নিয়োগ পেতে শিক্ষকতার ৪ বছরের অভিজ্ঞতা থাকার কথা উল্লেখ ছিল। এ ক্ষেত্রে তিনি ডা. রহিমা খাতুন স্বাক্ষরিত ৪ বছরের একটি অভিজ্ঞতার সনদ জমা দেন। যার মূল ভিত্তি স্বাস্থ্য অধিদফতরের তৎকালীন পরিচালক ডা. জালাল আহমেদ স্বাক্ষরিত একটি অফিস আদেশ (যার স্মারক স্বাস্থ্য/হোঃদেঃচি/২০০২/অনারারি/৯৫/৬৬৬৫/১(৩))। যা ২০০৯ সালের ২৪ আগস্ট স্বাক্ষরিত হলেও পরবর্তী সময়ে ২০০৯ সালের ৯ নভেম্বর অপর একটি স্মারকে (স্বাস্থ্য/ হোঃদেঃচি/২০০২/অনারারি/৯৫/৬৭-৬৭/১(৩)) বাতিল করা হয়।

অভিযোগ উঠেছে, ডা. আ জ ম দৌলত আল মামুন যে এনজিও প্রতিষ্ঠানের কাগজপত্র জমা দিয়েছেন সেটি তার নিজস্ব প্রতিষ্ঠান। আর এ সনদে তিনি চাকরি পেলেও পরে স্বাস্থ্য অধিদফতরের সংশ্লিষ্ট শাখায় আল মামুনের এ প্রতারণা জানাজানি হয়। এ বিষয়ে তদন্তও হয়। এমনকি দুর্নীতি দমন কমিশনও তদন্ত করে। এতে প্রতারণার সত্যতাও পাওয়া যায়। কিন্তু অজ্ঞাত কারণে বিষয়টি ওখানেই আটকে থাকে।

সংশ্লিষ্টরা জানান, দেশে শুধু সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয় ইউনানি, আয়ুর্বেদিক ও হোমিওপ্যাথিক মেডিসিনের ওপর পোস্ট গ্র্যাজুয়েশন ডিগ্রি দিতে পারে। যদিও ডা. আল মামুন যে সময়ে পোস্ট গ্র্যাজুয়েশন সম্পন্ন করার সনদ দিয়েছেন ওই সময়ে দেশের কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে এ ধরনের কোর্স চালু হয়নি। এ দেশে যাদের এ বিষয়ে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি রয়েছে, তারা ভারত থেকে এ ডিগ্রি অর্জন করছেন।

ডা. মামুনের প্রতারণার বিষয়টি বুঝতে পেরে ২০১৬ সালের ১৫ জুন এক চিকিৎসক দুদকে একটি লিখিত অভিযোগ করেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে এএমসি প্রকল্পে অযোগ্য প্রার্থীকে (ডা. দৌলত আল মামুন) চাকরি দেওয়ার অভিযোগপত্র দেন স্বাস্থ্য অধিদফতরের অল্টারনেটিভ মেডিকেল কেয়ারের তৎকালীন লাইন ডিরেক্টর। অভিযোগের ভিত্তিতে ওই বছরের ২১ জানুয়ারি অভিযুক্ত ডা. আল মামুনকে দুদকের প্রধান কার্যালয়ে হাজির হয়ে তদন্তকারী কর্মকর্তার কাছে বক্তব্য দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। এমনকি নির্ধারিত সময়ে উপস্থিত না হলে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও উল্লেখ করা হয়।

কিন্তু এরপর দীর্ঘদিন এ বিষয়ে আর কোনো তৎপরতা দেখা যায়নি। ২০১৯ সালের ৯ অক্টোবর অধিদফতরের অল্টারনেটিভ মেডিকেল কেয়ারের সাবেক লাইন ডিরেক্টর ডা. হাবিবুর রহমানের নেতৃত্বে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। শিক্ষাগত যোগ্যতা ও ভুয়া সনদপত্র জমা দেওয়ার পাশাপাশি বিপুল পরিমাণ অর্থের বিনিময়ে নিয়োগ পাওয়ার অভিযোগ ওঠায় তাকে (ডা. আ জ ম দৌলত আল মামুন) লাইন ডিরেক্টর (এএমসি) অফিসে ডাকা হয়। দীর্ঘ তদন্তের পর ২০২১ সালের ২৫ মে স্বাস্থ্য অধিদফতরে প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়। সেই প্রতিবেদনেও ডা. আ জ ম দৌলত আল মামুন যে কাগজপত্র জমা দিয়েছেন তা সঠিক নয় বলেও উল্লেখ করা হয়। এ ছাড়া তিনি যে প্রতিষ্ঠানের স্নাতকোত্তর ডিগ্রির সনদ জমা দিয়েছেন তার কোনো অস্তিত্ব খুঁজে পায়নি তদন্ত কমিটি। তার বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ব্যবস্থা নিতে সুপারিশ করা হয়। প্রায় একইরকম প্রতিবেদন জমা দেয় দুদকের তদন্ত কমিটিও।

২০২৩ সালের ১৩ ডিসেম্বরে দুদকের সেই প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘পরস্পর যোগসাজশে অবৈধ লাভ ও লোভের বশবর্তী হয়ে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী শিক্ষাগত যোগ্যতা না থাকা সত্ত্বেও সহকারী অধ্যাপক পদে নিয়োগ লাভ করেছেন। তিনি বিশ্বাস ভঙ্গের মাধ্যমে প্রতারণামূলকভাবে ভুয়া শিক্ষা সনদ দাখিল ও দুষ্কর্মে সহায়তার মাধ্যমে ৪ বছরের চাকরির অভিজ্ঞতার ভুয়া সার্টিফিকেট প্রস্তুত ও এর ব্যবহার করে সহকারী অধ্যাপক (আয়ুর্বেদিক মেডিসিন) পদে নিয়োগপ্রাপ্ত হয়ে ৬/১১/২০১৪ খ্রি. তারিখ থেকে ৩০/০৬/২০২৩ খ্রি. তারিখ পর্যন্ত সময়ে সরকারি বেতন-ভাতা বাবদ ৬২ লাখ ৫৯ হাজার ৫৪৭ টাকা টাকা উত্তোলনপূর্বক আত্মসাৎ করছেন। যা দণ্ডবিধির ৪২০/৪০৯/৪৬৭/৪৬৮/৪৭১/১০৯ এবং দুর্নীতি প্রতিরোধ আইন, ১৯৪৭-এর ৫(২) ধারায় শাস্তিযোগ্য অপরাধ।’ এর পরিপ্রেক্ষিতে ডা. আ জ ম দৌলত আল মামুনের বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনের সহকারী পরিচালক মোহাম্মদ জিন্নাতুল ইসলাম সমন্বিত জেলা কার্যালয় ঢাকা-১-এ মামলার এজাহার দায়ের করেন। মামলাটি এখনও চলমান।

জাল ও ভুয়া সনদে চাকরি নেওয়ার প্রসঙ্গে ডা. আ জ ম দৌলত আল মামুন সময়ের আলোকে বলেন, স্বাস্থ্য অধিদফতরের তদন্ত কমিটি ও দুদকের কমিটিতে আমি একাধিকবার সাক্ষ্য দিয়েছি। এখন দুদকের মামলার শুনানি চলছে। আমি হাজিরা দিচ্ছি। আবার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়েও একটি তদন্ত চলছে। আমি আমার জবাব স্পষ্টভাবে দিয়েছি। আর অধিদফতরে যখন সার্কুলার হয়েছিল তখন পোস্ট গ্র্যাজুয়েশনের কোনো ডিগ্রির প্রতিষ্ঠান ছিল না। কিন্তু নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে ইউনানি ও আয়ুবের্দিক বিষয়ে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি চাওয়া হয়। আমার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হেলথ ইকোনমিক্স ইনস্টিটউট থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি ছিল এবং একটি এনজিও ট্রেনিং ছিল। কিন্তু সেটি অথেনটিক ছিল না। আর নিয়োগ বোর্ড কমিটি তা কোর্স হিসেবে ধরেনি। তারা কাগজপত্র যাচাই-বাছাই করে প্রবেশপত্র দেয় এবং লিখিত ও ভাইভা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে আমি নিয়োগপ্রাপ্ত হই। তখন একবারের জন্য কেউ বলেনি যে, আমার কাজগপত্রে সমস্যা আছে। নিয়োগ দেওয়ার এক বছর পরে স্বাস্থ্য অধিদফতর আমার অভিজ্ঞতার সনদ বাতিল করে। অর্থাৎ আমার নিয়োগ পাওয়ার শুরু থেকেই আমি একটি গ্রুপের কাছে হিংসার পাত্র হয়ে গেছি। আমাকে বলির পাঁঠা বানানো হচ্ছে।

এ ব্যাপারে মিরপুর সরকারি ইউনানি ও আয়ুর্বেদিক মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের অধ্যক্ষ ডা. মাহাবুবা সাঈদ সোমা সময়ের আলোকে বলেন, এসব বিষয়ে তো ফোনে কথা বলা সম্ভব নয়। আমার অফিসে এলে বিস্তারিত বলা যাবে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে স্বাস্থ্য অধিদফতরের অল্টারনেটিভ মেডিকেল কেয়ারের (এএমসি) লাইন ডিরেক্টর ডা. মো. আবু জাহের সময়ের আলোকে বলেন, ডা. আ জ ম দৌলত আল মামুনের ভুয়া কাগজপত্রে নিয়োগের বিষয়টি আমরা জানি। নিয়োগ কমিটিতে যারা ছিল তারা ভালো বলতে পারবেন। মন্ত্রণালয় তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগসংক্রান্ত কাগজপত্র চেয়েছে। আমরাও তা জমা দিয়েছি। আর বিষয়টি এখন স্বাস্থ্য শিক্ষার অধীনে চলে গেছে। কিন্তু এখন যেহেতু বিষয়টি নিয়ে মামলা চলছে। তাই বিচারাধীন বিষয়ে কোনো কিছু বলা ঠিক হবে না।

সময়ের আলো/আরএস/




https://www.shomoyeralo.com/ad/1698385080Google-News-Update.jpg

সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত


ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: কমলেশ রায়, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক গাজী আহমেদ উল্লাহ
নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।

ফোন : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৭৫ | ই-মেইল : shomoyeralo@gmail.com
close