ই-পেপার রোববার ২৬ জানুয়ারি ২০২০ ১২ মাঘ ১৪২৬
ই-পেপার রোববার ২৬ জানুয়ারি ২০২০

হৃদরোগ হাসপাতাল থেকে কোনো রোগী ফেরত দেওয়া হয় না
মো. আফজালুর রহমান
প্রকাশ: সোমবার, ৯ সেপ্টেম্বর, ২০১৯, ১২:০০ এএম | প্রিন্ট সংস্করণ  Count : 88

জাতীয় হৃদরোগ হাসপাতাল বছরের ৩৬৫ দিন, ২৪ ঘণ্টা বিরতিহীনভাবে চলমান। আমরা হৃদরোগে আক্রান্ত কোনো রোগী হাসপাতালে এসে পৌঁছলে তাকে ফিরিয়ে দেই না। এই মুহূর্তে বিছানার সংকট রয়েছে যা আমরা অচিরেই কাটিয়ে উঠব। কিন্তু ফ্লোরে বা করিডোরে রেখে হলেও আমরা সব রোগীকে সঠিক চিকিৎসাসেবাটা দিয়ে যাচ্ছি। বিছানা খালি নেই বলে কাউকে
ফিরিয়ে দেওয়া হয় না। আমি মনে করি, এটাই এই হাসপাতালের সবচেয়ে বড় এবং উল্লেখযোগ্য দিক








জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল দেশের সর্ববৃহৎ সরকারি বিশেষায়িত হৃদরোগ হাসপাতাল। এই হাসপাতাল দেশের সর্বস্তরের মানুষের হৃদরোগ চিকিৎসায় অগ্রগণ্য ভ‚মিকা পালন করে। হাসপাতালটি নিরলস চিকিৎসাসেবা দেওয়ার মধ্য দিয়েই দেশের আপাময় জনসাধারণের আস্থা অর্জনে সমর্থ হয়েছে। ঢাকা এবং ঢাকার বাইরে দেশের যেকোনো প্রান্তের সাধারণ মানুষ যেকোনো ধরনের হৃদরোগের সমস্যায় পড়লেই সর্বপ্রথম এই হৃদরোগ হাসপাতালের কথা স্মরণ করে। হাসপাতালের বিছানা সংখ্যার ৩-৪ গুণ রোগী এখানে ভর্তি থাকলেও দিন-রাত ২৪ ঘণ্টা সবাই চিকিৎসাসেবা পায়।
আর এই হাসপাতালের সেবা সংশ্লিষ্ট
কর্তৃপক্ষ যে যার অবস্থানে থেকে নিরলসভাবে কাজ করে।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০১৮ সালের ২৯ অক্টোবর হাসপাতালের অতিরিক্ত চার তলা ভার্টিকেল এক্সটেনশনের কাজের ভিত্তিপ্রস্তর উদ্বোধন করেন। নানা প্রতিক‚লতা পেরিয়ে এবং প্রশাসনিক জঞ্জাল পরিষ্কার করে এ কাজটি এখন সফলভাবে শেষের পথে। বর্তমানের জাতীয় হৃদরোগ হাসপাতালে সব মিলে বেড রয়েছে ৪১৪টি। এর সঙ্গে নতুন ভবনে আরও ৮৩৪টি বেড সংযোজিত হলে সর্বমোট বেড সংখ্যা দাঁড়াবে ১২৪৮টি। তখন এটি হবে দেশের হৃদরোগে সর্ববৃহৎ এবং সর্বাধুনিক চিকিৎসাকেন্দ্র। উন্নত বিশে^ হৃদরোগের যে ধরনের জটিল অস্ত্রপচারসহ যে যে ধরনের আধুনিক চিকিৎসা হয়, এখানেও অতি অল্প খরচে সেই একই সেবা পাওয়া যাবে।
শুধু তাই নয়, অবকাঠামো বৃদ্ধির পাশাপাশি চিকিৎসার ক্ষেত্রেও দ্রæত এগিয়ে যাচ্ছে এই হৃদরোগ হাসপাতাল। এখানে দেশের অন্যান্য হাসপাতালের তুলনায় অত্যন্ত স্বল্প ব্যয়ে বিভিন্ন ইন্টারভেনশনাল চিকিৎসা, যেমনÑ এনজিওগ্রাম, স্টেন্টিং বা রক্তনালিতে রিং লাগানো, পেসমেকার প্রতিস্থাপন, হৃৎপিÐের ভাল্বের ত্রæটি সংশোধন এবং বাইপাস অপারেশন, রক্তনালির অপারেশনসহ বিভিন্ন চিকিৎসাসেবা প্রদান করা হচ্ছে। এতে হৃদরোগের চিকিৎসার জন্য বিদেশ যাওয়ার প্রবণতা বহুলাংশে হ্রাস পেয়েছে। বর্তমানে অত্যাধুনিক ৩৮ বেডের আইসিইউ, ৭টি অত্যাধুনিক কার্ডিয়াক সার্জারি অপারেশন থিয়েটার, ও ১টি ইমার্জেন্সি ভাসুকাল অপারেশন থিয়েটার সর্বদা সেবা দিয়ে যাচ্ছে। এ ছাড়াও ৩টি অত্যাধুনিক ভাসকুলার সার্জারি অপারেশন থিয়েটার অচিরেই চালু হবে।
প্রতিষ্ঠা লগ্ন থেকে শুরু হওয়া উত্তর বøকের নিচ তলায় পুরনো ক্যাথ ল্যাব বিভাগটি সংস্কার ও আধুনিকায়ন করে মধ্য বøকের দ্বিতীয় তলায় স্থানান্তরের কাজ এগিয়ে চলছে। এতে করে একই ফ্লোরে ক্যাথ ল্যাব, সিসিইউ ও পিসিসিইউ সেবা রোগীরা অতি দ্রæত লাভ করবে। বর্তমান অর্থবছরে সিএমএসডির মাধ্যমে নতুন ও উন্নতমানের দুটি এনজিওগ্রাম মেশিন ক্রয় করা হয়েছে। এ ছাড়াও ক্যাথ ল্যাবের জন্য স্টেন্ট লাগালে রোগীরা কতটুকু উপকৃত হবে সেই লক্ষ্যে এফএফআর ও আইভাস নামক অত্যাধুনিক মেশিন সংযোজন করা হয়েছে। এ ছাড়াও রোগীদের চিকিৎসার স্বার্থে, চারটি আল্ট্রাসাউন্ড মেশিন, নতুন কালার ডপলার ইকো মেশিন, ভাসকুলার ডপলার মেশিন, ইসিজি মেশিন সরকারি সকল নিয়মনীতি অনুসরণ করে ক্রয় করা হয়েছে। আমাদের সবার একমাত্র লক্ষ্যই হচ্ছে কোনো প্রকার হয়রানি ও বিড়ম্বনা ছাড়াই যেন একজন রোগী স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় উন্নতমানের চিকিৎসা পায়।
হাসপাতাল থেকেই সব রোগীকে হার্ট অ্যাটাকের চিকিৎসায় ব্যবহৃত জীবন রক্ষাকারী ওষুধ স্ট্রেপটোকাইনেস সিসিইউ-১ ও সিসিইউ-২ তে বিনামূল্যে দেওয়া হয়। এ ছাড়া ভর্তিকৃত সব রোগীকে প্রথম দুই দিন ৪টি করে ওহল. ঊহড়ীধঢ়ধৎরহ বিনামূল্যে দেওয়া হয়। হৃদরোগ চিকিৎসায় অন্যান্য সব প্রয়োজনীয় ওষুধও হাসপাতাল থেকে বিনামূল্যে দেওয়া হয়। এ ছাড়া আমরা যে বিভিন্ন ইন্টাভেনশনাল পদ্ধতিতে রোগীদের চিকিৎসা দিয়ে থাকি তাতে প্রচুর উুব ব্যবহার করতে হয়। এটাও বেশ ব্যয়বহুল। জাতীয় হৃদরোগ হাসপাতালে দেশের ভেতরে সরকারিভাবে বিনামূল্যে সরবরাহ এটাই প্রথম।
জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট সর্বতোভাবে চেষ্টা করে যাচ্ছে এদেশে হৃদরোগ চিকিৎসা ব্যবস্থা এবং হৃদরোগ শিক্ষা ব্যবস্থার অবকাঠামোকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করতে। আমাদের ইন্টারভেনশনাল কার্ডিওলজি ইতোমধ্যে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত হয়েছে। এ ছাড়া আমাদের বাংলা ইন্টাভেনশনাল থেরাপিউটিক্স (বিআইটি) আন্তর্জাতিক অঙ্গনের
নেতৃস্থানীয় ইন্টারভেনশনাল কার্ডিওলজির একটি সংগঠন। নিয়মিত প্রশিক্ষণ, কর্মশালা, সেমিনার ও সম্মেলনের মাধ্যমে যুগোপযোগী হৃদরোগ চিকিৎসায় এই সংগঠন কাজ করছে।
আমরা সবাই জানি, সারা দুনিয়ায় তো বটেই, বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি মৃত্যু হার হৃদরোগে। তাই হৃদরোগ থেকে মুক্ত থাকতে বা হৃদরোগীদের জন্যই শুধু নয়, আমাদের সবাইকেই দৈনন্দিন জীবনে সতর্কতার সঙ্গে নিয়মতান্ত্রিক জীবনযাপন করা প্রয়োজন। আমাদের মনে রাখা প্রয়োজন যেকোনো রোগই প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধ উত্তম। হৃদরোগের ক্ষেত্রে এ কথাটা সবচেয়ে বেশি প্রযোজ্য। হৃদরোগ প্রতিরোধযোগ্য। হৃদরোগ প্রতিরোধের জন্য আমাদের সচেতন হতে হবে। ধূমপান ত্যাগ করতে হবে। স্বাস্থ্যসম্মত খাবার-দাবারে অভ্যস্ত হতে হবে। প্রতিদিন টাটকা শাক-সবজি, ফলমূল খেতে হবে। অধিক তেল-চর্বিজাতীয় খাবার বর্জন করতে হবে। প্রতিদিন কমপক্ষে আধা ঘণ্টা হাঁটতে হবে। ৪০ বছর বয়সের পর নিয়মিত কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, রক্তে উচ্চ মাত্রার কোলস্টেরল আছে কি না দেখতে হবে এবং সে অনুযায়ী চিকিৎসা নিয়ে নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে। আমরা দেশে ও বিদেশে দেখে ও জেনে আসছি যে, একটি আন্তর্জাতিক মানের হাসপাতালের জন্য পর্যাপ্ত পরিমাণে আধুনিক যন্ত্রপাতি, প্রশিক্ষিত টেকনিশিয়ান, প্রশিক্ষিত নার্স, ব্রাদার, জুনিয়র ডাক্তার এমনকি বয়-আয়াও গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু আমাদের দেশের হাসপাতালগুলোতে রোগীর আনুপাতিক হারে নার্স ও ডাক্তারের সংখ্যা প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম। সব সীমাবদ্ধতার মধ্যেও সরকার আন্তরিকভাবে কাজ করছে, চেষ্টা করছে আমাদের চিকিৎসা ব্যবস্থাকে আরও এগিয়ে নিতে। এ ব্যাপারে সরকার চেষ্টা করে যাচ্ছে। ইতোমধ্যে প্রধানমন্ত্রী সারা দেশে প্রচুর সংখ্যক নার্স নিয়োগ দিয়েছেন। চিকিৎসক নিয়োগ একটি চলমান প্রক্রিয়া। আমার মনে হয়, চিকিৎসকদের পাশাপাশি নার্স, আয়া, ওয়ার্ড বয়দেরও প্রশিক্ষণ দরকার। উন্নত দেশে কিন্তু নার্স, আয়া, ওয়ার্ড বয়রা রোগী সেবায় খুব দক্ষ। আমরাও চেষ্টা করছি আন্তর্জাতিক মানের দক্ষ নার্স, আয়া ও ওয়ার্ড বয় তৈরি করতে। চিকিৎসা একটি সম্মিলিত দলবদ্ধ প্রচেষ্টা। আমি আশাবাদী বাংলাদেশ হৃদরোগ চিকিৎসার একটি সর্বোৎকৃষ্ট পেশাগত জনবল তৈরি হবে।
একই সঙ্গে আমাদের সবাইকে মনে রাখতে হবে, মানুষ মানুষের জন্য। সবাইকে মানুষের জন্য কাজ করতে হবে। দেশের জন্য কাজ করতে হবে। আর আমরা যারা চিকিৎসক, এ ক্ষেত্রে আমাদের সুযোগ অন্য আর দশটা পেশার মানুষের চেয়ে অনেক বেশি।
মনোযোগ দিয়ে রোগীর সেবা করাই পরম ধর্ম এবং দেশ সেবার অন্যতম কাজ। মানুষের সেবার মাঝেই সব আনন্দ ও তৃপ্তি। অন্য কিছুতে তা নেই। আমাদের একমাত্র লক্ষ্য রোগীর সেবা অর্থ্যাৎ শ্রম, মেধা ও মনন খাটিয়ে তাকে সুস্থ করে তোলা। আমি সুদক্ষ হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ তৈরি করার জন্য জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে যেসব কাজ করছি তার মূল লক্ষ্যও দেশের রোগীদের সেবা করা। আমি সবার উদ্দেশে বলব, হাতে-কলমে কাজ শিখুন, প্রশিক্ষণ
নিন, গবেষণা করুন, প্রকারান্তরে
এদেশের রোগীরাই সুফল পাবে। দেশের গৌরব বাড়বে। জাতীয় হৃদরোগ হাসপাতাল বছরের ৩৬৫ দিন, ২৪ ঘণ্টা বিরতিহীনভাবে চলমান। আমরা হৃদরোগে আক্রান্ত কোনো রোগী হাসপাতালে এসে পৌঁছলে তাকে ফিরিয়ে দেই না। এই মুহূর্তে বিছানার সংকট রয়েছে যা আমরা অচিরেই কাটিয়ে উঠব। কিন্তু ফ্লোরে বা করিডোরে রেখে হলেও আমরা সব রোগীকে সঠিক চিকিৎসাসেবাটা দিয়ে যাচ্ছি। বিছানা খালি নেই বলে কাউকে ফিরিয়ে দেওয়া হয় না। আমি মনে করি, এটাই এই হাসপাতালের সবচেয়ে বড় এবং উল্লেখযোগ্য দিক।

অধ্যাপক, চিকিৎসক ও পরিচালকজাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল, শেরেবাংলা নগর, ঢাকা




সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত


ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: কমলেশ রায়, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড-এর পক্ষে প্রকাশক গাজী আহমেদ উল্লাহ
নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।

ফোন : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৭৫। ই-মেইল : [email protected]