ই-পেপার বিজ্ঞাপনের তালিকা বৃহস্পতিবার ৯ জুলাই ২০২০ ২৫ আষাঢ় ১৪২৭
ই-পেপার বৃহস্পতিবার ৯ জুলাই ২০২০

বুলবুলের ছোবলে বিপর্যস্ত জনজীবন (ভিডিও)
সময়ের আলো ডেস্ক
প্রকাশ: রোববার, ১০ নভেম্বর, ২০১৯, ১২:০০ এএম আপডেট: ১০.১১.২০১৯ ৮:৪২ এএম | প্রিন্ট সংস্করণ  Count : 603


ভয়ঙ্কর হয়ে ওঠা ঘূর্ণিঝড় বুলবুল আঘাত হেনেছে বাংলাদেশে। এর আঘাতে দেশের উপকূলীয় এলাকা ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ডুবে গেছে অনেক জেলেনৌকা। নিখোঁজ হয়েছেন অনেক জেলে। স্বাভাবিকের চেয়ে ৫ থেকে ৭ ফুট উচ্চতার জলোচ্ছ্বাসে বেড়িবাঁধ ভেঙে প্লাবিত হয়েছে নিঞ্চল। ঝড়ের অগ্রবর্তী অংশ শনিবার দুপুরেই সুন্দরবনের দুবলার চর এলাকায় আঘাত হানে। দুপুর ১২টার দিকে ৬০ থেকে ৭০ কিলোমিটার বেগে ১০-১৫ মিনিটব্যাপী ঝড়ো বাতাস বয়ে যায়। তারপর এটি উপকূলীয় এলাকায় আছড়ে পড়ে।



শনিবার সকালেই বাগেরহাটের মোংলা ও পটুয়াখালীর পায়রা সমুদ্রবন্দরকে ১০ নম্বর মহা বিপদ সঙ্কেত দেখাতে বলে আবহাওয়া অধিদফতর। চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দরকে ৯ নম্বর মহা বিপদ সঙ্কেত দেখাতে বলা হয়। তবে কক্সবাজারে আগের মতোই ৪ নম্বর হুঁশিয়ারি সঙ্কেত বহাল থাকে। ঘূর্ণিঝড়ের কারণে চট্টগ্রাম শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে বিমান ওঠানামা বন্ধ হয়ে যায়। শনিবার বিকাল ৪টা থেকে রোববার ভোর ৬টা পর্যন্ত চট্টগ্রাম বিমানবন্দর বন্ধ থাকার ঘোষণা দেওয়া হয়।

উপকূলীয় জেলা ভোলা, বরগুনা, পটুয়াখালী, বরিশাল, পিরোজপুর, ঝালকাঠি, বাগেরহাট, খুলনা, সাতক্ষীরা এবং তাদের অদূরবর্তী দ্বীপ ও চরগুলোকে ১০ নম্বর মহা বিপদ সঙ্কেতের আওতায় রাখা হয়েছে। চট্টগ্রাম, নোয়াখালী, লক্ষীপুর, ফেনী, চাঁদপুর থাকবে ৯ নম্বর বিপদ সঙ্কেতের আওতায়। ইতোমধ্যেই বুলবুল ভারতের পশ্চিমবঙ্গের সাগরদ্বীপে আছড়ে পড়েছে। সেখানে প্রবল বৃষ্টি ও ঝড়ো বাতাস বয়ে যাচ্ছে।

আবহাওয়া দফতর জানায়, ‘রাত ১০টা থেকে ঘূর্ণিঝড়ের বর্ধিতাংশ উপকূলীয় এলাকায় প্রবেশ শুরু করতে পারে। ঘূর্ণিঝড় কেন্দ্র উপক‚লে আঘাত হানতে মধ্যরাত লাগতে পারে। ঘূর্ণিঝড়টির ব্যাস ২০০ থেকে ২৫০ কিলোমিটার। মূল কেন্দ্রের ব্যাসও ২০ কিলোমিটারের মতো।’ বর্তমান গতিচিত্র অনুযায়ী, ঘূর্ণিঝড়টির কেন্দ্র উপকূলে উঠবে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ হয়ে, এরপর এটি স্থলভাগের ওপর দিয়ে সাতক্ষীরা হয়ে বাংলাদেশে ঢুকবে।

বুলবুল অতিক্রমের সময় সাগরে জোয়ার থাকবে বলে স্বাভাবিকের চেয়ে ৫-৭ ফুট বেশি উঁচু জলোচ্ছ্বাসের আশঙ্কার কথা আগেই জানিয়েছে আবহাওয়া বিভাগ। ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাবে উপকূলীয় এলাকাগুলোতে বৃষ্টি ঝরছে।

ঘূর্ণিঝড় ‘বুলবুল’ বাংলাদেশে আঘাত হানার আগে শনিবার সন্ধ্যা পর্যন্ত ১৮ লাখ মানুষকে ৪ হাজার ৭১টি আশ্রয়কেন্দ্রে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে দুই হাজার প্যাকেট করে খাবার সরবরাহ করা হয়েছে। প্রতি প্যাকেটের খাবার একটি পরিবার সাত দিন খেতে পারবে। উপকূলীয় সাতটি জেলা খুলনা, সাতক্ষীরা, বাগেরহাট, বরগুনা, পটুয়াখালী, ভোলা ও পিরোজপুরে দুই হাজার করে মোট ১৪ হাজার শুকনো খাবারের প্যাকেট এবং নগদ ১০ লাখ করে মোট ৭০ লাখ টাকা, ২০০ টন করে ১৪শ’ টন চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। শনিবার সচিবালয়ে ঘূর্ণিঝড় মোকাবেলায় আন্তঃমন্ত্রণালয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সমন্বয় কমিটির সভা শেষে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী মো. এনামুর রহমান এসব তথ্য জানান।

অবস্থা মোকাবেলায় সশস্ত্র বাহিনী প্রস্তুত রয়েছে জানিয়ে এনামুর রহমান বলেন, এলজিআরডি মন্ত্রণালয় ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ১ হাজার ৫০০ মেডিকেল টিম প্রস্তুত রেখেছে। প্রচুর পরিমাণে পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট ও খাবার স্যালাইন প্রস্তুত রাখা হয়েছে। এ ছাড়া নোয়াখালী, লক্ষীপুর, ফেনী, চাঁদপুর, চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার জেলায় পাঁচ লাখ করে মোট ৩০ লাখ টাকা, ১০০ টন করে মোট ৬০০ টন চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। খুলনা, সাতক্ষীরা, পিরোজপুর, বরগুনা, বরিশাল, ঝালকাঠি, পটুয়াখালী, ভোলা ও বাগেরহাটের নয়টি জেলায় এক লাখ টাকা করে গোখাদ্য বাবদ এবং এক লাখ টাকা করে শিশুখাদ্য বাবদ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। চাহিদা অনুযায়ী বরাদ্দ আরও বাড়ানো হবে বলে জানিয়েছেন প্রতিমন্ত্রী।

যাদের আশ্রয়কেন্দ্রে সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে তাদের গবাদিপশু যেন নিরাপদে সাইক্লোন শেল্টারে আশ্রয় নিতে পারে সে বিষয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে ঘূর্ণিঝড় বুলবুল সংশ্লিষ্ট ১৩টি উপকূলীয় জেলা ও এর অন্তর্ভুক্ত উপজেলায় কর্মরত সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ছুটি বাতিল করা হয়েছে। উপক‚লীয় জেলা-উপজেলায় এ বিষয়ে সতর্কতামূলক প্রচারণা কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে। প্রতিমন্ত্রী বলেন, দুপুর ২টার মধ্যে সবাইকে আশ্রয়কেন্দ্রে সরিয়ে নেওয়ার কথা থাকলেও আমাদের দেশে একটা প্রবণতা হচ্ছে, আঘাত হানার আগমুহূর্ত পর্যন্ত মানুষ বাড়িতে থাকতে চায়। আমরা নির্দেশনা দিয়েছি, বল প্রয়োগ করে হলেও সবাইকে নিয়ে আসার জন্য।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সবসময় যোগাযোগ রাখছেন জানিয়ে এনামুর রহমান বলেন, শুক্রবার সারা দিন এক ঘণ্টা পর পর তিনি টেলিফোনে কথা বলেছেন। আমাদের নির্দেশনা দিয়েছেন, কী পদক্ষেপ নিয়েছি সেগুলো শুনেছেন। তিনি সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন, আমরা যেন এসওডি (দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিষয়ক স্থায়ী আদেশাবলি) অনুযায়ী ঘূর্ণিঝড় আঘাত হানার ১৮ ঘণ্টা আগে সব উপক‚লের জনগণকে নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্রে নিতে পারি।

প্রস্তুত স্থানীয় সরকার বিভাগ : বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদফতরের পূর্বাভাস অনুযায়ী বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট ঘূর্ণিঝড় বুলবুলের সম্ভাব্য প্রভাব মোকাবেলার জন্য আগাম প্রস্তুতি নিয়েছে স্থানীয় সরকার বিভাগ। শনিবার স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের জনসংযোগ কর্মকর্তা মাহমুদুল হাসান স্বাক্ষরিত গণমাধ্যমে পাঠানো এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়।

বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, ঘূর্ণিঝড় বুলবুলের প্রস্তুতি হিসেবে ১৩টি উপক‚লীয় জেলার স্থানীয় সরকার বিভাগের আওতাধীন স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদফতর ও জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদফতর এবং স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানে (জেলা পরিষদ, পৌরসভা, উপজেলা পরিষদ ও ইউনিয়ন পরিষদ) কর্মরত সকল কর্মকর্তা-কর্মচারীকে ৯ থেকে ১০ তারিখের ছুটি (সাপ্তাহিক ও সরকারি) বাতিলসহ কর্মস্থল ত্যাগ না করার নির্দেশনা জারি করেছে স্থানীয় সরকার বিভাগ। জেলাগুলো হলো সাতক্ষীরা, বাগেরহাট, পটুয়াখালী, ভোলা, বরগুনা, পিরোজপুর, নোয়াখালী, ফেনী, লক্ষীপুর, খুলনা, চাঁদপুর, কক্সবাজার ও চট্টগ্রাম।

ফায়ার সার্ভিস কর্মীদের ছুটি বাতিল : ঘূর্ণিঝড় বুলবুল মোকাবেলায় সর্বোচ্চ প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদফতর। ছুটি বাতিল করে সংশ্লিষ্ট এলাকায় কর্মরত সব কর্মকর্তা-কর্মচারীকে স্ট্যান্ডবাই রাখা হয়েছে।

বিষয়টি নিশ্চিত করে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদফতরের মিডিয়া সেলের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. শাহজাহান শিকদার জানান, উপক‚লীয় জেলাগুলোতে প্রস্তুত রাখা হয়েছে ওয়াটার রেসকিউ টিম, ফাস্ট এইড টিম এবং সার্চ অ্যান্ড রেসকিউ টিম। তিনি বলেন, ঘূর্ণিঝড় বুলবুলের যাবতীয় খবরাখবর সংগ্রহ ও সার্বক্ষণিক যোগাযোগের জন্য ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের পক্ষ থেকে ৪টি স্বতন্ত্র নিয়ন্ত্রণ কক্ষ খোলা হয়েছে।

সময়ের আলোর নিজস্ব প্রতিবেদক ও প্রতিনিধিদের পাঠানো খবর
বাগেরহাট : ঘূর্ণিঝড় বুলবুল মোকাবেলায় বাংলাদেশ কোস্ট গার্ডের বাগেরহাটের মোংলাস্থ পশ্চিম জোনের সদস্যরা ১০টি অপারেশনাল জাহাজ নিয়ে সব ধরনের প্রস্তুতি গ্রহণ করে। দুবলার চর হতে পর্যটকদের ফেরত পাঠানোসহ স্থানীয় জেলেদের কোস্ট গার্ডের সিসিএমসিতে আশ্রয় দেওয়া হয়েছে। শ্যামনগর থানার গোলাখালী গ্রাম থেকে ৬৫০ জন পুরুষ ও মহিলাকে নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। বাগেরহাটের জেলা প্রশাসক জানান, ঘূর্ণিঝড় মোকাবেলায় এবং জানমালের যাতে ক্ষতি না হয় সে জন্য সরকারিভাবে ব্যাপক প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। জেলায় ২৩৪টি আশ্রয়কেন্দ্রে সোয়া দুই লাখ মানুষের আশ্রয়ের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হয়েছে।

বরিশাল : ঘূর্ণিঝড় বুলবুল মোকাবেলায় বরিশাল বিভাগীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে সব ধরনের প্রস্তুতি নেওয়ার সিদ্ধান্ত জানানো হয়েছে। মোট ২ হাজার ১১৪টি আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত করা হয়েছে। পাশাপাশি বরিশালের ছয় জেলায় ২৫ হাজার সেচ্ছাসেবক নামানো হয়েছে। দুর্যোগকালীন সময়ে বিতরণের জন্য চাল, নগদ টাকা এবং শুকনো খাবার তৈরি করা রয়েছে। বিভিন্ন সংস্থার স্বেচ্ছাসেবকদের প্রস্তুত রাখার পাশাপাশি সব সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীর ছুটি বাতিল করা হয়েছে। আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখার পাশাপাশি বিভিন্ন বিদ্যালয় ভবন, কমিউনিটি সেন্টার ও উপাসনালয় ভবনও প্রস্তুত রয়েছে। দুর্যোগপরবর্তী ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য পর্যাপ্ত পরিমাণে শুকনো খাবারসহ বিভিন্ন সহায়তার ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। সেই সঙ্গে বিশুদ্ধ পানির সংকট হলে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল বিভাগকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

বরগুনা : বুলবুল মোকাবেলায় বরগুনায় নেওয়া হয়েছে সর্বোচ্চ প্রস্তুতি। তবে এর মধ্যেই বঙ্গোপসাগরের নারিকেলবাড়িয়া নামক স্থানে এফবি,তরিকুল নামের একটি মাছধরার ট্রলার ১৫ জেলেসহ নিখোঁজ রয়েছে। বরগুনা জেলা মৎস্যজীবী ট্রলার মালিক সমিতির সভাপতি গোলাম মোস্তফা চৌধুরী জানান, শনিবার দুপুর পর্যন্ত নিখোঁজ ১৫ জেলের সন্ধান পাওয়া যায়নি। বৃহস্পতিবার বিকালে বঙ্গোপসাগরের নারিকেলবাড়িয়া এলাকায় ওই মাছধরা ট্রলারের ইঞ্জিন বিকল হয়ে যায়। ঘটনার পর থেকে গত দুদিনে ১৫ জেলেসহ ট্রলারটির সন্ধান পাওয়া যায়নি।

এদিকে বরগুনার জেলা প্রশাসক মোস্তাইন বিল্লাহ জানান, বেড়িবাঁধের বাইরের লোকজনকে সরিয়ে নিয়ে আসা হয়েছে। বরগুনায় ৫০৯টি সাইক্লোন শেল্টার, ৪২টি মেডিকেল টিম, ৮টি জরুরি কন্ট্রোল রুমসহ সিপিপি, রেড ক্রিসেন্ট ও বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের ১০ হাজার স্বেচ্ছাসেবক প্রস্তুত রয়েছেন। সব সাইক্লোন শেল্টারে পর্যাপ্ত শুকনো খাবারের ব্যবস্থা করা হয়েছে।

খুলনা : বুলবুলের প্রভাবে উপক‚লীয় নদীর পানির উচ্চতা বৃদ্ধি পেয়েছে। দক্ষিণাঞ্চলের উপক‚লীয় তিন জেলা খুলনা, বাগেরহাট ও সাতক্ষীরায় প্রায় ৫০০ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ ঝুঁকিপূর্ণ রয়েছে। প্রস্তুত রাখা হয়েছে ৮৫৩টি সাইক্লোন শেল্টার। কয়রার আটহারা এলাকাসহ বেড়িবাঁধের বেশ কিছু এলাকা ঝুঁকিপূর্ণ। পানির যে চাপ তাতে যেকোনো সময় বাঁধ ভেঙে গ্রাম তলিয়ে সিডর-আইলার মতো ক্ষতি হতে পারে। শনিবার সকালেও দমকা বাতাস আর গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি হচ্ছিল। স্থানীয় উপজেলা প্রশাসন ও সিপিপির স্বেচ্ছাসেবকরা মাইকিং করে সতর্কতামূলক প্রচারণায় নেমেছেন। সাগর ও সংলগ্ন সুন্দরবনের নদ-নদী খুবই উত্তাল রয়েছে। মোংলা বন্দরসহ সুন্দরবন উপক‚লের আশপাশের এলাকায় হালকা ও মাঝারি বৃষ্টিপাত এবং ঝড়ো হাওয়া বয়ে যাচ্ছে। খুলনাসহ উপক‚লীয় জনপদে ত্রাণ ও উদ্ধার তৎপরতার জন্য খুলনা নৌঘাঁটি তিতুমীরে পাঁচটি জাহাজ প্রস্তুত রাখা হয়েছে।

মোংলা : শনিবার সকাল থেকে মোংলা বন্দর শহরে মুষলধারে বৃষ্টি হচ্ছে। বন্দরে অবস্থানরত সব দেশি-বিদেশি বাণিজ্যিক জাহাজের পণ্য খালাস-বোঝাই কাজ বন্ধ রয়েছে। ১০ নম্বর মহা বিপদ সঙ্কেত হওয়ায় পশুর নদী ও মোংলা নদীতে সব নৌযান নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। বন্দরে বিশেষ সতর্কতা অ্যালার্ট-৩ বলবত রয়েছে। সকাল থেকে মানুষকে নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়ার জন্য সিপিপি, পৌরসভা ও উপজেলা প্রশাসন মাইকিং করে। উপজেলার পৌরসভাসহ সব ইউনিয়নের ৭৮টি আশ্রয়কেন্দ্র খুলে রাখা হয়েছে এবং সব এলাকায় পাকা স্থাপনা ও স্কুল, কলেজ, মাদ্রসার ভবনগুলো মানুষের আশ্রয়ের জন্য প্রস্তুত রাখে উপজেলা প্রশাসন। শুকনা খাবার চিড়া-মুড়ি-গুড়, মোমবাতি ও বিশুদ্ধ পানি ব্যবসায়ীদের মজুদ রাখার নির্দেশনা দিয়েছেন নির্বাহী কর্মকর্তা।

ঝালকাঠি : শনিবার বেলা ১১টা থেকে ভারী বৃষ্টি ও দমকা হাওয়া বইতে শুরু করে। স্থানীয় সুগন্ধা, বিষখালী ও হলতা নদীতে সকল ধরনের নৌযান চলাচল বন্ধ রয়েছে। ঝালকাঠি লঞ্চ টার্মিনাল থেকে নৌযানগুলোকে নদীর ওপারে নিয়ে নিরাপদ স্থানে নোঙর করে রাখা হয়েছে। দুর্যোগ মোকাবেলার জন্য জেলায় প্রায় ৩ হাজার স্বেচ্ছাসেবক, ৩৭টি মেডিকেল টিম ও শুকনো খাবার প্রস্তুত রাখা হয়েছে। জেলায় ২৯টি সাইক্লোন শেল্টার ও ৪৫টি অস্থায়ী সাইক্লোন শেল্টার প্রস্তুত রাখা হয়েছে। এই আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে মানুষকে নিরাপদে সরিয়ে নেওয়ার কাজ শুরু হয়েছে। জেলা প্রশাসক মো. জোহর আলী জানান, চাল এবং শুকনা খাবার প্রস্তুত রাখা হয়েছে। ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্রে আশ্রিতদের দুপুরে খিচুড়ি দেওয়া হয়েছে। সন্ধ্যায় তাদেরকে শুকনা খাবার দেওয়া হয়। আবহাওয়া স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত আশ্রিতরা পুনর্বাসিত থাকবেন বলেও জানান তিনি।

কলাপাড়া (পটুয়াখালী) : কলাপাড়ায় (খেপুপাড়া) চলছে মহা বিপদ সঙ্কেতের মাইকিং ও সাইরেন। প্রশাসনিক নির্দেশ ও মসজিদের মাইকের প্রচার শুনে আশ্রয়কেন্দ্রে ছুটছে মানুষ। সাগর প্রচন্ড উত্তাল। স্বাভাবিক জোয়ারে ডুবে যাওয়া সাত কিলোমিটার বেড়িবাঁধ ভাঙায় লালুয়ার চারিপাড়া, চৌধুরীপাড়াসহ নয়টি গ্রামের মানুষ দিশাহারা হয়ে ছুটেছে আশ্রয়কেন্দ্রে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার দেওয়া তথ্যমতে অন্তত ৮০টি আশ্রয়কেন্দ্রে ৬৬ হাজার মানুষ শনিবার সকালে আশ্রয় নেয়। এসব আশ্রয়রকন্দ্রে থাকা লোকজনের নিরাপত্তাসহ সব ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। শুকনো খাবারের ব্যবস্থা করার কথা জানান লালুয়ার ইউপি চেয়ারম্যান শওকত হোসেন তপন বিশ্বাস।

লক্ষীপুর : লক্ষীপুরে দুই দিন ধরে গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি হচ্ছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে মেঘনা উপক‚লীয় এলাকার বাসিন্দাদের নিরাপদে সরিয়ে আনতে মাইকিং করা হচ্ছে। জেলেরা মাছধরার ট্রলার ও নৌকা নিয়ে নদীর তীরে অবস্থান করছেন। স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে দুর্যোগ মোকাবেলায় প্রস্তুত রাখা হয়েছে ১০০টি সাইক্লোন শেল্টার এবং গঠন করা হয়েছে ৬৬টি মেডিকেল টিম।

জেলা প্রশাসক অঞ্জন চন্দ্রপাল জানান, ইতোমধ্যে রামগতি উপজেলায় নগদ দেড় লাখ টাকা ও ৬০ টন চাল, কমলনগর উপজেলায় নগদ দেড় লাখ টাকা ও ৬০ টন চাল, লক্ষীপুর সদর উপজেলায় নগদ এক লাখ টাকা ও ৪০ টন চাল এবং রায়পুর উপজেলায় নগদ এক লাখ টাকা ও ৪০ টন চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।

গোপালগঞ্জ : শনিবার গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি ও বাতাস বইছিল। টানা দুই দিনের বৃষ্টিতে শ্রমজীবী মানুষ কাজে বের হতে পারেনি। সমস্যায় পড়ে গোপালগঞ্জের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা দিতে আসা শিক্ষার্থীরা। উঠতি আমন ধান, ইরি বোরো বীজতলা ও শীতকালীন সবজির ক্ষতি হয়েছে। জরুরি প্রয়োজন ছাড়া কাউকে ঘর থেকে বাইরে যেতে দেখা যায়নি। দিনরাত থেমে থেমে বৃষ্টি ও বাতাস থাকায় বিদ্যুৎ বিভ্রাটও ঘটেছে। উপজেলা প্রশাসনকে সতর্ক থাকতে নির্দেশ দিয়েছেন জেলা প্রশাসক শাহিদা সুলতানা।

নড়াইল : নড়াইলে ঘূর্ণিঝড় বুলবুলের মোকাবেলায় জেলা প্রশাসন ও রেডক্রিসেন্ট সোসাইটি ব্যাপক প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে। জেলা প্রশাসক আনজুমান আরা জানান, জেলার প্রতিটি উপজেলা প্রশাসনকে দুর্যোগ মোকাবেলা ও দুর্যোগপরবর্তী পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত রাখা হয়েছে। জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে কন্ট্রোল রুম খোলা হয়েছে। এ ছাড়া জেলার সকল আশ্রয়কেন্দ্র খোলা রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

নোয়াখালী : ঘূর্ণিঝড় বুলবুলের প্রভাবে সকাল থেকে জেলার পুরো আকাশ মেঘাচ্ছন্ন ও থমথমে অবস্থায় রয়েছে এবং গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি হচ্ছে। ঘূর্ণিঝড় মোকাবেলায় নোয়াখালীতে ৩৪৫টি আশ্রয়কেন্দ্র ও সাড়ে ছয় হাজার স্বেচ্ছাসেবক প্রস্তুত রাখা হয়েছে। অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক ইসরাত সাদমীন জানান, উপক‚লীয় ৩ উপজেলার বাসিন্দাদের সচেতন করার জন্য মাইকিং করা হচ্ছে। ইতোমধ্যে প্রত্যেক উপজেলায় ২০০ প্যাকেট করে শুকনো খাবার পাঠানো হয়েছে। জরুরি প্রয়োজনে ৩০০ টন চাল ও নগদ ৫ লাখ টাকা, ৩০ হাজার পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট এবং পর্যাপ্ত শুকনো খাবার প্রস্তুত আছে। জেলার সিভিল সার্জন ডা. মোমিনুর রহমান জানান, ঘূর্ণিঝড় মোকাবেলায় উপক‚লীয় উপজেলাগুলোতে ১১টি মেডিক্যাল টিম গঠন করা হয়েছে এবং প্রয়োজনীয় পর্যাপ্ত ওষুধ মজুদ রয়েছে।

সাতক্ষীরা : সাতক্ষীরায় দিনভর গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টিসহ ঝড়ো হাওয়া বয়ে যায়। পুলিশ, বিজিবি, নৌবাহিনী ও কোস্ট গার্ডের সমন্বয়ে গঠিত টিম উপক‚লবর্তী মানুষকে নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্রে আনার কাজ করেছে। হাসপাতাল ও কমিউনিটি ক্লিনিক সার্বক্ষণিক খোলা রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া সার্বিক সহযোগিতার জন্য সেনাবাহিনীও মোতায়েন করা হয়েছে দুর্যোগপূর্ণ এলাকায়।
জেলা দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি ও জেলা প্রশাসক এসএম মোস্তফা কামাল জানান, বিকাল ৫টা পর্যন্ত জেলার ২৭০টি আশ্রয়কেন্দ্রে ১ লাখ ৩৫ হাজার মানুষ আশ্রয় নিয়েছে। এ ছাড়া দুর্যোগকবলিতদের সহায়তায় ৩১০ টন চাল, নগদ ৫ লাখ ৪২ হাজার টাকা, ২ হাজার প্যাকেট শুকনো খাবার, ২৭ হাজার পিস পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট ও পর্যাপ্ত ওষুধপত্র মজুদ রাখা হয়েছে। একই সঙ্গে দুর্যোগপূর্ববর্তী, দুর্যোগকালীন এবং দুর্যোগপরবর্তী তিন স্তরের প্রশিক্ষিত ২২ হাজার স্বেচ্ছাসেবকসহ ৮৫টি মেডিকেল টিম প্রস্তুত রয়েছে।

মাদারীপুর : ঘূর্ণিঝড় বুলবুলের প্রভাবে কাঁঠালবাড়ী-শিমুলিয়া নৌরুটে লঞ্চ ও স্পিডবোটের পর শনিবার বিকালে বন্ধ করে দেওয়া হয় ফেরি সার্ভিস। ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাবে শিমুলিয়া-কাঁঠালবাড়ী নৌরুটের পদ্মা নদী উত্তাল হয়ে উঠেছে। এ জন্য কর্তৃপক্ষের নির্দেশে শনিবার ভোর থেকে সকল লঞ্চ ও স্পিডবোট চলাচল বন্ধ রাখা হয়। তবে ফেরি চলাচল করলেও বিকাল থেকে তাও বন্ধ করে দেওয়া হয়।




সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত


ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: কমলেশ রায়, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড-এর পক্ষে প্রকাশক গাজী আহমেদ উল্লাহ
নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।

ফোন : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৭৫। ই-মেইল : [email protected]