ই-পেপার বিজ্ঞাপনের তালিকা মঙ্গলবার ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২০ ১২ ফাল্গুন ১৪২৬
ই-পেপার মঙ্গলবার ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২০

২৪ শহীদ পরিবারের খোঁজ কেউ রাখেনি
তাড়াশ (সিরাজগঞ্জ) প্রতিনিধি
প্রকাশ: রোববার, ১৫ ডিসেম্বর, ২০১৯, ১১:৫৯ এএম আপডেট: ১৫.১২.২০১৯ ৬:০৩ পিএম | অনলাইন সংস্করণ  Count : 268

১৯৭১ মুক্তিযুদ্ধে উত্তাল দেশ। স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষায় মুক্তিপাগল বাঙালি সশস্ত্র সংগ্রামে লিপ্ত। ঠিক সেই সময় সারাদেশের ন্যায় সিরাজগঞ্জের তাড়াশেও পাক হানাদার বাহিনী রাজাকারদের সহায়তায় একের পর এক তারা চালায় হত্যা, গণহত্যা ও নারী নির্যাতনের মতো মানবতাবিরোধী অপরাধ। লুটে নেয় ধর্মীয় সংখ্যালঘু মানুষদের ঘরবাড়ি। শহীদ হন ২৪ জন মুক্তিকামী বীর সেনানী। অথচ এসব শহীদ পরিবারের খোঁজ স্বাধীনতার ৪৮ বছরেও কেউ নেয়নি এমনটাই দাবি করেছেন শহীদ পরিবারের লোকজন।

তাড়াশ মুক্তিযোদ্ধা কমান্ড কর্তৃক প্রস্তুত এক নথি থেকে জানা যায়, মুক্তিযুদ্ধে ৭ নং সেক্টরের অধীনে ছিলো চলনবিল অধ্যূষিত তাড়াশ উপজেলা (তৎকালীন থানা)।

১৯৭১ সালের ৭ মার্চ জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভাষণের পরপরই তাড়াশের কৃতি সন্তান ম.ম.আমজাদ হোসেন মিলন, আতাউর রহমান, এম. মোবারক হোসেন মিয়া ও আনসার প্রশিক্ষক আব্দুর রহমান মিয়ার নেতৃত্বে মুক্তিযোদ্ধাদের স্থানীয়ভাবে অস্ত্র প্রশিক্ষণ দেয়া হয়। পরবর্তীতে তারা ভারতে গিয়ে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন।

রাজাকাররা শুরু করে গ্রামের পর গ্রাম হিন্দু সম্প্রদায়ের ঘরবাড়ি লুট। আতংক ছড়িয়ে পড়লে হাজার হাজার মানুষ সীমান্ত অতিক্রম করে ভারতে আশ্রয় নেয়। এ সময় এসব স্বাধীনতা বিরোধীরা পাক সেনাদের পথ চিনিয়ে নিয়ে এসে মুক্তিযোদ্ধাদের ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দেয়।

এরা একের পর এক হত্যা করে তাড়াশের জমিদার পরিবারের সন্তান প্রতুল চন্দ্র গোস্বামী ( হীরা লাল গোস্বামী), অতুল চন্দ্র গোস্বামী (চুনিলাল গোস্বামী), সাংবাদিক ইয়ার মোহাম্মদ ও শিক্ষক মহাদেব চন্দ্র সাহাসহ ২৪ জন মুক্তিকামী মানুষকে।

নথি থেকে আরো জানা যায়, ১৯৭১ সালে ২৩ এপ্রিল জমিদার নন্দন প্রতুল গোস্বামী ওরফে হীরা লাল গোস্বামী তাড়াশ সদরের তার নিজ বাড়ির দোতলায় অবস্থান করছিলেন। এ সময় রাজাকারদের সহায়তায় পাক সেনারা বাড়িটি ঘিরে ফেলে। পাক আর্মিরা কাঠের সিঁড়ি বেয়ে উপরে ওঠার চেষ্টা করলে তিনি রামদা দিয়ে একে একে চারজন পাক সেনাকে হত্যা করেন। তখন মিলিটারীরা সেল নিক্ষেপ করে বাড়িটির উপর।

গুরুতর আহত হীরালাল গোস্বামীকে মৃত ভেবে পাক সেনারা ফেলে চলে গেলে, স্থানীয়রা তাকে উদ্ধার করেন। পরে কোহিতের মাঠ দিয়ে অন্যত্র যাবার সময় রঞ্জু ওরফে রণজিৎ তার মাথায় আঘাত করে এবং তাড়াশে অবস্থানরত পাক সেনাদের হাতে তুলে দেয়। আর্মিরা গরুর গাড়িতে হীরা লাল গোস্বামীকে উল্টো করে বেঁধে নিয়ে গিয়ে হত্যা করে। তার পরিবার তার লাশটি পর্যন্ত খুঁজে পাননি।

প্রতুল গোস্বামীর অপর ভাই অতুল চন্দ্র গোস্বামী ওরফে চুনি লাল গোস্বামীকেও রাজাকার মাওলানা মফিজ মাদানীর নেতৃত্বে বস্তুলে ধরে নিয়ে গিয়ে নির্মম নির্যাতন করে রাজাকার হরফ আলীর হাতে তুলে দেয় এবং তাকে জীবন্ত বস্তায় ভরে নদীতে ফেলে দিয়ে হত্যা করে।

ভারতে প্রশিক্ষণ শেষে তাড়াশের মুক্তিযোদ্ধাগণ যোগ দেন ৭নং সেক্টরের অধীনে আব্দুল লতিফ মির্জার নেতৃত্বে গড়ে ওঠা সাব সেক্টর পলাশডাঙা যুব শিবিরে। এ সময় মুক্তিযোদ্ধারা একের পর এক সফল অপারেশান চালালে স্থানীয় রাজাকাররা ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে পরে। ১৯৭১ সালের ১১ নভেম্বর পলাশডাঙা যুবশিবিরের মুক্তিযোদ্ধাগণ অবস্থান নেন তাড়াশে নওগাঁ বাজারে।

এ সময় রাজাকাররা পাকসেনাদের নিয়ে এসে মুক্তিযোদ্ধাদের অবস্থান জানিয়ে দেয়। ভোর রাত থেকে দুপুর পর্যন্ত চলে অবিরাম গোলা বর্ষণ। এ যুদ্ধে মুক্তিযোদ্ধারা বিজয় অর্জন করেন। জীবন্ত ধরা পড়ে ক্যাপ্টেন সেলিমসহ বেশ কয়েক জন পাক সেনা। পরে তাদেরকে হত্যা করা হয়।

পরবর্তীতে বিমান হামলা জোরদার করা হলে মুক্তিযোদ্ধারা নিরাপদ দূরত্বে সরে যায়। মুক্তিযোদ্ধাদের সহযোগিতা করার অপরাধে এর একদিন পর অর্থাৎ ১৩ নভেম্বর রাজাকারদের সহায়তায় পাকসেনারা তাড়াশের আমবাড়িয়া গ্রাম জ্বালিয়ে দিয়ে গণহত্যা চালায়। এ সময় সাংবাদিক ইয়ার মোহাম্মদসহ ১৫ জনকে পুড়িয়ে হত্যা করা হয়।

শহীদ প্রতুল গোস্বামী ওরফে হীরা লাল গোস্বামীর একমাত্র কন্যা ফরিদপুর থেকে মুঠোফোনে দুঃখের সাথে জানান, খোঁজ তো দূরের কথা আমার বাবার শহীদ মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি পেতেও ৪৮ বছর পেরিয়ে গেলো।

হীরা লাল গোস্বামীর ভাতুষ্পূত্র তপন গোস্বামী বলেন, শহীদ হীরা লাল গোস্বামীর নামে একটি রাস্তার নামকরণের প্রস্তাব উপজেলা প্রশাসন পাশ করলেও অজ্ঞাত কারণে তা আজও বাস্তবায়ন হয়নি।

শহীদ সাংবাদিক ইয়ার মোহাম্মদের ছেলে দোবিলা ইসলামপুর ডিগ্রি কলেজের অধ্যক্ষ লুৎফর রহমান বলেন, সে এক দুঃসহ স্মৃতি। যারা পাকসেনাদের সহযোগিতা করে এতো বড় গণহত্যা চালালো তাদের বিচার স্বাধীনতার ৪৮ বছরেও হয়নি এটা সত্যিই দুঃখজনক।

তবে আশার কথা সরকার শীর্ষ যুদ্ধাপরধীদের বিচার করে ফাঁসি দিয়েছেন, সে ক্ষেত্রে বিচারের জন্য আমরা আশায় বুক বাঁধতেই পারি।

তাড়াশ মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডের কমান্ডার গাজী মো. আরশেদুল ইসলাম জানান, মহান মুক্তিযুদ্ধে তাড়াশ উপজেলার ২৪ জন মুক্তিকামী মানুষ শহীদ হয়েছেন। তাদের নামের তালিকা আমরা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডে নথিভুক্ত করেছি। এখন অপেক্ষা সরকারি সিদ্ধান্তের।




সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত


ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: কমলেশ রায়, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড-এর পক্ষে প্রকাশক গাজী আহমেদ উল্লাহ
নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।

ফোন : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৭৫। ই-মেইল : [email protected]