ই-পেপার বিজ্ঞাপনের তালিকা বৃহস্পতিবার ১৬ জুলাই ২০২০ ১ শ্রাবণ ১৪২৭
ই-পেপার বৃহস্পতিবার ১৬ জুলাই ২০২০

ক্যাসিনো হোতা এনু-রুপন গ্রেফতার
বংশপরম্পরায় জুয়ার ব্যবসা
মোস্তফা ইমরুল কায়েস
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ১৪ জানুয়ারি, ২০২০, ১২:০০ এএম আপডেট: ১৩.০১.২০২০ ১১:৫৮ পিএম | প্রিন্ট সংস্করণ  Count : 403

গেন্ডারিয়ার বহিষ্কৃত আওয়ামী লীগ নেতা এনামুল হক এনু ও রুপন ভূঁইয়া সহোদর। দীর্ঘদিন ধরেই পরিবারটি জুয়ার ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। গত আড়াই বছরে ক্যাসিনো ব্যবসা চালিয়ে বিপুল পরিমাণ টাকা, বাড়ি-জমি ও বিলাসবহুল একাধিক গাড়ির মালিক বনে যান তারা। ক্যাসিনো থেকে আয়ের টাকা বিভিন্ন আত্মীয়-স্বজনের বাসায় ভল্টে করে রাখতেন তারা। গত সেপ্টেম্বরে বিভিন্ন বাসায় অভিযান চালিয়ে ৫ কোটি টাকা উদ্ধার করে র‌্যাব। এরপর থেকেই পলাতক ছিলেন এই দুই ভাই। অবশেষে ধরা পড়েন পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) জালে।

রোববার রাতে ঢাকার কেরানীগঞ্জের মক্কানগর এলাকার একটি ভাড়া বাসা থেকে এনু ও রুপন ছাড়াও তাদের সহযোগী শেখ সানি মোস্তফাকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এ সময় তাদের কাছ থেকে ৪০ লাখ টাকা, ১২টি মোবাইল ফোন ও একটি পাসপোর্ট জব্দ করে সিআইডি। তাদের জিজ্ঞাসাবাদে বেরিয়ে আসতে শুরু করেছে নানা তথ্য। ক্যাসিনোর টাকায় ২২টি বাড়ি, জমি, ৯ ব্যাংকে ৯১টি ব্যাংক হিসাবে ১৯ কোটি টাকার সন্ধান পেয়েছে সিআইডি। এনামুল হক গেন্ডারিয়া থানা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি ও রুপন ভূঁইয়া সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। ক্যাসিনো কাণ্ডে তারা বহিষ্কৃত হয়েছেন।

বংশপরম্পরায় জুয়ার ব্যবসা : সিআইডির একটি সূত্র জানিয়েছে, এনু ও রুপন আগে থেকেই জুয়ার ব্যবসা করতেন। বাবা সিরাজুল হক ভূঁইয়ার হাত ধরেই তাদের জুয়ার ব্যবসায় আসা। তাদের পরিবারের সাত ভাই-বোনের সবাই এই ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। জুয়ারি পরিবার ও ব্যবসাটি তারা পায় বংশপরম্পরায়। এনু ও রুপন ক্যাসিনো ব্যবসার আগে ম্যানুয়াল জুয়ার ব্যবসা চালাত। আড়াই বছর আগে কয়েকজন নেপালির সঙ্গে তাদের পরিচয় হয়। তাদের হাত ধরে মতিঝিলের ওয়ান্ডারার্স ক্লাবে প্রথম চালু করা হয় এই ক্যাসিনো ব্যবসা। এনামুল ওয়ান্ডারার্স ক্যাসিনো ক্লাবের পরিচালক ছিলেন। প্রতিদিন তারা ক্যাসিনো থেকে আয়ের টাকা বিভিন্ন খাতে দিয়ে ৪-৫ লাখ টাকা করে বাসায় নিয়ে যেতেন। ক্যাসিনোর টাকাই ছিল তাদের আয়ের মূল উৎস।

দুই ভাইয়ের ২২ বাড়ি ও জমি : দুই ভাই ক্যাসিনোর টাকায় ঢাকার ওয়ারীসহ বিভিন্ন এলাকায় বানিয়েছেন ২২টি বাড়ি। তার মধ্যে কয়েকটি এখনও নির্মাণাধীন। বিভিন্ন এলাকায় থাকা বাড়িগুলো হলো ৪০নং গুরুদাস সরদার লেনে (২০ তলা নির্মাণাধীন ভবন), ১নং নারিন্দা লেনে চারতলা বাড়ি, ১৫ নারিন্দা লেনে ছয়তলা বাড়ি, ৬৪ মনির হোসেন লেনে ছয়টি ফ্ল্যাট, ৬/২ গুরুদাস সরদার লেনে নির্মাণাধীন বাড়ি, ৩৯ শরৎগুপ্ত রোডে ১৬ কাটা জায়গার ওপরে বাড়ি (দাদাভাই বাড়ি), ৬৯ শাহ সাহেব লেনে চারতলা নির্মাণাধীন বাড়ি, ৭১ শাহ সাহেব লেনে দশতলা ভবন, ৭৩ শাহ সাহেব লেনে (ডাক্তার বাড়ি), ১২৪/৫ ডিস্টিলারি রোডের মুরগিটোলায় সাততলা বাড়ি, ৩৯ ডিস্টিলারি রোডের মুরগিটোলায় পুরনো ভবন, ১১৯/১ লালমোহন সাহা স্ট্রিট ওয়ারীতে ছয়তলা মমতাজ ভিলা, ১২১ লালমোহন সাহা স্ট্রিটে একটি বাসা, ১০৬ লালমোহন সাহা স্ট্রিটে একটি, ৪৪/বি ভজহরি সাহা স্ট্রিটে চারতলা বাড়ি, ৭১/১ দক্ষিণ মৈশুন্ডীতে একটি, ধোলাইপাড় এলাকার হানিফ গার্মেটের সঙ্গে বাধন এন্টারপ্রাইজ, মুরগিটোলা রোডে এনু-রুপম স্ট্রিলের দোকান, একই জায়গার ঢাকা ব্যাংকের বিপরীতে আরেকটি স্ট্রিলের দোকান, দুটি বাংলোবাড়ি (একটি কেরানীগঞ্জের তেঘরিয়ায়, আরেকটি মুন্সীগঞ্জের সিরাজদীখানের রাজেন্দ্রপুর এলাকায়)।

বাজেয়াপ্ত হতে পারে বাড়িগুলো : ক্যাসিনোর টাকায় এত বাড়ি থাকলেও তারা বাড়িগুলোয় থাকতেন না। বাড়িগুলো করেছিলেন বিভিন্ন আত্মীয়-স্বজনের নামে। তবে অবৈধ টাকায় তৈরি এসব বাড়ি মানি লন্ডারিং আইনে বাজেয়াপ্ত হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

বিভিন্ন নামে ৯১ ব্যাংক অ্যাকাউন্ট : বাড়ি ও জমি ছাড়াও দুই ভাই তাদের স্ত্রী, সন্তান, ভাই-বোন ও আত্মীয়-স্বজনের নামে ৯ ব্যাংকে ৯১টি অ্যাকাউন্ট ও এফডিআর খুলে ক্যাসিনোর টাকা রাখতেন। এছাড়াও দূরের বিভিন্ন আত্মীয়-স্বজনের বাসায় ভল্টে ক্যাসিনোর টাকা রাখা হতো।

ভাড়া বাসায় দাড়ি রেখে আত্মগোপন : গত আড়াই মাস আগে দুই ভাই তাদের সহযোগী শেখ সানি মোস্তফার মাধ্যমে কেরানীগঞ্জের মক্কানগর এলাকায় একটি বাসা ভাড়া নেয়। তিন রুমের বাসাটির ভাড়া ১১ হাজার টাকা। ওই বাসায় মোস্তফা, তার স্ত্রী, বাচ্চা, শাশুড়ি ও দুই ভাই এনু-রুপন থাকতেন। বাসাটিতে ওঠার পর থেকে একদিনও বাসার বাইরে বের হননি দুই ভাই। এমনকি গ্রেফতার এড়াতে তারা মুখভর্তি দাড়িও রাখেন। খাওয়া-দাওয়া, গোসল ও টয়লেট সব কিছু ঘরেই সারতেন। বাসার বাজার-সদায় করতেন মোস্তফা। এজন্য তাকে বাড়ি ভাড়াসহ বাজারের টাকা তারাই বহন করতেন। সিআইডির একটি সূত্র জানায়, বাসাটিতে অভিযানের সময় এনু ও রুপন বিষয়টি টের পেয়েছিলেন। ফলে তারা বাসাটির একটি কক্ষের বাথরুমের ওপরে থাকা ফাঁকা জায়গায় আশ্রয় নিয়েছিলেন; কিন্তু শেষরক্ষা হয়নি।

সিআইডি যা বলছে : সিআইডির অর্গানাইজড ক্রাইম বিভাগের ডিআইজি ইমতিয়াজ আহমেদ জানান, তাদের জিজ্ঞাসাবাদে মোট ২২টি জমি ও বাড়ির সন্ধ্যান মিলেছে। যার অধিকাংশই পুরান ঢাকাকেন্দ্রিক। এছাড়া সারা দেশে ব্যাংকের বিভিন্ন শাখায় ৯১টি অ্যাকাউন্টে তাদের মোট ১৯ কোটি টাকা জমা রয়েছে। ব্যক্তিগত পাঁচটি গাড়িরও তথ্য তারা জানিয়েছেন। তিনি আরও বলেন, আমরা জেনেছি এই দুজনের মাধ্যমেই বাংলাদেশে ক্যাসিনো ব্যবসার গোড়াপত্তন হয়। নেপালিদের মাধ্যমে তারা ক্যাসিনোর সরঞ্জাম বাংলাদেশে এনেছিল।





সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত


ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: কমলেশ রায়, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড-এর পক্ষে প্রকাশক গাজী আহমেদ উল্লাহ
নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।

ফোন : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৭৫। ই-মেইল : [email protected]