ই-পেপার শনিবার ১৮ জানুয়ারি ২০২০ ৪ মাঘ ১৪২৬
ই-পেপার শনিবার ১৮ জানুয়ারি ২০২০

স্বপ্নের সুচিত্রা সেন
নিপু বড়ূয়া
প্রকাশ: শুক্রবার, ১৭ জানুয়ারি, ২০২০, ১২:০০ এএম আপডেট: ১৭.০১.২০২০ ১২:৪২ এএম | প্রিন্ট সংস্করণ  Count : 33


সুচিত্রা সেন। একটা নাম নয়, তিনি বাঙালি হৃদয়ে একটা মিথ। তার নামটি শুনলে চোখের সামনে ভেসে ওঠে ভুবন ভোলানো হাসি। আকর্ষণীয় চাহনি। এই নামটির সঙ্গে পরিচিত নন এমন বাঙালি খুঁজে পাওয়া সত্যিই কঠিন। কোটি ভক্তের স্বপ্নরানী সুচিত্রা সেনের প্রয়াণ দিবস আজ। ২০১৪ সালের ১৭ জানুয়ারি বাংলা চলচ্চিত্রের এই মহানায়িকা সবাইকে শোকসাগরে ভাসিয়ে না ফেরার দেশে পাড়ি দেন। তার বয়স হয়েছিল ৮৩ বছর। রেখে গেছেন অভিনেত্রী কন্যা মুনমুন সেন ও দুই নাতনি রিয়া এবং রাইমাকে। সুচিত্রার জাদুতে এখনও সবাই সমান মগ্ন। বিন্দুমাত্র ভাটা পড়েনি তার আকাশছোঁয়া জনপ্রিয়তায়

রমা থেকে সুচিত্রা হয়ে ওঠার গল্প
১৯৩১ সালে পাবনা শহরের দিলানপুর মহল্লায় হেমসাগর লেনে অবস্থিত বাড়িতে সুচিত্রা সেনের জন্ম। তার ডাক নাম রমা। পাবনার মহাখালি পাঠশালায় প্রাইমারি পাঠ চুকিয়ে তিনি ভর্তি হন পাবনা গার্লস স্কুলে। এখানে দশম শ্রেণি পর্যন্ত লেখাপড়া করেন তিনি। এরপর ১৯৪৭ সালে বিয়ের পিঁড়িতে বসে স্বামীর হাত ধরে কলকাতায় চলে যান। স্বামী দিবানাথের আগ্রহ এবং মামা শ্বশুর বিমল রায়ের সহযোগিতায় রমা সেন চলচ্চিত্রে আসেন। চলচ্চিত্রে প্রথমদিকে তার অভিজ্ঞতা সুখকর ছিল না। ১৯৫২ সালে প্রথম ছবি শেষ কোথায় দিয়ে সুচিত্রা সেনের যাত্রা শুরু হলেও ছবিটি মুক্তি পায়নি।

চলচ্চিত্রে সুচিত্রার উত্থান ঘটেছিল উল্কার বেগে। ১৯৫৩-৫৫ সাল পর্যন্ত ১৯টি ছবি মুক্তি পায়। ডুবন্ত বাংলা সিনেমাকে যেমন বাঁচিয়েছিলেন তেমনি তার বিপর্যস্ত সংসারকে আবার ফিরিয়ে দিয়েছিলেন স্বমহিমায়। ১৯৫৩ সালে প্রথম মুক্তি পায় ‘সাত নম্বর কয়েদী’। এ ছবিতে রমা সেন পদবি পরিবর্তন করে নাম দেওয়া হয় সুচিত্রা সেন। পরিচালক সুকুমার দাসগুপ্তের সহকারী নীতিশ রায় এই নতুন নামটি দেন। উত্তম কুমারের সঙ্গে প্রথম ছবি করেন ‘সাড়ে চুয়াত্তর’।

এরপর এই জুটির ৩০টি ছবি মুক্তি পায়। তার অভিনীত চলচ্চিত্রে গৌরী প্রসন্ন মজুমদারের লেখা গান, হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গীত পরিচালনা ও সন্ধ্যা রায়ের প্লেব্যাক তিনটি বিষয় রমা সেনকে সুচিত্রা সেন হতে সহায়তা করেছে। পুরুষ শাসিত ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতে নিজের ইমেজে সুচিত্রা সেন হয়ে উঠেছিলেন অন্য এক উচ্চতায়। সুচিত্রা উত্তম জুটির ছবি দেখার জন্য কলকাতার প্রেক্ষাগৃহে দর্শকদের প্রথম অগ্রিম টিকেট কেটে ছবি দেখার প্রচলন শুরু হয়। গুলজার পরিচালিত আঁধি ছবিতে ইন্দিরা গান্ধীর চরিত্রে অভিনয় করেন সুচিত্রা সেন। ছবিটি এক সময় নিষিদ্ধ হয় সেন্সর বোর্ডে। ১৯৭৭ সালে জনতা পার্টি ক্ষমতায় এলে ছবিটি পুনরায় মুক্তি দেওয়া হয়।

কলকাতার ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতে সুচিত্রার সাহস ও জেদ তাকে নিয়ে গেছে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। সুচিত্রা সেন উত্তম কুমারের চেয়ে বেশি পারিশ্রমিক নিতেন। শুধু পারিশ্রমিকই নয়, নায়কের আগে নায়িকার নাম পোস্টার-পাবলিসিটি ছবির টাইটেলে দেওয়া শুরু করেন। প্রতিটি স্টুডিওতে তার জন্য আলাদা রুম ছিল, সেখানে তিনি একা মেকাপ নিতেন ও বিশ্রাম করতেন। ভারতীয় চলচ্চিত্রে নায়িকাদের সম্মানের আসনে বসিয়েছিলেন সুচিত্রা সেন। অরুণ কুমার নামের একদা ফ্লপ মাস্টার হিরোকে উত্তম কুমার নামে ম্যাটিনী আইডল তৈরি করেন সুচিত্রা। তা স্বীকার করে গেছেন জীবদ্দশায় মহানায়ক উত্তম কুমার।

পুরস্কার ও সম্মাননা
১৯৬৪ সালে ‘সাত পাকে বাঁধা’ ছবির অর্চনা চরিত্রে অভিনয়ের জন্য মস্কো আন্তর্জাতিক ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে সেরা অভিনেত্রীর পুরস্কার পান সুচিত্রা সেন। হিন্দি ছবি দেবদাসের জন্য ১৯৫৫ সালে, আঁধি (১৯৭৫) ছবির জন্য ১৯৭৬ ফিল্ম ফেয়ার, সালে সপ্তপদী (১৯৬১), উত্তর ফালগুনী (১৯৬৩), আলো আমার আলো (১৯৭২) ও আঁধি (হিন্দি) ছবির জন্য বেঙ্গল ফিল্ম জার্নালিস্ট অ্যাসোসিয়েশনের শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রীর পুরস্কার পান। হিন্দি ছবি মমতার জন্য তৃতীয় মস্কো আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে সেরা অভিনেত্রীর, ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার কর্তৃক পদ্মশ্রী (১৯৭২) ও পশ্চিমবঙ্গ সরকার কর্তৃক বঙ্গবিভ‚ষণ পুরস্কার (২০১২) অর্জন করেন। ২০০৫ সালে ভারত সরকারের পক্ষ থেকে দাদা সাহেব ফালকে সম্মাননা ভূষিত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে সুচিত্রা সেন দিল্লি যেতে হবে বলে সবিনয়ে তা প্রত্যাখ্যান করেন।

ক্যারিয়ার
১৯৬১ সালে উত্তম কুমার-সুচিত্রার সপ্তপদী ছবি মুক্তির পর ১৯৬২ সালে এই দুই তারকার পর্দা বিচ্ছেদ ঘটে। ১৯৫২-৬২ সাল পর্যন্ত এই জুটি ১০ বছরে মোট ২৫টি ছবিতে কাজ করেন। ১৯৬২-৬৬ সাল পর্যন্ত উত্তম সুচিত্রা আর কোনো ছবিতে কাজ করেননি। ১৯৬৭-৭৮ সাল পর্যন্ত মাত্র পাঁচটি ছবিতে পুনরায় একসঙ্গে কাজ করেছেন। ২৬ বছরের চলচ্চিত্র ক্যারিয়ারে ১৯৫২-৭৮ সাল পর্যন্ত ৫৩টি বাংলা ও সাতটি হিন্দি মিলিয়ে মোট ৬০টি ছবিতে কাজ করেন মহানায়িকা সুচিত্রা সেন।

দাম্পত্য জীবনের অবসান
১৯৪৭ সালে দিবানাথের সঙ্গে বিয়ে হলে মাত্র ১০ বছর তাদের সংসার টেকে। ১৯৫৭-৫৮ সালে দুজনের সংসার ভেঙে যায়। ১৯৬৩ সালে সুচিত্রা সেন আলাদা হলেন দিবানাথের কাছ থেকে। ডিভোর্স নয়, আইনগত বিচ্ছেদও নয়। শুধু আলাদা। সুচিত্রা দিবানাথের বালিগঞ্জের বাড়ি ছেড়ে নিউ আলীপুরে থাকা শুরু করেন। ১৯৬০ সালে প্রাক্তন কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী শচীন চৌধুরীর বালিগঞ্জ সার্কুলার রোডের বাড়িটি কিনে নিজের মতো করে সাজিয়ে নেন সুচিত্রা সেন। দিবানাথ আমেরিকায় পাড়ি জমান। সুচিত্রা সেনের দীর্ঘ ২২ বছরের যন্ত্রণাদায়ক দাম্পত্য জীবনের অবসান হয় ২৯ নভেম্বর ১৯৬৯ দিবানাথের মৃত্যুর মধ্য দিয়ে।





সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত


ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: কমলেশ রায়, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড-এর পক্ষে প্রকাশক গাজী আহমেদ উল্লাহ
নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।

ফোন : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৭৫। ই-মেইল : [email protected]