ই-পেপার শনিবার ১৮ জানুয়ারি ২০২০ ৪ মাঘ ১৪২৬
ই-পেপার শনিবার ১৮ জানুয়ারি ২০২০

মার্কিন নিশানায় ‘নিহত’
মাহমুদুল হাকিম
প্রকাশ: শুক্রবার, ১৭ জানুয়ারি, ২০২০, ১২:০০ এএম | প্রিন্ট সংস্করণ  Count : 2

বিশে^ নিজেদের আধিপত্য বজায় রাখতে আর স্বার্থরক্ষায় যুুক্তরাষ্ট্রের ভ‚মিকা সবসময়ই বিতর্কিত। সে কারণেই ৪০-এর দশক থেকে শুরু করে আজ অবধি মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ একাধিক গুপ্তহত্যা ঘটিয়েছে। এই কাজটি তারা করেছে কখনও তাদের নিজস্ব শক্তি ব্যবহার করে, আবার কখনও স্থানীয় সামরিক বাহিনীকে কাজে লাগিয়ে। সে রকমই আলোড়ন তোলা কয়েকটি হত্যাকাÐ সম্পর্কে জানাচ্ছেন

ওসামা বিন লাদেন
ওসামা বিন লাদেন ছিলেন ‘আল কায়েদা’র প্রতিষ্ঠাতা প্রধান। যুক্তরাষ্ট্রে ঘটে যাওয়া দুনিয়া কাঁপানো সন্ত্রাসী হামলা ৯/১১ এর মূল হোতা। ওই হামলায় প্রায় ৩০০ জন লোকের প্রাণহানি ঘটে, আহত হয় আরও ৫০০০ এর মতো। ২০০১ থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত এফবিআইএর মূল টার্গেট ছিল বিন লাদেনকে আটক করা। ওসামা বিন লাদেনের সন্ধান দেওয়ার বিনিময়ে এফবিআই ২৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার পুরস্কার ঘোষণা করেছিল।
প্রায় ১০ বছর ওসামা বিন লাদেন আত্মগোপন করে ছিলেন এবং গোপনে তরুণ যুবকদের প্রশিক্ষণ দিয়ে জিহাদি হিসেবে তৈরি করছিলেন। এদিকে সিআইএ এবং অন্যান্য গোয়েন্দা সংস্থাগুলো লাদেনের গোপন আস্তানা তন্ন তন্ন করে খুঁজতে থাকে। অবশেষে ২০১০ সালের আগস্ট মাসে পাকিস্তানের অ্যাবোটাবাদের একটি বাড়িতে ওসামা বিন লাদেনের অবস্থান নিশ্চিত করা হয়।
২০১১ সালের ২ মে নৌবাহিনীর একটি টিম বাড়িটিতে আক্রমণ করে। বাড়ির ভেতরে প্রবেশ করে লাদেনকে চিহ্নিত করে তাকে গুলি করে হত্যা করে। এই ঘটনায় যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা জাতির উদ্দেশে টেলিভিশনে দেওয়া এক ভাষণে বলেন, ‘সুবিচার সম্পন্ন হয়েছে।’


চে গুয়েভারা
সাম্যবাদ প্রতিষ্ঠার জন্য নিজের জীবন উৎসর্গ করেছিলেন চে গুয়েভারা। আধুনিক তরুণ সমাজে যে মানুষটির ছবি সবচেয়ে বেশি সমাদৃত তিনি চে গুয়েভারা। আর্জেন্টাইন বংশোদ্ভূত তরুণ এই নেতা ১৯৫০-এর দশকের শেষ দিকে কিউবার সাম্যবাদী নেতা ফিদেল কাস্ত্রোর দিকে সাহায্যের হাত বাড়ান। দুই অবিসংবাদিত নেতা মিলে কিউবার তৎকালীন স্বৈরশাসক ফুলজেনসিও বাতিস্তাকে ক্ষমতাচ্যুত করেন। ফিদেল কাস্ত্রো কিউবার ক্ষমতা গ্রহণ করেন এবং কিউবায় সাম্যবাদের বিপ্লব ঘটান। সে সময় চে গুয়েভারা কিউবার শিল্পমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন।
১৯৬৫ সালে কিউবার ক্ষমতা ছেড়ে দিয়ে চে গুয়েভারা বলিভিয়ায় চলে যান। সেখানে ১৯৬৬ সালে বলিভিয়ানদেরকে তাদের সরকারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর জন্য উৎসাহ দেন। কিন্তু বেশি দূর এগুতে পারেন নি। মার্কিন গ্রিন ব্যারেট ও সিআইএর সহায়তায় বলিভিয়ান সেনাবাহিনী চে গুয়েভারাকে বন্দি করে এবং হত্যা করে। ১৯৯৭ সালে চে গুয়েভারার দেহাবশেষ উদ্ধার করে কিউবায় ফিরিয়ে নিয়ে পুনরায় সমাহিত করা হয়।

জেনারেল কাসেম সোলাইমানি
সর্বশেষ এ বছরের ৩ জানুয়ারি বাগদাদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় ইরানের বিপ্লবী গার্ডস বাহিনীর এলিট কুদস ফোর্সের কমান্ডার মেজর জেনারেল কাসেম সোলাইমানিসহ পাঁচজন নিহত হন। খোদ মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নির্দেশে ওই হামলা চালানো হয় বলে পেন্টাগন নিশ্চিত করে। ইরানের বিপ্লবী গার্ডসও জেনারেল কাসেমের মৃত্যুর কথা স্বীকার করে। তারা জানায়, মার্কিন হেলিকপ্টার থেকে হামলা চালিয়ে তাকে হত্যা করা হয়েছে। বিগত বছরগুলোতে মধ্যপ্রাচ্যে ইরানি প্রভাব বিস্তারে বারবারই সোলাইমানির নাম আলোচনায় আসছিল। এর আগেও তাকে হত্যা চেষ্টা করেছিল যুক্তরাষ্ট্র। ঘটনার পর ট্রাম্প বলেন, ‘কাসেম সোলাইমানিকে হত্যা করা হয়েছে যুদ্ধ বন্ধে, আরেকটি যুদ্ধ শুরু করতে নয়’। তার মতে, সোলাইমানির ‘সন্ত্রাসের শাসন শেষ’।



সালভাদর আলেন্দে
যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট নিক্সন ১৯৭০ সালে সিআইএ কে এটা পরিষ্কার করে জানিয়ে দেন, চিলির প্রেসিডেন্ট সালভাদর আলেন্দে তাদের জন্য বিপদ ডেকে আনবে। তাই তিনি সিআইএকে আলেন্দের বিরুদ্ধে হামলা চালানোর জন্য প্ররোচিত করেন। ১৯৭৩ সালের সেপ্টেম্বরে চিলির সামরিক জেনারেল আউগুস্তো পিনোশে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএর সহায়তায় আলেন্দেকে রাষ্ট্রপতির রাজপ্রাসাদে অন্তরীণ করলে আলেন্দে আত্মহত্যা করেন। তবে আলেন্দের অনেক সমর্থক মনে করেন তাকে হত্যা করা হয়েছিল। প্রায় দুই দশক পরে ১৯৯০ সালে আলেন্দের মৃতদেহ একটি নামচিহ্নহীন কবর থেকে উত্তোলন করা হয় এবং সান্তিয়াগোতে তার যথাযথ অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়।


নো দিন দিয়েম
মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএর সহায়তায় ডুয়াং ভান মিন দক্ষিণ ভিয়েতনামের প্রেসিডেন্ট নো দিন দিয়েমকে হত্যা করেছিলেন। সেটা ছিল ১৯৬৩ সাল। দিয়েমের অপরাধমূলক কাজকর্মের জন্য তার মৃত্যুর পর সাধারণ মানুষ খুব খুশি হয়েছিল বটে। কিন্তু তার মৃত্যুর পর দেশটিতে প্রচÐ রাজনৈতিক অস্থিরতা সৃষ্টি হয়। সেই সুযোগে যুক্তরাষ্ট্র পুরোপুরিভাবে ভিয়েতনামের রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়ে। উদ্দেশ্য একটাই কমিউনিস্টদের ফাঁদে ফেলে ভিয়েতনামে সাম্যবাদ প্রতিষ্ঠা প্রতিহত করা।


দাগ হ্যামারশোল্ড
১৯৬১ সালে রোডেশিয়ার আকাশে বিমান দুর্ঘটনার কী এমন কারণ ছিল যার জন্য জাতিসংঘের সাবেক সচিব ও সুইডিশ ক‚টনীতিক ড্যাগ হ্যামারশোল্ডকে প্রাণ দিতে হয়েছিল? কেউ কেউ ধরে নিয়েছিল এটা পাইলটের ভুল আবার কেউ ভেবেছিল এটা নিছক দুর্ঘটনা। ২০১৬ সালের জুলাই মাসে জাতিসংঘ সেই বিমান দুর্ঘটনা নিয়ে নতুন তদন্ত প্রকাশ করে। জাতিসংঘের তদন্ত কর্মকর্তারা জানান, সেটি দুর্ঘটনা ছিল না, ছিল সম্পূর্ণ পরিকল্পিত একটি হত্যাকাÐ। কারণ হ্যামারশোল্ড ওই ফ্লাইটে কঙ্গো যাচ্ছিলেন, সেখানে কঙ্গোর প্রেসিডেন্ট ময়েস টিসম্বের সঙ্গে গোপন বৈঠক হওয়ার কথা ছিল। যেখানে জরুরি যুদ্ধবিরতি ও গৃহযুদ্ধ বন্ধ করা নিয়ে আলোচনা করার কথা ছিল। এ শান্তি চুক্তি বন্ধ করতে পেরে সবচেয়ে বেশি লাভ হয়েছিল যুক্তরাষ্ট্রের। কারণ কঙ্গো ছিল খনিজ সম্পদ, সোনা, হীরা ও তেলে ভরপুর একটি রাষ্ট্র। হ্যামারশোল্ডের সঙ্গে শান্তি চুক্তি হলে এ সমস্ত সম্পদ যুক্তরাষ্ট্রের হাতছাড়া হয়ে যেত। তাই মার্কিন সংস্থা এনএসএ হ্যামারশোল্ডকে বহনকারী বিমানের পাইলটের কাছ থেকে নেওয়া তথ্যে সম্পূর্ণ অনৈতিকভাবে রেডিও ইন্টারসেপ্টের মাধ্যমে এ হত্যাকাÐ চালায়।


আবু বকর আল-বাগদাদি

আবু বকর আল-বাগদাদি ইরাকের পশ্চিমাঞ্চল ও সিরিয়ার উত্তর-পূর্বাঞ্চল নিয়ে একটি ইসলামিক রাষ্ট্র ঘোষণা করেছিলেন এবং নিজেকে ওই রাষ্ট্রের খলিফা ঘোষণা দিয়েছিলেন। পরে তিনি ইরাকে আল-কায়েদার নেতা হিসেবে আবির্ভূত হন। ২০১১ সালের অক্টোবরে যুক্তরাষ্ট্র আল-বাগদাদিকে সন্ত্রাসী বলে ঘোষণা করে। তাকে ধরিয়ে দেওয়ার জন্য ২৫ মিলিয়ন ডলার পুরস্কার ঘোষণা করা হয়। গত বছরের ২৬ অক্টোবর রাতে উত্তর-পশ্চিম সিরিয়ায় রাতের বেলায় একটি অভিযান চালায় যুক্তরাষ্ট্রের একটি বিশেষ বাহিনী। সে সময় মাটির নিচে একটি গুহায় আটকে পড়া আবু বকর আল-বাগদাদি নিজের শরীরে থাকা সুইসাইড ভেস্টের বিস্ফোরণ ঘটিয়ে আত্মহত্যা করেন। বিশেষ ঘোষণায় তার মৃত্যুর কথা জানান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।


প্যাট্রিস লুমুম্বা
প্যাট্রিস লুমুম্বা ছিলেন বৈধভাবে নির্বাচিত কঙ্গোর প্রথম প্রধানমন্ত্রী। বেলজিয়ামের শোষণ হতে কঙ্গোকে মুক্ত করার পেছনে সবচেয়ে বড় অবদান ছিল লুমুম্বার। ১৯৬০ সালে আফ্রিকার এ দেশটি স্বাধীন হওয়ার অল্প কিছুদিন পরই পরিস্থিতি লুমুম্বার প্রতিক‚লে যেতে থাকে। উপায় না দেখে অসহায় লুমুম্বা সোভিয়েত ইউনিয়নের সহায়তা চান। আফ্রিকার একটি দেশ যদি সোভিয়েত ইউনিয়নের অধীনে চলে যায় তাহলে সেটা হবে যুক্তরাষ্ট্রের বিপদস্বরূপ। সেটা ভেবে যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট আইজেন হাওয়ার নাখোশ হন। তিনি সিআইএর পরিচালককে নির্দেশ দেন লুমুম্বাকে যেন পথ থেকে সরিয়ে ফেলা হয়। নির্দেশ পাওয়ামাত্র সিআইএ হত্যার পরিকল্পনা শুরু করে। বিভিন্নভাবে সিআইএ প্রেসিডেন্ট লুমুম্বাকে হত্যা করার চেষ্টা করে আসছিল। অবশেষে ১৯৬০ সালের সেপ্টেম্বরে ক্যু-এর মাধম্যে তাকে ক্ষমতাচ‚্যত করেন প্রেসিডেন্ট কাসাবুভু। পরের বছরের ১৩ ফেব্রæয়ারি জানানো হয়, কারাগার থেকে পালানোর পর আততায়ীর হাতে নিহত হয়েছেন লুমুম্বা। ২০১৪ সালে জানা যায়, সিআইএ ওই হত্যাকাÐে জড়িত ছিল।





সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত


ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: কমলেশ রায়, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড-এর পক্ষে প্রকাশক গাজী আহমেদ উল্লাহ
নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।

ফোন : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৭৫। ই-মেইল : [email protected]