ই-পেপার শনিবার ১৮ জানুয়ারি ২০২০ ৪ মাঘ ১৪২৬
ই-পেপার শনিবার ১৮ জানুয়ারি ২০২০

প্রধানমন্ত্রীর ইউএই সফর : একটি মূল্যায়ন 
মমতাজউদ্দীন পাটোয়ারী
প্রকাশ: শুক্রবার, ১৭ জানুয়ারি, ২০২০, ১২:০০ এএম | প্রিন্ট সংস্করণ  Count : 1

                                 

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ১২ থেকে ১৪ তারিখ পর্যন্ত তিন দিনের এক সরকারি সফরে সংযুক্ত আরব আমিরাত গিয়েছিলেন। সেখানে অনুষ্ঠিত ‘আবুধাবি সাসটেইনেবিলিটি উইক’ ও ‘জায়েদ সাসটেইনেবিলিটি প্রাইজ’-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে অংশ নিতে তিনি আমন্ত্রণক্রমে গিয়েছিলেন। বিশে^র আরও কয়েকটি দেশের সরকার প্রধানরা ওই সম্মেলনে অংশগ্রহণ করেছিলেন। ওই সম্মেলনে পাঁচটি ক্যাটাগরিতে বিভিন্ন দেশের ১০টি সংগঠন ও প্রতিষ্ঠানকে ‘জায়েদ সাসইটেনেবল প্রাইজ’ প্রদান করা হয়।
বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অন্যতম একটি প্রতিষ্ঠানের হাতে ওই পুরস্কার অর্পণ করেন। প্রতিষ্ঠানটি গেøাবাল হাইস্কুল ক্যাটাগরিতে মর্যাদাপূর্ণ হওয়ার জন্য ওই পুরস্কারে ভ‚ষিত হয়েছে। পুরস্কার প্রদান অনুষ্ঠানে সাতটি দেশের রাষ্ট্র ও সরকার প্রধান বিজয়ীদের মধ্যে পুরস্কার প্রদান করেন। মঙ্গলবার বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রধানমন্ত্রী শেখ মোহাম্মদ বিন রশিদ আল মাকতুম এবং আবুধাবির যুবরাজ শেখ মোহাম্মদ বিন জায়েদ বিন সুলতান আল-নাহিয়ান ও ইউএইর প্রতিষ্ঠাতা ও প্রথম প্রেসিডেন্টের স্ত্রী শেখ ফাতিমা বিনতে মুবারক আল কেতবির সঙ্গে দেখা করেন।
এর আগে দুবাইভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ডিপি ওয়ার্ল্ডের চেয়্যারম্যান সুলতান আহমেদ বিন সুলায়েম এদিন আবুধাবিতে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। প্রধানমন্ত্রী তাকে বাংলাদেশে জ্বালানি খাতের পাশাপাশি বন্দর, জাহাজ নির্মাণ ও তথ্যপ্রযুক্তি খাতে (আইসিটি) বিনিয়োগের আহŸান জানিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রীর এই সফরকালে আবুধাবির ক‚টনৈতিক এলাকা বাংলাদেশ দূতাবাসের স্থায়ী ভবন নির্মাণের জন্য জমি বরাদ্দের বিষয়ে একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। প্রধানমন্ত্রীর সফরসঙ্গী হিসেবে পররাষ্ট্রমন্ত্রী, বৈদেশিক ও কর্মসংস্থানমন্ত্রী, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী, পররাষ্ট্র সচিবসহ গুরুত্বপূর্ণ সরকারি কর্মকর্তারা ছিলেন। এ সফরের গুরুত্বপূর্ণ দিকটি হচ্ছে আবুধাবিতে বাংলাদেশের ৯ রাষ্ট্রদূতকে নিয়ে আয়োজিত সম্মেলন।
বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যে একটি উত্তেজনাকর পরিস্থিতি বিরাজ করছে। এই সময়ে বাংলাদেশ কী ধরনের নীতি ও কৌশল নিয়ে অগ্রসর হবে সে ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মধ্যাপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে কর্মরত ৯ রাষ্ট্রদুতকে যে ব্রিফিং দিয়েছেন সেটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হয়। কেননা মধ্যপ্রাচ্যের অভ্যন্তরে বিভিন্ন দেশের মধ্যে সম্পর্কের নানা টানাপড়েন আছে। তাতে সামান্যতম ভুল বার্তা গেলে বাংলাদেশের সঙ্গে কোন কোন দেশের সম্পর্ক জটিল হতে পারে। সে কারণে প্রধানমন্ত্রীর বার্তাটি সব রাষ্ট্রদূতের জন্য খুবই তাৎপর্যপূর্ণ ছিল।
তিনি স্পষ্ট করে বলেছেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্র নীতি হচ্ছে সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে বৈরিতা নয়। বাংলাদেশের পররাষ্ট্র নীতির ওই দর্শনটি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭২ সালেই শুরু করেন। শেখ হাসিনাও রাষ্ট্র ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হওয়ার পর সেই নীতি অনুসরণ করছেন। মধ্যপ্রাচ্যে এমনিতেই মুক্তিযুদ্ধকে কেন্দ্র করে বিশ^ পরাশক্তির নানা দ্ব›দ্ব-সংঘাতে বাংলাদেশ অনেক দেশের কাছ থেকে প্রয়োজনীয় সমর্থন লাভ করতে পারেনি। সেটি অর্জন করতে বাংলাদেশকে বেশ বেগ পেতে হয়েছিল। তা ছাড়া আওয়ামী লীগ সরকার সম্পর্কে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে ক্রিয়াশীল কোনো কোনো মহল সেইসব দেশকে ভুল বার্তা প্রদান করত। এর ফলে এক ধরনের সন্দেহ থেকে কোনো কোনো রাষ্ট্র আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করার পর কিছুটা দূরত্ব বজায় রেখে চলত। কিন্তু শেখ হাসিনা ১৯৯৬-২০০১ শাসনামলে মধ্যপ্রাচ্যের
দেশগুলোর সঙ্গে বন্ধুত্বের সম্পর্ক বৃদ্ধির আপ্রাণ চেষ্টা করেছিলেন।
২০০৯ সালের পর থেকে সেই সম্পর্ক উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পেতে শুরু করে।
বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যের সব দেশের সঙ্গেই বাংলাদেশের সম্পর্ক ঘনিষ্টতর। বিশেষত এই মুহূর্তে মধ্যপ্রাচ্যে কিছু বিষয় নিয়ে এক ধরনের উত্তেজনা চলছে। সেই মুহূর্তে বাংলাদেশ সব রাষ্ট্রের সঙ্গে বন্ধুত্ব বজায় রাখার যে বার্তাটি রাষ্ট্রদূতদের মাধ্যমে দেওয়ার চেষ্টা করছে তা আমাদের সঙ্গে দেশগুলোর সম্পর্কে কোনো ফাটল তৈরি হবে না বলেই মনে হচ্ছে। শেখ হাসিনা সরকার প্রধান হিসেবে এই সুযোগটি কাজে লাগানোর যে উদ্যোগ নিয়েছেন সেটি খুবই প্রশংসনীয়।
কেননা, এই মুহূর্তে প্রায় ৫০ লাখ বাংলাদেশের নাগরিক মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে কর্মরত আছেন। বিপুল এই জনশক্তি মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে দীর্ঘদিন থেকে কাজ করছেন, আবার অসংখ্য নতুন নতুন জনশক্তি এসব দেশে কাজ করতে যাচ্ছেন। সব দেশের কাজের পরিবেশ একরকম নয়। নানা ধরনের সমস্যা সব দেশেই কমবেশি রয়েছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে কোনো ধরনের ভুল বোঝাবুঝির সৃষ্টি হলে বা এক্ষেত্রে কোনো ধরনের সমস্যা তৈরি হলে সেটির ধাক্কা দেশের অভ্যন্তরেও পড়তে পারে। বিষয়টি খুবই জটিল এবং স্পর্শকাতরও। এমনিতেই মধ্যপ্রাচ্যে এখন দক্ষ ও প্রযুক্তিজ্ঞান সম্পন্ন মানুষের চাহিদার বিপরীতে অপেক্ষাকৃত কম দক্ষ বা অদক্ষ জনশক্তির কর্মসংস্থান কমে আসছে। সেক্ষেত্রে বাংলাদেশের জনশক্তিকে আরও বিপুলভাবে কীভাবে দক্ষ ও অভিজ্ঞ করে পাঠানো যায় সে বিষয়ে সরকারের দিক থেকে যথেষ্ট উদ্যোগ রয়েছে। কিন্তু সেটি নির্ভর করবে সেই দেশে কাজের চাহিদা সুযোগ-সুবিধা এবং সম্পর্কের ওপর। সেক্ষেত্রে রাষ্ট্রদূতরা সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্র ও সরকারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বৃদ্ধি করার মাধ্যমে দেশের ক্রমবর্ধমান জনশক্তির কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করার যে পরামর্শ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দিয়েছেন সেটি গুরুত্বের সঙ্গে নেওয়ার বিষয়। তা ছাড়া বাংলাদেশ বিদেশ থেকে যে রেমিট্যান্স পাচ্ছে তার বড় অংশই আসছে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে কর্মরত বাংলাদেশের নাগরিকদের কাছ থেকে।
বর্তমানে দেশের অর্থনীতির যে প্রবাহ বিদ্যমান রয়েছে তার বড় অংশই এদের কাছ থেকে পাওয়া। সুতরাং সেক্ষেত্রে কোনো ধরনের সমস্যা তৈরি হলে দেশের অর্থনীতি নাজুক পরিস্থিতির মুখে পড়তে পারে। সরকার বিষয়টি সম্পর্কে সচেতন থেকেই রাষ্ট্রদূতদের মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে কর্মসংস্থান বৃদ্ধির সম্ভাব্য সুযোগগুলোতে কাজে লাগানোর উদ্যোগ নিতে সচেষ্ট থাকতে পরামর্শ দিয়েছেন। একই সঙ্গে যারা এসব
দেশে কর্মরত আছেন তাদের সমস্যা সমাধান এবং সহযোগিতা প্রদানে সচেষ্ট থাকতে পরামর্শ দিয়েছেন।
প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে মধ্যপ্রাচ্যে কর্মরত বাংলাদেশের নাগরিকদের প্রতি তার আন্তরিকতা ও ভালোবাসার যে নিদর্শন ফুটে উঠেছে সেটি রাষ্ট্রদূতরা কনস্যুলেট সেবার মাধ্যমে প্রদান করলে দেশ যথার্থই লাভবান হবে, বিদেশে কর্মরত বাঙালিরা ব্যক্তিগতভাবে উপকৃত হবেন। প্রধানমন্ত্রী কর্মরত বাঙালিদের সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি করার বিষয়টি ছাড়াও দেশগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক আরও নিবিড় করা, ব্যবসা-বাণিজ্য সম্প্রসারণ, বাংলাদেশে বিভিন্ন খাতে বিনিয়োগ আকর্ষণ ইত্যাদিতে ভ‚মিকা রাখতে রাষ্ট্রদূতদের নির্দেশ দিয়েছেন।
আমরা জানি, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশের অভ্যন্তরে একশটির মতো শিল্পজোন স্থাপন করেছেন, বিদেশি বিনিয়োগের
পরিবেশ অনুক‚ল করার সব ধরনের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।
দেশে এই মুহূর্তে জ্বালানি ও বিদ্যুতের উৎপাদন সরবরাহ আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বিনিয়োগের জন্য অনেক বেশি অনুক‚লে। সেই জন্য প্রধানমন্ত্রী তার সফরসঙ্গী মন্ত্রীদের দুই মন্ত্রীকে মূলত জ্বালানি ও কর্মসংস্থানের সুযোগ বৃদ্ধি করার জন্যই নিয়ে গেছেন। একই সঙ্গে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, সচিবকে নিয়ে যাওয়ার মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির সুস্পষ্ট লক্ষণ প্রদর্শন করারও চেষ্টা করেছেন। সব মিলিয়ে তিন দিনের এই সফরে বাংলাদেশকে মধ্যপ্রাচ্যে যেভাবে তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন তা সেখানকার কর্মরত দূতাবাসগুলো অনুধাবন ও অনুসরণ করে কাজ করলে বাংলাদেশ লাভবান হওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেশি রয়েছে বলেই আমরা মনে করি। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি হলোÑ উত্তেজনাকর এই মুহূর্তে বাংলাদেশ তার ঘোষিত পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করা এবং সেসব দেশে বাংলাদেশের জনশক্তির জন্য বাজার আরও সম্প্রসারণ করার সুযোগ সন্ধানে সচেষ্ট হতে প্রয়াস চালিয়েছে। এটি দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্তাব্যক্তিরা বাস্তবায়নে সচেষ্ট থাকলে বাংলাদেশ লাভবান হবে। আমরা সেটি এই মুহূর্তে বিশেষভাবে কামনা করছি।

শিক্ষাবিদ, ইতিহাসবিদ





সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত


ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: কমলেশ রায়, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড-এর পক্ষে প্রকাশক গাজী আহমেদ উল্লাহ
নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।

ফোন : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৭৫। ই-মেইল : [email protected]