ই-পেপার শনিবার ১৮ জানুয়ারি ২০২০ ৪ মাঘ ১৪২৬
ই-পেপার শনিবার ১৮ জানুয়ারি ২০২০

সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়তে প্রয়োজন পুঁজিবাজারের স্থিতিশীলতা
মোহাম্মদ মনিরুল ইসলাম
প্রকাশ: শুক্রবার, ১৭ জানুয়ারি, ২০২০, ১২:০০ এএম | প্রিন্ট সংস্করণ  Count : 22

একটি দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে পুঁজিবাজারের ভ‚মিকা বিশ^ জুড়ে স্বীকৃত। বাংলাদেশের অর্থনীতির অমিত সম্ভাবনাকে বাস্তবরূপ দিতে আমাদের পুঁজিবাজারের প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম। স্টক এক্সচেঞ্জ সঞ্চয়কারীদের পুঞ্জীভ‚ত সঞ্চয় ও উদ্যোক্তাদের মূলধন জোগানের মাঝে একটি সঞ্চালন লাইন হিসেবে কাজ করে। পৃথিবীর উন্নত দেশগুলোতে দীর্ঘমেয়াদি মূলধনের জন্য প্রধানত পুঁজিবাজারের ওপর নির্ভরশীল। স্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশের ক্রমবিকাশমান শিল্পের উন্নয়নে পুঁজিবাজার দীর্ঘমেয়াদি মূলধন জোগানের অন্যতম মাধ্যম হিসেবে কাজ করার চেষ্টা করে যাচ্ছে, যা বিগত দুই দশকে বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে, কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য বাংলাদেশের শিল্পায়নের অর্থায়নে এখনও পর্যন্ত ব্যাংকিং খাতের একক আধিপত্য রয়েছে। উদ্যোক্তাদের অর্থায়নে এই অসামঞ্জস্যপূর্ণ আচরণ দেশের আর্থিক খাতের জন্যও ঝুঁকিপূর্ণ এবং এর প্রভাব ইতোমধ্যে আমাদের আর্থিক খাতে পরিলক্ষিত হচ্ছে।
তবে এটি অত্যন্ত আশাব্যাঞ্জক যে, দেশের অর্থনীতির বৃহত্তর স্বার্থে সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংক ২০১৯ অর্থবর্ষের প্রথমার্ধের (জুলাই-ডিসেম্বর ২০১৮) মুদ্রানীতিতে দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নে প্রচলিত ব্যাংক ঋণের পরিবর্তে পুঁজিবাজার ও বন্ড মার্কেটের মাধ্যমে অর্থায়নের ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেছে। এখন একটি টেকসই ও উন্নত পুঁজিবাজার গড়ার স্বার্থে, ব্যাংকের ওপর চাপ কমাতে স্বচ্ছ মানসিকতা নিয়ে উদ্যোক্তাদের এগিয়ে আসতে হবে। বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) হলো দেশের মূলধন বাজারের নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থা। একসময় জয়েন্ট স্টক কোম্পানিজ রেজিস্ট্রারের (আরজেএসসি) অধীনস্থ কন্ট্রোলার অব ক্যাপিটাল ইস্যুর অধীনে চলত দেশের পুঁজিবাজার।
দিন দিন বাজারের কলেবর বড় হতে থাকায় দেশের পুঁজিবাজারকে নিয়ন্ত্রণের জন্য আলাদা রেগুলেটরি বডির প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। আর সে লক্ষ্যে ১৯৯৩ সালের ৮ জুন সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন আইন ১৯৯৩-এর ক্ষমতাবলে সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (এসইসি) প্রতিষ্ঠা করা হয়। প্রতিষ্ঠার পরপরই পুঁজিবাজারের উন্নয়নে কিছু আইন-কানুন প্রণয়ন শুরু করে এসইসি। ওইসব আইন-কানুন দিয়েই দীর্ঘ প্রায় দেড় যুগ চলে বাংলাদেশের পুঁজিবাজার। এর মধ্যে ১৯৯৬ সালে পুঁজিবাজারে বড় ধরনের ধস হলেও কালের বিবর্তনে অনেক চড়াই-উৎরাই পেরিয়ে তা কাটিয়ে ওঠে। পরবর্তীতে বিভিন্ন অব্যবস্থাপনার কারণে ২০১০ সালের শেষ দিকে দেশের পুঁজিবাজারে ভয়াবহ ধস নামে। এরপর সময়ের দাবি বিবেচনায় ২০১২ সালের ১০ ডিসেম্বর এক আইনের মাধ্যমে এসইসির নাম পরিবর্তন করে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) নামকরণ করা হয়। অর্থ মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ প্রতিষ্ঠান ও পুঁজিবাজারের রেগুলেটর হিসেবে বিএসইসি তখন থেকে নতুনভাবে কাজ শুরু করে।
বিগত ১০ বছর কমবেশি ৮০টির মতো আইন-কানুন প্রণয়ন ও সংস্কার করেছে সরকারি এ প্রতিষ্ঠানটি। তারপরও পুঁজিবাজারের ধস ঠেকানো যায়নি। পুঁজিবাজার নিয়ে সাধারণের আস্থা ফেরেনি। উল্লেখ্য, ২০১৯ সালে ২৪ জানুয়ারি থেকে ৯ জানুয়ারি ২০২০ পর্যন্ত সূচক কমেছে প্রায় ১৭৫৩ পয়েন্ট। বিশেষজ্ঞরা বলে থাকেন, বাজারে উত্থান-পতন থাকবে এটাই স্বাভাবিক। এই ১০ বছরে উত্থান কখন হলো যে এভাবে পতন! অথচ এ সময়ে অর্থনীতি এগিয়েছে, মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) প্রবৃদ্ধিতে নতুন রেকর্ড হয়েছে। চলতি ২০১৯-২০ অর্থবছরের জন্য সরকার মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) আকার ধরেছে ২৮ লাখ ৮৬ হাজার কোটি টাকা কিন্তু এই জিডিপির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় দেশের পুঁজিবাজার। সরকার ২০১২-১৩ অর্থবছরে জিডিপির আকার ধরেছিল ১১ লাখ ৮৮ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ সাত বছরে জিডিপির আকার বেড়েছে ১৬ লাখ ৯৮ হাজার কোটি টাকা বা প্রায় আড়াইগুণ। অথচ দেশের পুঁজিবাজার সূচকের হিসাবে ফিরে গেছে ঠিক সাত বছর আগের জায়গায়। পুঁজিবাজারকে পাশ কাটিয়ে একটি দেশের উন্নয়ন কখনই টেকসই হতে পারে না। অর্থনীতির মৌলিক এলাকা হচ্ছে পুঁজিবাজার। পুঁঁজিবাজারের উন্নয়ন ছাড়া সামনে এগোনো যাবে না। মানুষের প্রয়োজনে আইন-কানুন তৈরি হয়। আর সেই আইনের সঠিক প্রয়োগের মাধ্যমেই সমাজ, জাতি, প্রতিষ্ঠান, দেশ সুশৃঙ্খল হয়। সেই আইন প্রয়োগেই আমাদের যত দুর্বলতা বা অনীহা। তা না হলে এত সংস্কার করেও পুঁজিবাজারে স্থিতিশীলতা আসছে না কেন? বাজারসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, বাজারের ওপর সাধারণ বিনিয়োগকারীদের আস্থা একেবারে তলানিতে এসে ঠেকেছে। বাজার নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) নামে যে সংস্থাটি আছে সেটির ওপরই বিনিয়োগকারীদের আস্থার চরম ঘাটতি দেখা দিয়েছে। আস্থা ফেরাতে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসির পুনর্গঠন এখন সময়ের দাবি। কারণ, বর্তমান কমিশন ১০ বছরের বেশি সময় দায়িত্ব পালনের পরও বাজারের প্রতি বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরাতে পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছে।
এর ফলে বিদায়ি বছরে প্রায় দুই লাখ দেশি ও ১৮ হাজার ১৪২ জন বিদেশি বিনিয়োগকারী পুঁজিবাজার ছেড়েছেন। সাম্প্রতিক সময়ে দেশের পুঁজিবাজারের জন্য যেসব আইন-কানুন হয়েছে, সেগুলো এই বাজারকে সুরক্ষা দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। এখন পুঁজিবাজারের জন্য সবচেয়ে বেশি দরকার ব্র্যান্ডিং। পুঁজিবাজারকে যদি বড় করা না যায়, বাজারের প্রতি যদি বিনিয়োগকারীদের আস্থা প্রতিষ্ঠা না হয়, তাহলে আইন-কানুনের কোনো সুফল পাওয়া যাবে না। সবকিছুর আগে একটি গতিশীল ও টেকসই বাজার সৃষ্টি করার জন্য, সচেতন বিনিয়োগকারী সৃষ্টিতে বিনিয়োগ শিক্ষা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সে লক্ষ্যে ২০১৭ সালের শুরুর দিকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিএসইসির এক আনুষ্ঠানের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে এ কাজটি উদ্বোধন করেন। এই শিক্ষা বিনিয়োগকারী, স্টেক হোল্ডার, কোম্পানির উদ্যোক্তা-কর্মকর্তা-কর্মচারীদেরও প্রয়োজন। এক কথায় বললে পুঁজিবাজারের সঙ্গে যুক্ত সব অংশীজনদের জন্যই বিনিয়োগ শিক্ষার সুযোগ রয়েছে এবং পরবর্তীতে অবশ্যই তাদের নীতি নৈতিকতা ও মূল্যবোধের সহিত কাজ করতে হবে। একটি কথা উল্লেখ্য যে, বাজারে বিভিন্ন ধরনের কোম্পানি থাকবে, তাই বলে সবার সব কোম্পানিতে বিনিয়োগ করতে হবে তা কিন্তু ঠিক নয়। তাই বিনিয়োগের সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে আমাদেরকে নিজেদের অবস্থান, আর্থিক সামর্থ্য, ভবিষ্যৎ প্রয়োজনীয়তা ইত্যাদি বিবেচনায় রাখতে হবে। ধার-কর্জ করা টাকা নিয়ে পুঁজিবাজারে না এসে, নিজের ও পরিবারের ভরন-পোষণের পর অতিরিক্ত টাকা থাকলে তার একটি অংশ পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ করা উচিত। আর কখনই অন্যের কথায় প্ররোচিত না হয়ে, গুজবে কান না দিয়ে, হাউসে বসে তথাকথিত আইটেম না খুঁজে, ব্যক্তি সচেতনতা ও দক্ষতা বৃদ্ধির মাধ্যমে, নিজে জেনে-বুঝে দীর্ঘসময়ের কথা বিবেচনায় রেখে, বিনিয়োগের ক্ষেত্র যাচাই-বাছাই করে, কোম্পানির ম্যানেজমেন্ট বা উদ্যোক্তাদের বিষয়াদি বিশ্লেষণ করে, ভালো মৌলভিত্তি সম্পন্ন শেয়ারে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ করলে নিজেদের বিনিয়োগ সুরক্ষা নিশ্চিত করা যাবে এবং পুঁজিবাজারও একটি স্থিতিশীল ও টেকসই খাতে পরিণত হয়ে ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে তুলতে বিশেষ ভ‚মিকা রাখবে।

পুঁজিবাজার বিশ্লেষক




সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত


ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: কমলেশ রায়, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড-এর পক্ষে প্রকাশক গাজী আহমেদ উল্লাহ
নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।

ফোন : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৭৫। ই-মেইল : [email protected]