ই-পেপার শনিবার ১৮ জানুয়ারি ২০২০ ৪ মাঘ ১৪২৬
ই-পেপার শনিবার ১৮ জানুয়ারি ২০২০

সময়ের আলো সাক্ষাৎকার মাওলানা আলী আকবর কাসেমী
মানবসেবায় এগিয়ে আসা ইবাদত
প্রিন্সিপাল, জামিয়া সিদ্দীকিয়া যাদুরচর মাদ্রাসা, সাভার
প্রকাশ: শুক্রবার, ১৭ জানুয়ারি, ২০২০, ১২:০০ এএম আপডেট: ১৭.০১.২০২০ ৭:২৫ পিএম | প্রিন্ট সংস্করণ  Count : 311

1

1

শীতকাল অসহায় মানুষদের জন্য কষ্টের সময়। তারপরও দেশব্যাপী টানা শৈত্যপ্রবাহে দুর্ভোগ বেড়েছে কয়েকগুণ। এ সময় সমাজের বিত্তবান ব্যক্তিদের দায়িত্ব অভাবগ্রস্তদের পাশে দাঁড়ানো। ইসলামে মানবসেবা ও অসহায়দের সহযোগিতার বিষয়ে সময়ের আলোকে সাক্ষাৎকার দিয়েছেন সাভারের জামিয়া সিদ্দীকিয়া যাদুরচর মাদ্রাসার প্রিন্সিপাল ও ইত্তিহাদুল উলামা সাভারের সেক্রেটারি হাফেজ মাওলানা আলী আকবর কাসেমী। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন আবদুল্লাহ ফিরোজী।

সময়ের আলো : মানবসেবা বিষয়ে ইসলামের নির্দেশনা কী?
মাওলানা আলী আকবর কাসেমী : ‘খেদমতে খালক’ বা মানবসেবা ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ বিধান। ইসলাম মানবসেবা, মানবকল্যাণ এবং জনহিতকর কাজকে গুরুত্ব প্রদান করেছে। ইসলামের নবী মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ (সা.) ছিলেন মানবসেবার সর্বোত্তম উদাহরণ। কিশোর বয়সেই মানবসেবার উদ্যোগ নিয়ে তিনি মক্কাবাসীর মনোযোগ আকর্ষণ করেছিলেন। আর্তমানবতার সেবা এবং অসহায়-ক্ষুধার্তকে অন্নদান বিরাট সওয়াবের কাজ। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেছেন, ‘যদি তোমরা দান-সদকা বা সাহায্য-সহযোগিতা প্রকাশ্যে কর, তা কতই না উত্তম। আর যদি এমন কাজ গোপনে কর এবং অভাবগ্রস্তদের দিয়ে দাও, তাহলে তা তোমাদের জন্য আরও উত্তম। আল্লাহ তোমাদের কিছু গুনাহ দূর করে দেবেন। আল্লাহ তোমাদের কৃত কর্মের খুব খবর রাখেন।’ (সুরা বাকারা : ২৭১)। অন্যত্র আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, ‘তোমরা মানুষের প্রতি তেমন অনুগ্রহ কর (সদকা বা যেকোনো উপায়ে) যেমন আল্লাহ তোমাদের প্রতি অনুগ্রহ করেছেন।’ (সুরা কাসাস : ৭৭)

সময়ের আলো : অভাবগ্রস্তদের পাশে দাঁড়ানোর গুরুত্ব কতটুকু?
মাওলানা আলী আকবর কাসেমী : ইসলামে অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানোর বিষয়ে কেবল গুরুত্ব প্রদানই নয়, এসব কাজে অংশগ্রহণ করার ব্যাপারে উৎসাহও দিয়েছে। এ ব্যাপারে ত্রুটি হলে কেয়ামতের দিন আল্লাহর সামনে জিজ্ঞাসিত হতে হবে। হজরত আবু হুরায়রা (রা.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘আল্লাহ তায়ালা কেয়ামতের দিন বলবেন, হে আদম সন্তান! আমি অসুস্থ ছিলাম; তুমি আমাকে দেখতে আসনি। তখন সে বলবে, হে আমার রব! আমি আপনাকে কীভাবে দেখতে যাব? আপনি তো বিশ্বজাহানের রব! আল্লাহ বলবেন, তুমি কি জানতে না যে, আমার অমুক বান্দা অসুস্থ ছিল? তুমি তাকে দেখতে যাওনি। তুমি যদি তাকে দেখতে যেতে, আমাকে অবশ্যই তার কাছে পেতে।

আল্লাহ আরও বলবেন, হে আদম সন্তান! আমি তোমার কাছে খাবার চেয়েছিলাম। তুমি আমাকে খাবার দাওনি। সে বলবে, হে আমার রব! আমি আপনাকে কীভাবে খাবার দিতাম? আপনি তো বিশ্বজাহানের রব। আল্লাহ বলবেন, ‘তুমি কি জান না, আমার অমুক বান্দা তোমার কাছে খাবার চেয়েছিল? তুমি তাকে খাবার দাওনি। সে সময় যদি তুমি তাকে খাবার দিতে তাহলে তা এখন আমার কাছে পেতে!

আল্লাহ আরও বলবেন, হে আদম সন্তান! আমি তোমার কাছে পিপাসা নিবারণের জন্য পানি চেয়েছিলাম। তুমি পানি দিয়ে তখন আমার পিপাসা নিবারণ করনি। সে বলবে, হে আমার রব! আমি কীভাবে আপনার পিপাসা নিবারণ করতাম? আপনি তো বিশ্বজাহানের রব। আল্লাহ বলবেন, আমার অমুক বান্দা তোমার কাছে পানি চেয়েছিল, তুমি তখন তাকে পানি দাওনি। যদি তুমি সে সময় তাকে পানি দিতে, তাহলে তা এখন আমার কাছে পেতে। (মুসলিম : ২৫৬৯; ইবনে হিব্বান : ৯৪৪)। এই হাদিস দ্বারা বুঝে আসে অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো আমাদের জন্য ইবাদত। পরকালে এর জন্য উত্তম বিনিময় অপেক্ষা করছে।

2

2

সময়ের আলো :
শীতার্ত মানুষের কষ্ট দূর করতে বিত্তবানদের করণীয় কী?
মাওলানা আলী আকবর কাসেমী : বর্তমানে তীব্র শীতে দেশ কাঁপছে। হাড়কাঁপা এই শীতে অসহায়-গরিব মানুষরা শীত নিবারণের যথেষ্ট উপকরণ না পাওয়ায় বর্ণনাতীত কষ্ট হচ্ছে তাদের। মানবতা ও ধর্মের বিধান মতে এই করুণ মুহূর্তে সমাজের বিত্তবানদের দায়িত্ব সাহায্য-সহযোগিতায় এগিয়ে আসা। জাতি, ধর্ম, বর্ণ ও দলমত নির্বিশেষে শীতার্ত মানুষের পাশে দাঁড়ানো। নবী মুহাম্মদ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি কোনো মুমিনের পার্থিব একটি মুসিবত দূর করবে, আল্লাহ তায়ালা কিয়ামতের দিন তার মুসিবতসমূহ দূর করে দেবেন। আর যে ব্যক্তি কোনো অভাবী মানুষকে সচ্ছল করে দেবে, রব্বে কারীম তাকে ইহকাল ও পরকালে সচ্ছল করে দেবেন এবং আল্লাহ বান্দার সাহায্য করবেন যদি বান্দা তার ভাইয়ের সাহায্য করে।’ (মুসলিম; মেশকাত : ৩২ পৃ)

সময়ের আলো : শীতার্তদের মাঝে বস্ত্র বিতরণের বিষয়ে ইসলাম কী বলে?
মাওলানা আলী আকবর কাসেমী : ইসলামের ইতিহাস বলে বদরের যুদ্ধবন্দি হজরত আব্বাসকে (রা.) রাসুল (সা.) পোশাকের ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন। একবার রাসুল (সা.)-এর নিকট মুদার গোত্র হতে গলায় চামড়ার আবা পরিহিত বস্ত্রহীন কিছু লোক আগমন করল। তাদের করুণ অবস্থা দেখে তার চেহারা বিষণ্ন হয়ে গেল। তিনি নামাজ শেষে সাহাবায়ে কেরামের সামনে দান-সাদকার প্রতি উৎসাহমূলক বক্তব্য প্রদান করলেন। ফলে সাহাবাগণ এত অধিক পরিমাণ দান করলেন যে, খাদ্য ও পোশাকের দুটি স্ত‚প হয়ে গেল। এ দৃশ্য দেখে রাসুল (সা.) অত্যন্ত আনন্দিত হলেন। তার চেহারা মোবারক উজ্জ্বল হয়ে গেল।

বস্ত্রদানের প্রয়োজনীয়তা ও ফজিলত সম্পর্কে রাসুল (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘কোনো মুসলমান অন্য মুসলমানকে কাপড় দান করলে আল্লাহ তায়ালা তাকে জান্নাতের পোশাক দান করবেন। ক্ষুধার্তকে খাদ্য দান করলে আল্লাহ তায়ালা তাকে জান্নাতের সুস্বাদু ফল দান করবেন। কোনো তৃষ্ণার্ত মুসলমানকে পানি পান করালে মহান আল্লাহ তাকে জান্নাতের সিলমোহরকৃত পাত্র থেকে পবিত্র পানীয় পান করাবেন।’ (তিরমিজি : ২৪৪৯)

হাদিসের আলোকে সমাজের সামর্থ্যবানদের কাছে আবেদন জানাই, যার যার এলাকার অসহায় মানুষদের পাশে দাঁড়ান। যতটুকু সামর্থ্য আছে তা নিয়েই এগিয়ে আসুন। এ ক্ষেত্রে সরকারেও দায়িত্ব রয়েছে। অসহায় মানুষের কষ্ট লাগবে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদেরও দায়িত্ব রয়েছে। ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা হজরত ওমর ইবনে খাত্তাব (রা.) প্রতি সন্ধ্যা-রাতে জনগণের অবস্থা পরিদর্শনের জন্য রাস্তায় বের হতেন।

গভীর রাত অবধি ঘুরে ঘুরে দেখতেন কার কী অবস্থা এবং তদানুযায়ী ব্যবস্থা নিতেন। তিনি ‘বাইতুল মাল’ অর্থাৎ রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে মুসলিম ও অমুসলিম দরিদ্র, খাদ্য-বস্ত্রহীন অসহায়, বৃদ্ধ, এতিম, বিধবা ও অক্ষমদের সহায়তা প্রদান করতেন। এমনকি নিজ কাঁধে আটার বস্তা নিয়ে অসহায় মানুষের ঘরে পৌঁছে দিতেন। তিনি পৃথিবীর রাষ্ট্রপ্রধানদের দেখিয়ে দিয়েছেন কীভাবে জনগণের দোরগোড়ায় রাষ্ট্রীয় সেবা পৌঁছে দিতে হয়। আমাদের দেশের দায়িত্বশীলরাও এভাবে দরিদ্রদের কাছে সহায়তা পৌঁছে দেবেন আমরা এমনটা প্রত্যাশা করি।




সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত


ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: কমলেশ রায়, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড-এর পক্ষে প্রকাশক গাজী আহমেদ উল্লাহ
নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।

ফোন : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৭৫। ই-মেইল : [email protected]