ই-পেপার বিজ্ঞাপনের তালিকা শুক্রবার ২ অক্টোবর ২০২০ ১৬ আশ্বিন ১৪২৭
ই-পেপার শুক্রবার ২ অক্টোবর ২০২০

‘শালাদের অনেক মেরেছি, কিন্তু একটাও স্বীকার করে নি’
ঢাবি প্রতিনিধি
প্রকাশ: বুধবার, ২২ জানুয়ারি, ২০২০, ৬:৫৮ পিএম আপডেট: ২৩.০১.২০২০ ৫:৫৭ পিএম | অনলাইন সংস্করণ  Count : 512


সত্যতা না পেয়ে আটকের ১০ ঘন্টা পর ছেড়ে দিল পুলিশ
হাতুড়ি, ডিসের তাঁর ও রড দিয়ে পিটানো হয়
নির্যাতনের প্রতিবাদে বিক্ষোভ মিছিল করে ভিপি নুর


ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্জেন্ট জহুরুল হক হলে চার শিক্ষার্থীকে রাতভর আটকে রেখে নির্যাতন করেছে ছাত্রলীগের কয়েকজন নেতা-কর্মী। পরবর্তীতে তাদেরকে প্রক্টরিয়াল টিমের মাধ্যমে শাহবাগ থানায় সোপর্দ করে। ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা তাদের বিরুদ্ধে শিবির সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ এনেছেন। যদিও পরবর্তীতে তাদের বিরুদ্ধে আনিত অভিযোগের কোনো সত্যতা না পেয়ে দুপুর দেড়টার দিকে মুচলেকা নিয়ে তাদেরকে ছেড়ে দেয় শাহবাগ থানা পুলিশ।

মঙ্গলবার দিবাগত রাত ১টার দিকে এ ঘটনা ঘটে। এর প্রতিবাদে বিকাল ৪ টায় বিক্ষোভ মিছিল করে ডাকসু ভিপি নুরুল হক নুর।

মারধ‌রের শিকার চার শিক্ষার্থী হ‌লেন, ট্যুরিজম এন্ড হস‌পিটা‌লি‌টি ম্যা‌নেজ‌মেন্ট বিভাগের ৩য় বর্ষের শিক্ষার্থী মুকিমুল হক চৌধুরী, রাষ্টবিজ্ঞান বিভাগের ৩য় বর্ষের সানোয়ার হোসেন, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃ‌তি বিভাগের ২য় বর্ষের শিক্ষার্থী মিনহাজ উদ্দিন এবং আরবী বিভাগের ২য় বর্ষের শিক্ষার্থী আফসার উদ্দিন।

নির্যাতনে নেতৃত্বদানকারী‌দের ম‌ধ্যে ছি‌লেন- হল ছাত্রলীগের সহ সভাপ‌তি আনোয়ার হোসেন, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আমির হামজা, হল সংসদের সহ-সভাপতি সাইফুল্লাহ আব্বাসী অনন্ত ও সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক ও বর্তমানে হলের সর্বোচ্চ পদ প্রত্যাশী মাহফুজুর রহমান ইমন।

এদের ম‌ধ্যে আনোয়ার এবং হামজা ছাত্রলী‌গের কেন্দ্রীয় সভাপ‌তি আল না‌হিয়ান খান জ‌য়ের অনুসারী, আব্বাসী সাধারণ সম্পাদক লেখক ভট্টাচা‌র্যের অনুসারী এবং ইমন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মেয়াদউত্তীর্ণ কমিটির সভাপতি সঞ্জিত চন্দ্র দাসের অনুসারী।

প্রত্যক্ষদর্শী সূত্রে জানা যায়, ফেসবুকের কয়েকটা স্ক্রিনশটের ওপর ভিত্তি করে রাত ১১টায় ভুক্ত‌ভোগী শিক্ষার্থী‌দের‌কে হলের গেস্টরুমে ডেকে আনে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। পরে, শিবিরের সাথে তার সংশ্লিষ্টতা রয়েছে এমন অভিযোগে তাকে মানসিক চাপ দিতে থাকে। স্বীকার না করায় তাকে মারধর করে।

এ সময় তার মোবাইলে আরও তিন বন্ধুর সঙ্গে যোগাযোগ তালিকায় নাম থাকায় তাদেরকেও ডেকে গেস্টরুমে আনা হয়।

উপস্থিত ছাত্রলীগের এক নেতা নাম না বলা সূত্রে জানান, প্রথমে হাতুড়ি দিয়ে পিটায় বাংলাদেশ ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সাবেক সদস্য ও জুহুরুল হক হল সংসদের ভিপি সাইফুল্লা আব্বাসী অনন্ত, হল শাখা ছাত্রলীগের সাংগঠনিক
সম্পাদক শাহীন আলম। পরবর্তীতে লাঠি, রড ও কিল-ঘুষি মারে হল শাখা ছাত্রলীগের সহ-সভাপতি কামাল উদ্দীন রানা, যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক আমির হামজা ও মাহফুজুর রহমান ইমন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক প্রত্যক্ষদর্শী এক শিক্ষার্থী বলেন, রাত এগারোটা থেকে মুকিমকে রুমে পাওয়া যাচ্ছিল না। পরে আমরা বন্ধুরা রাত দুইটার দিকে তাকে খুঁজতে বের হলে গেস্ট রুম থেকে বড় ভাইদেরকে মুকিমকে সাথে নিয়ে বের হতে দেখি। এ সময় মুকিম আহত অবস্থায় ছিল বলেও নিশ্চিত করেছেন এ শিক্ষার্থী ।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, রাত ১১টার দিকে জহুরুল হক হলের গেস্টরুমে ছাত্রলীগের নিয়মিত গেস্টরুম কর্মসূচি চলছিল। তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী মো. মুকিম চৌধুরীকে শিবির সন্দেহে গেস্টরুমে ডাকা হয়।

সেখানে হল শাখা ছাত্রলীগের বিলুপ্ত কমিটির সহ-সভাপতি আনোয়ার হোসেন ও যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক আমির হামজা তাদের অনুসারীদের দিয়ে মুকিমকে প্রথমে মানসিক চাপ দেয়। এতে স্বীকার না করায় তাকে লাঠি, স্টাম্প ও রড দিয়ে বেধড়ক মারধর করতে থাকে।

পরে তার ফোনের চ্যাটলিস্ট দেখে রাষ্টবিজ্ঞান বিভাগের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী সানওয়ার হোসেনকে গেস্টরুমে আনা হয়। সেখানে তাকেও বেধড়ক মারধর করে ছাত্রলীগের নেতারা। মারধর সহ্য করতে না পেরে তারা উভয়েই মেঝেতে বসে ও শুয়ে পড়ে।

এর একটু পর ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী মিনহাজ উদ্দীন ও একই বর্ষের আরবি বিভাগের শিক্ষার্থী আফসার উদ্দীনকে ধরে গেস্টরুমে আনা হয়। সেখানে রাত দুইটা পর্যন্ত তাদের ওপর বিভিন্ন নির্যাতন করতে থাকে ছাত্রলীগ নেতারা।

পরে রাত ২টার পর তাদেরকে প্রক্টরিয়াল টিমের মাধ্যমে শাহবাগ থানায় হস্তান্তর করা হয়। তা‌দের অবস্থা দে‌খে পুলিশ তাদেরকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করে।

নির্যাতনকারী হল শাখা ছাত্রলীগের যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক আমির হামজা বলেন, আমরা তাদের মারধর করিনি। শুধুমাত্র জিজ্ঞাসা করেছি। তাদের কাছ থেকে শিবিরের দুটি বই উদ্ধার করেছি। তবে সাংবাদিকরা জানতে চাইলে তার কোনো নাম অথবা প্রমাণ দিতে পারেনি। তবে এর আগে বিভিন্ন অপরাধের সাথে জড়িত আমির হামজার জড়িত থাকার বিভিন্ন প্রমাণ পাওয়া যায়।

অন্যদিকে শিবির সংশ্লিষ্টতা প্রমাণ করতে পারেনি বলে গণমাধ্যম কর্মীদের মাঝে স্বীকার করেন মারধরকারী আরেক নেতা জহুরুল হক হল শাখা ছাত্রলীগের সহ-সভাপতি আনোয়ার হোসেন।

তিনি সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার এক পর্যায়ে মুখ ফসকে বলে ফেলেন, ‘শালাদের অনেক মেরেছি। কিন্তু একটাও স্বীকার করেনি। একজনের নামও বলেনি।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক ড. এ কে এম গোলাম রব্বানী বলেন, আমরা হল প্রশাসনের মাধ্যমে এ বিষয়ে অবহিত হয়েছি। ইতোমধ্যে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। যদি ওই শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রবিরোধী ও শৃঙ্খলাবিরোধী কাজে জড়িত থাকার বিষয়টি প্রমাণিত হয়, তাহলে অবশ্যই তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। আর যদি কোনো তথ্য-প্রমাণ পাওয়া না যায় তাহলে তাদেরকে কোনো ধরনের হয়রানি করা যাবে না, এটা আমরা বলে দিয়েছি।

হল ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন চলমান থাকা অবস্থায় ছাত্রলীগের নেতারা কীভাবে শিক্ষার্থীদের মারধর করে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এটাও তো শৃঙ্খলা ভঙ্গ। যে বা যারাই শৃঙ্খলা ভঙ্গ করবে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

ভিপি নুরের বিক্ষোভ মিছিল : ৪ শিক্ষার্থীকে ছাত্রলীগ কতৃক নির্যাতনের প্রতিবাদে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে বিক্ষোভ মিছিল করেছে সন্ত্রাসবিরোধী ছাত্র ঐক্য।

বুধবার বিকেল ৪ টায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সন্ত্রাস বিরোধী রাজু ভাষ্কর্য থেকে মিছিলটি শুরু করে ক্যাম্পাসের বিভিন্ন দিক প্রদক্ষিণ করে আবার রাজু ভাষ্কর্যে এসে শেষ হয়। এ সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় শতাধিক শিক্ষার্থী উপস্থিত ছিল।

নুরুল হক জহুরুল হক হলের সামনে দাঁড়িয়ে বলেন, দলকানা প্রশাসন ছাত্রলীগের নির্মম নির্যাতনের পরেও কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি। জহুরুল হক হলে গতকাল রাতে চারজনকে ছাত্রলীগ নির্যাতন করে। তারা বেধড়ক পিটিয়েছে। যে নির্যাতন করেছে তা আমি শাহবাগ থানায় গিয়ে দেখেছি। তাদেরকে আবরারের মত পিটিয়েছে। হাতুড়ি দিয়ে, স্টাম্প দিয়ে পিটিয়েছে। হয়তো এই চারজনের মধ্যে কেউ একজনের আবরারের মতো পরিণতি হতে পারত।

তিনি আরো বলেন, ছাত্রলীগের নির্যাতন নিপীড়ন থেকে কেউ রেহাই পাচ্ছে না। আমি ভিপি হয়েও ডাকসু ভবনের নির্যাতনের শিকার হয়েছি। তাহলে সাধারণ শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা কোথায়? এই সন্ত্রাসবিরোধী ছাত্র ঐক্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নিরাপত্তার জন্য করা হয়েছে। আপনারা সন্ত্রাসবিরোধী ছাত্রলীগের নেতৃত্বে হলে ছাত্রলীগের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ গড়ে তুলুন।




সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত


ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: কমলেশ রায়, নির্বাহী সম্পাদক : শাহনেওয়াজ দুলাল, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড-এর পক্ষে
প্রকাশক গাজী আহমেদ উল্লাহ। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।

ফোন : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৭৫। ই-মেইল : [email protected]