ই-পেপার বিজ্ঞাপনের তালিকা বৃহস্পতিবার ১ অক্টোবর ২০২০ ১৫ আশ্বিন ১৪২৭
ই-পেপার বৃহস্পতিবার ১ অক্টোবর ২০২০

এবার তারা সর্বস্বান্ত
মোস্তফা ইমরুল কায়েস
প্রকাশ: শনিবার, ২৫ জানুয়ারি, ২০২০, ১২:০০ এএম আপডেট: ২৪.০১.২০২০ ১১:৩৩ পিএম | প্রিন্ট সংস্করণ  Count : 80

ভোরের আলো তখন ফোটেনি। পুবের আকাশে লালচে আলোর ঝলকানি। চারদিকে আগুন আগুন চিৎকার। এরই মাঝে ঘুম ভেঙে যায় অনেকের। দ্রুত উঠে কেউ কেউ দৌড় দেন বাহিরে। কিন্তু ততক্ষণে সব পুড়ে ছাই। শুক্রবার ভোরে রাজধানীর মিরপুর চলন্তিকা বস্তিতে চোখের সামনেই সব পুড়েছে। সর্বস্বান্ত হয়ে গেছে প্রায় কয়েক হাজার পরিবার। পাঁচ মাস আগেও তাদের কপাল পুড়েছিল। এবারও একই দশা। অনেকে ঘুরে দাঁড়ানোর স্বপ্ন আঁকছিলেন কিন্তু সেই রঙ তুলিও পুড়ে গেছে শুক্রবারের ভয়াবহ আগুনে।

আগুন যাদের সর্বস্বান্ত করেছে : কয়েক বছর আগে স্বামীকে হারিয়েছেন গার্মেন্ট কর্মী নাজমা বেগম। তার কপাল অনেক আগেই পুড়েছে। এবার পুড়লো তার ঘর। এক ছেলে ও মেয়েকে নিয়ে বস্তিতেই থাকতেন। সেই মাথা গোঁজার ঠাঁইটুকুও এবার পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। নাজমা আহাজারি করে বলছিলেন, এই শীতে কোথায় থাকব, কী পরব আর কী খাব বুঝতে পারছি না। সবইতো পুড়ে গেছে। তারই পাশ দিয়ে একটি হাঁড়ি, একটি পাতিল, একটি মসলার ঝুড়ি নিয়ে কাঁদতে কাঁদতে দৌড়াচ্ছিলেন আসমা বেগম।

তার ঘরের সব পুড়েছে। মাত্র কিছু জিনিসপত্র তিনি কুড়াতে পেরেছেন। আসমা তার ঘরের কয়েকটি জিনিসপত্র পেলেও বস্তির বাসিন্দা নাজমুল কিছুই নিতে পারেননি। তিনি বলেন, আচমকা ঘুম ভেঙে বেরিয়ে আসায় ঘর থেকে কিছুই বের করে নিয়ে আসতে পারিনি। যা কিছু ছিল, তাও আগুনের পেটে গেল।

গতকালের আগুনে কারও ঘর পুড়েছে, কারও দোকান, রিকশা, ভ্যান ও মূল্যবান জিনিসপত্র। নিজের চোখের সামনেই দোকানের তিন লাখ টাকার মালামাল পুড়ে ছাই হয়েছে মমিনা বেগমের। ষাটোর্ধ্ব এই নারী মাটিতে বসে বসে বিলাপ করে বলছিলেন, ‘সব শ্যাষ হইয়া গেল। কাইল কী খামু সেইডাও নাই। আল্লায় আমারে সর্বস্বান্ত কইরা ছাড়ল।’ তার মতো আরেক নারী সালমারও একই দশা। তিনি স্বামী হারিয়ে বাঁচার লড়াইয়ে একটি দোকান চালু করেছিলেন।

কিন্তু সেটিও পুড়ে ছাই। ফলে সর্বস্বান্ত হয়ে যাওয়া এই নারী পুড়ে যাওয়া দোকানের পাশে বসেই হু হু করে কাঁদছিলেন। আর এই বস্তিতে ঘর বানিয়ে নিজে থাকার পাশাপাশি কয়েকটি ঘর ভাড়াও দিয়েছিলেন জোসনা বেগম কিন্তু এখন তারই থাকার ঘর নেই। জোসনা বলেন, এখন আমরা খোলা জায়গাতেই থাকব।

জাহিদ নামের এক যুবক জানান, তিনি ঘুম থেকে উঠেই দৌড় দিয়েছেন ফলে কোনো কাপড় নিতে পারেননি। জাহিদের মতোই হাজারও নারী, পুরুষ, যুবক, তরুণী আগুনের ভয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে পড়েন। শুক্রবার তারা সারা দিনই এক কাপড়ে ছিলেন। তবে দুপুরের দিকে স্থানীয় কাউন্সিলর প্রার্থীদের কয়েকজন যান। পোড়া বস্তিবাসীর সঙ্গে কথা বলেন এবং তাদের অনেকে খিচুড়ি, শুকনা খাবার ও নির্বাচিত হলে তাদের জন্য কিছু করার আশ্বাস দেন বলে জানা গেছে। শুক্রবার বিকাল পর্যন্ত এই মানুষগুলোর খোলা আকাশের নিচেই দিন কেটেছে।

মাথায় ঋণের কিস্তির বোঝা : অনেকে এই বস্তিতে উঠে দাঁড়ানোর স্বপ্নে বিভিন্ন এনজিও থেকে ঋণ নিয়েছিলেন। ফলে শুক্রবারের আগুনে সেই সর্বস্বান্ত মানুষগুলোর কিস্তি পরিশোধ অনিশ্চিত হয়ে গেল। পাঁচ মাস আগে সব পুড়ে ছাই হওয়ার পর আবারও স্বপ্ন দেখেছিলেন রুবেল মিয়া। তিনিও কিছু টাকা লোন নিয়ে একটি রিকশা কিনেছিলেন। কিন্তু সেই রিকশাটিও পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। পেটে ভাত নেই তার ওপর লোনের বোঝা মেটাবেন কী করে সেই চিন্তায় কাঁদছিলেন।

বিধবা নারী রহিমা ছেলেমেয়ের সঙ্গে বস্তিতে থাকতেন। সংসারের প্রয়োজনে একটি এনজিও থেকে লাখ টাকা ঋণ নিয়েছিলেন। তা পরিশোধও করছিলেন। কিন্তু আগুনের ঘটনায় তিনি হতভম্ব। এই লোন তিনি পরিশোধ করবেন কী করে? কীভাবে তিনি কিস্তি মেটাবেন বলে প্রশ্ন ছিল তার। রুবেল মিয়া ও বিধবা নারী রহিমার মতোই এই বস্তিতে হাজারও নারী বাঁচার সংগ্রামে শামিল হতে ঋণ নিয়েছিলেন। কিন্তু এখন সেই ঋণ পরিশোধ করবেন কী করে সেই চিন্তাই তাদের তাড়া করছে। যদিও মানুষগুলোর এখনও কোনো ঠাঁই হয়নি।




সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত


ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: কমলেশ রায়, নির্বাহী সম্পাদক : শাহনেওয়াজ দুলাল, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড-এর পক্ষে
প্রকাশক গাজী আহমেদ উল্লাহ। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।

ফোন : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৭৫। ই-মেইল : [email protected]