ই-পেপার বিজ্ঞাপনের তালিকা সোমবার ২১ সেপ্টেম্বর ২০২০ ৬ আশ্বিন ১৪২৭
ই-পেপার সোমবার ২১ সেপ্টেম্বর ২০২০

বাদুড়, সাপ এবং নব্য করোনা ভাইরাস
সাইফুদ্দিন একরাম
প্রকাশ: শনিবার, ২৫ জানুয়ারি, ২০২০, ১২:০০ এএম | প্রিন্ট সংস্করণ  Count : 369

চীনের উহান শহরে ডিসেম্বর ২০১৯ থেকে নতুন এক করোনা ভাইরাসের প্রকোপ দেখা দিয়েছে। দিন দিন আক্রান্তের সংখ্যা বেড়ে চলছে। গত বছর ৩১ ডিসেম্বর এই শহরে নিউমোনিয়ার মতো একটি রোগ ছড়াতে দেখে প্রথম চীনের কর্তৃপক্ষ বিশ^ স্বাস্থ্য সংস্থাকে অবহিত করে। এরপর ১১ জানুয়ারি প্রথম একজনের মৃত্যু হয়। ঠিক কীভাবে করোনা ভাইরাস সংক্রমণ শুরু হয়েছিল তা এখনও বিশেষজ্ঞরা চিহ্নিত করতে পারেননি। এক দশক আগে যে ভাইরাস সংক্রমণের ফলে সৃষ্ট সার্সের কারণে পৃথিবীতে ৮০০ লোকের মৃত্যু হয়েছিল, সেটিও এক ধরনের করোনা ভাইরাস দিয়েই ঘটেছিল। সার্সে আক্রান্ত হয়েছিল ৮ হাজারের বেশি লোক। একই ধরনের আরেকটি ভাইরাসজনিত রোগ ছিল মার্স। ২০১২ সালে এতে মৃত্যু হয় ৮৫৮ জনের। বিশ^ স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুসারে ২১ জানুয়ারি ২০২০ পর্যন্ত : ক. সব মিলিয়ে ৩১৪ জন নিশ্চিতভাবে নব্য করোনা ভাইরাস দিয়ে আক্রান্ত হয়েছেন। খ. ৩১৪ জনের মধ্যে ৩০৯ জনই চীনের, দুজন থাইল্যান্ড, একজন জাপান এবং একজন কোরিয়ার নাগরিক। গ. থাইল্যান্ড, জাপান এবং কোরিয়ার রোগীরা চীনের উহান শহর থেকে ফেরার পরে আক্রান্ত হয়েছেন। ঘ. আক্রান্তদের মধ্যে ৫১ জন গুরুতর অসুস্থ এবং ১২ জন ক্রিটিকাল অবস্থায় ছিলেন। ঙ. উহান থেকে ছয়জনের মৃত্যুর খবর স্বীকার করা হয়েছে। চ. এ পর্যন্ত ১৬ জন স্বাস্থ্যকর্মী আক্রান্ত হয়েছেন।

কোথা থেকে এলো এই ভাইরাস?
করোনা ভাইরাস আমাদের অতি পরিচিত। ইলেকট্রন মাইক্রোস্কোপের নিচে করোনা ভাইরাসকে দেখতে মুকুট বা সৌর রশ্মির মতো মনে হয়। এ জন্য এর নাম করোনা ভাইরাস। এই ভাইরাস বাতাসের মাধ্যমে ছড়ায়। স্তন্যপায়ী প্রাণী এবং পাখিরা এর দ্বারা বেশি আক্রান্ত হয়। শীতকাল এবং বসন্তের শুরুর দিকে প্রতিবছরই কমবেশি যে সর্দি-কাশি হয়, তার কারণ এই অতি পরিচিত করোনা ভাইরাস। সমস্যা হচ্ছে মাঝে-মধ্যে করোনা ভাইরাসের চেহারা-চরিত্র বদলে যায়। সাধারণত অন্য কোনো প্রাণীর শরীর থেকে মিউটেশন হয়ে এই ভাইরাসটি মানুষের শরীরে ঢুকলে এটি মারাত্মক রূপ ধারণ করে। প্রথম থেকেই মনে করা হচ্ছিল এবারও ভাইরাসটি কোনো প্রাণীর শরীর থেকে এসেছে। এবারের ভাইরাসটির আরেক নাম দেওয়া হয়েছে ২০১৯-এনসিওভি। প্রশ্ন হচ্ছে কোন প্রাণী থেকে এলো? অনেক রকম করোনা ভাইরাসের সঙ্গে আমরা পরিচিত। কিন্তু এখন যেটির সংক্রমণ ঘটছে, তা নতুন। বিশেষজ্ঞদের ধারণা চীনের উহান বাজারের কোনো প্রাণীই এর উৎস ছিল। এসব প্রাণী থেকে প্রথমে ভাইরাসটি কোনো মানুষের দেহে ঢুকেছে, এবং তারপর মানুষ থেকে মানুষে ছড়িয়েছে।
অতীতের সার্স এবং মার্স দুটোই প্রাণীবাহিত ভাইরাস রোগ। এর অর্থ মানুষের শরীরে এ দুটো রোগ প্রথমে কোনো প্রাণী থেকে ঢুকেছিল। প্রমাণিত হয়েছে যে, এর আগে চীনে সার্স ভাইরাস প্রথমে বাদুড়ের শরীরে ছিল এবং পরে তা খট্টাশ বা গন্ধগোকুলের শরীরে প্রবেশ করে। সেখান থেকে এটা মানুষের দেহে ঢুকেছিল। মধ্যপ্রাচ্যের মার্স ভাইরাস উটের শরীর থেকে এসেছিল; অর্থাৎ বাদুড় থেকে উটের মাধ্যমে মানুষের শরীরে প্রবেশ করেছিল। ২০১৯ সালের করোনা ভাইরাস সংক্রমণের ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে উহানের আক্রান্ত সব রোগী একটি বাজারের দোকানদার অথবা ক্রেতা ছিলেন। ওই বাজারে সামুদ্রিক মাছ, মুরগি, ভেড়া, শূকর, শিয়াল, ইঁদুর, বাদুড়, সাপ এবং খরগোশসহ নানারকম বন্যপ্রাণী বিক্রি করা হয়। এ পর্যন্ত সামুদ্রিক কোনো জীব থেকে করোনা ভাইরাস সংক্রমণের নজির নেই। এ জন্য সবাই ওই বাজারের অন্যান্য প্রাণীদের বিষয়ে সন্দেহ প্রকাশ করছিল। ইতোমধ্যে উহান বাজারের বিভিন্ন প্রাণীর শরীর থেকে নমুনা সংগ্রহ করে করোনা ভাইরাস শনাক্ত করা হয়েছে এবং তাদের জেনেটিক কোড নির্ণয় করা হয়েছে। দেখা যাচ্ছে ২০১৯-এনসিওভির সঙ্গে চীনের বাদুড়ের সার্সজাতীয় করোনা ভাইরাসের গভীর মিল রয়েছে এবং এটা মানুষের শরীরে আক্রমণ করার সক্ষমতা অর্জন করেছে। এর জন্য দ্বিতীয় আরেকটি প্রাণীর সহায়তা দরকার।
বিজ্ঞানীরা সম্ভাব্য সব প্রাণীর শরীরের করোনা ভাইরাসের জেনেটিক কোড বিশ্লেষণ করে খুবই অবাক হয়েছেন।
কারণ এবারের করোনা ভাইরাসের প্রোটিন কোডের মিল পাওয়া যাচ্ছে সাপের শরীরে বাসকারী ভাইরাসের সঙ্গে। সাপ অনেক সময় বাদুড়কে শিকার করার চেষ্টা করে। বিজ্ঞানীদের ধারণা চীনে বাদুড় থেকে ভাইরাস সাপের শরীরে এসেছে। এমন সাপ উহান বাজারে বিক্রি করার সময় বিক্রেতা এবং ক্রেতাদের শরীরে তা প্রবেশ করেছে। দক্ষিণ-পূর্ব চীনে প্রধানত দুই ধরনের সাপ পাওয়া যায়Ñ বাঙ্গারুস মাল্টিসিঙ্কটাস বা কালাচ এবং নাজা আত্রা বা চীনা গোখরো। সাপের মাংস চীনের উহানের খাবারের বাজারে বিক্রি করা হয়। সেখান থেকেই সম্ভবত এই ভাইরাস মানুষের শরীরে চলে এসেছে। সাপের রক্ত শীতল, আর বাদুড়ের রক্ত উষ্ণ। করোনা ভাইরাস একই সময়ে শীতল এবং উষ্ণ রক্তবিশিষ্ট প্রাণীর শরীরে কীভাবে টিকে থাকল, সেটাই এখন রহস্য।
এ রহস্য ভেদ করার জন্য উহান বাজারের আরও সাপ এবং অন্যান্য প্রাণীর নমুনা পরীক্ষা করার দরকার ছিল। কিন্তু রোগের প্রাদুর্ভাব হওয়ার পর ওই বাজার বন্ধ করে দিয়ে ব্যাপক পরিচ্ছন্নতা অভিযান পরিচালিত হয়েছে; ফলে এখন আর অরিজিনাল নমুনা পাওয়ার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে।

কী কী লক্ষণ দেখা যায়?
বেশিরভাগ করোনা ভাইরাসই বিপজ্জনক নয়; কিন্তু এবারের অপরিচিত এই নতুন ভাইরাসটি দিয়ে সৃষ্ট নিউমোনিয়া দুনিয়া জোড়া মহামারীর দিকে ঠেলে দিতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। করোনা ভাইরাস সংক্রমণের প্রধান লক্ষণ হলো জ্বর, কাশি এবং শ^াসকষ্ট। কিন্তু এর পরিণামে নিউমোনিয়া, অরগ্যান ফেইলিওর বা দেহের বিভিন্ন প্রত্যঙ্গ বিকল হয়ে যাওয়া এবং মৃত্যু হতে পারে। ভাইরাসটি শরীরে ঢোকার পর সংক্রমণের লক্ষণ দেখা দিতে প্রায় পাঁচ দিন লাগে। প্রথম লক্ষণ হচ্ছে জ্বর। তারপর দেখা দেয় শুকনো কাশি। এক সপ্তাহের মধ্যে দেখা দেয় শ^াসকষ্ট এবং তখন কোনো কোনো রোগীকে হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়। এই ভাইরাস কত বিপজ্জনক সেটা একটা প্রশ্ন। এখন পর্যন্ত আক্রান্তদের দুই শতাংশ মারা গেছেন, হয়তো আরও মৃত্যু হতে পারে। তা ছাড়া এমন মৃত্যুও হয়ে থাকতে পারে যা চিহ্নিত হয়নি। তাই এ ভাইরাস ঠিক কতটা ভয়ঙ্কর তা এখনও স্পষ্ট নয়।

কত দ্রæত ছড়াতে পারে এই ভাইরাস?
নতুন কোনো করোনা ভাইরাস আবির্ভাব হলেই আমরা জানতে চাই এর ল²ণগুলো কতটা মারাত্মক? কত দ্রæত এটা ছড়াতে পারে? ডিসেম্বরে উহান শহরে প্রথম এ ভাইরাসটির অস্তিত্ব জানা গিয়েছিল এবং এ পর্যন্ত মারা গেছে ছয়জন। কিন্তু কর্তৃপক্ষের উদ্বেগের কারণ হলো সামনেই রয়েছে চান্দ্র নববর্ষ বা বসন্ত উৎসব।
নববর্ষ উপলক্ষে লাখ লাখ মানুষ বিশ^ জুড়ে ভ্রমণ করেন। চীনেই অন্তত ৪০ কোটি মানুষ এ সময় বিভিন্ন জায়গায় ভ্রমণ করবেন। ফলে নতুন এই ভাইরাসে অসংখ্য মানুষ আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকবে। দক্ষিণ কোরিয়া, জাপান ও থাইল্যান্ডেও এ নতুন ভাইরাসে আক্রান্ত হবার খবর নিশ্চিত করেছে। এক রিপোর্টে বলা হয়েছে যে, ইতোমধ্যে এক হাজার সাতশ মানুষ নতুন করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছে। বিজ্ঞানীদের ধারণা মানুষ থেকে মানুষে সংক্রমিত হওয়ার ঘটনা ঘটেছে।

আমাদের কি উদ্বিগ্ন হওয়া উচিত?
নতুন করে সংক্রমণের বিস্তারিত খবর না পাওয়া পর্যন্ত বলা কঠিন যে এ মুহূর্তে আমাদের কতটা উদ্বিগ্ন হওয়া উচিত। সার্সের বিষয়টা আমাদের মনে আছে। কিন্তু এখন যেকোনো দেশের এ ধরনের রোগের সঙ্গে লড়াই করার জন্য অনেক বেশি প্রস্তুতি রয়েছে। যেকোনো ভাইরাসই মানুষকে আক্রমণ করতে পারে। আর একবার মানুষের শরীরে প্রবেশ করতে পারলে তা বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে। ভাইরাসকে সে সুযোগ দেওয়া উচিত নয়।

এর কি কোনো চিকিৎসা আছে?
যেহেতু এই ভাইরাসটি নতুন, তাই এর কোনো টিকা বা ভ্যাকসিন এখনও নেই এবং এমন কোনো চিকিৎসা নেই যা এ রোগ ঠেকাতে পারে। আক্রান্ত ব্যক্তিকে অন্যান্য ভাইরাসজনিত রোগের মতোই পর্যাপ্ত বিশ্রাম, পানীয় এবং পুষ্টির ব্যবস্থা করতে হবে। রোগের তীব্রতা অধিক মনে হলে চিকিৎসকের পরামর্শ
নিতে হবে, প্রয়োজনে হাসপাতালের শরণাপন্ন হতে হবে।

এর হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার উপায় কী?
একমাত্র উপায় হলো, যারা ইতোমধ্যেই আক্রান্ত হয়েছে বা করোনা ভাইরাস বহন করছেÑ তাদের সংস্পর্শ এড়িয়ে চলা। হাত সবসময় পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে। হাত দিয়ে নাক বা মুখ ঘষবেন না, ঘরের বাইরে গেলে প্রয়োজনে উপযুক্ত মাস্ক বা মুখোশ পরতে হবে। অন্যকে সংক্রমিত করার ঝুঁকি পার হওয়া পর্যন্ত সংক্রমিত ব্যক্তিকে আলাদা করে রেখে চিকিৎসা দিতে হবে। ইতোমধ্যে উহান প্রদেশের সেই বাজার বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে এবং সেখানে পরিচ্ছন্নতা অভিযান চলছে। এক কোটিরও বেশি মানুষকে শহর থেকে অন্য
কোথাও যেতে বারণ করা হয়েছে।
মানুষজনকে অরক্ষিত প্রাণী থেকে সাবধানতার পাশাপাশি ডিম ও মাংস রান্না এবং ঠান্ডা বা ফ্লুতে আক্রান্ত ব্যক্তির সংস্পর্শে থাকার বিষয়ে সতর্ক করা হয়েছে। চীনা নববর্ষের সময় যারা ভ্রমণ করবেন তাদের শরীরের অতিরিক্ত তাপমাত্রা আছে কি না সেটি দেখা হবে। বিভিন্ন দেশে উহান থেকে আসা যাত্রীদের স্ক্রিনিং শুরু হয়েছে। চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের ভালো যোগাযোগ থাকায় ঢাকার আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরেও বিশেষ সতর্কতা নেওয়া হয়েছে। বিশ^ স্বাস্থ্য সংস্থা দুনিয়া জুড়ে এটি
ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা নিয়ে হাসপাতালগুলোকে সতর্ক করেছে।

অধ্যাপক, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক




সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত


ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: কমলেশ রায়, নির্বাহী সম্পাদক : শাহনেওয়াজ দুলাল, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড-এর পক্ষে
প্রকাশক গাজী আহমেদ উল্লাহ। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।

ফোন : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৭৫। ই-মেইল : [email protected]