ই-পেপার বিজ্ঞাপনের তালিকা সোমবার ২১ সেপ্টেম্বর ২০২০ ৫ আশ্বিন ১৪২৭
ই-পেপার সোমবার ২১ সেপ্টেম্বর ২০২০

সম্প্রীতির বন্ধনই অসাম্প্রদায়িক  বাংলাদেশের মূল ভিত্তি
তাপস হালদার
প্রকাশ: শনিবার, ২৫ জানুয়ারি, ২০২০, ১২:০০ এএম | প্রিন্ট সংস্করণ  Count : 334

হাজার বছর ধরে এই ভ‚খÐে জাতি ধর্ম বর্ণের মানুষ শান্তিপূর্ণভাবে বসবাস করে আসছে। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি এদেশের মানুষের সুমহান ঐতিহ্য। বিশে^ বাংলাদেশ সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির দেশ হিসেবে পরিচিত। বাংলাদেশের মানুষ ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের প্রতি সর্বদাই সহনশীল। বাংলাদেশের প্রত্যেক ধর্মের মানুষ স্ব-স্ব ধর্ম পালন করলেও উৎসবের আনন্দ সব ধর্মের মানুষ একসঙ্গে উদযাপন করে। প্রধানমন্ত্রী দেশরতœ শেখ হাসিনা যথার্থ বলেছেন, ধর্ম যার যার, উৎসব সবার।
এখনও বিশে^ বাংলাদেশ সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির অন্যতম উদাহরণ। বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে গভীর সংহতি ও জাতীয় ঐক্য ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে থাকবে। হিন্দু মুসলমান ঐক্যবদ্ধ হয়ে ব্রিটিশদের বিতাড়িত করেছে। ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধে মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টানসহ সব ধর্ম-বর্ণের মানুষ ঐক্যবদ্ধভাবে অংশগ্রহণ করেছিল, যা সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির অনন্য উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। সেজন্যই ১৯৭২ সালের সংবিধানে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশকে ধর্মনিরপেক্ষ দেশ হিসেবে ঘোষণা করেছিলেন। সেই থেকে বাংলাদেশ অসাম্প্রদায়িক ধর্মনিরপেক্ষ দেশ হিসেবে পথ চলতে শুরু করে। তাঁরই সুযোগ্য কন্যা দেশরতœ শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশ এখন সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির আদর্শ ভ‚মিতে পরিণত।
সম্প্রীতি বাংলাদেশের সঙ্গে প্রোগাম করতে গিয়ে দেখেছি, বাগেরহাটের পিসি কলেজে মসজিদ মন্দির পাশাপাশি তৈরি হয়েছে। তবে অবাক করার বিষয় হলোÑ মন্দির তৈরিতে অনেক মুসলিম ছাত্র শিক্ষক অবদান রেখেছেন। তাদের নাম খোদাই করা আছে। এটাই সম্প্রীতির বাংলাদেশ। জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের কবিতাÑ ‘গাহি সাম্যর গান’ সেøাগানকে ধারণ করে ২০১৮ সালের জুলাই মাসে আত্মপ্রকাশ করে ‘সম্প্রীতি বাংলাদেশ’ নামে একটি সামাজিক সংগঠন। মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ধারণ করে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ যারা স্ব-স্ব ক্ষেত্রে সমাজের নেতৃত্ব দিচ্ছেন এমন ব্যক্তিদের সমন্বয়ে পারস্পরিক সম্প্রীতি ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে প্রতিষ্ঠা করার লক্ষ্যে সংগঠনটির জন্ম হয়। বিশে^ সম্ভবত প্রথম
কোনো সংগঠন যেখানে সব ধর্ম-বর্ণের মানুষকে নিয়ে সংগঠনটি করা হয়েছে।
বর্তমান সময়ে সারা বিশ^ সন্ত্রাসবাদ ও জাতিগত দ্ব›েদ্ব অস্থির টালমাটাল। আমেরিকায় চলছে সাদা কালোর লড়াই, আরব দেশগুলোতে শিয়া সুন্নির লড়াই, ইউরোপের প্রতিটি দেশও রয়েছে সন্ত্রাসবাদের ঝুঁকিতে, জাতিগত দ্ব›েদ্ব মিয়ানমারে চলছে সংখ্যালঘু মুসলিম নিধন, ভারত পাকিস্তানে চলছে যুদ্ধের মহড়া। বাংলাদেশেও কয়েকটি উগ্রপন্থি ইসলামী সংগঠন রাজনৈতিক ফায়দা লাভের উদ্দেশ্যে মাঝেমধ্যে গুজব সৃষ্টি করে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর হামলার পরিবেশ তৈরি করে। প্রধানমন্ত্রী দেশরতœ শেখ হাসিনা তার পিতার মতোই অসাম্প্রদায়িক চেতনা ধারণ করে বিধায় তিনি সন্ত্রাসবাদ ও সাম্প্রদায়িকতাকে কঠেরহস্তে দমন করেন। সে জন্য উগ্র সন্ত্রাসবাদ মাথা তুলে দাঁড়াতে পারে না, কিন্তু ঝুঁকিতে নেই সে কথা বলা যাবে না। এমতাবস্থায় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনার হাতকে শক্তিশালী করতে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় সমাজের সব ধর্ম-বর্ণের মানুষের সমন্বয়ে একটি শক্তিশালী প্লাটফরমের খুব প্রয়োজন। বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক জগতের অন্যতম পুরোধা, সর্বজন শ্রদ্ধেয় বরেণ্য নাট্যব্যক্তিত্ব পীযূষ বন্দ্যোপাধ্যায় ও বাংলাদেশের প্রখ্যাত চিকিৎসক, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ^বিদ্যালয়ের অধ্যাপক ডা. মামুন আল মাহতাবের নেতৃত্বে প্রগতিশীল ব্যক্তিদের নিয়ে গঠিত হয় সম্প্রীতি বাংলাদেশ। যার মূল উদ্দেশ্যÑ বাংলাদেশ হবে একটি অসাম্প্রদায়িক মুক্তিযুদ্ধের চেতনাভিত্তিক রাষ্ট্র।
মধ্যযুগের কবি চÐীদাস বলেছেনÑ সবার ওপর মানুষ সত্য, তাহার ওপরে নাই। মানুষকে মানুষ হিসেবে বিবেচনা না করে ধর্ম-বর্ণ-জাতি দিয়ে পার্থক্য করে দেখার নামই সাম্প্রদায়িকতা। ধর্ম ও সাম্প্রদায়িকতা এক নয়। পৃথিবীর সব ধর্মের মূল কথা প্রেম, মৈত্রী, শান্তি ও সম্প্রীতি। অথচ এই উপমহাদেশেও বিভিন্ন শাসকরা রাজনৈতিক কারণে ধর্মকে ব্যবহার করেছেন। ব্রিটিশরা তাদের ক্ষমতাকে ধরে রাখতে হিন্দু মুসলমানের মধ্যে বিরোধ বাধিয়ে রাখত। ১৯২২ থেকে ১৯৪৬ সাল পর্যন্ত এ অঞ্চলে অসংখ্য দাঙ্গা হয়েছে, নিহত হয়েছে হাজার হাজার নিরপরাধ মানুষ। যার ফলে ধর্মের ভিত্তিতে ভারত পাকিস্তান দুটি রাষ্টের জন্ম হয়। পাকিস্তান আমলেও সংখ্যালঘু নির্যাতনের ধারা অব্যাহত থাকে। ১৯৭১ সালে সার্বজনীন মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে পাকিস্তানি শাসনের অবসান ঘটিয়ে জন্ম নেয় স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ। মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টানসহ সব সম্প্রদায়ের মানুষ সমন্বিতভাবে যুদ্ধ করে দেশ স্বাধীন করে। আমরা পেয়েছিলাম ধর্মনিরপেক্ষ সংবিধান। বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, আর সাম্প্রদায়িকতা যেন মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে না পারে। ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র হবে বাংলাদেশ। মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান যার যার ধর্ম পালন করবে। কেউ কাউকে বাধা দিতে পারবে না। অথচ বঙ্গবন্ধু হত্যাকাÐের পর দুই সামরিক শাসকই রাষ্ট্রের অসাম্প্রদায়িক চরিত্রকে নষ্ট করে সাম্প্রদায়িকতার বীজ বপন করে। আবার বাংলাদেশে বিভক্তির রাজনীতির শুরু হয়। ২০০১ সালে
বিএনপি-জামায়াত ক্ষমতায় এসে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা চালায়। এখনও তাদের প্রেতাত্মারা বিভিন্ন ইস্যু তৈরি করে সাম্প্রদায়িক উসকানি দেয়। রামুতে বৌদ্ধ মন্দিরে হামলা, নাসিরনগরে হিন্দু পল্লীতে হামলা, পাবনার সাথিয়ায় হামলা, নওগাঁয় সাঁওতাল কৃষকদের হত্যা অন্যতম।
এক্ষেত্রে বর্তমান সরকারের দৃঢ় পদক্ষেপে এসব দ্রæত দমন করা হয়েছে।
এদেশের সাধারণ মানুষ ধর্মভীরু হলেও উগ্রপন্থি নয়। বিছিন্নভাবে যেসব অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটছে তা অনেক সময় রাজনৈতিক আবার কখনও ব্যক্তিস্বার্থ হাসিলের উদ্দেশ্যেই করা হয়েছে। এর সঙ্গে সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ ছিল না বরং একে অপরের সহযোগিতায় এগিয়ে এসেছে এ রকম উদাহরণ অনেক আছে। অতি সাম্প্রতিককালে ভোলার বোরহানউদ্দিনের ঘটনায় চট্টগ্রামের হাটহাজারীর মাদ্রাসার মসজিদের পাশেই শ্রীশ্রী সীতা কালীমন্দিরে কয়েকজন
দুষ্কৃতকারী ইট-পাটকেল ছুড়ে মারছিল তখন মাদ্রাসার ছাত্ররাই তাদেরকে রুখে দিয়ে মন্দিরের চারদিকে মানবপ্রাচীর করে দাঁড়িয়ে ছিল। সুপ্রাচীনকাল থেকে মুসলিম হিন্দুর মিলিত সংস্কৃতিই বাঙালি সংস্কৃতি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত। এখানে যেমন আজানের ধ্বনিতে ভোরে মানুষের ঘুম ভাঙে, তেমনি সূর্যাস্তের সময় উলুধ্বনি ও শঙ্খধ্বনি শোনা যায়।
সম্প্রীতি বাংলাদেশ সংগঠনটি দেশব্যাপী সম্প্রীতির বার্তা নিয়ে কাজ করে যাচ্ছে। সংগঠনের জেলা সফরে কয়েকটি জায়গায় আমার যাওয়ার সুযোগ হয়েছে, সেখানে বিভিন্ন ধর্মের প্রতিনিধি, রাজনৈতিক দলের নেতা, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিরা, পেশাজীবীরা, সরকারি কর্মকর্তাসহ সাধারণ মানুষের সঙ্গে কথা বলা ও তাদের বক্তব্য শোনার সুযোগ হয়েছে। বিশেষ করে ধর্মীয় প্রতিনিধিদের বক্তব্যগুলো অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে হয়েছে। আমার ক্ষুদ্র জ্ঞানে মনে হয়েছে যারা ধর্ম সম্পর্কে বেশি জানে তারা তত বেশি অসাম্প্রদায়িক। প্রত্যেক ধর্মের মূল কথাই হলো শান্তি। পরস্পরকে শ্রদ্ধা করা। ধর্মীয় প্রতিনিধিরা অত্যন্ত সুন্দরভাবে ধর্মের ব্যাখ্যা করছেন।
সাধারণ মানুষ মোটেও সাম্প্রদায়িক নয়। তাদের বক্তব্য থেকে একটি বিষয় বেরিয়ে এসেছে যে, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্ট করার জন্য যেগুলো ঘটনা ঘটছে তার মূলে রয়েছে রাজনৈতিক অথবা ব্যক্তিগত স্বার্থ হাসিলের অপচেষ্টা। এ ধরনের অপচেষ্টা রুখতে সম্প্রীতি বাংলাদেশের ‘সম্প্রীতি সংলাপ’ গুরুত্বপূর্ণ ভ‚মিকা রাখবে।
প্রধানমন্ত্রী দেশরতœ শেখ হাসিনা বাংলাদেশকে একটি উন্নত রাষ্ট্রের মর্যদায় নিয়ে যাচ্ছেন। সে জন্য দেশের প্রতিটি মানুষের মধ্যে সম্প্রীতি ও সৌহার্দ্য প্রয়োজন। বিশ^ যখন আজ সাম্প্রদায়িকতার বিষফোঁড়ায় আক্রান্ত, এমন একটি সময় আশার আলো নিয়ে কাজ করে যাচ্ছে সম্প্রীতি বাংলাদেশ। সম্প্রীতি বাংলাদেশ সেই বার্তাটি নিয়েই সারা দেশে কাজ করে যাচ্ছে। যদি সম্প্রীতির বন্ধনটা দৃঢ় হয় তাহলেই অসাম্প্রদায়িক মানবিক বাংলাদেশ গড়ে উঠবে।

সদস্য, সম্প্রীতি বাংলাদেশ ও সাবেক ছাত্রনেতা




সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত


ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: কমলেশ রায়, নির্বাহী সম্পাদক : শাহনেওয়াজ দুলাল, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড-এর পক্ষে
প্রকাশক গাজী আহমেদ উল্লাহ। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।

ফোন : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৭৫। ই-মেইল : [email protected]