ই-পেপার বিজ্ঞাপনের তালিকা  বুধবার ২৮ অক্টোবর ২০২০ ১২ কার্তিক ১৪২৭
ই-পেপার  বুধবার ২৮ অক্টোবর ২০২০

জলবায়ু পরিবর্তন : আমরা লোভী ও মূর্খ
শহিদুল ইসলাম
প্রকাশ: রোববার, ২৬ জানুয়ারি, ২০২০, ১২:০০ এএম | প্রিন্ট সংস্করণ  Count : 53

৩ এপ্রিল ২০১৯ তারিখে ‘দ্য ইনটেলেকচুয়াল’ পত্রিকায় জন জাম্বিস আমাদের জানান যে, স্টিফেন হকিং বিবিসিতে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, ‘জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য মানুষের লোভ এবং মূর্খতা দায়ী।’ গত বছর তিনি ল্যাবি কিংসকে বলেছিলেন, ‘নিশ্চিতভাবে বলা যায় না যে, আমাদের লোভ কমেছে কিংবা আমাদের মূর্খতা কমেছে।’ এটা সত্য যে জলবায়ু পরিবর্তনই বর্তমান বিশে^র প্রধান আলোচ্য বিষয় এবং এই পরিবর্তন ঠেকাতে বিশে^ সবচেয়ে বেশি অর্থ খরচ করা হচ্ছে। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের ধরন যে দিন দিন বাড়ছে, এটা আজ আর কেউ অস্বীকার করতে পারছেন না। তা ছাড়া জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে অর্থনীতির সম্পর্ক এত নিবিড় যে বিশে^র সবচেয়ে বড় গ্যাস-তেল-কয়লা কোম্পানি কোটি কোটি ডলার খরচ করে প্রমাণ করতে চাইছে যে জলবায়ু পরিবর্তন এমন কিছু ক্ষতির কারণ নয়। তার জন্য বিশে^র বড় বড় বিশ^বিদ্যালয়ের প্রফেসরদের নিয়োগ করেছে। যে ৫টি কোম্পানি বছরে ২০০ মিলিয়ন পাউন্ড খরচ করছে, সেগুলো হলো বিপি শেল, অ্যাকশন, মোবিল ও শেভরন। (নীল ম্যাকার্থি, ফোর্বস, ২৫ মে, ২০১৯)। এরা ২০১৫ সালের প্যারিস চুক্তি মানতে রাজি নয়। পৃথিবী গোল্লায় যাক, তাদের কাছে সম্পদটাই বড়। পুঁজিবাদী অর্থনীতি যে বৈশি^ক জীবনযাত্রা পাল্টিয়ে দিয়েছে, সে সম্পর্কে কোনো সন্দেহ নেই। একসময় রান্নাঘর নামে যে কক্ষটির গুরুত্ব ছিল সবচেয়ে বেশি এখন আর তা নেই। মানুষ আজ বাইরের হোটেল বা রেস্টুরেন্টে খেতে পছন্দ করে বা অর্থনীতি তাদের বাধ্য করে। তাই আনাচে-কানাচে অলিতে-গলিতে আজ নানা স্তরের হোটেল রেস্টুরেন্টের অস্তিত্বই তার প্রমাণ। ফুড ইন্ডাস্ট্রি ও তরল পানীয় আজ বিশে^র অন্যতম প্রধান শিল্পে পরিণত হয়েছে। বিশে^র মাত্র দশটি ফুড ইন্ডাস্ট্রি আমাদের খাদ্য পছন্দ করার অধিকার কিনে নিয়েছে। তাদের বাইরে আমরা চিন্তাই করতে পারি না। সে দশটি হলোÑ নেসলে, পেপসিকো, কোকা-কোলা, ইউনিলিভার, ড্যানোন, জেনারেল মিলস, কেলোপস, মারস অ্যাসোসিয়েটেড, ব্রিটিশ ফুড ও মোনডেলেজ। সারা বিশে^ এরা লক্ষ কোটি মানুষ নিয়োগ করেছে এবং বছরে হাজার হাজার কোটি ডলার আয় করছে। কোন কোম্পানি বছরে কত আয় করছে তাও উল্লেখ করা হয়েছে। এরা কীভাবে বাজার দখল করেছে এবং বিলিয়নস ডলার আয় করছে, সে সম্পর্কে তারা কখনও জনসম্মুখে কোনো হিসেব প্রদান করে না। তাদের মধ্যে চিঠি চালাচালি থেকে এই হিসাবটা বের করেছে অকসদাম। (কেট লাইলার, ইনডিপেন্ডেন্ট, ৪ এপ্রিল ২০১৭)।
মৃত্যুর কিছুদিন আগে বিবিসিতে দেওয়া ওই সাক্ষাৎকারে স্টিফেন হকিং বলেছিলেন, ‘আমরা এমন এক স্থানে পৌঁছেছি যে, পৃথিবীর উষ্ণতা বৃদ্ধির গতি কমানো বা বিপরীতমুখী করা যাবে না। তা সময়ের মতো ভবিষ্যৎমুখী। ট্রাম্পের সিদ্ধান্ত পৃথিবীকে ধ্বংসের কিনারায় নিয়ে এসেছে সেখানে শুক্র গ্রহের মতো পৃথিবীর তাপমাত্রা ২৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছাতে পারে এবং সালকিউরিক অ্যাসিড বৃষ্টি হতে পারে।’ উল্লেখ্য, ট্রাম্প প্যারিস সিদ্ধান্ত থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে বের করে এনেছে, যদিও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সবচেয়ে বেশি গ্রিনহাউস গ্যাস উদগীরণ করছে। আরও উল্লেখযোগ্য যে, ৬ কোটি বছর ডাইনোসর পৃথিবী শাসন করার পর উল্কাপাতের ফলে সৃষ্ট সালফিউরিক অ্যাসিড বৃষ্টির কারনে নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। ওই সাক্ষাৎকারে হকিং বলেন, ‘জলবায়ু পরিবর্তন মানুষের সামনে আজ ভয়াবহতম বিপদ এবং আমরা যদি তা ঠেকাতে এখনই সক্রিয় হই, তাহলে তা ঠেকানো সম্ভব।’ তিনি বলেন, ‘মানুষ এত দ্রুত প্রাকৃতিক সম্পদ ধ্বংস করছে যে, প্রকৃতি বা প্রযুক্তি তা পূরণ করতে পারবে না।’ তাদের শেষ সাক্ষাৎকারের ৬ বছর পর মানুষের সংখ্যা বেড়েছে ৫০ কোটি (১/২ বিলিয়ন)। এই বৃদ্ধির হার কমার কোনো সম্ভাবনা দেখা যায় না। এই গতিতে মানুষের সংখ্যা বাড়লে একশ শতকের মধ্যে পৃথিবীর জনসংখ্যা দাঁড়াবে ১ হাজার ১০০ বিলিয়ন। হকিং মানুষকে একটি ধ্বংসকামী ও স্বার্থপর প্রাণী বলে মনে করেন। তিনি সন্দেহ প্রকাশ করেন যে, এই সহজাত চরিত্রের জন্য মানুষ কখনও জলবায়ু পরিবর্তন রোধকল্পে তেমন কোনো কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করবে বলে তিনি মনে করেন না। সেই সাক্ষাৎকারে স্টিফিনে হকিং আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেছিলেন, ‘আমি ভয় করি যে ক্রমবিকাশের ফলেই মানুষের মধ্যে লোভ এবং আক্রমণের ‘জিন’ অনুপ্রবেশ করেছে। সংঘর্ষ বন্ধ হওয়ার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না বরং যুদ্ধাস্ত্র তৈরির প্রযুক্তির প্রতিযোগিতায় তার উন্নয়ন ঘটছে দ্রুততর গতিতে। সার্বিক ধ্বংসাত্মক মারণাস্ত্র তৈরি আমাদের ক্রমশ দ্রুততর গতিতে ধ্বংসের দিকে নিয়ে চলেছে।’
দুই.
কেউ আজ জলবায়ু পরিবর্তনের বিপদ অস্বীকার করতে পারে না। ২০১৯ সালের কয়েকটি ধ্বংসাত্মক বুশফায়ার, সুনামি ও জলোচ্ছ্বাস এবং মেরু প্রদেশের হিমবাহ ও হিমাচল পাহাড়ের চূড়ায় বরফ গলার গতি আমরা দেখেছি। অস্ট্রেলিয়ায় চার মাসব্যাপী বুশফায়ারের মাঝে সাম্প্রতিক বৃষ্টির কারণে আপাতত স্বস্তির আবহাওয়া তৈরি করেছে। মানুষ ইতোমধ্যে ভাবতে শুরু করেছে, ‘যাক, বাঁচা গেল।’ আসলে কি বাঁচা গেল? পৃথিবীর তাপমাত্রা বিশ শতকে এক ডিগ্রি বৃদ্ধি পেয়েছে। আগামী খরায় কী হার হবে, তা নিয়ে কি আমরা চিন্তা করছি? ৭২ বয়সি টম রিয়ার ১৯৮০ সালে বুশফায়ার নিয়ে সর্বপ্রথম গবেষণা করেন এবং ১৯৮৮ সালে ঞবংঃৎধষরধহ ইঁড়যলরঁ উধঁমবৎব ঁহফবৎ ঈযধহমরহম ঈষরসধঃব জবমরড়হং নামে একটি প্রবন্ধ প্রকাশ করেন। সেখানে টম রিয়ার জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে বুশফায়ারের সম্পর্কটি সুন্দরভাবে তুলে ধরেন। সাবধান বাণী উচ্চারণ করেন। তার আগে ১৯৮৭ সালে তিনি প্রবন্ধটি ৫০টি সেমিনারে পাঠ করেন এবং ৭৪৫ পৃষ্ঠার একটি বই প্রকাশ করেন। মিডিয়াতে বহুবার তিনি তার সাবধান বাণী প্রকাশ করেন। এমনকি সুদূর আমেরিকার বুশফায়ার বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন। কিন্তু তিনি হতাশ হন। কেউ তার কথা বিশ^াস করেনি। কারণ তার সাবধান বাণী প্রকাশের পর ১০ বছর তেমন মারাত্মক বড় বুশফায়ার ঘটেনি। ফলে তার কথা সবাই ভুলে গিয়েছিল। আজ হাজার হাজার মানুষ বুশফায়ারের আক্রমণ ঠেকাতে দিন-রাত অমানবিক পরিশ্রম করে যাচ্ছেন। রিয়ার হতাশ হয়ে বলেন, ‘আমি কী করতে পারি?’ (১৬ নভেম্বর, ২০১৯)। এনভারমেন্ট অ্যান্ড হেলথ পত্রিকায় ২০১৯ সালের ১৮ নভেম্বর রবার্ট আর রাইমন্ড লিখছেন, ‘পুঁজিবাদ, প্রকৃতি এবং পৃথিবীর ভবিষ্যৎ’। সেখানে তিনি সুস্পষ্টভাবে বলেন যে, পুঁজিবাদই পৃথিবীকে ধ্বংস করছে। জান্টিন ম্যাক ব্রাইন ১৪ সেপ্টেম্বর ২০১৯ তারিখে লিখেছেন, ‘এটা শুধু নিশ্চিহ্ন হওয়া নয়Ñ বরং প্রথম পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড। আমরা আজ যা দেখছি তা কেবল অসার ভৌগোলিক ঘটনা নয়। পুঁজিবাদী হত্যাকাণ্ড।’ সি পি পলিক্রনিও বলেন, ‘জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের জন্য আমাদের বাস্তুসংস্থানের গণতন্ত্র দরকার।’ (১১ সেপ্টেম্বর, ২০১৯)। তিনি আরও বলেন, ‘ক্ষমতার যে বৈষম্য এই জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য দায়ী, আমাদের প্রথমে সেই ক্ষমতা কাঠামোর বিরুদ্ধে লড়াই করা দরকার।’ কিন্তু কিছু মানুষ তাদের চোখের সামনে ঘটে যাওয়া জলবায়ু পরিবর্তনে বিশ^াস করেন না। কেন? তা নিয়ে বড় একটি প্রবন্ধ লিখেছেন ডেভিড হল গত ১১ অক্টোবরে। তিনি মূল্যবোধের সঙ্গে বাস্তবের সংঘাত হিসেবে দেখছেন। পুঁজিবাদী মূল্যবোধের সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনের দ্বন্দ্বের কারণে তারা জলবায়ু পরিবর্তনে বিশ^াস করেন না। জলবায়ু পরিবর্তন একটি ‘অনুপযোগী সত্য’। যার মধ্যে আমরা বাস করছি এবং সর্বদা তার সঙ্গে সংঘাতে জড়িয়ে পড়ছি, আমরা সেই সত্যকে অস্বীকার করছি। আজ উন্নত বিশে^ সবচেয়ে বেশি গবেষণা হচ্ছে জলবায়ু পরিবর্তনের ওপর। প্রতিদিন তার ওপর বড় বড় গবেষণাপত্র পাওয়া যাচ্ছে। এ নিয়ে লিখতে গেলে কোনো কাগজে তার ঠাঁই হবে না। তাই আমি সর্বশেষ ১৩ জানুয়ারি, ২০২০ প্যাট্রিক গ্রিশফিল্ডের একটি লেখার প্রতি পাঠকের দৃষ্টি আকর্ষণ করে লেখাটি শেষ করব। আগামী অক্টোবরে জাতিসংঘের জলবায়ু সম্মেলনে যে প্রস্তাবটি পাস হতে যাচ্ছে, তা নিয়ে লেখক লিখেছেন, ‘ব্যান্ড ফাউন্ডেশনে’। লেখাটির নাম ঞযব অমব ড়ভ ঊীঃরঁমঃরড়হ : টহ ফৎধভঃ ঢ়ষধহ ংবঃং ২০৩০ ঃধৎমবঃ ঃড় ধাবৎঃ ঊধৎঃয’ং ংরীঃয সধংং বীঃরহমঃরড়হ. বিশে^র উন্নত ও উন্নতশীল দেশের বহু বড় বড় বিজ্ঞানীরা ওই প্রস্তাবটি তৈরি করতে সাহায্য করেছেন। অক্টোবর পর্যন্ত তার ওপর আরও ঘষামাজা হবে। তবে রিপোর্টের প্রথমেই তারা বলছেন যে, বর্তমান দশকের শেষে পৃথিবীর এক-তৃতীয়াংশ সাগর ও জমি বাঁচাতে হলে আমাদের উদ্ভিদ বৈচিত্র্যকে বাঁচাতে হবে এবং তার গতি বিপরীতমুখী করতে হবে। তা না হলে মানবজাতির ধ্বংস অনিবার্য। ২০১০ সালে জাপানের আইচিতে যে সিদ্ধান্ত গ্রহীত হয়েছিল তা বাস্তবায়ন করতে বিশে^র প্রায় সব দেশই ব্যর্থ হয়েছে। বিশে^র ৩০ শতাংশ বাঁচাতে তারা বিশটি করণীয় কাজের একটি লিস্ট তৈরি করেছেন। অনেকটা প্যারিস চুক্তির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। উদ্দেশ্য আক্রমণকারী প্রজাতির নিয়ন্ত্রণ, প্লাস্টিক বর্জ থেকে
প্রকৃতিকে রক্ষা এবং অত্যধিক পুষ্টিকর খাদ্য ৫০ শতাংশ কমিয়ে আনা। বিশে^র জলবায়ু পরিবর্তন বন্ধে সক্রিয় গোষ্ঠীগুলো রিপোর্টটি সমর্থন করেছে এবং সব দেশের সরকারকে তা কার্যকর করার আহ্বান জানিয়েছে। গত মে মাসে বিশে^র প্রধান বিজ্ঞানীরা সাবধান বাণী উচ্চারণ করে বলেছেন, ‘মানুষ
প্রকৃতির ক্ষতিসাধন করে চলেছে। গত ১ কোটি বছরের গড় গতির চাইতেও আজকের পরিবর্তন আরও বেশি দ্রুততর। তার জন্য মানুষের কর্মতৎপরতা দায়ী।’
তিন.
আবারও স্টিফেন হকিংয়ের কথাটি উচ্চারণ করে লেখাটির সমাপ্তি টানি। ‘জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য মানুষের লোভ এবং মূর্খতাই দায়ী।’

ষ শিক্ষাবিদ, সাবেক অধ্যাপক
    রাজশাহী বিশ^বিদ্যালয়











সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত


ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: কমলেশ রায়, নির্বাহী সম্পাদক : শাহনেওয়াজ দুলাল, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড-এর পক্ষে
প্রকাশক গাজী আহমেদ উল্লাহ। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।

ফোন : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৭৫। ই-মেইল : [email protected]