ই-পেপার বিজ্ঞাপনের তালিকা শুক্রবার ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২০ ৮ ফাল্গুন ১৪২৬
ই-পেপার শুক্রবার ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২০

টেকসই উন্নয়নের জন্য প্রয়োজন উদ্যোক্তা উন্নয়ন
এম এ খালেক
প্রকাশ: রোববার, ২৬ জানুয়ারি, ২০২০, ১২:০০ এএম | প্রিন্ট সংস্করণ  Count : 15

বাংলাদেশ সাম্প্রতিক সময়ে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে চমৎকার উন্নতি সাধন করেছে। বাংলাদেশের অর্জিত অর্থনৈতিক উন্নয়ন বিশ^ব্যাপী বিস্ময়ের সৃষ্টি করেছে। বিশেষ করে স্বল্পোন্নত অনেক দেশ এখন বাংলাদেশকে তাদের উন্নয়নের ‘রোল মডেল’ হিসেবে গ্রহণ করেছে। এটা আমাদের জন্য অত্যন্ত গর্বের ব্যাপার। কিন্তু বাংলাদেশের এই অর্থনৈতিক উন্নয়ন কতটা টেকসই এবং স্থিতিশীল তা নিয়ে অনেকেই প্রশ্ন উত্থাপন করতে শুরু করেছেন। উল্লেখ্য, শুধু অর্থনৈতিক উন্নয়ন সাধন করাটাই শেষ কথা নয় সেই উন্নয়ন কীভাবে টেকসই এবং স্থিতিশীল করা যায় সেটাও বিবেচ্য বিষয় বটে। অধিকন্তু উন্নয়নে সুফল সাধারণ মানুষের ন্যায্যতার ভিত্তিতে ভোগ করতে পারছে কি না সেটাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
পরিবারের একজন কাজ করবে আর তার সুফল সবাই বসে বসে ভোগ করবেÑ সেই দিন গত হয়েছে অনেক আগেই। এখন মনে করা হয়, একটি পরিবারের সদস্যদের প্রতিটি হাতই কর্মীর হাতিয়ারে পরিণত হবে। এটা করতে হলে কারিগরি শিক্ষা বিস্তারের মাধ্যমে প্রতিটি হাতকে কর্মীর হাতিয়ারে পরিণত করা ব্যতীত কোনো গত্যন্তর নেই। ইতোমধ্যেই বিশ^ব্যাংকের রেটিংয়ে বাংলাদেশ
নিম্ন মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হয়েছে। জাতিসংঘ বাংলাদেশকে প্রাথমিকভাবে উন্নয়নশীল দেশের তালিকায়
স্থান দিয়েছে।
২০২৪ সালে বাংলাদেশ চূড়ান্তভাবে উন্নয়নশীল দেশের কাতারে উঠে আসবে। এই অবস্থায় আমাদের টেকসই উন্নয়নের ধারা অব্যাহত রাখতে হবে। এটা করতে হলে উদ্যোক্তা উন্নয়নের কোনো বিকল্প নেই। আমাদের দেশে উদ্যোক্তা উন্নয়নের বিষয়টি আগে খুব একটা গুরুত্ব পায়নি। বর্তমান সরকার উদ্যোক্তা উন্নয়নের জন্য নানাভাবে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। এই মুহূর্তে বাংলাদেশে ৪ কোটিরও বেশি ছাত্রছাত্রী রয়েছে। যেখানে কানাডার মতো দেশের মোট জনসংখ্যাই হচ্ছে ৩ কোটি ৬৪ লাখ। অর্থাৎ কানাডার মোট জনসংখ্যার চেয়ে আমাদের দেশের তরুণ জনগোষ্ঠীর সংখ্যা বেশি। প্রত্যেকটি তরুণ-তরুণীকে উদ্যোক্তায় পরিণত করা ছাড়া আমাদের সামনে আর কোনো বিকল্প নেই।
উদ্যোক্তা উন্নয়ন করতে হলে আমাদের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা এবং কার্যক্রম গ্রহণ করতে হবে। বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার দুই-তৃতীয়াংশই কর্মক্ষম অর্থাৎ তাদের বয়সসীমা ১৫ হতে ৬০ বছরের মধ্যে। এই অবস্থাকে ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড বলে। অর্থনীতিবিদরা মনে করেন, একটি জাতির জীবনে একবারই আসে। যারা সেই অবস্থার সুযোগ পরিপূর্ণভাবে কাজে লাগাতে পারে তারাই বিশ^ অর্থনীতিতে সফল হতে পারে। যারা ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড অবস্থার সুফল কাজে লাগাতে ব্যর্থ হয় তারা কখনই অর্থনৈতিক উন্নয়নের শিখরে উপনীত হতে পারে না। ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড অবস্থার সুফল পরিকল্পিতভাবে কাজে লাগাতে হলে আমাদের কারিগরি শিক্ষার ব্যাপক বিস্তার ঘটাতে হবে।
বর্তমানে বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান সামাজিক সমস্যা হচ্ছে ব্যাপক মাত্রার বেকারত্ব। কোনোভাবেই আমরা বেকারত্বের হাত থেকে মুক্তি পাচ্ছি না। উল্লেখ্য, শুধু রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে চাকরির মাধ্যমে বেকার সমস্যা রোধ করা যাবে না। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বারবার বলেছেন, সরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি দিয়ে বেকার সমস্যা দূর করা যাবে না। তাই আমাদের আত্মকর্মসংস্থানের ওপর জোর দিতে হবে। প্রত্যেকের একটি লক্ষ্য থাকতে হবেÑ আমরা চাকরি প্রত্যাশী হব না, আমরা চাকরিদাতা হব। প্রত্যেকটি তরুণ-তরুণীকে উদ্যোক্তায় পরিণত করা ছাড়া আমাদের সামনে আর কোনো বিকল্প নেই। উদ্যোক্তা উন্নয়ন করতে হলে আমাদের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা এবং কার্যক্রম গ্রহণ করতে হবে। দেশের সত্যিকার এবং টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য উদ্যোক্তা উন্নয়নের কোনো বিকল্প নেই। এ জন্য উদ্যোক্তাদের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার আওতায় নিয়ে আসতে হবে। এটা সত্যি যে, কিছু কিছু ভুইফোঁড় প্রতিষ্ঠান আছে যারা উদ্যোক্তা উন্নয়নের নামে স্বল্পকালীন প্রশিক্ষণ দিয়ে থাকে। আমি দৃঢ়ভাবে বলতে চাই স্বল্পকালীন প্রশিক্ষণদানের মাধ্যমে কখনই সত্যিকার উদ্যোক্তা উন্নয়ন সম্ভব নয়। একজন উদ্যোক্তা গড়ে তুলতে হলে অবশ্যই দীর্ঘমেয়াদি প্রশিক্ষণের প্রয়োজন রয়েছে। উদ্যোক্তা উন্নয়নে কোনো সর্টকাট ব্যবস্থা নেই। আমরা যদি আমাদের প্রতিটি কর্মক্ষম মানুষের জন্য উপযুক্ত কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে না পারি তাহলে অর্জিত অর্থনৈতিক সাফল্য ধরে রাখা সম্ভব হবে না। বাংলাদেশ ২০২৪ সালে চূড়ান্তভাবে উন্নয়নশীল দেশের তালিকায় উন্নীত হবে। কিন্তু উন্নয়নশীল দেশের তালিকায় উঠে আসাটাই শেষ কথা নয়। সেই অর্জনকে টেকসই করাটাও বিবেচ্য বিষয় বটে। উল্লেখ্য, দ্বিতীয় বিশ^যুদ্ধের পর থেকে এ পর্যন্ত মাত্র ৫টি দেশ স্বল্পোন্নত দেশের কাতার থেকে টেকসইভাবে উন্নয়নশীল দেশের মর্যাদা লাভ করতে সমর্থ হয়েছে। কয়েকটি দেশ উন্নয়নশীল দেশের প্রাথমিক মর্যাদা লাভ করলেও শেষ পর্যন্ত তারা সেই অর্জনকে ধরে রাখতে পারেনি। এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ হচ্ছে নেপাল।
নেপাল কয়েক বছর আগে উন্নয়নশীল দেশের মর্যাদা লাভ করলেও প্রাকৃতিক দুর্যোগের অভিঘাত সহ্য করার মতো সামর্থ্য অর্জনে ব্যর্থতার কারণে তারা আবারও স্বল্পোন্নত দেশের তালিকায় স্থান করে নিয়েছে। তাই বাংলাদেশ উন্নয়নশীল দেশের মর্যাদা লাভ করতে যাচ্ছে সেটাই শেষ বিবেচ্য নয়। সেই অর্জনকে ধরে রাখার নিরন্তর চেষ্টাই হবে আমাদের আগামীর চ্যালেঞ্জ।
আমরা যদি সম্ভাব্য উন্নয়নশীল দেশের মর্যাদা ধরে রাখতে বা টেকসই করতে চাই তাহলে প্রতিটি কর্মীকে উপযুক্ত প্রশিক্ষণদানের মাধ্যমে উদ্যোক্তায় পরিণত করতে হবে। কিন্তু বাংলাদেশে কারিগরি শিক্ষার হার বিশে^র অন্যান্য দেশের তুলনায় খুবই কম। বাংলাদেশে বর্তমানে কারিগরি শিক্ষায় শিক্ষিত জনগোষ্ঠীর হার হচ্ছে ১৪ শতাংশ। ভারতে এটা ১৭ শতাংশ, দক্ষিণ কোরিয়ায় ৯৬ শতাংশ, সিঙ্গাপুরে ৭৪ শতাংশ, জাপানে ৭৫ শতাংশ, চীনে ৭৫ শতাংশ, যুক্তরাজ্যে ৪৩ শতাংশ, ইউরোপীয় ইউনিয়নে কারিগরি শিক্ষায় শিক্ষিত জনগোষ্ঠীর হার হচ্ছে ৬০ শতাংশ। যে দেশের জনগণ যত বেশি কারিগরি শিক্ষায় শিক্ষিত সেই দেশে বেকার সমস্যা তত কম। কারণ প্রকৃত কারিগরি শিক্ষায় শিক্ষিত একজন মানুষ কখনই দীর্ঘমেয়াদে কর্মহীন থাকতে পারে না। বাংলাদেশে ভয়াবহ বেকার সমস্যার অন্যতম কারণ হচ্ছে কারিগরি শিক্ষার অপ্রতুলতা। আর যারা বিভিন্নভাবে কর্মসংস্থানের সুযোগ পাচ্ছেন তাদের মধ্যেও ছদ্ম বেকার বা প্রচ্ছন্ন বেকারের হার খুব একটা কম নয়। উল্লেখ্য, অর্থনীতির পরিভাষায় যোগ্যতা অনুযায়ী উপযুক্ত কাজ খুঁজে পাওয়াকেই কর্মসংস্থান বলে। একজন মানুষ যেনতেন কাজের মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করলেই তাকে পূর্ণ কর্মসংস্থান বলা যায় না। যিনি কাজ করবেন তার উপার্জিত অর্থ দ্বারা স্ট্যাটাস অনুযায়ী ৫-৬ জন সদস্যের পরিবারের ভরণ-পোষণের ব্যবস্থা করতে পারলেই তাকে পূর্ণ কর্মসংস্থান করা যেতে পারে। একজন ইঞ্জিনিয়ার যদি কোনো সওদাগরি প্রতিষ্ঠানে ম্যানেজারের দায়িত্ব পালন করেন তাকে কখনই পূর্ণ কর্মসংস্থান বলা যাবে না।
আমাদের দেশের ব্যক্তি মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানগুলোতে যে বেতন-ভাতা প্রদান করা হয় তা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই পূর্ণ কর্মসংস্থানের সংজ্ঞায় পড়ে না। উন্নত দেশগুলোতে যেভাবে বেকারত্বকে সংজ্ঞায়িত করা হয় তা আমাদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে না। কারণ তাদের দেশে বেকার ভাতা প্রদান করা হয়। কাজেই তাদের বেকার আর বাংলাদেশের বেকারের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে।
বাংলাদেশ যেভাবে অর্থনৈতিক উন্নয়ন অর্জন করে চলেছে তাকে টেকসই করতে হলে আমাদের দেশব্যাপী উদ্যোক্তা উন্নয়নের লক্ষ্যে কাজ করতে হবে। বাংলাদেশ ইনভেস্টমেন্ট ডেভেলপমেন্ট অথরিটি (বিডা) দেশব্যাপী ২০ হাজার উদ্যোক্তা সৃষ্টির লক্ষ্যে ব্যাপকভিত্তিক প্রশিক্ষণ কর্মসূচি হাতে নিয়েছে। শুধু এই একটি উদ্যোগের মাধ্যমে উদ্যোক্তা উন্নয়নের মতো বিশাল কর্মযজ্ঞ সম্পাদন করা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। উদ্যোক্তা উন্নয়ন করতে হলে মাধ্যমিক শিক্ষা পর্যায় থেকেই উদ্যোক্তা উন্নয়ন নিয়ে কাজ শুরু করতে হবে। এ ছাড়া যারা কর্মসংস্থান উপলক্ষে বিদেশে গমন করেন তাদেরও উপযুক্ত ট্রেডভিত্তিক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। এটা করা গেলে তুলনামূলক স্বল্পসংখ্যক জনশক্তি বিদেশে প্রেরণ করেই আরও বেশি পরিমাণে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা যেতে পারে। জনসংখ্যা তা পরিকল্পিতই হোক আর অপরিকল্পিতই হোকÑ এটা কখনই সমস্যা নয়। সমস্যা হচ্ছেÑ জনসংখ্যাকে জনসম্পদে পরিণত করার ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতা।

ষ অবসরপ্রাপ্ত ব্যাংকার










সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত


ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: কমলেশ রায়, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড-এর পক্ষে প্রকাশক গাজী আহমেদ উল্লাহ
নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।

ফোন : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৭৫। ই-মেইল : [email protected]