ই-পেপার বিজ্ঞাপনের তালিকা রোববার ২০ সেপ্টেম্বর ২০২০ ৫ আশ্বিন ১৪২৭
ই-পেপার রোববার ২০ সেপ্টেম্বর ২০২০

সরেজমিন হাজারীবাগ থানা
দিনে নীরব, রাতে সরব ভেতরে চলে রফাদফা
মোস্তফা ইমরুল কায়েস
প্রকাশ: রোববার, ২৬ জানুয়ারি, ২০২০, ১২:০০ এএম আপডেট: ২৬.০১.২০২০ ১২:০৮ এএম | প্রিন্ট সংস্করণ  Count : 106

সোমবার বেলা ১১টা। রাজধানীর হাজারীবাগ থানার বাইরে তখন সাত-আটজনের জটলা। ফিসফিস করে তারা কথা বলছিলেন। কিছুক্ষণের মধ্যেই চলে আসল প্রিজন ভ্যান। ভ্যানের পাশে দাঁড়িয়ে আসামির এক স্বজন বলছিলেন ‘টাকাগুলো ভালো করে রাখিস। ওইখানে খাইতে হইবো তো।’ আটক ব্যক্তির আরেকজন ইশারায় সিগারেট তাকে দেওয়া হয়নি তা ইঙ্গিতে জানিয়ে দিলেন বন্ধুকে। একে একে সবাই উঠলে ভ্যান চলে যায় প্রধান সড়কের দিকে। কিছুক্ষণ পরই ফাঁকা হয়ে যায় থানার সামনের রাস্তা। ওইদিন আরও কিছু সময় থানা ও আশপাশে অবস্থান করে অনেকটা সুনসান নীরব অবস্থা দেখা যায়। তবে সে রাতে অবস্থানকালে দেখা গেছে উল্টো চিত্র। থানায় প্রচুর লোকসমাগম। এর মধ্যে ছিলেন স্থানীয় কাউন্সিলর প্রার্থী, রাজনৈতিক নেতা ও এলাকার চিহ্নিত কিছু দালাল।
সোমবার ও মঙ্গলবার রাজধানীর হাজারীবাগ থানার কার্যক্রম সরেজমিনে পর্যবেক্ষণকালে এমনই চিত্র দেখা যায়। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, থানার ভেতরেই একটি কক্ষে মূলত রাতে বিভিন্ন বিষয়ে রফাদফা অনুষ্ঠিত হয়। এ কারণে দিনে থানা প্রাঙ্গণ অনেকটা নীরব থাকলেও রাতে সরব হয়ে ওঠে। তবে প্রতিদিন সকালে হাজারীবাগ থানার সামনে ভুক্তভোগী পরিবারের লোকজনের ভিড় থাকে বলেও জানান স্থানীয়রা। কোনো দিন কম, কোনো দিন বেশি। এ থানায় বছরে সাধারণ ডায়েরির সংখ্যাও কম। এই জিডি করতে গিয়ে অবশ্য কেউ হয়রানির শিকার হননি। কারও কাছে টাকাও চাওয়া হয়নি।
গত সোমবারের ওই প্রিজন ভ্যানে তোলা আসামিদের স্বজনরা জানান, আদালতে চালান দেওয়া ব্যক্তিদের অধিকাংশ নিউমার্কেট থানায় হকারি করেন। বাকিরা চাকরি করেন। হাজারীবাগের খালপাড় এলাকা থেকে আটক করা হয়েছিল বলে পরিবারগুলো ও মামলা সূত্রে জানিয়েছে। তবে ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর অভিযোগ, তাদের জুয়ার আসর থেকে আটক করা হয়েছিল। কিন্তু পরদিন মাদক মামলায় চালান দেওয়া হয়েছে। ভুক্তভোগী ব্যক্তিদের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক স্বজন বলেন, রাত ১টার দিকে খবর পেয়ে থানায় গেলাম। শুনলাম তাদের নাকি জুয়ার আসর থেকে আটক করা হয়েছে। আবার এখন শুনছি, তাদের নামে মাদকের মামলা দেওয়া হয়েছে। তাদের কাছ থেকে নাকি ইয়াবাও উদ্ধার হয়েছে। আসলে বিষয়টি হাস্যকর। নিরপরাধ এ মানুষগুলোর জীবন হুমকির মুখে ফেলে দেওয়া হলো। অনেকের মামলায় লড়বে তারও টাকা নেই। অথচ তারা নাকি ইয়াবাসহ আটক হয়েছে। তবে এ ধরনের ঘটনা হাজারীবাগ থানায় প্রায়ই ঘটে থাকে। ভুক্তভোগীদের অনেকে অভিযোগ করেন আবার কেউ কেউ সামাজিক মর্যাদার ভয়ে চেপে যান বলে জানা গেছে। ১৭ ব্যক্তিকে আটকের বিষয়ে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা হাজারীবাগ থানার এসআই তৌহিদুল ইসলাম সময়ের আলোকে বলেন, তাদের ইয়াবাসহ আটক করা হয়েছিল। তারা সবাই ইয়াবা ব্যবসায়ী। পরিবার যে অভিযোগ করেছে তা সঠিক নয়।
সোমবার থানার সামনে সকাল থেকে রাত ১২টা পর্যন্ত অবস্থান করা হয়। এদিন বিকাল পর্যন্ত মাত্র একজন ব্যক্তিকে সাধারণ ডায়েরি করতে আসতে দেখা যায়। বাকি সময় ফাঁকাই ছিল থানা চত্বর। কিন্তু সন্ধ্যা নামলেই থানার সামনে ছুটে আসেন লোকজন। সে দিন হাজারীবাগ থানার আশপাশ, ভেতর ও বাইরে অবস্থান করে এসব তথ্য পাওয়া গেছে। এ থানায় দালাল কম। বাইরের লোক না থাকায় থানার এসআই ও কনস্টেবলরাই দালালি করে। থানার ভেতর বাইর সারা দিন ফাঁকাই থাকে। কিন্তু প্রতি সন্ধ্যার পর মানুষের জটলা বাড়তে থাকে। সঙ্গে যোগ দেন থানার কিছু পুলিশ সদস্য। যাদের যোগসাজশে শুরু হয় তদবির ও রফাদফা। তাদের কথায় রাজি হলে আসামির স্বজনের সঙ্গে রফাদফা চলে থানার ভেতরে বসে। সমঝোতায় গ্রিন সিগনাল মিললে তবেই আসামিকে ছাড়া হয়। নয় তো পরদিন আদালতে চালান। থানার দ্বিতীয় তলার রুমে বসেন পুলিশের সদস্য এসআই মনির। সেই মূলত এসব তদবির ও রফাদফার প্রধান বলে জানা গেছে।
একই দিন রাত ১১টার দিকে ১৫নং ওয়ার্ডের কাউন্সিলর প্রার্থী ইলিয়াসুর রহমান বাবলাসহ এক ব্যক্তি থানায় প্রবেশ করেন এবং প্রায় ১৫ মিনিটের মতো সময় অবস্থান করে বের হয়ে আসেন তারা। পরে জানা গেল, নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বাবলাসহ আশপাশের অনেক নেতাই থানায় আসেন। রাত হলেই থানার ভেতরে ভিড় বাড়তে থাকে রাজনৈতিক নেতাদের।
ওই এলাকার ভুক্তভোগী মানুষ অভিযোগ করেন, হাজারীবাগ থানা এলাকায় পুলিশ সদস্যদের চাঁদা দিয়েই গাড়ি চালাতে হয়। প্রধান সড়কে এমনটি না ঘটলেও, বেড়িবাঁধ এলাকার সড়কে ঠিকই ঘটে। সেখানে নিয়মিত চাঁদা দিতে হয়। প্রতিটি হিউম্যান হলার, লেগুনা, চামড়া তৈরির কাঁচামাল ও নিষিদ্ধ পলিথিনের ট্রাক বহনেও গুনতে হয় মাসিক, সাপ্তাহিক ও দৈনিক ভিত্তিতে চাঁদা।
তবে এ থানায় বিনা অপরাধে মানুষকে ধরে হয়রানির অভিযোগও কম নয়। তার সত্যতাও মিলল সোমবার সরেজমিনে। সেদিন সন্ধ্যার পর থানার সামনে ছুটে আসেন ইয়াসিন ও কাওসার নামের দুই যুবকসহ আরও কয়েকজন। তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, এলিফ্যান্ট রোড থেকে শফিকুল ইসলাম নামের এক যুবককে ওইদিন বিকালে হাজারীবাগ থানা পুলিশ আটক করে। এর আগে শফিকুলের পুরনো ইলেক্ট্রনিক্সের দোকানে ল্যাপটপ বিক্রির জন্য এক যুবক আসেন। ওই সময় শফিকুল সেটি ক্রয়ের জন্য মেমো দেখতে চান এবং দরদাম করছিলেন। এরই মধ্যে সেখানে কয়েকজন পুলিশ সদস্য হাজির হন এবং ওই যুবকসহ তাকে আটক করে থানায় নিয়ে আসেন। এরপরই সেখানে ছুটে যান তারা। সে দিন রাত সাড়ে ১টা অবধি থেকে শফিকুলকে টাকার বিনিময়ে ছাড়ানো সম্ভব হয়েছিল বলে শফিকুলের বন্ধুদের অভিযোগ। কিন্তু সেই টাকাটা তারা কাকে দিয়েছেন সেটি বলতে চাননি। রাত সাড়ে ১০টা থেকে সাড়ে ১১টা পর্যন্ত তারা থানার ভেতরে অবস্থান করেন। এরপর ১২টার দিকে বের হয়ে আসেন এবং আবারও জড়ো হয়ে আলাপ আলোচনা করতে থাকেন। একপর্যায় থানার এক ব্যক্তির ফোন পেয়ে থানার ভেতরে প্রবেশ করেন এবং গভীর রাতে শফিকুলকে ছাড়িয়ে নেন তারা। এরপর সে পরিবারটি সোজা বাসার দিকে চলে যায়।
অভিযোগ রয়েছেÑ শুধু রুবেল নয়, তার মতো প্রতিদিন অনেক যুবককেই এভাবে বিনা অপরাধে ধরে আনা হয় এবং টাকার বিনিময়ে ছেড়ে দেয় হাজারীবাগ থানা পুলিশের একটি চক্র। এ চক্রের মূল হোতা মনির নামে এক এসআই। এ ছাড়াও এই চক্রে রয়েছে এসআই হান্নান, এসআই আল মোমিন, এসআই জয়নাল, এসআই মোশারফ, এসআই তারিক, এসআই তরিকুল, এসআই আসাদ, এসআই অজয়, এএসআই মিজান। চক্রের হোতা মনির মূলত বসেন দ্বিতীয় তলার একটি কক্ষে। মনির সারা দিন বিভিন্ন জায়গায় ডিউটি পালনকালে সাধারণ মানুষদের ধরে আনেন এরপর আটকে রেখে টাকা আদায় করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। থানার এসআইরা মানুষকে আটকে টাকা আদায় করে। রাত ১০টায় ডিউটি শেষ হলেও হাজারীবাগ থানায় কর্মরত (কুড়িগ্রাম উলিপুর উপজেলা বাড়ি) এসআই (নেমপ্লেট ছিল না) সেখানে সাদা পোশাকে অবস্থান করেন এবং তার এক সহকর্মী মিলে এক ব্যক্তির সঙ্গে আটক নিয়ে রফাদফা করছিলেন। এরপর সাড়ে ১১টার দিকে তিনি তার মোটরসাইকেল চালিয়ে বাসার দিকে চলে যান। তবে তখনও তার কোমরের পেছনে হ্যান্ডকাপ ছিল। এ বিষয়ে হাজারীবাগ থানার ওসি ইকরাম হোসেনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তাকে পাওয়া যায়নি।








সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত


ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: কমলেশ রায়, নির্বাহী সম্পাদক : শাহনেওয়াজ দুলাল, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড-এর পক্ষে
প্রকাশক গাজী আহমেদ উল্লাহ। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।

ফোন : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৭৫। ই-মেইল : [email protected]