ই-পেপার বিজ্ঞাপনের তালিকা মঙ্গলবার ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২০ ১২ ফাল্গুন ১৪২৬
ই-পেপার মঙ্গলবার ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২০

পদ্ধতিগত জটিলতায় কাক্সিক্ষত সুফল  দিচ্ছে না কৃষি ও পল্লী ঋণ
এম এ খালেক
প্রকাশ: শনিবার, ১৫ ফেব্রুয়ারি, ২০২০, ১২:০০ এএম | প্রিন্ট সংস্করণ  Count : 11

পল্লী এলাকার ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা সৃষ্টি এবং তাদের জন্য তুলনামূলক স্বল্প সুদে ঋণপ্রাপ্তি নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ২০০৯-২০১০ অর্থবছর থেকে কৃষি ও পল্লী ঋণ নামে এক বিশেষ ঋণদান কার্যক্রম শুরু করা হয়েছে। অনেকেই এই ঋণদান কার্যক্রমকে সাধারণ কৃষি ঋণ মনে করলেও আসলে এটা বিশেষ এক ধরনের ঋণদান কার্যক্রম যার মূল উদ্দেশ্যই হচ্ছে পল্লী এলাকার কৃষিনির্ভর ক্ষুদ্র উদ্যোগ গড়ে তোলা। কৃষি ও পল্লী ঋণের সুদহারও প্রচলিত যেকোনো ব্যাংক ঋণের চেয়ে তুলনামূলকভাবে কম। যখন ট্র্যাডিশনাল অন্যান্য ঋণের ক্ষেত্রে ১৩-১৪ শতাংশ হারে সুদারোপ করা হচ্ছিল তখনও কৃষি ও পল্লী ঋণের সুদহার ছিল ৯ শতাংশ। আজকে ব্যাংক ঋণের ক্ষেত্রে সিঙ্গেল জিডিট সুদহার আরোপের যে প্রচেষ্টা চলছে, অনেক আগে থেকেই কৃষি ও পল্লী ঋণ কার্যক্রমে তা বাস্তবায়িত হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক দেশে ব্যবসারত বাণিজ্যিক ব্যাংক এবং বিশেষায়িত ব্যাংকের মাধ্যমে এই ঋণ কৃষকদের মাঝে বিতরণের ব্যবস্থা করছে। প্রত্যেকটি ব্যাংকের জন্য কৃষি ও পল্লী ঋণদানের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে দেওয়া হয়। নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী ব্যাংকগুলো কৃষি ও পল্লী ঋণ প্রদানে বাধ্য। কোনো ব্যাংক যদি নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী এই ঋণ বিতরণে ব্যর্থ হয় তাহলে ঋণদানের পর লক্ষ্যমাত্রার অবশিষ্ট অর্থ বাংলাদেশ ব্যাংক তাদের দায়িত্বে অধিকারে নিয়ে একটি সুদবিহীন বøক অ্যাকাউন্টে সংরক্ষণ করে। পরবর্তী অর্থবছরে সেই ব্যাংকের নতুন শাখা খোলার অনুমতি দানের ক্ষেত্রে কঠোরতা অবলম্বন করা হয়। সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের রেটিংয়ের ওপর এর প্রভাব পড়ে। ফলে ব্যাংকগুলো চেষ্টা করে কীভাবে কৃষি ও পল্লী ঋণ বিতরণের নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা যায়।
প্রতিবছরই কৃষি ও পল্লী ঋণ বিতরণের হার বাড়ছে। কিন্তু কিছু পদ্ধতিগত জটিলতার কারণে
তৃণমূল পর্যায়ের কৃষি খাতভিত্তিক উদ্যোক্তারা এর সুফল পুরোপুরি ভোগ করতে পারছেন না বরং শোষণের শিকার হচ্ছেন। প্রতিবছরই কৃষি ও পল্লী ঋণ বিতরণের লক্ষ্যমাত্রা বৃদ্ধি করা হচ্ছে। কিন্তু পদ্ধতিগত জটিলতা নিরসনের কোনো উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে না। ফলে একটি মহতী ঋণদান কার্যক্রম সঠিকভাবে উদ্যোক্তাদের উপকারে আসছে না। তাই কৃষি ও পল্লী ঋণের সুফল কাজে লাগিয়ে পল্লী এলাকায় সম্ভাবনাময় উদ্যোক্তা শ্রেণি গড়ে তুলতে হলে এখই এই ঋণদান কার্যক্রমের ত্রæটিগুলো সংশোধনের উদ্যোগ নিতে হবে।
পল্লী এলাকায় কৃষি বহিভর্‚ত অর্থনৈতিক কর্মকাÐ প্রতিনিয়তই বৃদ্ধি পাচ্ছে। সরকারও চেষ্টা করছে কীভাবে পল্লী এলাকায় কৃষিজাত কাঁচামালনির্ভর উদ্যোক্তা শ্রেণি গড়ে তোলা যায়। যেহেতু ১ এপ্রিল থেকে ব্যাংক ঋণের সুদের হার সিঙ্গেল ডিজিটে নামিয়ে আনা হচ্ছে তাই আশা করা যায় কৃষি ও পল্লী ঋণের ওপর আরোপিত সুদহারও আনুপাতিকভাবে কমে আসবে। সরকার শহরের সুবিধা গ্রামে সম্প্রসারণে প্রতিশ্রæতিবদ্ধ। এই মহা কর্মযজ্ঞে কৃষি ও পল্লী ঋণ ব্যাপক ভ‚মিকা রাখতে পারে। বাংলাদেশের মোট শ্রমশক্তির ৬০ থেকে ৬৫ শতাংশ এখনও প্রত্যক্ষভাবে কৃষি সেক্টরের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্যি যে, আমরা এখনও কৃষি খাতকে প্রকৃতির দয়ার ওপর ছেড়ে দিয়ে উৎপাদন বৃদ্ধির স্বপ্ন দেখছি।
কৃষি খাতের সম্ভাবনাকে সঠিকভাবে কাজে লাগাতে হলে সাধারণ কৃষি খাতকে দ্রæত কৃষিনির্ভর শিল্পে রূপান্তর করতে হবে। কৃষি ও পল্লী ঋণ এক্ষেত্রে সহায়ক ভ‚মিকা পালন করতে পারে। এই ঋণদান কার্যক্রমের প্রসারও বেশ ভালো কিন্তু তা সংশ্লিষ্টদের কতটা উপকারে আসছে সেটাই বিবেচ্য।
২০০৯-১০ অর্থবছরে কৃষি ও পল্লী ঋণ খাতে ৯ হাজার কোটি টাকার কিছু বেশি ঋণ মঞ্জুরের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল। ব্যাংকগুলোর মোট ঋণদান কার্যক্রমের অন্তত ২ শতাংশ কৃষি ও পল্লী ঋণ খাতে বরাদ্দ করা বাধ্যতামূলক করা হয়। এক দশকের ব্যবধানে ২০১৮-১৯ অর্থবছরে কৃষি ও পল্লী ঋণ বিতরণের লক্ষ্যমাত্রা ১৫০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ২১ হাজার ৮০০ কোটি টাকায় উন্নীত করা হয়। কিন্তু বছর শেষে কৃষি ও পল্লী ঋণ বিতরণের পরিমাণ নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা অতিক্রম করে যায়।
এই খাতে মোট ঋণ বিতরণের পরিমাণ দাঁড়ায় ২৩ হাজার ৬১৬ কোটি ২৫ লাখ টাকা, যা নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ৮ শতাংশ বেশি। চলতি অর্থবছরে কৃষি ও পল্লী ঋণ বিতরণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারিত রয়েছে ২৪ হাজার ১২৪ কোটি টাকা। অর্থবছরের প্রথম ৬ মাসে (জুলাই-ডিসেম্বর) ব্যাংকগুলো ১০ হাজার ৮০০ কোটি টাকা ঋণ বিতরণ করেছে, যা নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার ৩৮ শতাংশের মতো। চলতি অর্থবছরের কৃষি ও পল্লী ঋণ বিতরণের যে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে তার মধ্যে রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংক ও বিশেষায়িত ব্যাংকের লক্ষ্যমাত্রা হচ্ছে ১০ হাজার ৩৭৫ কোটি টাকা এবং ব্যক্তি মালিকানাধীন ও বিদেশি ব্যাংকের মিলিত লক্ষ্যমাত্রা হচ্ছে ১৩ হাজার ৭৪৯ কোটি টাকা। ডিসেম্বর, ২০১৯ পর্যন্ত নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন বাণিজ্যিক ব্যাংক ও বিশেষায়িত ব্যাংকগুলো বিতরণ করেছে ৫ হাজার ৪২৮ কোটি টাকা। অবশিষ্ট ৫ হাজার ৩৭২ কোটি ১৪ লাখ টাকা বিতরণ করেছে ব্যক্তি মালিকানাধীন ও বিদেশি ব্যাংকগুলো।
চলতি অর্থবছরের কৃষি ও পল্লী ঋণ বিতরণ কার্যক্রমে বেশ কিছু নতুন আইটেম যোগ করা হয়েছে। যেমন, কাজু বাদাম ও থাইল্যান্ডের ফল রাম্বুটান চাষ, কচুরিপানার ডাবল বেড পদ্ধতিতে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে আলু চাষ, বাণিজ্যিক ভিত্তিতে ছাগল ও ভেড়া পালন, বাণিজ্যিক ভিত্তিতে রেশম উৎপাদন ইত্যাদি। কৃষি ও পল্লী ঋণ বিতরণ নীতিমালায় বেশ কিছু বিষয়ে পরিবর্তন সাধন করা হয়েছে। বিশেষ করে মাইক্রো ফাইন্যান্স ইনস্টিটিউশন (এমএফআই) নির্ভরতা কমিয়ে নিজস্ব শাখা ও এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে ঋণ বিতরণ উল্লেখযোগ্য।
পল্লী ও কৃষি ঋণের ক্ষেত্রে সবচেয়ে সমস্যার সৃষ্টি করছে ঋণ বিতরণের ক্ষেত্রে ব্যাংকগুলোর অতিমাত্রায় এমএফআই নির্ভরতা। কৃষি ও পল্লী ঋণ প্রচলিত ঋণদান কার্যক্রমের মতো নয়। এই ঋণ বিতরণ করতে হলে ব্যাংক ম্যানেজারদের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে সম্ভাবনাময় গ্রামীণ উদ্যোক্তাদের খুঁজে বের করতে হয়। এ ছাড়া এই ঋণের সুদের হার তুলনামূলকভাবে কম। ট্রেডিশনাল কমার্শিয়াল ব্যাংকগুলো কৃষি ও পল্লী ঋণের মতো ঋণ বিতরণে অভ্যস্থ নয়। এ ছাড়া অধিকাংশ বাণিজ্যিক ব্যাংকের পল্লী এলাকায় শাখা নেই। ফলে কৃষি ও পল্লী ঋণ বিতরণের জন্য দূরদূরান্ত পর্যন্ত যেতে হয়। এসব কারণে ব্যাংকগুলো এমএফআই অর্থাৎ এনজিওর মাধ্যমে কৃষি ও পল্লী ঋণ বিতরণে বেশি তৎপর থাকে। ব্যাংক সরাসরি কৃষক বা
কৃষিনির্ভর উদ্যোক্তাদের ঋণ প্রদান করলে ৯ শতাংশ সুদহার প্রয়োগ করতে পারে। এনজিওর মাধ্যমে হোলসেল লিঙ্কেজে ঋণ বিতরণ করা হলে ব্যাংক ৯ শতাংশ সুদহার প্রয়োগ করতে পারে। অর্থাৎ ব্যাংক সরাসরি ঋণ বিতরণ করলে যে সুদ পায় এনজিওর মাধ্যমে বিতরণ করলেও একই সুদ পায়। কিন্তু এনজিওর সুদ আরোপের ক্ষেত্রে নীতিমালায় বলা হয়েছে, তারা এমআরএ (মাইক্রো ক্রেডিট রেগুলেটরি অথরিটি) নির্ধারিত সুদহার প্রয়োগ করতে পারবে। আগে এমআরএ নির্ধারিত সুদহার ছিল ২৭ শতাংশ, যা বর্তমানে ২৪ শতাংশে নামিয়ে আনা হয়েছে। সমস্যা দেখা দিয়েছে এখানেই।
ব্যাংক সরাসরি উদ্যোক্তা বা টার্গেট গ্রæপ বা একক উদ্যোক্তার নিকট ঋণ বিতরণ করলে ৫ লাখ টাকা হতে ১০ লাখ টাকা বিতরণ করতে পারবে। কিন্তু এনজিও হোলসেল লিঙ্কেজে ঋণ বিতরণের ক্ষেত্রে এ ধরনের কোনো সীমা নির্ধারিত নেই। তাদের নিকট একবারে ৫০ কোটি বা তারও বেশি ঋণ বিতরণ করা যায়। ব্যাংকগুলো তাদের পরিশ্রম বাঁচানোর জন্য সরাসরি উদ্যোক্তাদের নিকট ঋণ বিতরণের চেয়ে এনজিও লিঙ্কেজে ঋণ বিতরণেই বেশি আগ্রহী। অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে যে ১০ হাজার ৮০০ কোটি টাকা ঋণ বিতরণ করা হয়েছে। এর বেশিরভাগই এনজিও লিঙ্কেজে বিতরণকৃত। এই পদ্ধতিতে ঋণ বিতরণের ফলে ব্যাংক এবং সংশ্লিষ্ট এনজিওরা লাভবান হলেও টার্গেট গ্রæপ যে গ্রামীণ উদ্যোক্তাÑ তারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কারণ যে ঋণ তাদের ৯ শতাংশ সুদে পাবার কথা ছিল তা তারা পাচ্ছে ২৪ শতাংশ সুদে। প্রচলিত কোনো ব্যাংক ঋণের সুদের হার ২৪ শতাংশ নেই। তৃণমূল পর্যায়ের উদ্যোক্তাদের জন্য কৃষি ও পল্লী ঋণের সুফল প্রাপ্তি নিশ্চিত করতে হলে ব্যাংকগুলোকে সরাসরি ঋণ বিতরণে বাধ্য করতে হবে। অথবা এনজিওদের সর্বোচ্চ সুদহার ৯ শতাংশ নির্ধারণ করে দিতে হবে। বিষয়টি এমন হতে পারেÑ যেহেতু ব্যাংক নিজ উদ্যোগে ঋণ বিতরণে সমর্থ নয় তাই তারা এনজিওদের ঋণ প্রদানের ক্ষেত্রে ব্যাংক রেটের সঙ্গে এক শতাংশ সার্ভিস চার্জ রেখে ৬ শতাংশ সুদহারে ঋণ প্রদান করবে। আর এনজিওরা তৃণমূল পর্যায়ে ঋণদানের ক্ষেত্রে ৯ শতাংশ সুদহার প্রয়োগ করবে। অনেকেই বলে থাকেন, এনজিওদের অপারেটিং কস্ট অনেক বেশি। তাই তাদের সুদহারও বেশি হওয়াটাই বাঞ্ছনীয়। আমার প্রশ্ন হচ্ছেÑ এমন একটি মহতী ঋণদান কার্যক্রমে এনজিওদের সম্পৃক্ত না করলেই কি নয়?

অবসরপ্রাপ্ত ব্যাংকার




সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত


ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: কমলেশ রায়, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড-এর পক্ষে প্রকাশক গাজী আহমেদ উল্লাহ
নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।

ফোন : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৭৫। ই-মেইল : [email protected]